আমার সেজকাকু মান্না দে (অষ্টম পর্ব)

সুদেব দে

সেজকাকুকে নিয়ে লিখছি, সে লেখা যে আপনাদের ভালো লাগছে, তার জন্য বারবার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। কাকার বর্ণবহুল জীবনের বিভিন্ন দিক, যখন যেমন মনে পড়ছে, সেভাবেই স্মৃতি ঘেঁটে তুলে আনছি আপনাদের কাছে। এবছর ২৩শে জানুয়ারি আমরা পেরিয়ে এলাম নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী। বাঙালি হিসাবে নেতাজি সুভাষকে নিয়ে আমার সেজকাকু মান্না দে’র কিছু বিশেষ অনুভবের জায়গা ছিল। কাকাকে নিয়ে লেখা বইগুলোতে তেমন কিছু প্রসঙ্গ জায়গা পেয়েছে বটে, তবু ছোটবেলা থেকে তাঁর কাছাকাছি থাকার জন্য আমি যেটুকু দেখেছি, শুনেছি সেটুকুই আজ তুলে ধরব আপনাদের কাছে।

ছোটবেলা থেকেই আমাদের বাবা-কাকারা বলতেন, ‘ঋজু শিরদাঁড়ার মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবে। নিজের মেরুদণ্ড যেন সোজা থাকে। কখনও এমন কাজ করবে না, যেটা লোকজনের থেকে লুকোতে হয়, বা যার জন্য নিজেকে লুকিয়ে রাখতে হয়।’ তখন এসব কথার মানে বুঝিনি, বুঝেছি অনেক পরে। আমরা যেখানে থাকতাম, মদন ঘোষ লেনের সেই বাড়ি থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বেই সিমলেপাড়া, স্বামী বিবেকানন্দের বাড়ি। আমাদের বাড়ি থেকেই একরকম দেখা যেত সে বাড়ি। এই পরিবেশে বড় হওয়ার জন্য ছোটবেলা থেকেই বাবা- কাকার কাছে প্রায়ই শুনতাম স্বামীজির কথা, নেতাজীর কথা।

ত্রিশ-চল্লিশের দশকে যখন কাকার বয়স কম, কলেজে পড়াশোনা করছেন, গোবর গুহ’র কুস্তির আখড়ায় শরীরচর্চা করছেন, টুকটাক গানবাজনাও করছেন, তখন অন্যদিকে স্বাধীনতা আন্দোলনে সারা দেশ উত্তাল। কলকাতার পথে মিটিং মিছিল লেগেই থাকত সেসময়। একদিকে গান্ধীজির অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলন, আর অন্যদিকে বাঙালির কাছে দেশাত্মবোধের মূর্ত প্রতীক নেতাজি সুভাষের ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ- এই দুইই কমবয়েসে প্রভাবিত করেছিল সেজকাকুকে। গান্ধিজিকে ছোটো না করেই বলছি, সেই তরুণবয়সে বাবা-কাকাদের মধ্যে নেতাজির প্রভাব অনেক বেশি ছিল। কাকার মুখে শুনেছি, সেই কলেজজীবনে যখন যেখানেই সুভাষচন্দ্রের সভা থাকত, তাঁরা ছুটে যেতেন, শুধু নেতাজিকে একবার চোখের দেখা দেখবেন বলে, তাঁর কথা শুনবেন বলে।

সেজকাকুর মুখে শুনেছি, নেতাজি বলতেন, ‘আমাদের এক গালে চড় মারলে, অন্য গাল বাড়িয়ে দেব না, বরং তার সমুচিত জবাব দেব’, জানিনা আমি তাঁর উক্তিটা একেবারে ঠিকঠাক বলতে পারলাম কী না! কিন্তু বাবা-কাকাদের মুখে এসব গল্প শুনে ছোটবেলায় আমরাও ভীষণ উজ্জীবিত হয়েছি।

সেজকাকুর মুখে শুনেছি, নেতাজির সঙ্গে তাঁর প্রথম মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয় থিয়েটার রোডে ‘জাহাজ বাড়ি’ নামের একটি বাড়িতে। যে সময়ের কথা বলছি, তখন আমার দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে বাংলার খুবই জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী, তাঁকে কোনও আসরে বা অনুষ্ঠানে পাওয়া উদ্যোক্তাদের জন্য সেসময় খুব সহজ ছিল না৷ থিয়েটার রোডের এই ‘জাহাজ বাড়ি’র সেদিন গৃহপ্রবেশ। সেই গৃহপ্রবেশে সঙ্গীত পরিবেশন করার জন্য আমন্ত্রিত ছিলেন আমার দাদু। দাদুর সঙ্গে নানা অনুষ্ঠানে সেসময় পালা করে কখনও বাবা, কখনও সেজকাকা, কখনও বা ছোটকাকা প্রভাস দে’ও যেতেন। জাহাজবাড়ির ক্ষেত্রে সঙ্গে গেছিলেন সেজকাকু।

