আমার স্যার শঙ্খ ঘোষ

সব্যসাচী দেব

দেখতে দেখতে ঊনষাট বছর ফিজিক্স অনার্স মেজাজে মিলল না বলে একটা বছর নষ্ট করে ভর্তি হলাম সিটি কলেজে, বাংলা অনার্স নিয়ে জুনের এক মধ্য দুপুরে, আগে দু-একটা ক্লাশ হয়ে গেছে, ক্লাশ নিতে এলেন তিরিশের এক যুবক অধ্যাপক; রুটিনে যাঁর নাম লেখা আছে সি.পি.জি পুরো নাম যে চিত্তপ্রিয় ঘোষ, সেটা অবশ্য জানা হয়ে গিয়েছিল প্রথম দর্শনে মুগ্ধ হওয়ার মতো কিছু ছিল না কিন্তু পড়াতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই যেটা আমাকে টানটান করে তুলল, তা হল তাঁর কণ্ঠস্বর কী ছিল সেই স্বরে! পনেরো পেরনো এক তরুণের কাছে তা মনে হয়েছিল মায়াবী, মনে হয়েছিল এই তো আমি প্রবেশ করব এক জাদু-জগতে

প্রথম দিনের ক্লাশেই জেনেছিলাম তিনি আমাদের পড়াবেন ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, ‘ছন্দ’, ‘ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস’, ‘পুনশ্চ’ আর রবীন্দ্রনাথের দুটো নাটক—‘মালিনী’ আর ‘রক্তকরবী’ সিলেবাসে আছে, কেউ না কেউ তো পড়াবেনই এগুলো, তবু মনে হয়েছিল এই পড়ানোটা অন্যরকম হবে, শুধু কণ্ঠস্বরে নয়, তাঁর কথা বলার মধ্যেই কোথাও ছিল সেই আশ্বাস

দুদিন কাটতে না কাটতেই এক সহপাঠী খবর আনল সি.পি.জি.র আসল নাম শঙ্খ ঘোষ কোনটা আসল, কোনটা নকল, নাকি দুটোই আসল, সেসব নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় ছিল না তখন আমার মাথার মধ্যে তখন ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁরই পঙ্‌ক্তি–‘… সর্পিনী পিচ্ছিলতা একটু নড়ুক চড়ুক’

কলেজে ঢোকার পরেই ইউনিয়ন থেকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল কলেজ ম্যাগাজিন, চমক লেগেছিল সেখানেই পরিচিত কয়েকটা নাম দেখে–সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর শঙ্খ ঘোষ তখনই জেনেছিলাম কোনও না কোনও সূত্রে এঁরা সকলেই সিটি কলেজের সঙ্গে যুক্ত নামগুলো পরিচিত ছিল এই কারণেই যে স্কুল জীবনের অন্তিম দু-তিন বছরেই বুঝি না বুঝি আধুনিক বাংলা কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে গিয়েছিল, প্রচুর সিলেবাসের বাইরের বই পড়তে পারার অবাধ স্বাধীনতার সুত্রে সেই অভিজ্ঞতার পরেই হাতে হাতে মিলল তাঁদের কবিতা শঙ্খ ঘোষের সেই কবিতা ‘কিউ’, না বুঝলেও এক মাদকতায় আচ্ছন্ন করে রেখেছিল আমাকে

সেই শঙ্খ ঘোষ এখন আমার মাস্টারমশাই সেদিন থেকে আজও তিনি আমার মাস্টারমশাই, যাঁকে স্যার ছাড়া অন্য কোনও সম্বোধনের কথা ভাবতেই পারিনি কখনও শিখেই চলেছি তাঁর কাছে, যদিও কোনোদিনই ভালো ছাত্র না হওয়ায়, সব শেখা যে সফল হয়েছে তা বলতে পারি না ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ আমার প্রিয় ছিল না, তাঁর কাছেই বুঝলাম রাবণের চরিত্রের দার্ঢ্য আর তার ট্রাজেডি, চরিত্রের ভিতরের নিঃসঙ্গতা আর যন্ত্রণা। আস্তে আস্তে মধুসূদনকে ভালোবাসতে শিখলাম সেই ক্লাশনোটগুলো আজও আছে জানি, বইপত্রের স্তূপে কোথাও মুখ লুকিয়ে মাঝে মাঝে খুঁজে দেখতে ইচ্ছে করে, ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সিটি কলেজের দিনগুলোতে

