কেরল পারলে, বাকি দেশ পারবে না কেন?

কেরল সরকার সেই রাজ্যে থেকে যাওয়া ভিনরাজ্য থেকে আগত শ্রমিকদের যেভাবে আগলে রেখেছে, তা অভূতপূর্ব। প্রথম কথাই হল এই যে, এদের কেরল সরকার ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ বা ‘মাইগ্রান্ট লেবারার’ বলছেই না; বরং বলছে, ‘অতিথি শ্রমিক’।

অংশুমান কর

মার্চের মাঝামাঝি, যখন দেশ জুড়ে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকল, বাড়তে লাগল করোনা আক্রান্তের সংখ্যা, তখন ছিল একেবারে প্রথম সারিতে। একটা সময়ে আক্রান্তের নিরিখে দেশে প্রথম স্থান অধিকারও করেছিল রাজ্যটি। দেশের মধ্যে প্রথম করোনা আক্রান্তের সন্ধানও পাওয়া গিয়েছিল কেরলেই, জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে। কিন্তু এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। আক্রান্তের হিসেবে আর প্রথম তিনেও নেই কেরল। মৃতের সংখ্যার নিরিখে এমনকি পশ্চিমবঙ্গেরও পরে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের তথ্য জানাচ্ছে, কেরলে এখন (১১ এপ্রিল ২০২০ বিকেল ৫টা ১২ মিনিট অবধি) আক্রান্ত ৩৬৪। মৃত মাত্র দুই! অন্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য এও বলছে যে, এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা আগের সপ্তাহের আক্রান্তের সংখ্যার চেয়ে ৩০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে আক্রান্তদের প্রায় ৩৪ শতাংশ সুস্থ হয়েছেন ইতিমধ্যেই। এই অসাধ্যসাধন সম্ভব হল কীভাবে?

কেরল সরকার যে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে, এখনও তা থেকে অন্য রাজ্যগুলি কিছু না কিছু শিখতেই পারে। চ্যালেঞ্জটা কিন্তু কেরল সরকারের কাছে ছিল বেশ কঠিনই। কেননা, ফি-বছর শীতে এই রাজ্যে কেবল ব্যাক ওয়াটারের আকর্ষণেই প্রচুর বিদেশি পর্যটকের সমাগম হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রথম করোনা আক্রান্তের সন্ধান পাওয়ার পরেই কেরলের রাজ্য সরকার বিমানবন্দরগুলিতে কড়াকড়ি শুরু করে দেয়। করোনার ‘হটস্পট’ বলে চিহ্নিত ইরান বা দক্ষিণ কোরিয়া সহ ৯টি দেশ থেকে আগত বিদেশিদের হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো শুরু হয়ে যায় ১০ ফেব্রুয়ারি থেকেই। কেন্দ্র সরকার তখনও এই ব্যাপারে সেভাবে নড়েচড়েই বসেনি। কোয়ারেন্টাইনের সময়সীমাতেও সারা দেশকে পেছনে ফেলে দিয়েছে কেরল। যেখানে সারা দেশে কোয়ারেন্টাইনের সময়সীমা ১৪ দিন, সেখানে কেরলে এই সীমা ২৮ দিন। কোয়ারেন্টাইনে যারা ছিলেন বা আছেন, তাদেরও তেমন বিক্ষোভ দেখা যায়নি। কেননা, তাদের নিজেদের পছন্দমতো খাবার দেওয়া হয়েছে, ফ্রি ওয়াইফাই-এর সুবিধে দেওয়া হয়েছে, আর করা হয়েছে কাউন্সেলিং। সেটিও নিয়মিত ভাবে। এটি, সন্দেহ নেই, অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ। একইভাবে কেরল সরকার অন্য রাজ্যগুলির চেয়ে টেস্ট করেছে অনেক অনেক বেশি। আজ তো বিশেষজ্ঞরা বলছেনই যে, শুধু লকডাউনে কাজ হবে না, দরকার র‍্যাপিড টেস্ট। তামিলনাড়ু, কেরলের প্রতিবেশী রাজ্য, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা কেরলের চেয়ে অনেক বেশি, সেই রাজ্যে যেখানে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে টেস্ট হয়েছে ছয় হাজার, সেখানে কেরলে টেস্ট হয়েছে তেরো হাজার! অনেকেই তাই বলেছেন যে, কেরলের রাজ্য সরকার করোনা মোকাবিলায় যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা ‘কড়া’ কিন্তু ‘মানবিক’।

