আমার সেজকাকু মান্না দে (পঞ্চম পর্ব)

সুদেব দে

সেজকাকুর রেওয়াজ নিয়ে কথা শুরু করেছিলাম আগের পর্বেই। আজ আরও কিছুটা বিস্তারে বলব সেই রেওয়াজের কথা। সেজকাকুর রেওয়াজ নিয়ে তাঁর অগণিত ভক্তেরা নানান প্রশ্ন করেন আমায়। প্রশ্ন করেন সঙ্গীতপিপাসু মানুষেরাও। কাকা যখন গানের তালিম নিয়েছেন সেসময় আমার জন্ম হয়নি। তবে সে ব্যাপারে পরে অনেককিছুই শুনেছি আমার বাবার মুখে। সেজকাকুও গল্পচ্ছলে বলেছেন অনেক অভিজ্ঞতার কথা। নিজের চোখে ওঁকে সরগম-সাধনা করতেও দেখেছি আমি, সেই স্মৃতিও কম দামি নয়৷ কাকা আমাকে একটা কথা প্রায়ই বলতেন… বলতেন, “গান করার আগে নিজে বুঝে নেবে ঠিক কী ধরণের গান করছ তুমি! ভারতীয় সঙ্গীতের এত বিশাল দিগন্ত, এত বৈচিত্র্য – খেয়াল, ধ্রুপদ, ধামার, ভজন, কীর্তন, গজল, গীত, বাউলাঙ্গের গান, নানা রকমের লোকসংগীতের বিস্তীর্ণ ভুবন। তাই গান গাওয়ার আগে বুঝতে হবে কোন গানটা তুমি গাইছ! কারণ সেই সঙ্গীতের যে বৈশিষ্ট্য তাকে ইমপ্লিমেন্ট করতে হবে, ধারণ করতে হবে নিজের গানে। তা না হলে সার্থকতা আসবে না।” কাকা নিজের জীবনেও অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতেন এই কথা।

সকালে উঠে আমার মায়ের হাতে এককাপ লিকার চা খেয়ে রেওয়াজে বসতেন কাকা। সকালবেলায় এই দুঘণ্টা তিনঘণ্টা রেওয়াজ ছিল শুধুমাত্র ক্ল্যাসিক্যাল বেসড। আর কিচ্ছু না। ছোটবেলায় সবটা না বুঝলেও কানে এক অপূর্ব মাধুরী ঢেলে দিত সেই সঙ্গীতসাধনা। পরে যখন নিজেও চর্চা করছি, তখন আরও স্পষ্ট বুঝতে পারতাম সেজকাকুর রেওয়াজের ধাপগুলো। হয়তো একদিন সকালে গাইছেন ভৈরব ঠাট। ভৈরব রাগে রে আর ধা কোমল আর বাকি সব শুদ্ধ৷ আমরা যারা গানের ছাত্র, আমরা জানি, সমস্ত সঙ্গীতই দাঁড়িয়ে আছে বারোটা স্বর বা পর্দার উপর। এই বারোটা স্বরই শাসন করে গানের ভুবন। সেজকাকু ভৈরব ঠাটে রেওয়াজ শুরু করলেন, হঠাৎ দেখি সরগম করতে করতে ভৈরব বদলে উনি চলে এলেন টোরিতে। মানে আগে ছিল রে, ধা কোমল, তার মধ্যেই ক্রমশ ঢুকে এল কোমল রে, কোমল গা, কড়ি মা। রাগের চেহারা বদলে গেল। এবার কখনও আরোহণ করছেন ভৈরবে, অবরোহণ করছেন টোরিতে। কখনও উল্টোটা- মানে, উঠছেন টোরিতে, নামছেন ভৈরবে। সঙ্গীতের ছাত্ররা জানেন এই কম্বিনেশন কত শক্ত!

রেওয়াজ করার সময় উনি হারমোনিয়াম ছুঁতেন না। সবসময় হাতে থাকত তানপুরা। আমাকেও বলতেন, “বাড়িতে রেওয়াজ যখন করবে, তানপুরাতেই করবে। তাহলেই শুদ্ধ স্বর লাগবে। পারফেকশন আসবে।” উনি একথাও বলতেন “গান নিয়ে আলোচনার সময় কখনও নিজের পাণ্ডিত্য প্রকাশ করবে না। অন্যের কথা শুনবে৷ ভগবান একটা মুখ দিয়েছেন, দুটো কান৷ তাই বলবে কম, শুনবে বেশি।” আত্মপ্রচারের বিরোধী ছিলেন বরাবর। উনি যে ভালো ক্ল্যাসিকাল জানতেন সেকথাও বলতেন না বিশেষ কাউকে। ধ্রুপদ শিখেছেন, খেয়াল শিখেছেন, কীর্তন শিখেছেন- কিন্তু কখনও তার প্রচার করতেন না কাকা। উনি জানতেন উনি প্রফেশনালি কী গান গাইবেন। আর সেদিকেই ছিল তাঁর একাগ্র মনঃসংযোগ। এমনই আশ্চর্য মানুষ ছিলেন আমার সেজকাকু।

