খসে যেত মিথ্যা এ পাহারা…

আমরাও তো সারাক্ষণ মুখোশ পরেই থাকি। থাকি না? উঁহু, যদি ভাবি যারা ছলচাতুরি করে কেবল তারাই মুখোশ পরে, তাহলে ভুল ভাবি। টুকটাক মিথ্যে তো আমরা বলেই থাকি। যেই একটা মিথ্যে বলি, অমনি পরে নিই একটা মুখোশ। পরি না?

অংশুমান কর

সারাদেশে যে মুখোশের চাহিদা এইভাবে হঠাৎই বেড়ে যাবে, কেউ কি কোনওদিন ভেবেছিল? মুখোশ? হ্যাঁ, মুখোশের কথাই বলছি। ‘মাস্ক’ মানে তো মুখোশই, নাকি? মাস্ক হল সেই জিনিস যা দিয়ে মুখ ঢাকা যায়। মানে মুখোশ। তো, যে কথা বলছিলাম। মার্চের গোড়া থেকেই গোটা দেশজুড়ে মুখোশ আর মেলে না! মাস্ক অমিল বাজারে। নেই স্যানিটাইজারও। চড়া দামে কালোবাজারিতে বিক্রি হচ্ছে তা। আমি শত চেষ্টা করেও বর্ধমান শহরে একখানা মাস্ক যোগাড় করতে পারিনি। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে গিয়েছিলাম জলপাইগুড়ি। সেখানের একটি দোকান থেকে দু’টি মুখোশ কিনেছিলাম। কালো আর লাল রঙের মিশ্রণে বানানো সেই মাস্ক দু’টি। দু’টিই মাত্র পড়েছিল সেই ওষুধের দোকানটিতে। বেশি দূরে যেতে হয়নি। যে হোটেলে ছিলাম, তার ঠিক নীচেই ছিল ওই ওষুধের দোকান। সাধারণ মাস্ক। কোভিডের ডাক্তারি শাস্ত্র মেনে বানানো মুখোশ নয়। ঢাল তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার। তবু ওদের ভরসাতেই সব্জির বাজার করতে বা ওষুধ আনতে বার-তিনেক ঘর থেকে বেরিয়েছি। দুরুদুরু বক্ষে!

রাস্তায় বেরিয়ে অবশ্য দেখি প্রায় সকলেই মুখোশ পরে আছেন। নানা রকমের মুখোশ আর কী! দু’-একজনই ওই এন ৯৫। বাকি সব আমার মতো। নিধিরাম সর্দার মুখোশ। অনেকেই মুখে বেঁধেছেন রুমাল। যাদের তাও নেই, সেইরকম দু’একজন গামছা। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে দু’টি অভিনব মুখোশ দেখলাম। একটি ভিডিওতে দেখলাম এক তরুণ মুখে হাগিস পরে বেরিয়েছেন। সেটাই মুখোশ। পুলিশ তাকে গৃহে অন্তরিন না থেকে বাহিরে ভ্রমণের জন্য পাকড়াও করেছে। ছেলেটি পুলিশকে বলছে, “সচেতন আছি, সচেতন আছি”। তার ওই অভিনব মুখোশ আর সচেতনতার কারণেই পুলিশ শেষমেশ তাকে ছেড়েই দেয়। আর একটি ছবি দেখলাম। সেটি সম্ভবত জঙ্গলমহলের। কয়েকজন মহিলা মুখে পাতার মুখোশ পরে বসে আছেন। কাজের কাজ হয়তো কিছুই হবে না এতে। কিন্তু ছবিটি এত ভরসা যোগাল। মনে হল পশ্চিমবঙ্গের সুদূর গ্রামেও তাহলে মানুষ জেগে রয়েছেন! চোখেরও একটু আরাম দিল বইকী ওই ছবি!

মুখোশ নিয়ে এই হাহাকারের সময়ে অন্তরিন অবস্থায় অনেক দিন পরে আমার চোখ গেল আমার ঘরে টাঙিয়ে রাখা মুখোশগুলির দিকে। দু’টি মুখোশ আছে এখন আমার বর্ধমানের কোয়াটার্সের বসবার ঘরে। একটি মুখোশ কিনেছিলাম সাহিত্য অকাদেমির একটি অনুষ্ঠানে গ্যাংটক গিয়ে। কাঠ আর ধাতু দিয়ে বানানো সেই মুখোশ। দেখে মনে হয় মুখটি এক বৃদ্ধের। চক্ষু তার অর্ধনিমীলিত। মুখ ঈষৎ খোলা। অন্তর্লীন এক বেদনা যেন ফুটে উঠেছে ওই মুখভঙ্গিতে। আর একটি মুখোশ আছে ছৌ নাচের। সেটি রাক্ষসের। এই মুখোশটি নিয়ে আমার একটি কবিতাও আছে। কবিতাটি কীভাবে এসেছিল একটু বলি। তখন ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ চলছে আমেরিকার। এক আমেরিকান অধ্যাপক বন্ধু সস্ত্রীক এসেছেন আমার কোয়াটার্সে। ডিনারে নেমন্তন্ন করেছি তাঁদের। ওঁরা দু’জনেই খুবই আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন ওই মুখোশটি দেখে। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন অসুর বৃত্তান্ত। আমি বললাম যতটা পারি। শুনেটুনে শেষমেশ মুখোশটির দিকে আঙুল তুলে বললেন, ‘দিস ইজ আওয়ার প্রেসিডেন্ট’। ব্যাস! আমি পেয়ে গেলাম আমার কবিতা।