মানবিক তো বটেই। রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি অর্থ মঞ্জুর করছে কেরল সরকারই। পরিমাণ কুড়ি হাজার কোটি টাকা। কেরল সরকারের ‘মানবিক’ মুখটি ফুটে উঠেছে সরকারের অন্য কাজেও। যেমন ধরা যাক, যাদের বলা হচ্ছে ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ তাদের কথাই। এদের করুণ অবস্থা নিয়ে ইতিমধ্যেই লেখালেখি হয়েছে বিস্তর। কেরল সরকার সেই রাজ্যে থেকে যাওয়া ভিনরাজ্য থেকে আগত শ্রমিকদের যেভাবে আগলে রেখেছে, তা অভূতপূর্ব। প্রথম কথাই হল এই যে, এদের কেরল সরকার ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ বা ‘মাইগ্রান্ট লেবারার’ বলছেই না; বরং বলছে, ‘অতিথি শ্রমিক’। এদের মধ্যে করোনা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে, ভাষা একটা বড় সমস্যা হতে পারে। তাই এইসব শ্রমিকদের রাখার জন্য যেসব ক্যাম্প তৈরি হয়েছে (এই ক্যাম্পও সংখ্যায় অগুনতি) সেই ক্যাম্পগুলিতে সেইসব কর্মীদেরই পাঠানো হচ্ছে যারা এই শ্রমিকদের ভাষা বলতে পারেন। মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ন নিজে ট্যুইট করেছেন মালায়ালমের পাশাপাশি হিন্দি এমনকি বাংলাভাষাতেও! কোনও সন্দেহ নেই যে, কেরল সরকার করোনা মোকাবিলায় কড়া পদক্ষেপ নিলেও সরকারের ‘মানবিক’ মুখটি নির্দেশ আর নিয়মকানুনের বেড়াজালে হারিয়ে যেতে দেয়নি।

আসলে করোনা মোকাবিলায় বাস্তবোচিত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেরলের সরকার বেশ কিছু বাস্তবোচিত পদক্ষেপ নিয়েছে দ্রুত। রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন। বলেছেন যে, “উই হোপড ফর দ্য বেস্ট বাট প্ল্যান্ড ফর দ্য ওয়ার্স্ট”। এটিই তো সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজা এটিও জানাতে ভোলেননি যে, এখন কার্ভটা একটু স্থির হয়েছে, কিন্তু আগামী সপ্তাহেই কী হবে কেউ জানেন না। অর্থাৎ, আত্মসন্তুষ্টির কোনও অবকাশ নেই। বাস্তবোচিত পদক্ষেপের পাশাপাশি কেরলের শাসকদলের রাজনৈতিক সদিচ্ছাকেও প্রশ্ন করা যাবে না। পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠেছে বোঝার সঙ্গে সঙ্গেই কেরলের মুখ্যমন্ত্রী বিরোধী দলনেতাকে নিয়ে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন। প্রশংসা প্রাপ্য বিরোধী দলটিরও। এই যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন জনমানসে এই বার্তা দিয়েছে যে, এখন কাজের সময়, রাজনৈতিক তরজার সময় নয়। রাজনীতির আঙিনার বাইরে যেমন করোনাকে আজ আমাদের দেশে কেন গোটা বিশ্বেই রাখা যাবে না, তেমনই রাজনৈতিক তরজার চোরাবালিতে আটকে পড়লে উত্তরণ অসম্ভব। তলিয়ে যাওয়াই তখন একমাত্র ভবিতব্য। দুঃখের এটাই যে, এই ক্রান্তিকালে রাজনৈতিক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে ওঠার যে দৃষ্টান্ত কেরল স্থাপন করতে পেরেছে, আমাদের রাজ্য তা পারছে না। আমরা এই লড়াইয়ে এখনও পর্যন্ত খুব খারাপ করিনি। কিন্তু আরও একটু ভাল করা যেতেই পারত। এখনও কিন্তু সে সুযোগ আছে। আজই সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী অনেকগুলি ‘মানবিক’ পদক্ষেপের ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে যেমন রয়েছে কৃষকদের জন্য অ্যাপ, তেমনই রয়েছে হোম ডেলিভারি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা। তবে এই সব পদক্ষেপের পাশাপাশি রাজনৈতিক তরজার উপরে আমাদের উঠতেই হবে। এবং এ জন্য কেবল রাজ্যের শাসকদলকেই দায়িত্ব দিলে হবে না, অন্য দলগুলিরও কিন্তু দায়িত্ব রয়েছে। বাম নেতারা যেমন ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন।

