খুব সহজেই আসতে পারে কাছে…

অংশুমান কর

শক্তি চট্টোপাধ্যায় এখন কী করতেন? এই অন্তরিন অবস্থায়? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে একবার শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন যে, বেশিক্ষণ ঘরের মধ্যে বসে থাকলে ওঁর দমবন্ধ লাগে। সেজন্যই নাকি উনি বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ান। সারাদিন ঘরে বসে বসে যাঁরা পড়াশুনো করেন, তাঁদের ওঁর পছন্দ নয়। তাই ভাবছি, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এখন থাকলে কী করতেন? রাখা যেত ওই দুর্দমনীয় শিশুটিকে ঘরের মধ্যে অন্তরিন? ভাবতে ভাবতে মনে হল যে, উনি নিশ্চয়ই নিয়ম মানতেন। অন্তরিনই থাকতেন, কিন্তু মাঝে মাঝেই এসে দাঁড়াতেন বারান্দায়।
কেন বলছি একথা? কারণ, তাঁর প্রয়াণের সময়ে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিশ্বভারতীতে। পড়াচ্ছিলেন বাংলা বিভাগে। ছিলেন পূর্বপল্লীর গেস্ট হাউসে। সেই গেস্ট হাউসে ঘরের সঙ্গে কোনও বারান্দা ছিল না। দোতলার ঘরেও কোনও ব্যালকনি ছিল না। ঘর একতলা থেকে দোতলা হয়ে গেলেই তো বারান্দার নাম হয়ে যায় ব্যালকনি। তো, এই যে পূর্বপল্লীর গেস্ট হাউসে বারান্দা ছিল না, এটা নিয়ে দুঃখ ছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের। এই কথা লিখে গিয়েছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সেজন্যই মনে হল যে, এই অন্তরিন অবস্থায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় থাকলে অবশ্যই বারান্দায় বা ব্যালকনিতে এসে ঘন ঘন দাঁড়াতেন।
বারান্দা বা ব্যালকনিই আজ আমাদের অনেকটা বাঁচিয়ে দিয়েছে। ভাগ্যিস লকডাউনের আওতায় বারান্দা বা ব্যালকনিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি! এটুকু লিখেই মনে হল যে, আজ নয়, বারান্দা বা ব্যালকনি চিরকালই আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে। ব্যালকনি না থাকলে পৃথিবীতে কত কত প্রেম যে জন্মই নিত না তার হিসেব কষা মুশকিল। কত কত বিখ্যাত সিনেমার দৃশ্যও তো আমরা উপহার পেতাম না! আর এখন তো ওই বারান্দা বা ব্যালকনিতেই মুক্তি!
দেখছিলাম একটি ভিডিও। ইতালিতে এই বন্দিদশা আর মৃত্যুমিছিল সহ্য করতে না পেরে এক যুবক তাঁর স্যাক্সোফোন নিয়ে বেরিয়ে আসছেন ব্যালকনিতে। তারপর সেই যন্ত্রে তুলছেন মায়াময় সুর। সে সুরে নেচে উঠছে গোটা পাড়া। একের পর এক ব্যালকনিতে বেরিয়ে আসছেন মানুষ। সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং মেনেই তৈরি করছেন সংযোগের ভাষা। আমাদের দেশেও তো এই দৃশ্য আমরা দেখলাম সেদিন। এই কঠিন সময়ে যাঁরা লড়ছেন, তাঁদের জন্য হাততালি দিতে ব্যালকনিতে বেরিয়ে এসেছেন বহু মানুষ। চমক ছিল এর মধ্যে। কিন্তু কোথাও একটা মুক্তি আর সহমর্মিতার বার্তাও ছিল তো! রাষ্ট্র যেভাবে সামলানোর চেষ্টা করছে এই সংকট তা নিয়ে যাঁদের প্রবল ক্ষোভ আছে তাঁরাও কেউ কেউ সেদিন হাততালি দিয়েছিলেন তো ব্যালকনিতে বেরিয়ে। আবার এই তো দু’দিন আগেই দেখলাম এক অপরূপ মায়াময় দৃশ্য তৈরি হল কলকাতার গড়িয়াহাটে। অঞ্জন দত্তের বেলা বোসের সুরে এই সময়ের কথা বসিয়ে নিয়ে গান গাইছেন কলকাতা পুলিশের কিছু কর্মী। আর সেই গান শুনতে ওই সাহসী মানুষগুলিকে দেখতে একটি-দু’টি মুখ এসে দাঁড়াচ্ছে ব্যালকনিতে। যাঁরা গোমড়ামুখো, গম্ভীর, ঘরে বসে শুধু পড়াশুনোই করেন, তাঁরাও এই সময়ে একবার না একবার ঠিক এসে দাঁড়াচ্ছেনই বারান্দা বা ব্যালকনিতে। ব্যালকনির মাহাত্ম্য এঁরাও আর অস্বীকার করতে পারছেন না।