তানপুরায় তালিম… কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে’র সঙ্গে কমবয়সী মান্না দে

রেওয়াজের প্রসঙ্গে ফিরি। কোনওদিন সকালে দেখলাম কল্যাণ ঠাটে রেওয়াজ শুরু করেছেন কাকা, তারপর নোটস বদলে চলে গেলে পূর্বিতে। আমি জানিনা গানের মানুষজন ছাড়া অন্য কেউ বুঝতে পারবেন কী না বিষয়টা। আমি নিজেও বুঝেছি অনেক পরে, রাগসাধনায় ঢুকেছি যখন… স্বরের এই পাকফেকশন, ধরা-ছাড়াই ছিল কাকার রেওয়াজের বিশেষত্ব। আবার কোনও কোনও দিন দেখলাম উনি সকালবেলার রেওয়াজ শুরু করলেন মারোয়া ঠাট দিয়ে। মারোয়ার উপর সরগম করলেন, তার উপর বিস্তার করলেন, কোনও একটা বন্দেজ গাইলেন… গাইতে গাইতেই ঠাট বদলে আশাবরী ঠাটে গাইতে শুরু করে দিলেন। মারোয়া ঠাটে কোমল ঋষভ, শুদ্ধ গান্ধার, কড়িমধ্যম, শুদ্ধ ধৈবত এই পর্দাগুলো লাগে। আবার আশাবরী ঠাটে শুদ্ধ ঋষভ, শুদ্ধ মধ্যম, পঞ্চম, কোমল ধৈবত, কোমল নিষাদ।

রেওয়াজ করছেন আমার বাবা প্রণব দে

সঙ্গীতের ছাত্র হিসাবে আজ বুঝতে পারি, একজন মানুষের কতখানি গভীর পারদর্শিতা থাকলে এভাবে রেওয়াজ চলাকালীনই এক ঠাট থেকে অন্য ঠাটে এমন অবলীলায় যাওয়া-আসা করা সম্ভব! রাগসাধনা চলাকালীন ওর রেওয়াজে ফিরে ফিরে আসত অসংখ্য কম্বিনেশন অফ সরগম, যাকে গানের ভাষায় বলে পালটা। এই সরগম সাধনার উপর বরাবরই খুব জোর দিতেন সেজকাকা৷ আমাদের দে পরিবারের গানের স্টাইলেই রয়েছে এই কম্বিনেশন অফ সরগমের সাধনা। আবার শুধু পালটা করলেও হবে না। এক একটা স্ট্যান্ডিং নোট ধরে ধরে রেওয়াজ করতে হবে। আমার দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে’ও এইভাবেই আমার বাবাকে,সেজকাকুকে রেওয়াজ করতে শিখিয়েছেন। তাঁরা আবার সেই একই শিক্ষা দিয়ে গেছেন আমাকেও।

এমনটাও দেখেছি ভৈরবী ঠুংরি গাইছেন সেজকাকু। গাইতে গাইতে ভৈরবীর ওই বন্দেজটাই উনি ঠুংরির মধ্যে ফেলে গাইছেন। সচরাচর ঠুংরিতে সরগম গাওয়া হয়না। কিন্তু একান্তে রেওয়াজের সময় কাকা এইরকম নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট করতে ভালোবাসতেন। কাকা বারবার বলতেন, যেকোনও গান গাওয়ার সময় তার স্ট্রাকচারটাকে জানতে হবে। কণ্ঠ অনেকটা কাদার তালের মতো, তাকে যে আকার দেওয়া হবে, সেই আকারই পাবে।

অপূর্ব কীর্তন গাইতেন সেজকাকু। দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে’র মতো প্রফেশনালি কীর্তন গাননি বটে, কিন্তু কীর্তনাঙ্গের গানেও আমার সেজকাকু মান্না দে ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। তখনকার বেশ কিছু লং-প্লে রেকর্ড বেরিয়েছিল, যেমন ‘রামী-চণ্ডীদাস’ বা ‘শ্রীরাধার মানভঞ্জন’… এগুলো বাংলা গানের কতখানি মূল্যবান সম্ভব, তা যাঁরা শুনেছেন তাঁরা জানেন। আমার দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে’কে বলা হত কীর্তন সম্রাট। পাশাপাশি আরও বিভিন্ন ধরণের গান গাইতেন তিনি। আমার গুরু সেজকাকু বলতেন, যখন কীর্তন গাইবে তখন কীর্তনের যে নিজস্ব ঘরানা তার সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে তোমার সঙ্গীত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, সরগম বিস্তারের ক্ষমতা। আবার খেয়াল রাখতে হবে তা যেন কীর্তনের রূপ নষ্ট না করে। সবটাই নির্ভর করে শিক্ষার গভীরতা আর প্রেজেন্স অফ মাইন্ডের উপর।

