দাদাগিরি ‘আনলিমিটেড’

যে ভাষায় আমেরিকার মাননীয় প্রেসিডেন্ট হুমকি দিলেন, সেটিও কি এই সময়ে ব্যবহারের যোগ্য ভাষা? তাহলে আমরা যাঁরা স্বপ্ন দেখছিলাম যে, হয়তো করোনা-উত্তর পৃথিবী একটি নতুন পৃথিবী হবে, তারা কি ভুল স্বপ্ন দেখছিলাম?

অংশুমান কর

দাদারা কারও কথা শোনেন না। মানে যাঁরা সত্যিকারের দাদা, তাঁরা। তাঁদের দাদাগিরি ‘আনলিমিটেড’। তেমনটাই মনে হল আর কী! দাদারা ততক্ষণই আমাদের কাছে ‘দাদা’ যতক্ষণ আমরা তাঁদের সব কথা শুনে চলছি। তাঁদের কথা শুনে চললে, তাঁরা উদার, আমরা তখন তাঁদের ‘ভাই’। বেগরবাই দেখলেই কিন্তু তখন তাঁরা আর আমাদের ‘দাদা’ থাকেন না, সঙ্গে সঙ্গে হয়ে ওঠেন ‘প্রভু’, ‘মালিক’। আমেরিকার মাননীয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত কয়েকদিনের কথাবার্তায় এরকমটাই মনে হল।

প্রথমে মাননীয় প্রেসিডেন্ট আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে বিশ্বজোড়া এই কঠিন সংকটের সময়ে একসঙ্গে লড়াইয়ের কথা বলেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও সম্মত হন যৌথ লড়াইয়ে। এ তো অতি উত্তম। এইরকম একটি পৃথিবীর স্বপ্নই তো আমরা দেখি। সীমান্তহীন এক পৃথিবী। কিন্তু এরপরেই গল্পটা অন্যরকম হতে লাগল। ট্রাম্প অনুরোধ করলেন মোদীকে আমেরিকাকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন দেওয়ার। সেই অনুরোধে তৎক্ষণাৎ সাড়া দিল না ভারত। কারণ, ভারতবর্ষে ততক্ষণে সরকারি নির্দেশনামা বেরিয়ে গিয়েছে যে, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন বিদেশে রফতানি করা যাবে না। তাই বোধহয় আমাদের রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না কী করা উচিত। ট্রাম্পের ‘অনুরোধে’ সাড়া দিতে দেরি হল তাই। ব্যাস, দাদা একদিন অপেক্ষা করেই সুর চড়ালেন। বুঝিয়ে দিলেন যে, ‘অনুরোধ’ আসলে ছিল ‘আদেশ’। ‘দাদা’ থেকে তাই এবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে উঠলেন ‘প্রভু’। দিলেন হুমকি। ব্যবসায়িক সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুললেন। যে ইংরেজি শব্দটি (ইন্টারনেট সহায়, ইন্টারনেটই এই শব্দটি দেখাল) তিনি ব্যবহার করেছেন তা হল ‘রিট্যালিয়েশন’। অর্থাৎ সোজা বাংলায় বললে, ‘বদলা’। এই শব্দটি ব্যবহার করে ট্রাম্প বুঝিয়ে দিলেন যে, যদি ভারত আমেরিকাকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন না দেয়, তাহলে ‘বদলা’ নেওয়া হবে। কী মারাত্মক কথা! এই শব্দ ব্যবহার করা যায় আজকের পৃথিবীতে? অবশ্য কাজ হল এই দাওয়াইয়ে। আমাদের দেশের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন রফতানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হচ্ছে। করোনা-মহামারী আক্রান্ত দেশগুলিতে এই ওষুধ পাঠানো হবে যথাযথ পরিমাণে।

অনেকেই এটা শুনেই রে রে করে উঠবেন। বলবেন যে, কাজটা ঠিক হচ্ছে না। আমাদের দেশেই পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নেবে তা ঠিক স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছে না এখনও, আর আমরা যে ওষুধটি একটু হলেও এই ঘনঘন রূপ পাল্টাতে থাকা ভাইরাসটির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারছে, সেই মহামূল্যবান (দামে নয়, গুরুত্বে) ওষুধটি রফতানি করব বিদেশে? আমি কিন্তু এই রফতানির বিরোধিতা করছি না। এটুকু শুনেই দয়া করে আমাকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে দাগিয়ে দেবেন না। অনুরাগ শ্রীবাস্তব যা বলেছেন, মানে নেটে ওঁর বক্তব্যের যে রূপটি পেলাম, তা হল এই রকম: ‘ইট হ্যাজ বিন ডিসাইডেড দ্যাট ইন্ডিয়া উড লাইসেন্স প্যারাসিটামল অ্যান্ড হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ইন অ্যাপ্রোপিয়েট কোয়ান্টিটিজ টু অল আওয়ার নেবারিং কানট্রিজ হু আর ডিপেন্ডেন্ট অন আওয়ার কেপেবিলিটিজ’। এর মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে তো আমি কোনও অন্যায় দেখছি না। এই বক্তব্য থেকে অবশ্য পরিষ্কার নয় যে, এই ওষুধটি আমেরিকাতেও পাঠানো হবে কিনা। যদি হয়ও, তাতেও কিন্তু কোনও অন্যায় নেই। খুব সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও যাঁরা ভাবেন, তাঁদেরও জানানো যেতে পারে যে, আমেরিকাতে ভারতীয়রাও কিন্তু করোনায় আক্রান্ত। আর মহামারীর সময়ে যদি আমাদের কাছে সত্যিই পর্যাপ্ত হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন মজুত থাকে, তাহলে তা বিপন্ন দেশগুলিতে পাঠানো হবে না কেন? আমাদের ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি কি চিরকাল আক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেনি? কেন্দ্র সরকার কি আমাদের এই ভরসা দিচ্ছেন যে, এই ওষুধ পাঠানোর জন্য দেশে এইরকম পরিস্থিতি হবে না যে একজন করোনা-আক্রান্ত প্রয়োজনের সময়ে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন পেলেন না? খবর যা পাওয়া যাচ্ছে তাতে ওষুধের দোকানগুলিতে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এই প্রশ্ন উঠবেই যে, আমাদের দেশের বাজারেই যদি এই ওষুধের আকাল থাকে, তাহলে কি এই ওষুধ রফতানি করার মতো জায়গায় আমরা থাকব? নিশ্চয়ই না। মোদ্দা কথাটা হল এই যে, নিজেদের বিপন্ন করে নয়, কিন্তু নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এই সময়টা সমস্ত ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে আক্রান্তের পাশে দাঁড়ানোর সময়।