সিটি কলেজ

ক্লাশের পড়ার সেরা অভিজ্ঞতা অবশ্যই ‘রক্তকরবী’  আজও যে বারবার ফিরে যাই, ফিরে যেতে হয় রবীন্দ্রনাথের এই লেখাটির কাছে তার কারণ একটাই, এই অমোঘ আকর্ষণ তৈরি করে দিয়েছিলেন স্যার, সেখানে যেটুকু প্রবেশাধিকার পেয়েছি তা স্যারের শিলমোহর সঙ্গে আছে বলেই তবু ‘রক্তকরবী’-র প্রসঙ্গ বাদ দিতে চাই, কারণ সে কথা ফুরোবে না কোনোদিনও 

৫৯ বছর কাটল এখনও চোখ বুজলে দেখতে পাই সিটি কলেজের দোতলার বারান্দার এক প্রান্তে আমাদের ক্লাশরুম, সেখানে কোনো গ্রীষ্মের দুপুরে বা বৃষ্টির বিকেলে ধীর পায়ে ক্লাশে ঢুকছেন স্যার, আমরা অপেক্ষা করে থাকছি এক জাদু জগতের দরজা খুলে যাওয়ারস্যারের বাড়ি প্রথম গিয়েছিলাম, তখন বোধহয় থার্ড ইয়ার কোনো কারণ ছাড়াই গিয়েছিলাম ইন্দ্র বিশ্বাস রোডের সেই বাড়িতে, মিঠি তখন একেবারেই বাচ্চা সেই একদিনই যখন এম এ পড়ছি, তখন বাংলার স্টাফরুম ছিল ছোটো, সেমিনার রুমই বলতাম তাকে, তার সামনে জটলা করছি, হঠাৎ স্যার বেরোলেন ঘর থেকে; সম্ভবত দেখা করতে এসেছিলেন কোনো অধ্যাপকের সঙ্গে আমরা যারা সিটি কলেজ থেকে এসেছি, সে কজন দৌড়ে গিয়ে প্রণাম করতে মৃদু হেসে বললেন–এবার তো বাড়িতে আসতে পারো 

তারপরে গেছি কালাচাঁদ সান্যাল লেনের বাড়িতে কয়েকবার, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় রোডের বাড়িতে অনেকবা‌র ততদিনে আমি শুরু করেছি কবিতা লেখার ব্যর্থ চেষ্টা, সেই সব ব্যর্থ প্রয়াসের কিছু নমুনা ছাপাও হচ্ছে পত্রিকায় কিন্তু কোন্‌ এক ভ্রান্ত অহমিকায় নিজের লেখা কোনোদিনও কাউকে দেখানোর কথা মনে হয়নি, স্যারকেও দেখাইনি ফলে কবিতা আর আমার শেখা হল না কোনোদিনও যদিও যাকে বললাম অহমিকা, তা আসলে দুর্বলতারই লজ্জা মনের কোণে এই সংকোচটুকুও তো ছিল যে, কী নিয়ে দাঁড়াব তাঁর সামনে! এত দীন উপচার নিয়ে কি যাওয়া যায় বিরাটের সামনে!

কবিকে রাষ্ট্রপতির প্রণাম

শঙ্খ ঘোষের বাড়িতে সব সময়ই অবারিত দ্বার এই সেদিন পর্যন্ত এখন তাঁর শারীরিক অসুস্থতা বাধ্য করেছে অনর্গল না হতে কিন্তু সে বাড়ির রবিবারের আড্ডার কথা তো সবাই জানেন, যা এই অসুস্থতা আর করোনা-কালের দাপটে অনেকদিন বন্ধ, হয়ত বা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল তা

শঙ্খ ঘোষের অনুরাগীদের মধ্যেও অনেকে অখুশি ছিলেন এই আড্ডা নিয়ে একদলের মতে, এই আড্ডায় প্রশ্রয় পায় অনেক অনধিকারী আরেকদলের অভিযোগ, স্যারের অনেক সময় নষ্ট করি আমরা আড্ডাধারীরা কথাটা বা দুই অভিযোগই যে একেবারে মিথ্যে এমনটা বলা যাবে না কিন্তু স্যার তো কাউকে অনধিকারী মনে করেন না কী অসীম ধৈর্যে একেবারে অচেনা কবি-হতে-চাওয়া ছেলেমেয়েদের লেখা পড়েন তিনি, একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে তাদের বোঝান এটা ওটা, আর আমরা একটু দূর থেকে তখন দেখি এক যথার্থ শিক্ষককে, মনে মনে পাঠ নিতে চাই