কাকার রেওয়াজের প্রসঙ্গ উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমাদের সেই ন’নম্বর মদন ঘোষ লেনের একান্নবর্তী দে’বাড়ির ছবি। তখনও অফিশিয়ালি আমার গানবাজনার তালিম শুরু হয়নি। পড়াশোনা করি। মনে আছে, সেসময় সকালবেলা কাকা যখন রেওয়াজে বসতেন, দেখতাম বাড়ির নীচে রাস্তার উপর লাইন দিয়ে লোক দাঁড়িয়ে কাকার রেওয়াজ শুনছে৷ যে সময়ের কথা বলছি, তখন কাকা জনপ্রিয়তার শীর্ষে, টিকিট কেটেও তাঁর গানের লাইভ আসর দেখার সুযোগ হত না অনেকের। আমাদের সিমলা পাড়ার সেই বাড়ির সামনে একটা ছোট রক ছিল। সেখানেও বসে থাকতেন অনেকে। যারা জায়গা পেতেন না তাঁরা দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুনতেন মান্না দে’র সেই দুর্লভ সকালবেলার রেওয়াজ। কাউকে কোনওদিন এতটুকু বিরক্ত করতে দেখিনি।

একেকদিন সকালবেলায় এক এক ঠাট, এক এক রাগের উপর সুরের রেওয়াজ করতেন কাকা। তারপরে একটু তান-টান করে রেওয়াজ শেষ করতেন। ব্যস্ত মানুষ ছিলেন তো। রেওয়াজ শেষে সামান্য একটু ব্রেকফাস্ট করতেন। মিতাহারী মানুষ ছিলেন সেজকাকু, সামান্য দুটো টোস্ট, একটা ডিমপোচ, ব্যাস, তাঁর ব্রেকফাস্ট বলতে ছিল এটুকুই। তারপর স্নান সেরে তিনি বেরিয়ে যেতেন রেকর্ডিং-এ। এইসব রেকর্ডিং থেকে কত যে মণিমুক্তো পেয়েছি আমরা সেসময় – ‘হাজার টাকার ঝাড়বাতিটা’, ‘কাহারবা নয় দাদরা বাজাও’, ‘ যা খুশি ওরা বলে বলুক’ – এমন কত অসামান্য গান! ভোলা যাবে না। কিন্তু এসব গানের সঙ্গে ওঁর সকালবেলার রেওয়াজের কোনও সম্পর্কই ছিল না। সকালবেলা উনি আগাগোড়া পিওর ক্ল্যাসিক্যালে গলা সাধতেন। যদি একটা দশ দিনের স্প্যান ধরি তার প্রথম দিন হয়তো সেজকাকু রেওয়াজ করলেন ভৈরব আর টোরিতে, দ্বিতীয় দিনে সেই রেওয়াজটাই বদলে গেল কল্যাণ আর কাফি ঠাটে। আবার কাফি থেকে চলে যেতেন খাম্বাজে। কাফি যদিও সকালের রাগ নয়, কিন্তু সেজকাকু তো ব্যস্ত মানুষ ছিলেন। সারাদিন নানা কাজে,রেকর্ডে, অনুষ্ঠানে কেটে যেত তাঁর। অত বড় মানের প্রফেশনাল গায়ক, কিন্তু তার রেওয়াজের সময়টুকু ছিল সীমিত। তাই ওই সীমিত সময়েই নিজেকে উজার করে সরগম সাধনা করতেন তিনি৷ আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যাকরণে মোট তিনটে অক্টেভ আছে – উদারা, মুদারা, তারা। নিজের গলার রেঞ্জ ঠিক রাখার জন্য সেজকাকু তাঁর সকালের প্রথম রেওয়াজটাই করতেন মন্দ্রসপ্তকে বা উদারায়। সা থেকে খাদের দিকে যতদূর গলা যায় সেই অনুযায়ী এক একটা স্বরের উপর প্র‍্যাকটিস করতেন সেজকাকু।

তালিম দিচ্ছেন আমার গুরু সেজকাকুআসলে এই রেওয়াজের ব্যাপারটা তো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। বাবা আর সেজকাকার কাছ থেকে যে সম্পদ আমি পেয়েছি, তাঁরাও পেয়েছিলেন তাঁদের কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছ থেকে… দে ঘরানার সেই সাঙ্গীতিক উত্তরাধিকার আমি এখন তুলে দিই যারা আমার কাছে গান শিখতে আসেন তাদের হাতে৷ সঙ্গীত এমনই গুরুশিষ্য পরম্পরার জিনিস।

ক্রমশ…

মেল যোগাযোগ – [email protected]

আমার সেজকাকু মান্না দে (চতুর্থ পর্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More