সেই জাহাজবাড়ি, আজ দৈন্যদশায়

অনেকদিন আগেকার কথা, তবু জাহাজবাড়িতে সেদিনের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়তে দেখেছি সেজকাকুকে। খুব সম্ভ্রান্ত বাড়ি ছিল ওই জাহাজবাড়ি। তার উপর গান গাইছেন কৃষ্ণচন্দ্র দে, লোক তো উপচে পড়বেই। সেজকাকু আমাকে বলেছিলেন, “আমি বসে আছি, বাবুকাকা ( আমার দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে) ফরাস পেতে গানবাজনা করছেন, প্রচুর লোকজন আসছে। হঠাৎ দেখি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আমার স্বপ্নের পুরুষ, আমার আইডল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস। অত বড়মাপের একজন মানুষ, আমি তো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি! সে যে কী অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করে বোঝানো সম্ভব নয়!”

নেতাজি সুভাষকে কাছ থেকে দেখার সেই প্রথম অভিজ্ঞতা সেজকাকুর মনে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা ছিল। আজীবন নেতাজির আদর্শ আর বাণী- দুইই কাকাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে গেছে। আমরা তো দুর্ভাগা, অনেক পরে জন্মানোয় নেতাজির মতো অমন একজন মানুষকে চোখের দেখাটুকুও দেখতে পারিনি।নেতাজি সুভাষকে নিয়ে সেজকাকু একটা কথা খুব বলতেন, বলতেন, ‘অমন ডায়নামিক ব্যক্তিত্ব আমি আর দেখিনি।’ পরাধীন দেশে সেসময় স্বাধীনতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লড়াই করছেন বিপ্লবীরা। সেই অগ্নিযুগে নেতাজির বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় দেওয়া অগ্নিগর্ভ সব বক্তৃতা আমার বাবা-কাকাদের ভিতরেও আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। এমনিতে খুব কঠোর অনুশাসন ছিল আমাদের বাড়িতে, আমার মেজদাদু হেমচন্দ্র দে তো খুবই কড়াধাতের মানুষ ছিলেন। বাড়ির সেই পরিবেশ থেকে সরাসরি স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভাবাই যেত না। কিন্তু তখনকার বৈপ্লবিক কার্যকলাপ, ইংরেজের গাড়িতে বোম মারা, বা ফাঁসির মঞ্চে হাসিমুখে ঝুলে পড়া, এইসব কিছু আমাদের মতো রক্ষণশীল পরিবারের তরুণদের অবচেতনেও ভীষণভাবে দেশপ্রেম জাগিয়ে দিয়েছিল।

এইপ্রসঙ্গে বলতেই হয়, মোহিনী চৌধুরীর লেখা, আমার দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে’র সুর করা আর গাওয়া ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ গানটির কথা। সেই অশান্ত সময়ে দাদুর উন্মুক্ত কণ্ঠে এই গান যেন জনপ্লাবন ডেকে এনেছিল। আমার জন্মের অনেক আগের ঘটনা এসব।

ঠিকঠাক প্রমাণ না থাকলেও অনেকের মুখেই শুনেছি, নেতাজি সুভাষচন্দ্রের পরিকল্পনায় কলকাতায় যখন বিখ্যাত প্রেক্ষাগৃহ ‘মহাজাতি সদন’এর দ্বারোদঘাটন হয়, তখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আর নেতাজির উপস্থিতিতে সেখানে সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন আমার দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে। সেদিন ওই অনুষ্ঠানে তিনি ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ গানটিও গেয়েছিলেন বলে শুনেছি নানা লোকের মুখে।

দাদুর সঙ্গে সেদিন অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন আমার যুবক বাবা আর সেজকাকু। নেতাজিকে কাছ থেকে দেখার সেটাও ছিল একটা বড় সুযোগ। এইসব দেশাত্মবোধক গানের একটা গভীর প্রভাব পড়েছিল বাবা-কাকাদের উপর। এক্টিভিস্ট না হলেও, সরাসরি স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে না পড়লেও, গভীর দেশপ্রেমের ভাব জেগে উঠেছিল তাঁদের মধ্যেও।