সেই বিখ্যাত আড্ডা

কবি বা যে-কোনো শিল্পীর ক্ষেত্রেই অবশ্য সময় নষ্ট করার অভিযোগে সত্য বলেই মনে করা যায় এবং খুব কম মানুষই বাড়িতে-আসা সব বয়সের সব স্তরের মানুষকে এতটা সময় দেন শঙ্খ ঘোষের কাছে এটা সময় নষ্ট করা নয়, বরং এই সময় থেকে তিনি আহরণ করে নেন অনেক কিছু– তরুণদের কাছ থেকে তাদের তারুণ্যের দীপ্তি, প্রবীণদের কাছ থেকে তাঁদের অভিজ্ঞতা, এই আহরণ তাঁকে সজাগ রাখে, তাঁর রচনায় এনে দেয় যৌবনের সামর্থ্য এমন নয় যে এসব ছাড়া লিখতে পারতেন না তিনি, কিন্তু এই আড্ডা নিয়ে তিনি যেরকম উন্মুখ হয়ে থাকেন, বোঝা যায় এর উত্তাপটুকুকে তিনি বাদ দিতে চান না তাঁর পাঠতৃষ্ণার কথা সবাই জানে পাঠের মধ্যে যেমন থাকে দেশি-বিদেশি ধ্রুপদী বা বিখ্যাত লেখা, তেমনই তরুণতমের লেখাও পায় তাঁর সমান মনোযোগ এই কি তবে ‘ঐতিহ্যের বিস্তার’!

আমরা কেন যাই? আমরা, যারা প্রায় প্রতি রবিবার ঈশ্বরচন্দ্র নিবাসের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের বাড়িটির তিনতলার ফ্ল্যাটের বসার ঘরে জমায়েত হতাম প্রায় নিয়ম করে (হতাম লিখলাম, কারণ একবছর হলো সে আড্ডা বন্ধ, স্যারের অসুস্থতা আর করোনার প্রকোপে)–কী আমাদের টান? শঙ্খ ঘোষের মতো একজন বিখ্যাত ব্যক্তির সান্নিধ্য পাওয়া? তাঁর সঙ্গে সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করা? কেউ কেউ নিশ্চয়ই আসেন সেই উদ্দেশ্য নিয়েই, তাঁদের শেষ-হতে-না-চাওয়া ফটো সেশনে প্রকৃত আড্ডাধারীরাই একেক সময়ে বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে আসেন আড্ডা ছেড়ে, স্যার কিন্তু অচঞ্চল এই ধৈর্য সব সময় ভালো ফল দেয় না, নিজের শরীরেরই ক্ষতি করেন, তবু কখনও অবুঝদের অন্যায় আবদারে না করেন না এই সহিষ্ণুতা সম্ভবত হারিয়ে গেছে আমাদের জীবন থেকে, এ যেন গত শতকের ভদ্রতা শঙ্খ ঘোষ কি তার শেষ প্রতিনিধি?

আমরা যারা, সেলফি-উৎসুক নই, তারা লাভবান হই এই আড্ডায় হঠাৎ হঠাৎ পেয়ে-যাওয়া কিছু গুণী মানুষের চকিত সান্নিধ্যে কিন্তু সেটা তো সামান্য প্রাপ্তি নিজের কথা বলতে পারি, ঊনষাট বছর আগে শুরু করেছিলাম যে শিক্ষার্থীর জীবন তাঁর কাছে, আজও আমার তা শেষ হয়নি, শেষের প্রত্যাশীও নই এই আড্ডা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে কী শিখিয়েছে তা ব্যাখ্যা করে বলাও সম্ভব নয় তা কেবল অনুভব করার

