আমার সেজকাকু মান্না দে (দ্বিতীয় পর্ব)

সুদেব দে

আমাদের দে পরিবার বরাবরই একান্নবর্তী যৌথ পরিবার।  মান্না দে, সম্পর্কে আমার বাবার সেজ ভাই, আমাদের সেজো কাকু। বাবারা ছিলেন চার ভাই। আমার বাবা শ্রী প্রণব দে তাদের মধ্যে সবার বড়। নিউ থিয়েটার্সের ২নম্বর স্টুডিওর মিউজিক ডিরেক্টর ছিলেন তিনি। খুব গুণী মানুষ ছিলেন আমার বাবা। নিজের বাবা বলে বলছি না, কিন্তু এ যুগের মানুষ তেমনভাবে চিনলোই না মানুষটাকে। আমার দাদু, বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী শ্রী কৃষ্ণচন্দ্র দে। তাঁর হাত ধরেই এই দে পরিবারের গানবাজনার শুরু। দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছ থেকে প্রথম গানবাজনার তালিম পান তাঁর বড় ভাইপো, মানে, আমার বাবা প্রণব দে। বাবার ডাকনাম ছিল নীলু৷ বাবার পরে সেজোকাকা, প্রবোধ দে  দাদুর কাছে তালিম পান। প্রবোধ দে, নামটা শুনলে অনেকেই বুঝতে পারবেন না আমি ‘মান্না দে’র কথা বলছি। সেজো কাকার ডাক নাম ছিল মানা৷ দাদু তাঁকে সেই নামেই ডাকতেন। পরে যখন দাদুর সঙ্গে কাকা বম্বেতে গিয়ে কেরিয়ার শুরু করেন, তখন মারাঠিদের অদ্ভুত উচ্চারণে কাকার ডাকনাম ‘মানা’ই হয়ে গেল ‘মান্না’। কৃষ্ণচন্দ্র দে’র আদরের মানা কালে কালে হয়ে উঠলেন বম্বে কাঁপানো কণ্ঠশিল্পী মান্না দে।

আমার ঠাকুর্দা পূর্ণচন্দ্র দে চার্টার্ড ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল মহামায়া দেবী। আমার বাবারা চার ভাই  প্রণব, প্রকাশ, প্রবোধ, প্রভাস। তাঁদের ডাকনাম ছিল নিলু, পেকা, মানা আর ভেলু। চারভাইয়ের একমাত্র বোন, আমার পিসিমার নাম ছিল বীণাপাণি।  বিয়ের পর তাঁর নাম হয় বীণাপাণি শীল। মোটামুটি এই হল আমাদের পারিবারিক কাঠামো।

যৌথ পরিবারে গানবাজনার আবহের মধ্যে ছোটোবেলা কেটেছে আমার। পুরোনো একান্নবর্তী পরিবার হিসাবে উত্তর কলকাতায় আমাদের যে একটা পরিচিতি আছে, সেটা খুব ছোটোবেলা থেকেই বুঝতে পারতাম। জ্ঞান হওয়া ইস্তক সেই একান্নবর্তী পরিবারেই মানুষ আমি। প্রায় ত্রিশ সদস্যের সে এক ভরপুর যৌথ পরিবার। সারাদিন হইচই, আনন্দ, গানবাজনার ভিতরে আমাদের জন্ম আর বেড়ে ওঠা। শুধু গৃহসহায়তার জন্যই সেসময় পাঁচজন স্থায়ী কাজের মানুষ ছিলেন দে’বাড়িতে। একটু যখন বড় হলাম, ক্লাস টু-থ্রি’তে পড়ি, অল্পস্বল্প  জ্ঞানগম্যি হয়েছে, তখন বুঝতে পারলাম  বাবা-কাকাদের চারজনের মধ্যে বাকি তিনজন একবাড়িতে থাকলেও একজন থাকেননা। তবে মাঝেমধ্যেই তিনি দূরের কোনও এক শহর থেকে একরাশ খুশির বাতাসের মতো ছুটে আসতেন আমাদের বাড়িতে। গানবাজনায়, লোকজনের ভিড়ে তখন ভরে উঠত বাড়ি। বলাই বাহুল্য, ইনিই আমার সেজকাকু, বাংলার অন্যতম সেরা কণ্ঠশিল্পী মান্না দে।

