বান্দ্রার পরে আর শুকনো কথায় চিঁড়ে ভিজবে কি?

‘অতিথি শ্রমিক’দের জন্য আরও প্যাকেজ চাই। প্যাকেজ চাই আয়কর সীমানার নীচে থাকা মানুষদের জন্যও। বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের জন্যও চাই প্যাকেজ। চাই এবং দ্রুত চাই।

অংশুমান কর

দেখে মনে হচ্ছে যে, সংখ্যাটা হবে প্রায় হাজার তিনেক। কোনও কোনও চ্যানেলে বলছে অবশ্য সংখ্যাটা আড়াই হাজার। এঁরা ভিড় করেছিলেন মুম্বাইয়ের বান্দ্রা স্টেশনে। এঁদের বলা হচ্ছে ‘পরিযায়ী শ্রমিক’। যদিও এই শব্দবন্ধটি নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেক আপত্তি উঠেছে। যেমন, কেরল বা ওড়িশায় এঁদের বলা হচ্ছে ‘অতিথি শ্রমিক’। শব্দ ব্যবহার নিয়ে তর্কটি পরে কখনও তোলা যাবে। কিন্তু প্রথমেই যে প্রশ্নটি ওঠে তা হল, কেন আর কীভাবে এই আড়াই বা তিনহাজার শ্রমিক বান্দ্রা স্টেশনে জড়ো হলেন? কী করে এইরকম একটি ঘটনা ঘটল সেই মহারাষ্ট্রে যেখানে এই মুহূর্তে করোনা আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা দেশের মধ্যে সর্বাধিক?

এটা খুবই বেদনার যে, যখন দেশ প্রবেশ করতে চলেছে দ্বিতীয় পর্যায়ের লকডাউনে, তখন, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণেই ঘটল এই ঘটনা। নিঃসন্দেহে এই রকম একটি ঘটনা প্রবল আতঙ্ক সৃষ্টি করবে জনমানসে। কেননা, এই পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে যদি করোনা আক্রান্ত কেউ থাকেন, তাহলে তো ভয়ংকর বিপদ! করোনা-আক্রান্ত কেউ না থাকলেও কি দেশ নিরাপদ? না। তা কিন্তু নয়। কেননা, এঁদের মধ্যে একজনও যদি এমন কেউ থাকেন যিনি করোনা ভাইরাসের ‘অ্যাসিম্পোটোম্যাটিক ক্যারিয়ার’, তাহলে ওই এক ব্যক্তির থেকেও একাধিক মানুষ সংক্রমিত হতে পারেন। তাঁদের থেকে আরও আরও মানুষ। একটি চ্যানেলে এইরকমটাই বলছিলেন একজন ডাক্তারবাবু। অর্থাৎ চেনভাঙার যে লড়াই চলছে, সেই লড়াই মারাত্মকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। দেশ এই মারণরোগের বিরুদ্ধে যেভাবে লড়াই করছিল, পিছিয়ে যেতে পারে সেই লড়াই। আগের একটি লেখায় আমি বলেছিলাম যে, দ্বিতীয় পর্যায়ের লকডাউনে যদি সরকারগুলি একই সঙ্গে ‘কড়া’ ও ‘মানবিক’ না হতে পারে, তাহলে সমূহ বিপদ। দেখা যাচ্ছে যে, মহারাষ্ট্র সরকার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

প্রশ্ন উঠবেই যে, এই যে ঘটনাটি ঘটল, এর দায় কে নেবে? এই প্রশ্ন করলেই অনেকেই বলবেন যে, রাজনৈতিক প্রশ্ন করা হচ্ছে। মানি যে, রাজনৈতিক তরজার সময় এটা নয়। কিন্তু কিছু প্রশ্ন তো করতেই হবে। করতেই হবে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে গেলে। এতে কেউ যদি মনে করেন ‘রাজনীতি করা’ হচ্ছে, তাহলে বিনীতভাবে বলতে হয় যে, কেবল বিজ্ঞানের ব্যবহার দিয়ে করোনার মোকাবিলা করা যাবে না। সরকারগুলির ভূমিকা, প্রশাসনের ভূমিকা এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কিছু তেতো প্রশ্ন করতেই হবে। করতেই হবে যাতে করে একটি ভুল থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। কাজেই যে ঘটনা করোনার বিরুদ্ধে লড়াইকে একধাক্কায় অনেকখানি পিছিয়ে দিতে পারে, সেই ঘটনাটি কেন ঘটল তা বোঝার চেষ্টা আমাদের করতে হবেই। করতেই হবে কিছু প্রশ্ন আর তা রাজনীতির আঁচ বাঁচিয়ে তো করা যাবে না!