আমি কি খুব বাধ্য ছাত্র! সম্ভবত না সব মেনে নিই না, কিন্তু খেই হারিয়ে যায়, অসম্মতিগুলো সাজিয়ে তুলতে পারি না, এলোমেলো অসংলগ্ন হয়ে যায়, তারপর টের পাই সেই আপত্তিগুলো ততটা যুক্তিসম্মত নয় প্রকাশ্যে তাঁকে প্রণাম করি খুব কম, কিন্তু মনে মনে বারবার প্রণত হই এই আড্ডায় স্যার খুব কম কথাই বলেন, শোনেনই বেশি, কিন্তু তাঁর নীরব উপস্থিতিই অনেক বাঙ্ময় হয়ে ওঠে এক একটি চকিত মন্তব্য কখনও কখনও ঝলসে ওঠে, সবাই সেই ইশারা ধরতে না পারলেও কেউ কেউ তো পারেনই কখনও বা আড্ডার নিয়ম মেনেই, সিরিয়াস না হয়েই হাল্কা কোন জিজ্ঞাসা ভাসিয়ে দেয় কেউ, এর ওর তার ঘাট ঘুরে তা পৌঁছে যায় স্যারের কাছে, কোনো চেয়ার টেবিল বেঞ্চ না থেকেও আমরা তখন উদগ্রীব ছাত্র মাত্র, কথার পিঠে কথা গড়াতে থাকে, প্রশ্নের মীমাংসা হয় কিংবা হয় না, হয়ত তা অপেক্ষায় থাকে অন্য কোনো দিনের আর এভাবেই তো শিখে নিই কত কী? প্রতিদিনের আড্ডার শেষে বাড়ি ফিরে বুঝতে পারি আজ কতটা ভরল ঝুলি সব যে থেকে যায় তা নয়, ঝুলির কোন ফুটো দিয়ে গড়িয়ে পড়ে যায় অনেক কিছুই, যার ফলে শেখা হয়ও না কত কী, তবু যেটুকু রয়ে যায় বিরাটের কাছে পাওয়া, পিগমি আমরা তাই আমাদের অনেকখানি 

  ক্লাশে তাঁর কাছে পড়েছিলাম রবীন্দ্রনাথ পড়াতে গিয়ে তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন পাঠ্য নাটকের সঙ্গে কীভাবে মিলিয়ে নিতে হয় নাটক দেখা, সেই প্রণোদনায় দল বেঁধে গিয়েছিলাম নিউ এম্পায়ারে একাডেমি অব ফাইন আর্টস তখনও নাট্যমঞ্চ হয়ে ওথেনি, রবীন্দ্র সদন দূরের বস্তু, বহুরূপী নাটক করতেন নিউ এম্পায়ারেই সেই রক্তকরবী দেখা আর শঙ্খ ঘোষের পড়ানো মিলে আমরা জানছিলাম রক্তকরবী, জানছিলাম রবীন্দ্রনাথকে তাঁর পড়ানোয় নাটকীয়তা ছিল না, কিন্তু কণ্ঠস্বরের ওঠানামায়, স্বর প্রক্ষেপনের সহজ ভঙ্গিতে বিকেলের ছায়া-নামা সেই ক্লাশঘর হয়ে উঠত মঞ্চেরই সমান  

সেই ক্লাস তাই হয়ে উঠল আমার রবীন্দ্রনাথের দিকে যাত্রার সূচনা তারপর তাঁর অসংখ্য লেখায় কতভাবে পড়েছি

রবীন্দ্রনাথকে, তাঁর ভাষণে মুখের কথায় ধরা দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ আর মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভেবেছি কী করে তাঁর কবিতা কেবল রবীন্দ্র প্রভাবমুক্তই নয়, হয়ে রইল এমন রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ রহিত যেন খুব সযত্নে কবিতাতে তিনি এড়িয়ে যাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথকে তখন বুঝতে পারি তাঁর রবীন্দ্রনাথ একান্ত তাঁরই, ভক্তিরস নেই সেখানে, আছে আত্মস্থ করার সাধনা আড্ডাতেও তো টুকরো আলাপে অনেক সময়ই এসে যায় রবীন্দ্রনাথের কথা, সাহিত্য বা ব্যক্তির, কখনও তা গম্ভীর আলোচনার দিকে বাঁক নেয়, কখনও বা হাল্কা হাসিতে শেষ হয় হাতে নোটবই থাকে না, পেনসিলও–মনে মনে টুকে নিতে চেষ্টা করি এইসব টুকরো কথা 

