আমার সেজকাকু মান্না দে (নবম পর্ব)

সুদেব দে

সেজকাকুর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল বাবা-ছেলের মতো। গান শেখার মধ্যে দিয়েও নানা সময় তাঁর সাহচর্য পেয়েছি। গান শেখাতে গিয়ে গল্পচ্ছলে বিভিন্ন শিল্পীকে নিয়ে, বিভিন্ন কম্পোজারকে নিয়ে অনেক কথাই তিনি বলেছেন। সেসব কথা নেহাতই আমার শিক্ষার জন্য বলা। গানের পারফেকশন কতদূর হতে পারে কিংবা কোন শিল্পীর কী লিমিটেশন- এমন নানান কথা গান শেখাতে গিয়ে বলতেন সেজকাকু। আমি সঙ্গীতের খুব সাধারণ এক ছাত্র। সেসব গুরুবাক্য সবার সামনে খোলাখুলি বলা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। তবে কাকাকে নিয়ে লিখছি যখন, কিছু কিছু কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরব। গানের পারফেকশন কেমন হওয়া উচিত,সেটা বোঝাতে গিয়ে সেজকাকু প্রায়ই লতা’জির প্রসঙ্গ তুলতেন, তাঁর গাওয়া বিভিন্ন গানের রেফারেন্স দিতেন। আজ সেই লতা’জিকে নিয়েই দুকথা বলব আপনাদের কাছে।

লতা’জি, মানে আমাদের প্রিয় শিল্পী ‘ভারতরত্ন’ লতা মঙ্গেশকর’- তাঁর কথা খুব মনে পড়ছে আজ। কাকা বলতেন, লতা’জির মতো অত বড় সঙ্গীতশিল্পী ভারতবর্ষে জন্মায়নি। কোনও বড় শিল্পীকে ছোটো না করেই বলছি এ কথা। আসলে কাকার দেখার চোখ বরাবরই অন্যরকমের। গান শেখানোর সময় বা গান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কতরকম রেফারেন্স যে দিতেন আমাকে! সঙ্গীত নিয়ে ওঁর কত বিশাল অভিজ্ঞতা, সেটা বোঝা যেত সেসময়।

আমার যদ্দূর মনে পড়ছে, কাকা বলেছিলেন, তিনি তখন বম্বেতে স্ট্রাগল করছেন। কোনও একটা কাজে একদিন স্টুডিওতে গেছেন, সেখানেই দেখা হয়ে যায় বিখ্যাত সুরকার অনিল বিশ্বাসের সঙ্গে। অনিলদা ( কাকা এই সম্বোধনই করতেন) কাকাকে ডেকে বললেন, ‘একবার এদিকে আয়, একজনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই’। এগিয়ে গিয়ে সেজকাকু দেখলেন, রোগা শ্যামলা রঙের এক ভদ্রমহিলা, মেয়েই বলা যায়, স্টুডিওর এককোণে বসে আছে। ইনি, আর কেউ নন, স্বয়ং লতা মঙ্গেশকর। সেজকাকুর সঙ্গে লতা’জির সেই প্রথম আলাপ। বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী কে.সি. দে’র ভাইপো হিসাবে কাকার সঙ্গে সেদিন লতা’জির পরিচয় করিয়ে দিলেন অনিল বিশ্বাস। বললেন, একটু গান শুনব।’

রোগা শ্যামলা রঙের মেয়ে- কমবয়সে লতা মঙ্গেশকর

সেই প্রথম লতা’র গান শুনলেন সেজকাকু৷ যদ্দূর মনে পড়ছে, খালি গলায় সেদিন একটা ভজন গেয়ে শুনিয়েছিলেন লতা’জি। কাকা পরে বলেছিলেন, সে গান শোনার পর তাঁর সারাশরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গিয়েছিল। যারা সঙ্গীতের ছাত্র তাঁরা বুঝবে, এই শিহরণ জাগানো চাট্টিখানি কথা নয়। সাধারণ গান গাওয়া শুনে এমন হয়না। স্বরক্ষেপনের স্বর্গীয় ক্ষমতা থাকলেই একমাত্র শ্রোতার ভিতর এই শিহরণ জাগানো সম্ভব।নানা প্রসঙ্গে কাকা আমায় কতবার যে এই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন! তিনি বলতেন, ‘সেই দিনটা আমি ভুলতে পারব না’… কাকা সেদিনই না কি অনিল বিশ্বাসকে বলেছিলেন, এ তো সাংঘাতিক প্রতিভা! এভাবে গান করতে পারে মানুষ! এ তো স্বয়ং সরস্বতী!’

তারপর তো একসঙ্গে বহু কাজ করেছেন দুজনে। বাংলা হিন্দি মিশিয়ে লতাজির সঙ্গে প্রায় ১৭০টা ডুয়েট গান আছে সেজকাকুর। যদিও কাকা কোনওদিনই এসব পরিসংখ্যান নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। কোন গান, কবে, কোথায় গেয়েছেন- এসব বলতে পারতেন না উনি৷ ওঁর যাবতীয় মনোযোগই ছিল নিজের রেওয়াজ নিয়ে, সাধনা নিয়ে৷