কাকার সঙ্গে কাকিমাও আসতেন এ বাড়িতে। কাকার দুই মেয়ে, আমার দুই খুড়তুতো দিদি সুরমা আর সুমিতা। আমার ‘রমিদিদি আর সুমিদিদি। দিদিরা তখন বম্বেতেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করতেন। আর কাকিমা ছিলেন বম্বের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের প্রফেসর। ফলে খুব ঘন ঘন যে তাঁরা কলকাতায় সপরিবারে আসতে পারতেন, তেমন নয়। মূলত ভ্যাকেশনগুলোয়, গরমের বা শীতের ছুটিতে, যখন স্কুল কলেজ বন্ধ থাকত তখন তাঁরা কলকাতায় আসতেন।

দে’বাড়িতে ঢুকেই সোজা বাঁ হাতে যে ঘর, তাকে আমরা  ‘বৈঠকখানা’ বলতাম। নামে বৈঠকখানা হলেও, ওই ঘরটাই ছিল আসলে এ-বাড়ির গানবাজনার ঘর। ভারতবর্ষের এমন কোনও সঙ্গীত গুণী নেই, যাঁর পায়ের ধুলো পড়েনি আমাদের ওই বৈঠকখানা ঘরে। দে পরিবারের যিনি প্রাণপুরুষ, শ্রী কৃষ্ণচন্দ্র দে, তাঁর হাত ধরেই এই দে পরিবারের গানবাজনার পত্তন। বলা যায়, তিনিই আমাদের সুর-নদীর উৎসস্থল, আমাদের গঙ্গোত্রী। বাবারা তাঁকে ডাকতেন ‘বাবুকাকা’ বলে। আর আমাদের ছোটোদের শেখানো হয়েছিল তাঁকে ‘বাবুজি’ বলে ডাকার জন্য। যদিও আমার জন্মের আগেই দেহ রাখেন ‘বাবুজি’। তাঁকে আমি কখনও সচক্ষে দেখিনি। সঙ্গীতের ছাত্র হিসাবে এ যে আমার কত বড় দুঃখ আর আক্ষেপের বিষয়, কী বলব! দাদু বলে বলছি না, কিন্তু অমন গুণী এক মানুষের সঙ্গ পেলে সঙ্গীতের নানা খুঁটিনাটি  আরও অনেকখানি ঋদ্ধ হতে পারতাম আমি।

কৃষ্ণচন্দ্র দে অন্ধ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু জন্মান্ধ ছিলেন না। বারো তেরো বছর বয়সে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। মেজর গ্লুকোমায় তার চোখ দুটি নষ্ট হয়ে গেছিল। নানাবিধ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন বাবুজি। একাধারে তিনি ছিলেন দক্ষ অভিনেতা, সুরকার ও গায়ক। ধ্রুপদ, ধামার, গজল, রাগপ্রধানের চর্চা তো ছিলই, পাশাপাশি বহু বাংলা ও হিন্দি সিনেমার গানে সুর করেছেন তিনি। তার প্রতিভার দ্যুতি সত্যিই ছড়িয়ে পড়েছিল দিকবিদিকে। আমরা তো চোখে দেখেও ভুল গান করি। ভাবা যায় না, সেখানে একজন অন্ধ মানুষ কী না গেয়ে গেছেন সারাজীবনে! ছোটোবেলা থেকে নানান গুণী মানুষের কাছেই তাঁর অসামান্য প্রতিভার গল্প শুনে শুনে বড় হয়েছি আমরা। তৎকালীন অল ইন্ডিয়া রেডিওয় যে কটি সঙ্গীত শাখা ছিল, তার প্রত্যেকটি বিষয়ে গান গাইতে পারতেন তিনি, এমনই একজন ভার্সেটাইল শিল্পী ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র দে। পরবর্তীকালে এক ধীরেন মিত্র ছাড়া আর কেউই এই অসাধ্যসাধন করেননি৷ অবশ্য ভার্সেটালিটিতে বাবুজির যোগ্য উত্তরসুরী ছিলেন সেজকাকু মান্না দে, কিন্তু তিনি ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’র নিয়মিত শিল্পী ছিলেন না।