কিন্তু শুধু রাষ্ট্রনায়কদের দোষ দিলে হবে? আমরাও তো সারাক্ষণ মুখোশ পরেই থাকি। থাকি না? উঁহু, যদি ভাবি যারা ছলচাতুরি করে কেবল তারাই মুখোশ পরে, তাহলে ভুল ভাবি। টুকটাক মিথ্যে তো আমরা বলেই থাকি। যেই একটা মিথ্যে বলি, অমনি পরে নিই একটা মুখোশ। পরি না? যদি বা মিথ্যে নাও বলি, তাও তো পরি মুখোশ। কীভাবে? বলছি। আচ্ছা, একটি কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করেই বলা যাক। কবিতাটি লিখেছেন পৌলোমী সেনগুপ্ত। নাম “মেয়েকে, হাইস্কুলে যাওয়ার আগে”। ওর মেয়ে বৃষ্টিকে নিয়ে লেখা এই কবিতা। পৌলোমী লিখেছিলেন:

ভয় পাওয়ার কিছু নেই

আমার কথা শোনো।

পুরো জীবনটাই এক ইউনিফর্ম ছেড়ে

অন্য ইউনিফর্মে ঢুকে পড়ার গল্প।

আমি যেমন অফিসে যাওয়ার সময়

একটা ইউনিফর্ম পরে যাই।

ছুটির দিন রাতে যখন আমরা বেরোই,

তখন রঙিন জামা পরে যাই,

কী, যাই তো?

সেটাও আসলে একটা ইউনিফর্ম।

প্রমাণ করে, আমরা তখন ফ্রি। মানে মুক্ত।

মুক্ত মানে? তুমি পরে বুঝতে পারবে।

এমনকী, স্নানের সময়

বাথরুমে কাপড় ছাড়লে

আমরা আসলে স্নানের ইউনিফর্ম পরে থাকি।

এই যে ইউনিফর্ম–- এই ইউনিফর্ম আসলে কী? গোটা শরীরটা ঢেকে ফেলার একটা বড় মুখোশই তো! জন্মলগ্ন থেকেই সভ্যতা আমাদের এই মুখোশ পরিয়ে দেয়। মারণরোগ আজ সেই অন্তরিন মুখোশকে প্রকাশ্যে এনেছে।

প্রকৃতির কিন্তু মুখোশ লাগে না। প্রাণীদেরও না। এই যে এন ৯৫ মুখোশ আজ আমাদের পরতে হচ্ছে তার কারণ তো আমরাই। যে দূষণ আমরা সৃষ্টি করেছি, এ তার শাস্তি। আর আমাদের পক্ষে নিরাভরণ প্রকৃতি বা মুখোশহীন প্রাণী হওয়া সম্ভব নয়। এই কথাগুলো লিখতে লিখতেই মনে পড়ল মণীন্দ্র গুপ্তর একটি কবিতার কথা। কবিতাটির নাম “রাস্তার কুকুর”। মণীন্দ্র গুপ্ত লিখেছিলেন:

রাস্তার কুকুর তিনজন                আমার সঠিক বন্ধু তারা

যে-কোনো সাধুর চেয়ে সাধু,        মুক্তপুরুষেরও চেয়ে ছাড়া।

শুধু এটুকু লিখেই অবশ্য ক্ষান্ত হননি মণীন্দ্র গুপ্ত। কবিতাটি শেষ করেছিলেন এইভাবে:

শুধু, ওরা না জেনে, জীবনে         আশ্চর্য সম্মান নিয়ে বাঁচে।

জেনে–যদি ওদের মতন,             প্রকৃতির অতখানি কাছে

যেতে পারতাম, সাড়া দিয়ে          আদি সন্ন্যাসীর মুক্ত নাচে–

তাহলে জীবন পূর্ণ হত,               খসে যেত মিথ্যা এ পাহারা…

রাস্তার কুকুর তিনজন                আমার সঠিক বন্ধু তারা।

এইরকম একটি কবিতা পড়ার পর স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে হয়। মনে হয়, যারা আমাদের সঠিক বন্ধু তাদের কেন বারবার চিনতে আমাদের ভুল হয়ে যায়? যদি কবিরা পারেন, বিজ্ঞানীরা পারেন, তবে সাধারণ মানুষদের কেউ কেউ, মুনাফালোভী মাল্টিমিলিওনেয়ার আর রাষ্ট্রপ্রধানরা পারেন না? সত্যিই পারেন না। গোটা পৃথিবী জুড়েই আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের অনেকেই এটা বুঝতে পারেননি। আর মুনাফালোভী মাল্টিমিলিওনেয়ার আর রাষ্ট্রপ্রধানরা বুঝেও বোঝেননি। তাই নির্বিচারে চলেছে প্রকৃতি-ধ্বংস আর প্রাণীহত্যা। এইসব আটকাতে পারলে আজ আর মাস্কের কালোবাজারি আটকাতে অর্ডার জারি করে পুলিশ নামাতে হত না।

আরও পড়ুন…

দূরের পথ দিয়ে ঋতুরা যায়, ডাকলে দরজায় আসে না কেউ

একটা পূর্বদিক বেছে নিতে হবে

খুব সহজেই আসতে পারে কাছে…

আমি কি এ হাতে কোনও পাপ করতে পারি?

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More