ধুলো ঝেড়ে ছবিরা বেরোয়

বিশ্বজুড়ে যাঁরা সত্যিকারের ভাবুক, তাঁরা আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের ভাবনার ওপর পড়া ধুলোও তো ঝেড়েঝুড়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছেন এই সংকটকালে। দিচ্ছেন না?

অংশুমান কর

“মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ঝেঁটিয়ে বিদেয় কর”-– এই হচ্ছে কমবেশি মধ্যবিত্ত বাঙালিদের ধুলোর প্রতি ‘অ্যাটিটুড’। ধুলো তাড়ানোর জন্য তাই ঘরে ঘরে প্রস্তুত থাকে ঝাঁটা, নানা রকমের, নানা সাইজের ঝাড়ন, আর কখনও কখনও এমনকি ভ্যাকুয়াম ক্লিনারও! ধুলো নিয়ে আজ নয় সেই কোন কাল থেকেই তো আমাদের লড়াই-সংগ্রাম চলছে, চলবে! একবার মনে করে দেখুন রবীন্দ্রনাথের “জুতা আবিষ্কার” কবিতাটির কথা। ধুলো থেকে বাঁচতেই তো কারও পায়ে সত্তর টাকা দামের হাওয়াই চপ্পল আর কারও পায়ে সাত হাজার টাকার জুতো। কী বললেন? এ পোড়া দেশে কারও কারও এখনও হাওয়াই চপ্পলও জোটে না? সে তো বটেই! কিন্তু তা নিয়ে আপনি-আমি ভেবে কি খুব কিছু আর লাভ হবে? তাঁরা কি আদৌ এ নিয়ে ভাবেন বলুন যাঁদের পায়ে লক্ষ টাকা দামের জুতো? ওই যে সেদিন ফেসবুক লাইভে পড়লাম না সুব্রত চেলের কবিতা, যেখানে তিনি বলছেন কাউকে জুতো মারার আগে তাকে দুটো জুতো কিনে দেওয়া হোক–- কে মনে রাখে এই কথা? জুতো মেরে গব্বে যেভাবে ছাতি ফুলে ওঠে, জুতো কিনে দিয়ে কি আর ওই রকম ফুলে ওঠে ছাতি, ওই রকম বাঘ মারার মতো পোজ নিয়ে দাঁড়ানো যায়?

হচ্ছিল ধুলোর কথা, চলে গেলাম জুতোয়! যাচ্চলে! না, ধুলোতেই ফিরে আসা যাক। যেসব ধূলিকণারা এই কয়েক মাসে কিছু কিছু ঘরে বেশ জাঁকিয়ে বসেছিলেন, তাদের এবার রবীন্দ্রনাথের সাধারণ মেয়ের ভাষায় বলতে গেলে ‘মরণদশা’ ধরেছে। গিন্নিবান্নিরা (কর্তাবাবুরা মাফ করবেন–এই কাজ, যেটুকু খবর পেয়েছি, তাতে এখনও, সেই আগের মতোই, গিন্নীরাই করে চলেছেন) উঠে পড়ে লেগেছেন তাঁদের বিদেয় করতে। ঘরের দুরূহ সব কোণা, যেখানে পিপীলিকাও প্রবেশ করতে পারে না, সেখানে এখন তাঁদের ঝাড়ু বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের সরু ‘খাই খাই’ টিউব ঢুকে পড়ছে অনায়াসে। আর যায় কোথা! এতদিন ধুলোর সাথে সাথে গলা জড়াজড়ি করে ছিল যেসব শুকনো পাতার ছোট্ট ডগা, ভাঙা দেশলাই কাঠি আর সেই কোন আদ্যিকালে মরে ভূত হয়ে যাওয়া মাকড়সা–তাদেরও ‘মরণদশা’ ধরছে। এই ধুলো ঝাড়তে গিয়ে কত কিছুই যে আবিষ্কার করছে মানুষ! নানা কোনা থেকে নির্বাসন শেষে আবির্ভূত হচ্ছেন দু’টাকা দামের বড্ড প্রিয় লাল কালির ইউজ অ্যান্ড থ্রো কলম, কোলবালিশের দড়ি আটকাতে গিয়ে কিছুতেই খুঁজে না পাওয়া মাঝারি সাইজের সেফটিপিন, রেস্তোরাঁয় শেষবার খাবার পরে (সেটা যেন ঠিক কতদিন আগে?) ক্রেডিট কার্ডে বিল মেটানো ছোট্ট দলাপাকানো স্লিপ। এর মধ্যে স্লিপটি চলে যাচ্ছেন আবর্জনা ফেলার পলিথিনে আর কলম আর সেফটিপিন বাদশাহী মেজাজে আবার রাজ করতে শুরু করছেন পড়ার টেবিলে। কী বলছেন? আবার ধান ভাঙতে গিয়ে শিবের গীত গাইছি? ছিল বেড়াল, হয়ে গেল রুমালের মতো হয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা? ছিল ধুলো, হল সেফটিপিন আর কলম? আজ্ঞে না মশাই। ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। ভেবে দেখুন, এরা সবাই হলেন গিয়ে ধুলোর মামাতো/ পিসতুতো/ পাড়াতুতো ভাইবোন। তাই না?