কীর্তনাঙ্গের গানে নতুন জোয়ার নিয়ে এসেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র দে। বাঙালিদের চিরকালীন সম্পদ কীর্তন। সেই কীর্তনের পুরোনো আঙ্গিক বদলে ফেলে তাকে নতুন করে বাঙালির সামনে তুলে নিয়ে এলেন কৃষ্ণচন্দ্র দে। শৈলেন রায়ের কথায় আর বাবুজির কণ্ঠের মাদকতায় কীর্তনের সেই নতুন আবেদন আজও ভুলতে পারেনি বাংলার শ্রোতারা।

আমি নিজেও গানবাজনার মানুষ,  দেশেবিদেশে অনেক অনুষ্ঠান করেছি। এখন তো অনলাইনেও দেশ-বিদেশের বহু ছাত্রকে গান শেখাই। গান গাইতে গিয়ে দেখেছি আজও মানুষ কীভাবে শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রেখেছেন আমার দাদুকে৷ সঙ্গীতপ্রিয় মানুষেরা আজও শুনতে চান কৃষ্ণচন্দ্র দে’র গান। দাদুর মতো অত বড়মাপের প্রতিভার গান, তাঁর মতো করে গাইতে পারার যোগ্যতা আমার কতটুকু আছে, জানিনা। কিন্তু  আমার বাবার কাছে, সেজকাকুর কাছে যেটুকু গানবাজনা শিখেছি, দেখেছি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আজও আমার গলায় সেসব গান শুনে কী ভীষণ খুশি হন দেশে-বিদেশের মানুষ! সে আমার বিরাট বড় প্রাপ্তি। বাবা-মা’র মুখে শুনেছি দাদু যখন গান গাইতেন, তাঁর গলায় কীর্তন শুনে হাউ হাউ করে কাঁদত শ্রোতারা। আবার নাটকের মঞ্চে তিনিই একেবারে অন্য মানুষ। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে গাওয়া নাটকের গান ‘জয় সীতাপতি সুন্দরতনু’ বা ‘ওই মহাসিন্ধুর ওপার হতে’ শুনতে ছুটে যেতেন মানুষ। সীতা নাটকের গান তো এত জনপ্রিয় হয়েছিল, যে মা’র মুখে শুনেছি অভিনয় বন্ধ রেখে দর্শকদের অনুরোধে একই গান সাত-আটবার করে গেয়ে যেতে হত বাবুজিকে। ‘এনকোর’ ‘এনকোর’ আওয়াজে ভরে উঠত প্রেক্ষাগৃহ।

আমাদের দে’ঘরানার গানের ধারাতে মিশে আছে এক মনকেমন কীর্তনাঙ্গের সুর৷ কাকা মান্না দে’র সঙ্গীতশিক্ষার মধ্যেও সেই কীর্তনের ধারাটি আছে… খেয়াল আছে… ধ্রুপদ আছে। বিভিন্ন গুণী মানুষের সঙ্গে কথা বলে, পড়াশোনা করে আর নিজের সাঙ্গীতিক বোধ থেকে যেটুকু বুঝেছি, তাতে বলতে পারি, কাকার মতো বহুমুখী ভার্সেটাইল শিল্পী এ দেশে খুব বেশি জন্মাননি। গানবাজনার সঙ্গে জড়িত কাউকে ছোটো না করে, প্রত্যেকের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, কাকার গানের চেহারায় যে বহুমুখী বৈচিত্র, তা এ দেশে আর কোথাও নেই। যে লোকটা ‘জীবনে কী পাব না’ বা ‘আও ট্যুইস্ট করে’র মতো ওয়েস্টার্ন রিদম গাইছেন, বা ‘হায় হায় গো, রাত যায় গো’র মতো ওয়েস্টার্ন মেলোডি গাইছেন তিনিই আবার সিনেমার প্রয়োজনে গাইছেন ‘এখন আমি লেংচে মরি’র মতো হালকা মজার গান। হিন্দি সিনেমাতেও মেহমুদের সঙ্গে জুড়ি বেঁধে একের পর এক অসাধারণ কমেডি সং গেয়ে গেছেন কাকা। শুনলে বুঝতেই পারবেন না, এই কমেডি সং গাওয়া আসলে কতটা কঠিন। শুধু ক্ল্যাসিকাল মিউজিক জানলেই এই গান গাওয়া যায় না। এক অন্যরকম প্রতিভা, অন্যরকম আশীর্বাদ ছাড়া এ গান গাওয়া অসম্ভব। কাকা যে কতখানি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন, এই গানগুলোই তার প্রমাণ। ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, ঠুমরি, রাগপ্রধান, ভজন, গজল, নজম, গীত – কী গাননি তিনি! হিন্দি, মারাঠি, গুজরাতি, কাওয়ালি সব মিলিয়ে ভারতবর্ষের তেরোটা ভাষায় গান গেয়েছেন কাকা। তাঁর ভাইপো হয়ে জন্মেছি, তাঁর ছত্রছায়ায় গান শিখতে পেরেছি – এ আমার পূর্বজন্মের সুকৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়। তাঁর কাছে বেশ কিছুদিন সরাসরি গান শেখার সৌভাগ্যও হয়েছে, তবু বলব গায়কিতে কাকার নখের যোগ্যও হতে পারিনি আমি।

