আমার সেজকাকু মান্না দে (দশম পর্ব)

সুদেব দে

কাকার সঙ্গে লতাজি’র সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছিলাম গতপর্বে। গানের জগতের সহকর্মীই নন শুধু, অসম্ভব সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল দুজনের। ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্কও ছিল লতাজি’র পরিবারের সঙ্গে আমার সেজকাকু- সেজকাকিমার। একটা ভীষণ ভালো বন্ডিং ছিল সেজকাকুর সঙ্গে লতাজি’র, যেটা এখনকার অনেক লোকই জানেননা।

লতাজি’র সঙ্গে ডুয়েট গান প্রসঙ্গে একটা কথা কাকা আমায় বহুবার বলেছেন। আমার মনে হয় কাকার শ্রোতাদেরও এটা জানা দরকার। কাকা বলতেন, “লতার সঙ্গে ডুয়েট গাইতে গেলে রীতিমতো মুশকিল হত। কারণ আর কিছু না, যখন লতা গানটা গাইত আমি এতটাই অনুপ্রাণিত হয়ে যেতাম, এতটাই শিহরণ হত, যে পরের খেপে আমাকেও সঙ্গে সঙ্গে সুর ধরতে হবে, সেটা মনেই থাকত না। আমি নিজেও তখন লতার গানের শ্রোতা হয়ে যেতাম। আমাকেও যে ডুয়েটে গাইতে হবে সে সম্বিতটুকুও থাকত না।”
ভাবুন, মান্না দে’র মতো এত বড় মাপের শিল্পী বলছেন এ’কথা। বাইরে কোনও এক্সপ্রেশন নেই, কিন্তু কী নিঁখুতভাবে যে গানটা লতাজি পরিবেশনা করে যেতেন, সূক্ষ্ম আর দুরূহ কাজগুলো কী অবলীলায় তুলে নিতেন গলায়, মনে হত, যেন স্বয়ং মা সরস্বতী ছাড়া এভাবে গান গাওয়া আর কারো পক্ষে সম্ভবই নয়।

কাকা সচরাচর নিজের সম্পর্কে বেশি কথা বলতে চাইতেন না। কিন্তু ঘরোয়া আলোচনায় লতাজি’র প্রসঙ্গে কথা উঠলে টুকটাক কিছু কথা বলতেন। সেজকাকুর নোটেশন করার পদ্ধতি দেখে খুবই চমৎকৃত হয়েছিলেন লতাজি। বলেছিলেন, মান্না দা যেভাবে গানকে আপনি বোঝেন, যেখাবে একটা গান একবার শুনেই নোটেশন করে নেন, আমি এরকম আশ্চর্য স্কিল কারও মধ্যে দেখিনি! পরবর্তীকালে বেশ কিছু ইন্টারভ্যিউতেও গানবাজনার উপর কাকার দখল নিয়েও নানা কথা বলেছেন লতাজি। ক্ল্যাসিকাল থেকে কমেডি সবধরণের গানেই কাকার যে সাবলীল যাতায়াত, সেকথা লতাজি’ও স্বীকার করেছেন বারবার। সেজকাকুর মৃত্যুর পর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লতাজি খোলাখুলিই বলেছিলেন, মান্না দা যে দক্ষতা নিয়ে কাজ করে গেছেন বম্বের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে, সেই অনুপাতে যোগ্য সম্মান তিনি পাননি। এ কথা যে অতিকথন নয়, আমরা যারা সেজকাকুর গান শুনে বড় হয়েছি, তাঁকে ভালোবাসি, তারা সকলেই জানি।

নোটেশন প্রসঙ্গে একটা কথা শুনেছিলাম আমার গুরুদেব, আমার সেজকাকুর মুখে। যেকোনও গান শুনেই তার নোটেশন করে ফেলার এই পদ্ধতি একসময় লতাজি শিখতে চেয়েছিলেন কাকার কাছে। উত্তরে কাকা বলেছিলেন, ‘নোটেশন না শিখেই নোটস মাথায় রেখে তুমি যেভাবে নিখুঁত গান গাও, তাতে আর নতুন করে নোটেশন শেখার দরকার নেই তোমার৷’ লতাজি কিন্তু তারপরও নাছোড়, কাকাকে বলেছিলেন, ‘না মান্নাদা, আপনার এই অদ্ভুত স্কিল আমিও শিখতে চাই’। কাকা পরবর্তীকালে আমায় ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলেন, ‘লতার মতো শিল্পীকে আমি কী নোটেশন শেখাব। ওর মাথা তো কম্পিউটার, না শিখেই শুধু কানে শুনে যেকোনও গানের নোট নিখুঁতভাবে মনে রাখতে পারে।’ নোটেশন শেখার ব্যাপারটা তাই কিছুটা এড়িয়েই গেছিলেন কাকা। আশ্চর্যের মনে হলেও, ঠিক এতটাই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল এই দুই মহান শিল্পীর মধ্যে।

কোন ভাষায় না গান করেছেন দুজনে! হিন্দি, তামিল, গুজরাটির মতো একাধিক ভাষায় প্লেব্যাক করেছেন, পাশাপাশি ভোজপুরি ভাষাতেও যে পরিমাণ গান গেয়েছেন কাকা, সম্ভবত আর কোনও বাঙালি গায়ক তার কাছাকাছি আসতে পারবেন না। কাকা কোনওদিনই নিজের প্রশংসা করতেন না, শুনলেও কুণ্ঠিত হতেন। তবু গান শেখাতে গিয়ে নানা প্রসঙ্গে নানা কথা উঠে আসত। তেমনই এক প্রসঙ্গে একবার কাকা বলেছিলেন, কাকার কণ্ঠে হেলো গান শুনে লতাজি মুগ্ধ হয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘যেকোনও ব্রাহ্মণ পন্ডিতের চেয়েও আপনার উচ্চারণ ভালো মান্নাদা।’ এসব কথা শুনলে নিজের ভিতরেই অসম্ভব প্রেরণা পাই। ভাবি, এই মানুষগুলো কত প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন সেসময়।