মান্না দে আমার সেজকাকু, আমার গুরু। তাও বলব, সারাজীবনে আমি কাকার যেকটা গান শুনেছি, না শোনা গানের সংখ্যা তার চেয়ে ঢের বেশি। লতাজির প্রসঙ্গে ফিরি। পারফেকশন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কাকা প্রায়ই লতাজির উদাহরণ দিতেন। ওদের একটা ডুয়েট গান আছে না, ‘তুম গগনকে চন্দ্রমা’! কাকা বলতেন, এই লাইনটা যে নোটসের উপর রয়েছে, সঙ্গীত পরিচালক যে নোটস দেখিয়েছেন, লতাজি যখন গাইবেন ঠিক ঠিক সেই নোটেই গাইবেন। একটু এদিক ওদিক হবে না সুর। কিন্তু গানের ছাত্র হিসাবে আমরা দেখি, অনেক শিল্পীই গান করার সময় মিউজিক ডিরেক্টরের নির্দেশের বাইরেও কিছু স্বাধীনতা নেন। সেটা অনেকসময় হয়তো অজান্তেই করেন তারা। ধরুন নোটসে আছে গ ম প গ ম। সেটা গাইতে গিয়ে হয়তো প-এর কাছে একটু অন্য সুর লাগল, কিংবা হয়ত গা এর সঙ্গে একটু রে মিশল… এই ব্যাপারটা লতাজি’র মধ্যে একেবারেই ছিল না। উনি এতটাই পারফেকশনিস্ট ছিলেন, যে মিউজিক ডিরেক্টরের দেখিয়ে দেওয়া সুরে ঠিক ঠিক সেই নোটগুলোই লাগাতেন।

দীননাথ মঙ্গেশকর পুরস্কার- সেজকাকু আর লতা’জি একই মঞ্চে

লতাজির সঙ্গে ইউরোপে, লন্ডনের রয়্যাল এলবার্ট হলে বহু অনুষ্ঠান করেছেন সেজকাকু। আমি খুব চেষ্টা করেছিলাম সেসব গানের লাইভ অডিও জোগাড় করার। কিন্তু পাইনি। আর কাকা তো বরাবরই এসব ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। ওঁর একমাত্র মনোযোগ ছিল গান সৃষ্টিতে, রেকর্ড, পরিসংখ্যান এসব নিয়ে মাথাই ঘামাতেন না। ওঁদের দুজনের হিট গানের সংখ্যাও কম নয়। ‘ইয়ে রাত ভিগি ভিগি’, ‘প্যার হুয়া ইকরার হুয়া’, ‘তুম গগনকে চন্দ্রমা’- কত নাম করব! ১৯৫১ সালে ‘আওয়ারা’ ছবিতে মোটামুটিভাবে প্রথম ডুয়েট গান গাইলেন ওরা। তবে ১৯৪৯ এও বসন্ত দেশাইয়ের সুরে কাকা আর লতাজির একটা ডুয়েট গান পাওয়া যায়। ‘আওয়ারা’ ছবির ‘তেরে বিনা আগ ইয়ে চাঁদনি’ গানটা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল সেসময়। এ প্রসঙ্গে শঙ্কর জয়কিষণের নামও এসে যায়। কাকার জীবনে এই মানুষটির বিরাট ভূমিকা ছিল। পরবর্তী কোনও পর্যায়ে বলব সেসব নিয়ে। আজ লতা’জির কথাই হোক। বাংলাতেও অনেকগুলো ডুয়েট গান আছে লতা’জি আর সেজকাকুর৷ ‘শঙ্খবেলা’ ছবির ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ বা ‘মাদার’ ছবির ‘এই বৃষ্টিতে ভিজে মাটি’ এসব গান লোকের মুখে মুখে ফিরত সেসময়।

লতা’জির সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও খুব মধুর ছিল সেজকাকুর। লতা’জির বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন খুব বড় মাপের সঙ্গীতজ্ঞ মানুষ। ওদের পেডার রোডের বাড়িতে একসময় খুব যাওয়া-আসা ছিল সেজকাকুর। কাকার মুখে শুনেছি, লতা’জির মা-বাবা দুজনেই খুব স্নেহ করতেন কাকাকে। গানের জগতের এই দুই দিকপাল গায়ক-গায়িকার মধ্যে খুব আন্তরিক আর ভীষণ ভালো একটা বন্ধুত্ব ছিল, পারিবারিক সম্পর্কও ছিল খুব মজবুত। একটা সময় তো কাকার বাড়িতে প্রায়ই যেতেন লতাজি। আমার কাকিকার রান্নার হাতখানি ছিল ভারি চমৎকার। লতাজি মাঝেমাঝে এসে কাকিমার হাতের রান্না খেয়ে যেতেন। উলটো জিনিসটাও হত। কাকা-কাকিমাও প্রায়ই যেতেন লতা’জির বাড়ি তাঁর মায়ের হাতের ট্র্যাডিশনাল মারাঠি, কোঙ্কনি খাবার খেতে।

কাকার মুখে শুনেছি, লতাজি না কি খুব বেগুন, রসগোল্লা আর কলকাতার দই খেতে ভালোবাসতেন। তাই সেজকাকু যখনই কলকাতা থেকে বম্বে যেতেন, হ্যান্ডব্যাগ ভরে দই মিষ্টি কিনে নিয়ে যেতেন লতা’জি, তালাত মাহমুদ সাব আর এরকমই দুচারজন ঘনিষ্ঠ মানুষজনের জন্য। প্রফেশনাল সম্পর্কের উর্ধ্বে এতটাই মধুর সম্পর্ক ছিল আমার সেজকাকু আর সঙ্গীতসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের।

ক্রমশ…

মেল যোগাযোগ – [email protected]

আমার সেজকাকু মান্না দে (অষ্টম পর্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More