যেমন, প্রথমেই এই প্রশ্ন করতেই হয় যে, এতজন শ্রমিক কেন জড়ো হলেন বান্দ্রা স্টেশনে? এই লেখা যখন লেখা হচ্ছে, ততক্ষণে মূল যে উত্তর পাওয়া গেছে এই প্রশ্নের তার দু’টি অভিমুখ। প্রথম, এই শ্রমিকদের অনেকেই জানতেনই না যে, লকডাউনের মেয়াদ শেষ হয়েছে। তাঁদের ধারণা ছিল যে, আজ (১৪ এপ্রিল ২০২০) প্রধানমন্ত্রীর পূর্ব ঘোষণামতো লকডাউনের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। আর একটি ব্যাখ্যা যা পাওয়া গেছে তা আরও বেশি চিন্তার। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেছে যে, এই শ্রমিকদের কাছে খাবার নেই। এঁদের রোজকার নেই, তাই পয়সা নেই, খাবার নেই। যদি এই অভিযোগ সত্যি হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে যে, এই রকম অবস্থার মধ্যে পড়তে হল কেন এই শ্রমিকদের? মহারাষ্ট্র সরকার এই শ্রমিকদের সমস্ত দায়িত্ব নেবে, এই ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু বান্দ্রার ঘটনাটি কি তাহলে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, প্রতিশ্রুতি দেওয়া আর পালনের মধ্যে ফারাক রয়ে যাচ্ছে?

একটি চ্যানেলে শুনলাম একজন সাংবাদিক বলছেন যে, মহারাষ্ট্রের সরকার নাকি অপেক্ষা করছিল কেন্দ্রের তরফে এই মানুষগুলির জন্য কোনও আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করা হয় কি না সেটি দেখার জন্য। তবে, প্রধানমন্ত্রীর আজকের ভাষণে সেই রকম কোনও ঘোষণা ছিল না। ছিল শুধু বেসরকারি সংস্থাগুলিকে কর্মীদের ছাঁটাই না করার অনুরোধ। সময় এসেছে এইবার এই প্রশ্ন করার যে শুকনো অনুরোধে কেবল চিঁড়ে আর ভিজবে কি? ‘পরিযায়ী’ শ্রমিকদের জন্যও ইতিমধ্যেই যে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ঘোষিত হয়েছে, সেই সুযোগ-সুবিধেও তাঁরা ঠিকমতো পাচ্ছেন কি? বান্দ্রার ঘটনাটির পরে এই প্রশ্ন উঠবেই। এই কথা তো মানতেই হয় যে, করোনার পরোক্ষ শিকার গরিব বিপন্ন মানুষদের জন্য যে ধরনের আর্থিক প্যাকেজ কেন্দ্র সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশা করছেন মানুষ, সেই রকমের প্যাকেজ এখনও ঘোষণা হয়নি। যেমন আয়করের সর্বনিম্ন সীমার নীচে আছেন যে সমস্ত মানুষ, তাদের জন্যও আর্থিক প্যাকেজ অবিলম্বে ঘোষিত না হলে, এই অংশটিকে নিয়েও আগামী দিনে সমস্যা বাড়বে। বান্দ্রার ঘটনাটি নিয়ে তাই কেন্দ্র সরকার দায় সম্পূর্ণ এড়িয়ে যেতে পারে না। কিন্তু শুধুই কেন্দ্র সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে পারে কি মহারাষ্ট্র সরকারও? বলা যেতে পারে যে, এই শ্রমিকদের সকলেই খাবার না পেয়ে নিজেদের রাজ্যে ফিরে যেতে চাইছিলেন না। হতে পারে। অনেকেরই হয়তো আত্মীয়পরিজনদের জন্য মন কাঁদছে। সেইরকম হলে, সেটিও কি খুব অস্বাভাবিক? এক্ষেত্রে এই প্রশ্নও ওঠে যে, ‘এখন নিজেদের রাজ্যে ফিরে যাওয়া বিপদের’ শ্রমিকদের এই কথাটুকু ঠিকঠাক ভাবে বোঝানো যায়নি কেন? এঁদের কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন। জানতে ইচ্ছে করে, সেই উদ্যোগ ছিল কি?

বান্দ্রার ঘটনাটি থেকে এটাও মনে হয় পরিষ্কার যে, যে বস্তি অঞ্চলগুলিতে বা ক্যাম্পে এই শ্রমিকরা ছিলেন সেখানে লকডাউন সংক্রান্ত প্রচার সঠিকভাবে হয়নি। শ্রমিকরা জানতেই পারেননি যে, লকডাউনের সময়সীমা বেড়ে গেছে। এর দায় কার? মহারাষ্ট্র সরকারের কি উচিত ছিল না এই ক্যাম্পগুলিতে লকডাউনের সময়সীমা বৃদ্ধি নিয়ে প্রচার করা? এখানেও পাল্টা প্রশ্ন উঠতে পারে যে, ১৪ এপ্রিলের পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীও কি পারতেন না অন্তত ১৩ এপ্রিল জাতির উদ্দেশে তাঁর ভাষণটি দিতে? ভুলে গেলে চলবে না যে, এই ভারতবর্ষের মধ্যে অন্তত দুটো ‘দেশ’ রয়েছে। একটা ওই ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’। আর একটা ‘ভুখা ভারত’। এই ‘ভুখা ভারতে’ এই ইনফরমেশন আর টেকনোলজির যুগেও খবর যত দ্রুত পৌঁছয়, তার চেয়ে দ্রুত ছোটে গুজব।