বাঁ-দিক থেকে আশাজি, মুখেশজি, লতা মঙ্গেশকর, কিশোর কুমার আর সেজকাকু

কাকার মুখে শুনেছি, কোনও একটা সময় লতাজি সেজকাকুকে বলেছিলেন, ‘মান্নাদা, আমি একটা বাংলা গান রেকর্ড করব, আপনি সুর করে দিন।’ কথা মতো কাকা একটা গানে সুর বসান। রেকর্ডিং-এর সব ঠিকঠাক, তখন নানা ব্যস্ততায় একটা ডেট ফেল করলেন লতাজি। তারপর আরও একটা ডেট ফেল করলেন। কাকা ভিতরে ভিতরে খুব অভিমানী মানুষ ছিলেন। পরপর দুটো ডেট লতাজি যখন ফেল করলেন, তখন কাকার মনে হল, নাহ! এ গান আর ফেলে রাখা ঠিক হবে না। মিউজিশিয়ানেরা রেডি ছিল। সেই গান কাকা নিজের কণ্ঠেই রেকর্ড করলেন। ১৯৫৩ সালে প্রকাশ পেল সেই ঐতিহাসিক রেকর্ড, ‘কত দূরে আর নিয়ে যাবে বল’ আর ‘হায় হায় গো রাত যায় গো’। এই দুটো গান কাকার বেসিক রেকর্ডিং, কিন্তু শুরুতে গানদুটো গাওয়ার কথা ছিল লতা মঙ্গেশকরের।

কাকা বারবার বলতেন, গানবাজনা শিখলেই কিন্তু সঙ্গীতশিল্পী হওয়া যায় না। প্রকৃত শিল্পী হতে গেলে গানবাজনার তালিমের পাশাপাশি দরকার একটা অসম্ভব প্রতিভা৷ কে কী বলছে, কী টোনে বলছে, সেগুলো বোঝার মতো কান তৈরি করতে হবে৷

এ প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ছে, ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ ছবির একটা বিখ্যাত গান ছিল, ‘যশোমতী মাইয়া সে বোলে নন্দলালা’… এই গানটার রেকর্ডিং-এ একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। কাকা আগে থেকে জানতেন না, একদিন দুপুরবেলা তাঁকে ফোন করে স্টুডিওতে ডাকা হয় গানটার রেকর্ডিং-এর জন্য। রাজ কাপুর প্রোডাকশনের সিনেমা ছিল ওটা। ডুয়েট গান, দেখানো হয়েছে একজন বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে একটা ছোট মেয়ে গাইছে। কাকাকে রেকর্ডিংয়ের সময় বলে দেওয়া হয়েছিল বৃদ্ধ বাবার মতো গানের শেষে একটু কাশতে। সেই কাশিটাও আছে গানের মধ্যে। তারপর লতাজি’র কণ্ঠেই মূল গানটা রয়েছে। রেকর্ডিং হয়ে যাওয়ার পর রাজ কাপুর লতা’জিকে ডেকে বললেন, এত ভালো রেকর্ডিং হয়েছে, কিন্তু কিছু একটা মিসিং গানটার মধ্যে।

লতাজি তো অবাক! ভালো রেকর্ডিং বলছেন, অথচ মিসিং আছে কিছু! তখন রাজ কাপুর সাহেব লতাজি’কে বললেন, আপনি গানটা গাইছেন কিন্তু পদ্মিনী কোলাপুরীর জন্য। পদ্মিনীর বয়স তখন দশ কি বারো। সঙ্গে সঙ্গে লতা’জি বুঝে ফেলেছেন যা বোঝার। তিনি পদ্মিনী কোলাপুরীকে ডেকে নিয়ে গেলেন, তার সঙ্গে গল্প করলেন কিছুক্ষণ, তার গলায় গান শুনলেন, তারপর ফিরে এসে যখন সেই গানটাই আবার রেকর্ড করলেন, শুনলে মনে হবে যেন দশ-বারো বছরের কোনও কিশোরী গাইছে গানটা। এই হল লতা মঙ্গেশকরের বিশেষত্ব। আর কাকা এই গল্প আমাকে শোনালেন কেন? কারণ প্লেব্যাক সিঙ্গার ইন ট্রু সেন্স, বড় হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। ওই গানটা লতাজি যেটা আগে গেয়েছিলেন, একই সুর… কিন্তু পদ্মিনী কোলাপুরীর সঙ্গে কথাবার্তা বলে, গল্পগাছা করে যখন একই গান আবার গাইলেন, সুর এক হলেও সেটার ডেলিভারিটাই সম্পূর্ণ আলাদা। সেই গান শুনে মনে হবে যেন একটা ছোট্ট কিশোরী কণ্ঠ গাইছে গানটা। আর এটাই লতা মঙ্গেশকরের মাহাত্ম্য।

ক্রমশ…

মেল যোগাযোগ – [email protected]

 

আমার সেজকাকু মান্না দে (নবম পর্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More