কেন্দ্র সরকারের তাই প্রথমে নজর দেওয়া উচিত আমাদের দেশে এই ওষুধের উৎপাদন ও বাজারে তার সরবরাহের প্রক্রিয়াটি যেন বাধাপ্রাপ্ত না হয়। দেশে যদি পর্যাপ্ত ওষুধ থাকে, তাহলে ওষুধ পাঠানোয় সত্যিই সমস্যা নেই। সমস্যা অন্যত্র। যেভাবে ট্রাম্পের হুমকির পরেই সুর নরম করল ভারত, তাতে যদি কারও মনে হয় যে, প্রভুর দাসত্ব স্বীকার করল আমাদের দেশ, তাঁকে কি দোষ দেওয়া যায়? এই সিদ্ধান্ত তো আরও আগেই নেওয়া যেত, হুমকি আসার আগে। স্বাধীনভাবে। আমাদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে যাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, তাঁরা তাহলে সেই প্রশ্ন তুলতেন না। যে ভাষায় আমেরিকার মাননীয় প্রেসিডেন্ট হুমকি দিলেন, সেটিও কি এই সময়ে ব্যবহারের যোগ্য ভাষা? তাহলে আমরা যাঁরা স্বপ্ন দেখছিলাম যে, হয়তো করোনা-উত্তর পৃথিবী একটি নতুন পৃথিবী হবে, তারা কি ভুল স্বপ্ন দেখছিলাম? অবশ্য রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের গুলিয়ে ফেললে হবে না। ওই আমেরিকাতে বসেই তো নোয়াম চমস্কি এখনও বেসুরে গাইছেন। ৯১ বছরের এই বৃদ্ধ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই ক্রান্তিকাল অতিক্রান্ত হলে দুই অসুরের সঙ্গে আমাদের লড়াই করতে হবে। এক, নিউক্লিয়ার যুদ্ধ; দুই, বিশ্ব উষ্ণায়ন। সাধারণ মানুষ গোটা পৃথিবী জুড়েই কমবেশি চেষ্টা করছেন এই সংকটের সময়ে দূরে দূরে বেঁধে বেঁধে থাকার। এই মহাসংকট থেকে তাঁরা হয়তো শিখবেন অনেক কিছু। তাঁরা চাইবেন পুরনো ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনটাকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে। কিন্তু চাইলেই তাঁরা তা পারবেন কি? রাষ্ট্রনেতারা যদি এই মহাসংকট থেকেও কিচ্ছুটি না শেখেন, যদি তাঁদের শরীরী ভাষায় আর শব্দ ব্যবহারে কণামাত্র পরিবর্তন না আসে, তাহলে করোনা-উত্তর পৃথিবী কি আমাদের সব শুভ ইচ্ছেকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, বসবাসের জন্য আরও ভয়ংকর, আরও হিংস্র হয়ে উঠবে?

এইসব ভাবতে ভাবতেই ভাস্কর চক্রবর্তীর একটা কবিতার কথা মনে পড়ল। কবিতাটির নাম “শুধু এইটুকু”। আসুন পড়া যাক কবিতাটি:

‘যারা জেলে থাকেন, ভাইসাহেব, শুধু তারাই বন্দি নয়।

 

যখন মনে এল কথাটা, আমি তখন

দিব্যি চিত হয়ে

সিগারেট ফুঁকছিলাম বিছানায়।

উঠতে হবে, ভাঙা হাড়গুলো জোড়া দিতে দিতে

উঠতে হবে এবার-–

 

নতুন নাটকটা, ছুট্টে, শান্তভাবে, দেখে আসতে হবে-–

সুমন্তকে খোঁজখবর দিতে হবে নতুন কোনও আস্তানার-–

আর নব-দম্পতিকে, নব-দম্পতিকে গিয়ে কী বলব?

কী বলা যায়?

 

সুখে থাকো?

 

ধুৎ’।

মাননীয় রাষ্ট্রপ্রধানগণ, আমরা নবদম্পতিকে সত্যিই ‘সুখে থাকো’ বলতে চাই। একে অপরকে ‘সুখে থাকো’ বলতে চাই। প্লিজ, করোনা-উত্তর পৃথিবীতে এই শব্দ দু’টিকে অর্থহীন করে দেবেন না।

আরও দিন অন্তরিন…

দূরের পথ দিয়ে ঋতুরা যায়, ডাকলে দরজায় আসে না কেউ

একটা পূর্বদিক বেছে নিতে হবে

খুব সহজেই আসতে পারে কাছে…

আমি কি এ হাতে কোনও পাপ করতে পারি?

খসে যেত মিথ্যা এ পাহারা…

যতবার আলো জ্বালাতে চাই…

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More