কেরল মডেল থেকে তাই গোটা দেশই কিছু কিছু জিনিস শিখতেই পারে। বেশ কয়েকটি রাজ্য ইতিমধ্যেই কেরলের সরকারের কাছ থেকে জানতে চেয়েছে করোনা মোকাবিলায় ঠিক কী কী পদক্ষেপ কেরল নিয়েছে। কেউ কেউ অবশ্য প্রশ্ন করেছেন যে, কেরলে যা সম্ভব হয়েছে বা হচ্ছে তা কি ভারতের অন্য রাজ্যে সম্ভব হবে? দীর্ঘদিন কেরলে সাক্ষরতার হার অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় বেশি। শিশুমৃত্যুর হার দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম। শিশুদের টিকাকরণের হারে এ রাজ্য আবার দেশের মধ্যে প্রথম। অনেকেই বলেন যে, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটি সে রাজ্যেই সবচেয়ে শক্তপোক্ত। অনেকের পছন্দ না হলেও এই কথাটিও তো সত্যি যে, স্বাধীনতার পর থেকে সে রাজ্য সবচেয়ে বেশি থেকেছে বাম শাসনে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে রাজ্যশাসনে প্রথম থেকে গুরুত্ব দেওয়ার সুফল করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে আজ তাই পাচ্ছে কেরল। ঠিক যে, এইসব দিক বিচার করলে একথা মনে হতেই পারে যে, কেরল যা পেরেছে, তা অনেক রাজ্যই হয়তো পারবে না। কিন্তু কিছুটাও তো পারবে। কয়েকটি রাজ্য আগেই লকডাউনের মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে মিটিংয়ে আজ প্রধানমন্ত্রীও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, দেশে লকডাউন অন্তত আরও চার সপ্তাহ জারি থাকবে। অবশ্য সারা দেশে সমানভাবে এই লকডাউন জারি থাকবে কিনা তা অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না এখনই। কেননা প্রধানমন্ত্রী করোনা মোকাবিলায় দেশকে তিনটি জোনে বিভক্ত করে নেওয়ার কথা বলেছেন। তবে মোদ্দা কথা হল এই যে, ভিন্ন ভিন্ন ভাবে হলেও দেশের নানা প্রান্তে লকডাউনের মেয়াদ বাড়তে চলেছে। আমাদের রাজ্যেই যেমন আজ মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মিটিংয়ের পরে ঘোষণা করেছেন যে, লকডাউন জারি থাকবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। লড়াই তাই দীর্ঘমেয়াদী। এই অবস্থায় রাজনৈতিক ছুঁৎমার্গ ভুলে যদি কেরলের থেকে গোটা দেশ এই লড়াইয়ের কৌশল কিছু শিখতে পারে, তাতে তো লাভ সকলেরই। ভুলে গেলে চলবে না যে, করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই দ্বিতীয় পর্যায়ের লকডাউনকে একই সঙ্গে হতে হবে ‘কড়া’ ও ‘মানবিক’।

আগের পর্বগুলি…

দূরের পথ দিয়ে ঋতুরা যায়, ডাকলে দরজায় আসে না কেউ

একটা পূর্বদিক বেছে নিতে হবে

খুব সহজেই আসতে পারে কাছে…

আমি কি এ হাতে কোনও পাপ করতে পারি?

খসে যেত মিথ্যা এ পাহারা…

যতবার আলো জ্বালাতে চাই…

দাদাগিরি ‘আনলিমিটেড’

লকডাউন কি বাড়ানো উচিত হবে?

শিশুদের ভাল রাখার উপায় সম্বন্ধে যে দু-একটি কথা আমি জানি

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More