মহাজাতি সদনের অনুষ্ঠানে কবিগুরু আর নেতাজি

নেতাজির সঙ্গে যখন দেখা হচ্ছে, সেটা সম্ভবত ৩৭-৩৮ সাল, কাকাকের কলেজ জীবন চলছে। আমরা সবাই জানি, কাকা নিজেও অনেকবার কথাপ্রসঙ্গে বলেছেন, স্বামীজির জীবনদর্শনের বিরাট প্রভাব ছিল নেতাজির উপর। নেতাজির মতো ওইরকম দৃপ্ত পুরুষমানুষ খুব কমই জন্মেছে বাংলাদেশে।

এই কিছুদিন আগেই নেতাজি জন্মজয়ন্তী গেল। এই অবসরে মনে হল, সেজকাকুর নেতাজিপ্রেমের কথা যদি তুলে না ধরি, তাহলে তাঁর জীবনের একটা দিক অজানাই থেকে যাবে পাঠকদের কাছে। লিখতে বসে অনেক কথাই মনে পড়ছে। তখন দেশ স্বাধীন হয়েছে। প্রফেশনালি সঙ্গীতশিল্পী সেজকাকুর হিসাবে সুনামও হয়েছে। এইসময় ১৯৬৬ সাল নাগাদ ‘সুভাষচন্দ্র’ ছবিতে রজনীকান্ত সেনের লেখা ‘তব চরণ নিম্নে উৎসবময়ী’ গানটি গাওয়ার ডাক আসে সেজকাকুর কাছে। যাঁকে ছোটবেলা থেকে প্রায় দেবতার মতো সম্মান করেছেন, তাঁরই নামাঙ্কিত ছবিতে গান করার সুযোগ পেয়ে আশাতীত আনন্দ পেয়েছিলেন সেজকাকু। পরে তাঁর মুখে অনেকবার শুনেছি সে কথা। সেসময় লোকের মুখে মুখে ফিরত ‘সুভাষচন্দ্র’ ছবির সেই গান।

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় সলিল চৌধুরীর সুরে লেখা হয়েছিল দুটো বিখ্যাত গান- ‘ধন্য আমি জন্মেছি মা’, আর কানু ঘোষের সুর করা ‘শতকোটি মানুষের’। দুটো গানই কাকা গেয়েছিলেন। এরপর ২০০৩ নাগাদ কাকা নিজের এলবামে দেবপ্রসাদ চক্রবর্তীর লেখা, মৃণাল ব্যানার্জীর সুরে  নেতাজিকে নিয়ে একটি গান করেন “আমায় রক্ত দাও, আমি তোমায় স্বাধীনতা দেব”…  বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল সে গানও।

পরবর্তীকালে ২০১২ সালে ঢাকাতে বাংলাদেশ সরকারের তরফে শেখ হাসিনা সেজকাকুকে সম্বর্ধনা জানান। কাকা তখন খুব অসুস্থ, তাই তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর হয়ে আমিই ঢাকা গেছিলাম এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। কাকার হয়ে অ্যাওয়ার্ডও আমিই নিয়ে আসি।এবছরও ৬ই ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর বিখ্যাত বক্তৃতাকে স্মরণে রেখে কাকাকে সম্বর্ধনা দেওয়া হল। কাকা নেই, তাঁর হয়ে আমিই গ্রহণ করলাম সেই সম্বর্ধনাও।

ব্রিটিশ আমলে জন্মানোর জন্য আমার বাবা-কাকাদের রক্তে ছিল দেশপ্রেম। আমাদের বাড়ির পরিবেশও খুব সহায়ক হয়েছিল এই দেশাত্মবোধে। নেতাজি’র অন্তর্ধান বা মৃত্যু-রহস্য কাকাকে আজীবন হন্ট করেছে। যখনই প্রসঙ্গ উঠত, উনি বলতেন সে কথা। আরও অনেক বাঙালির মতো আমার সেজকাকু মান্না দে’ও এটা বিশ্বাস করেননি যে জাপানের তাইহোকুকে বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন নেতাজি। আসলে নেতাজির দুর্দমনীয় পৌরুষে আস্থা ছিল সেজকাকুর। তিনি আমাদেরও বলতেন মানুষ হয়ে জন্মালে নেতাজির মতো মানুষ হয়ে জন্মাতে হয়।

ক্রমশ…

মেল যোগাযোগ – [email protected]

আমার সেজকাকু মান্না দে (সপ্তম পর্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More