এতটুকু লিখে মনে হচ্ছে যে, বারান্দা বা ব্যালকনি না থাকলেও ঘর তো ঘরই। তবু বারান্দা বা ব্যালকনি থাকে কেন ঘরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে-মড়িয়ে? যাঁরা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার তাঁরা এক্ষুনি হয়তো এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেবেন। সে ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করব কী করে? এই অন্তরিন দিন তো বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, আসলে ঈশ্বর বলে যদি কেউ থাকেন এই পৃথিবীতে তিনি একজন দক্ষ বিজ্ঞানী, যিনি এই মারণরোগের হাত থেকে রক্ষা করবেন আমাদের, এনে দেবেন নিরাময়। কিন্তু, মাঝে মাঝে তো বিজ্ঞানের কথার সঙ্গেও জুড়ে দিতে ইচ্ছে করে আরও কিছু কথা। আমরা যাঁরা কবিতা লিখি, ছবি আঁকি, গান বানাই— মনে হয় যেন কোথাও একটা বিজ্ঞানের পরেও আরও একটু কিছু বললে (হয়তো তা অনেক সময়েই অর্বাচীনের মতো শোনায়) ভাল হয়। তাই মনে হচ্ছে যে, বারান্দা আর কিছুই নয়, ঘরের হৃদয়ের সম্প্রসারণ। বারান্দা যেন বুঝিয়ে দেয় যে, আমাদের হৃদয়পুর আসলে এক বড় গাঁ। যেন চুপিসারে বলতে আসে, ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে’। যেন বলে, মনে রেখো ঘরের ওই পারেই আছে আর এক বড় জগৎ, যে জগৎ বলছে, ‘প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’। ঘর আর বাহির এই দুই জগতের মধ্যে ছোট্ট একটা হাইফেনের মতো আজ তাই জেগে রয়েছে বারান্দা আর ব্যালকনি। না না, ঠিক হল না এই উপমা। বরং বলি, এই যে খরস্রোতা এক নদী বইছে আমাদের মাঝখান দিয়ে, এই যে সেই নদী দুই পারকে আজ আলাদা করে রেখেছে, বারান্দা বা ব্যালকনি যেন সেই খরস্রোতা নদীর ওপরে বানানো ছোট্ট একটা দড়ির ব্রিজ। আপৎকালীন সময়ে দুই পারের সংযোগ রক্ষা করছে। মানুষ, হ্যাঁ, কেবল মানুষই পারে এই রকম চমৎকার একটি ব্রিজ বানাতে।
আর কী! এইবার থামি। তবে শুরু করেছিলাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা দিয়ে। ওঁর একটি কবিতার কাছেই তাই ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে আবার। কবিতাটার নাম “আসতে পারে”। শক্তি লিখেছেন: ‘খুব সহজেই আসতে পারে কাছে/ ওই, যা কিছু– বুকের ভিতর আলগা হয়ে আছে’। এত এত শব্দ ক্ষয় করে যা বলতে চাইলাম কেমন দুই পঙ্‌ক্তিতেই সেকথা বলে দিলেন শক্তি। আর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এই দুই পঙ্‌ক্তি পড়তে পড়তেই, এই দুঃসময়ে, আমরা আবারও বুঝতে পারছি আমাদের পোড়াজীবনে বারান্দা আর ব্যালকনির মূল্য। বারান্দা আর ব্যালকনি ধরেই তো সহজে কাছাকাছি আসা যায় দূরে দূরে থেকেও। বারান্দা আর ব্যালকনি আমাদের বেশ বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, যাঁরা হৃদয়কে শক্ত মুঠিতে বেঁধে রাখতে চান, তাঁরাও ঠিক জানেন না যে, বুকের মধ্যে কত কিছুই না আলগা হয়ে আছে! বজ্রমুষ্ঠি সেই আলগা হয়ে থাকা জিনিসগুলিকে, আমাদের প্রেম, মায়া, দরদ, সহমর্মিতা আর সংযোগের আকুতিকে কিছুতেই অন্তরিন রাখতে পারবে না। ওরা ওই ছোট্ট দড়ির ব্রিজ ধরে সন্তর্পণে হাঁটতে হাঁটতে ওই পারে যাবেই।

দূরের পথ দিয়ে ঋতুরা যায়, ডাকলে দরজায় আসে না কেউ

একটা পূর্বদিক বেছে নিতে হবে

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More