গুজবের প্রসঙ্গ যখন এলই তখন বলি কেউ কেউ বলছেন যে, এই শ্রমিকরা যে এলাকাগুলিতে ছিলেন, সেই এলাকাগুলিতে গিয়ে কেউ বা কারা লকডাউন উঠে গেছে এই মিথ্যে প্রচার করে এঁদের বিভ্রান্ত করেনি তো? তা যদি হয়, তাহলে এর চেয়ে ঘৃণ্য কাজ আর কিছুই হতে পারে না। শোনা গেছে যে, ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত হবে। তদন্ত দ্রুত হোক। সত্য সামনে আসুক। গুজব ছড়িয়ে যদি কেউ দেশকে এত বড় বিপদের মধ্যে ফেলার চেষ্টা করে থাকেন, তাঁদের কঠিনতম সাজা প্রাপ্য। কিন্তু, তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে, গুজবে বিভ্রান্ত হয়েই অতগুলি মানুষ জড়ো হয়েছিলেন বান্দ্রা স্টেশনে, তাহলেও প্রশ্ন ওঠে যে, লকডাউনের সময় অতগুলি মানুষ কীভাবে এসে জড়ো হল বান্দ্রা স্টেশনে? প্রশাসন কী করছিল? পুলিশ? যে সক্রিয়তার সঙ্গে পুলিশকে এই শ্রমিকদের ওপর লাঠিচার্জ করতে দেখা গেল, সেই সক্রিয়তা কোথায় ছিল যখন এই মানুষগুলি জড়ো হচ্ছিলেন বান্দ্রা স্টেশনে? ম্যাজিকের মতো তো মুহূর্তের মধ্যে অত মানুষ একটা স্টেশন চত্বরে এসে জমা হতে পারেন না! সারাদেশ জুড়েই পুলিশকর্মীরা বেশ কিছু হাততালি পাওয়ার মতো কাজ করেছেন। কিন্তু এই ঘটনাটিতে পুলিশের ভূমিকাকে প্রশ্ন করতেই হবে।

বান্দ্রায় যা ঘটল, তার প্রভাব করোনার সঙ্গে লড়াইকে কতখানি ধাক্কা দেবে তা বোঝা যাবে আগামীতে। কিন্তু একটি জিনিস পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। কেবল বিজ্ঞান দিয়ে এই লড়াই জেতা যাবেন না। কেবল শুকনো কথাতেও আর চিঁড়ে ভিজবে না। অনেকে বলবেন যে, কাজ তো হচ্ছে অনেক। না হলে দেশ আরও খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ত। ঠিক। হচ্ছে। কিন্তু নির্দিষ্ট কতগুলি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করে সেখানে সুনির্দিষ্ট আরও কিছু কাজ করতে হবে দ্রুত। যেমন এই ‘অতিথি শ্রমিক’দের জন্য আরও প্যাকেজ চাই। প্যাকেজ চাই আয়কর সীমানার নীচে থাকা মানুষদের জন্যও। বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের জন্যও চাই প্যাকেজ। চাই এবং দ্রুত চাই। নইলে কিন্তু করোনার প্রত্যক্ষ শিকার মানুষগুলির চেয়ে দেশের সামনে আরও অনেক বড় সমস্যা হয়ে উঠবে করোনার অপ্রত্যক্ষ শিকার ভারতবাসী। বিপদঘণ্টা কিন্তু বাজতে শুরু করে দিয়েছে।

পড়ুন, আগের পর্বগুলি…

দূরের পথ দিয়ে ঋতুরা যায়, ডাকলে দরজায় আসে না কেউ

একটা পূর্বদিক বেছে নিতে হবে

খুব সহজেই আসতে পারে কাছে…

আমি কি এ হাতে কোনও পাপ করতে পারি?

খসে যেত মিথ্যা এ পাহারা…

যতবার আলো জ্বালাতে চাই…

দাদাগিরি ‘আনলিমিটেড’

লকডাউন কি বাড়ানো উচিত হবে?

শিশুদের ভাল রাখার উপায় সম্বন্ধে যে দু-একটি কথা আমি জানি

সময়, সবুজ ডাইনি

কেরল পারলে, বাকি দেশ পারবে না কেন?

টাটকা মাছ কেনে প্রতিদিন?

যেকথা বলিনি আগে

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More