এক অবিশ্বাস্য প্রতিভার নাম মান্না দে। আমি জানি আপনারাও সহমত হবেন আমার সঙ্গে। এ মানুষ ক্ষণজন্মা মানুষ। এমন প্রতিভা সচরাচর জন্মায় না। গুণী মানুষমাত্রই স্বীকার করবেন সে কথা। জানি,তাঁর মতো দেবতুল্য মানুষের শত্রু থাকা সম্ভবই নয়, তবু যদি কেউ কোথাও থেকে থাকেন, তিনিও আমার ধারণা কাকার এই অবিশ্বাস্য প্রতিভা নিয়ে দ্বিমত হবেন না। অতখানি মিউজিক্যাল এবিলিটি আর ভার্সেটাইলিটি এক মান্না দে ছাড়া আর কারও ছিল কি? ভাবা যায়, একজন মানুষ একইভাবে কখনও গাইছেন ‘লাগা চুনরি মেঁ দাগ ছুপাঁউ ক্যেয়সে’, আবার কখনও গাইছেন ‘ফুল গেন্দুয়া না মারো’ বা ‘লপক ঝপক তু আ রে বদরওয়া’ -এর মতো গান! যাঁরা ক্ল্যাসিকাল শিখেছেন, বা খেয়াল-শিল্পী যাঁরা, তাঁরাও এত দক্ষতা আর মিষ্টতার সঙ্গে এই গানগুলো গাইতে পারবেন না, এ আমি বাজি রেখে বলতে পারি।

আমার কমবয়েসে বম্বের এক সাংবাদিক সেজকাকুর একটি সাক্ষাৎকার নিতে আসেন। তাঁর কাছেই শুনেছি, বম্বেতে কাকার  মিউজিক এবিলিটিকে কতটা শ্রদ্ধার চোখে দেখা হত। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। বিখ্যাত সেতারবাদক বিলায়েৎ খাঁ সাহেব প্রথম জীবনে বম্বের রেকর্ডিংএ বাজাতেন। কম বয়স, কিন্তু তখনই তিনি খ্যাতির শীর্ষে। মান্না দে’র সঙ্গেও একাধিক রেকর্ডিং-এ কাজ করেছেন। সেইসময় সেজকাকুর গান শুনে তিনি কাকাকে বলেছিলেন “আপ পিওর ক্ল্যাসিকাল মেঁ আ যাওগে তো বহুত আদমি কা ছুট্টি হো যায়েগা”… কাকুর গান শুনে বিলায়েৎ খাঁ সাহেবের মতো গুণী মানুষেরও মনে হয়েছিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে সরাসরি ক্ল্যাসিকাল সঙ্গীতের সাধনায় নামলে, অনেক নামি-দামি ক্ল্যাসিকাল শিল্পীর পশার নষ্ট করার ক্ষমতা ছিল আমার সেজকাকু মান্না দে’র। সেজকাকুর প্রায় সমবয়সী ছিলেন পণ্ডিত রবিশংকর জি। দু’এক বছরের ছোটোই ছিলেন বোধহয়। কাকার সঙ্গে কাজ করার পর তিনিও বলেছিলেন, ” আপনার সঙ্গে কাজ না করলে বুঝতেই পারতাম না, এতখানি মিউজিক্যাল এফিসিয়েন্সি নিয়েও আপনি সিনেমায় কাজ করছেন”…