উনষাট বছর কি খুব কম সময়! এতগুলো বছর পেরিয়ে গেল তাঁকে প্রথম দেখার দিন থেকে মাঝখাঁনে পেরিয়ে এসেছি অনেক ঝোড়ো দিন, তাঁর কবিতার সঙ্গে পথ হাঁটতে হাঁটতে দেখেছি নানা বাঁক বদল রাজনৈতিক সংগ্রামের জটিল সময়ে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছি কোথাও তিনি আমাদের পাশে আছেন তাঁকে দেখেছি পারিবারিক পরিমণ্ডলে, নানা ভাবে পরিবারের অনেকের সঙ্গেই আমার ঘনিষ্ঠতা, পেয়েছি প্রতিমাদির অকৃপণ স্নেহ, আর টের পেয়েছি এর সবেরই মুল কারণ তিনি তাঁকে পেয়েছি মিছিলে, প্রতিবাদ সভায়, কতবার নানা অনুষ্ঠানশেষে ফেরার সময় সঙ্গী হয়েছি তাঁর, নানা গল্পে পার করেছি সময়, হঠাৎ কখনও অপ্রত্যাশিত ফোনে বেজেছে তাঁর গলা, আমার কোনো লেখার প্রশংসায় সেই দিনগুলো মনে হয়েছে স্বপ্ন তবু একেক সময় মনে হয় কীভাবে পৌঁছলাম তাঁর এতটা কাছে অবশ্যই সে তাঁরই অসীম ঔদার্য আমাকে অভিষিক্ত করেছে পরম স্নেহে 

দুহাত পেতে রেখেছি আজীবন যা তিনি দিয়েছেন, মুঠিতে ধরে রাখতে পারিনি তার সবকিছু, উপছে ছড়িয়ে গেছে কিছু এদিক ওদিক যা পেয়েছি তাই আঁকড়ে থাকি আমি নিরীশ্বরবাদী, তবু আমার একজন ঈশ্বর আছেন কখনও বন্ধুদের বলেছি সে কথা, হয়ত লিখেছিও কখনও– সেই ঈশ্বর রবীন্দ্রনাথ কিন্তু বড়ো দুরধিগম্য তিনি, বড়ো দুরূহ আর দুর্গম তাঁর কাছে পৌঁছনোর পথ তবু যে সে পথে কিছুটা এগোতে পেরেছি, তার কারণ আমার হাত ধরে এগিয়ে দিয়েছিলেন দুজন দেবদূত তাঁদের একজন শঙ্খ ঘোষ

কিন্তু দেবদূতরা কি স্পর্শযোগ্য! আমি তো ছুঁতে পেরেছি শঙ্খ ঘোষকে! কী সহজ দৈনন্দিনতায় পেয়েছি তাঁকে! কত অবলীলায় তাঁকে ডাকতে পেরেছি স্যার বলে!

হ্যাঁ, শঙ্খ ঘোষ আমার মাস্টারমশাই, সর্ব অর্থে তিনি আমার স্যার স্যার শঙ্খ ঘোষ‘প্রায় একবছর বাদে আজ দেখা হলো তাঁর সঙ্গে কথা আরও কমে গেছে, মাস্কে ঢাকা মুখে তবু টের পাওয়া যায় আগের মতোই মৃদু কৌতুকের বিচ্ছুরণ চলে আসার আগে প্রণাম করে এগোচ্ছি দরজার দিকে, বারণ সত্ত্বেও আগের মতোই তিনিও এগিয়ে আসছেন দরজা পর্যন্ত, খুব নিচু প্রায় অবোধ্য স্বরে আমাকে কিছু বললেন, তারপর বাঁহাত দিয়ে জড়িয়ে নিলেন আমার ডান হাত, নিজের ডান হাতের আঙুল দিয়ে আঁকড়ে ধরলেন আমার বাঁহাতের আঙুলগুলো চোখে জল ভরে এল আমার, কিন্তু সে জল ঝরতে দিইনি পাছে কেউ মেলোড্রামা ভাবে 

ফিরে এলাম তাঁর ওই স্নেহাকুল স্পর্শটুকু নিয়ে তিনি আমার স্যার। আজ তাঁর জন্মদিন।

ছবি ঋণ – শঙ্খ ঘোষ পেজ, ফেসবুক/ শাশ্বতী সান্যাল

সব্যসাচী দেব ৬০ দশকের উল্লেখযোগ্য কবি। গদ্য লেখেন ইরাবান বসু রায় নামে। সাহিত্যের পাশাপাশি ফিল্মতত্ত্ব নিয়েও তাঁর বিস্তৃত কাজ রয়েছে। ভালোবাসেন দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়াতে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More