তবে ধুলো ঝাড়তে গিয়ে কি শুধু এরাই অজ্ঞাতবাস শেষে পঞ্চপাণ্ডবের মতো বিজয়ীর বেশে আবির্ভূত হচ্ছেন? তা নয় কিন্তু। ধুলো মানে কি শুধু ধুলো? অ্যাঁ, অ্যাদ্দিনে এই বুঝলেন? ধুলোর একটা প্রতীকী ব্যাপার আছে না? এই যে পুরনো অ্যালবামের পাতা ওলটাচ্ছেন–- এও কি ধুলো ঝাড়া নয়? ফেসবুক তো ভরে গেল ধুলো ঝাড়ার এই প্রতীকী কর্মসূচিতে। ভালই লাগল কিন্তু। তাই না? নিজেকে ধুলো ঝেড়ে দেখতে কি আর মন্দ লাগে কখনও? প্রিয়জনদেরও তো দেখা হল। এই যে রাঙাপিসি। এখন আর নেই। কিন্তু ছিলেন। একদিন জাঁকিয়ে ছিলেন এই পৃথিবীতে। হরিদ্বারে গিয়ে তাঁর সেই রাবড়ি খেতে খেতে কেউ না খেতে চাইলেই ধমক দেওয়া কি ভোলা যায় কখনও? স্মৃতির ওপর তো ধুলো পড়ে। তাকে তো ঝেড়ে নিতে হয়, এভাবেই, মাঝেমাঝে।

যাঁরা লেখালেখি করেন, তাঁদেরও অনেকে কিন্তু ধুলো ঝাড়ছেন এই অবসরে। লিখতে লিখতে নিজের ভাষার ওপরেই তো ধুলো পড়ে যায়। ধুলো পড়ে যায় ভাবনাতেও। সেই ধুলোও তো ঝেড়ে নিচ্ছেন অনেকেই। কত কত কবিতা লেখা হচ্ছে, লেখা হচ্ছে অণুগল্প, এমনকি উপন্যাসও। ধুলো তো ঝাড়া হচ্ছেই বাংলা সাহিত্যের অন্দরমহলে। বিশ্বজুড়ে যাঁরা সত্যিকারের ভাবুক, তাঁরা আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের ভাবনার ওপর পড়া ধুলোও তো ঝেড়েঝুড়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছেন এই সংকটকালে। দিচ্ছেন না?

তবে যতই বলি না কেন ধুলোকে আমাদের একদম পছন্দ নয়, এই কথাটি যে পুরো সত্যি নয় সেটিও কিন্তু এই দুঃসময় আমাদের হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। যতই ঘরের ধুলো ঝাড়ুন না কেন, বাইরের ধুলোর জন্য মন উচাটন হয়নি আপনাদের? সত্যি করে বলুন, হয়নি? যেদিন মুক্তি ঘটবে এই অন্তরিন অবস্থা থেকে, যেদিন আবার চটি আর জুতোর ফাঁক গলে পায়ে এসে লাগবে ধুলো, মনে হবে না–- আহ, ধরিত্রী, তোমার স্পর্শে এত আরাম?

ধূলিকণাদেরও এই যে আমরা ঘর থেকে তাড়াচ্ছি, তাতে যে ধূলিকণারা সবাই খুব মুষড়ে পড়েছে, তাও নয় কিন্তু। ধাঁধার মতো শোনাচ্ছে? বেশ, একটা কবিতার ছোট্ট দু’টি পঙ্‌ক্তি পড়ুন। লিখেছেন চন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়। “অর্জিত পদ” নামে একটি সিরিজের তেরো নম্বর কবিতা এটি। চন্দ্রাণী লিখেছেন:

‘ভাঙা ফ্রেম নিপুণতা আদ্যোপান্ত গৃহটিতে ধুলো

দেয়ালে হেলান দিয়ে ঝাড়ন ধুলোর কথা ভাবে’।

কী? এবার বুঝলেন তো? ধুলোর সঙ্গে প্রেম হয়েছে ঝাড়নের! যতবার ঝাড়ন দিয়ে ধুলো ঝাড়েন, না জেনেই ওদের একজনকে অপরজনকে ছুঁতে দেন। ধরতে পেরেছিলেন এতদিন? পারেননি তো! দেখুন, কবি কিন্তু ধরতে পেরে গেছেন। এরকম কত প্রেমই যে আপনাদের চোখের আড়ালে পূর্ণতা পেয়ে যায়, আপনারা বুঝতেই পারেন না! সিকিউরিটি গার্ড যুবাটির সঙ্গে আপনাদের উনিশ বছর বয়সি কাজের মেয়ে আশার যে সেই কবে থেকেই ঝাড়ন আর ধুলোর সম্পর্ক হয়ে গেছে–- সে কি আপনারা আদৌ বুঝতে পেরেছেন? যতবার আশাকে বিস্কুট, এক্সট্রা এক প্যাকেট দুধ আর হঠাৎ ফুরিয়ে যাওয়া চিনি আনতে কমপ্লেক্সের বাইরে পাঠিয়েছেন, ততবার আসলে ওই ধুলোর সঙ্গে ঝাড়নের দেখা করিয়ে দিয়েছেন। বুঝলেন?

পড়ুন, আগের পর্বগুলি…

দূরের পথ দিয়ে ঋতুরা যায়, ডাকলে দরজায় আসে না কেউ

একটা পূর্বদিক বেছে নিতে হবে

খুব সহজেই আসতে পারে কাছে…

আমি কি এ হাতে কোনও পাপ করতে পারি?

খসে যেত মিথ্যা এ পাহারা…

যতবার আলো জ্বালাতে চাই…

দাদাগিরি ‘আনলিমিটেড’

লকডাউন কি বাড়ানো উচিত হবে?

শিশুদের ভাল রাখার উপায় সম্বন্ধে যে দু-একটি কথা আমি জানি

সময়, সবুজ ডাইনি

কেরল পারলে, বাকি দেশ পারবে না কেন?

টাটকা মাছ কেনে প্রতিদিন?

যেকথা বলিনি আগে

বান্দ্রার পরে আর শুকনো কথায় চিঁড়ে ভিজবে কি?

ঘরের ভিতরে ঠিক কী কী আছে এখনও অজানা

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More