একটা সাধারণ প্রবণতা আছে, যাঁরা ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল গান, মানে পিওর ক্ল্যাসিক্যালের চর্চা করেন, তারা ফিল্মের গানকে একটু ছোটো নজরে দেখেন। নিশ্চয়ই সবাই ভাবেন না এভাবে, কিন্তু ফিল্মের গান বা সুগম সঙ্গীতকে একটু খাটো করে দেখার প্রবণতা আছে কারও কারও। আর সেখানেই ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মান্না দে। যাঁদের মধ্যে ওপেননেস আছে, তাঁরা স্বীকার করবেন শুধু খেয়াল ধ্রুপদের তালিম নিয়ে এ গান গাওয়া যায় না। এ গান গাইবার জন্য এক অন্যরকম প্রতিভা লাগে, অন্যরকম শিক্ষা লাগে, অন্যরকম ডাইমেনশন লাগে। আর এখানেই আর পাঁচজন গায়কের থেকে আলাদা হয়ে যান মান্না দে। একদিকে ‘ লপক ঝপক তু আ রে বদরওয়া’র মতো পিওর ক্ল্যাসিক্যাল বন্দিশ গাইছেন তিনি, আবার অন্যদিকে গাইছেন ফৈয়জ খাঁ সাহেবের ‘না বানাও বতিয়া’,  আবার কখনও ‘ইয়ারি হ্যায় ইমান’ এর মতো সুপারহিট কাওয়ালি গেয়ে জমিয়ে ফেলছেন মজলিশ। বাংলাতেও ‘হায় হায় গো রাত যায় গো’, বা উত্তমকুমারের লিপে ‘লাল নীল সবুজের মেলা বসেছে’র মতো ওয়েস্টার্ন মেলোডি গাইবার পরও ‘অভিমানে চলে যেওনা’ বা ‘বাজে গো বীণা’র মতো একের পর এক রাগপ্রধান গান গেয়ে শ্রোতাদের মন জয় করে নিয়েছেন। সবদিক দিয়েই ভ্যারাইটির অপর নাম ছিলেন মান্না দে।

এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা বলি, কাকা বরাবর মদ্যপানকে কিছুটা ঘৃণার চোখে দেখতেন, আমাদেরও শিখিয়েছিলেন গানবাজনা করে মদ খাওয়া শিখো না, তাহলে কোনওদিনই কিছু করে উঠতে পারবে না। ১৯৯০এ কাকার বাইপাস সার্জারি হয়। বিখ্যাত ডাক্তার সুধাংশু ভট্টাচার্যর আন্ডারে বম্বেতে হয় সেই অপারেশন। অপারেশনের পর ব্লাড থিনার হিসাবে সেজকাকুকে রোজ দুপেগ ব্র্যান্ডি জাতীয় কিছু খাওয়ার পরামর্শ দেন ডাক্তার। এ গল্প কাকুর মুখেই শোনা। ডাক্তারের এমন অদ্ভুত প্রেসক্রিপশনে বলাই বাহুল্য খুব একটা খুশি হননি সেজকাকু। বলেছিলেন, আমার এতদিনের অহংকার আমি মদ স্পর্শ করি না, আর সেই আমাকেই মদ খেতে বলছেন! সেজকাকু অবশ্য বরাবরই স্মোক করতেন। কিন্তু আমি জ্ঞানত তাঁকে মদ স্পর্শ করতে দেখিনি কখনও। ডাক্তারি নিষেধাজ্ঞা তিনি কতদূর মেনেছিলেন সে আর জেনে ওঠা হয়নি। জীবনে এক বিন্দু মদ স্পর্শ করেননি, কিন্তু অবলীলায় গেয়ে গেছেন ইনটক্সিকেশনের গান “আভি তো হাত মে জাম হ্যায়”… গানের মধ্যে এতখানি অভিনয় দক্ষতা মিশিয়ে দিতে এক কিশোর কুমার ছাড়া আর কেউ পারতেন কি? এমনই এক অসামান্য, অবিশ্বাস্য, বহুমুখী প্রতিভা ছিলেন আমার সেজকাকু মান্না দে, সেকথা গুণীজনেরা বারবার স্বীকার করেছেন, আগামিতেও করবেন।

ক্রমশ…

মেল যোগাযোগ – [email protected]

আমার সেজকাকু মান্না দে (প্রথম পর্ব)

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More