লকডাউন কি বাড়ানো উচিত হবে?

লকডাউনে যে দেশের অর্থনীতি দুমড়ে গেছে একেবারে তা পরিষ্কার। বিশ্বের অন্য দেশগুলির মতোই প্রচুর মানুষ আমাদের দেশেও ইতিমধ্যেই কাজ হারিয়েছেন। সংখ্যাটা প্রায় ৯০ লক্ষ। জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে কাজ হারিয়েছেন এঁরা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আরও অনেকে কাজ হারাবেন। সবচেয়ে মুশকিলে পড়েছেন দিন-আনি-দিন-খাই যাঁদের জীবন সেই মানুষেরা।

অংশুমান কর

তীর্থের কাকের মতো সকলে তাকিয়ে ছিলেন ১৫ এপ্রিলের দিকে। ভেবেছিলেন, ওইদিন এই অন্তরিন অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু মনে হচ্ছে যে, সে গুড়ে বালি। আজ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মিটিং ছিল সংসদীয় দলের নেতাদের। সেই মিটিংয়ে এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে যা ইঙ্গিত পাওয়া গেল সেই মিটিংয়ের সারবস্তু সম্পর্কে তাতে মনে হচ্ছে যে, লকডাউন দ্রুত উঠবে না। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী সমস্ত দলের বক্তব্য শুনেছেন। জানিয়েছেন যে, পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে, সকলের পরামর্শ মেনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বাস্তবোচিত কথা এটি। কিন্তু সিদ্ধান্ত কী হবে? আমি তো গণৎকার নই। তাই শেষমেশ লকডাউন নিয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত কী হবে তা অনুমান করা অসম্ভব। তবে এই প্রসঙ্গে দু’-একটি কথা বলতে ইচ্ছে করছে।

প্রথমেই যেটা বলে নেওয়া ভাল তা হল, লকডাউন নিয়ে এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না যা দেশের জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে। এবং এই বিষয়টি অবশ্যই আমার চেয়ে অনেক বেশি ভাল বুঝবেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকখানি বুঝবেন বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সহ অন্যান্য মন্ত্রী এবং প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন। কেন না, তাঁরা পরিস্থিতির একটি সামগ্রিক চিত্র পাচ্ছেন যা হয়তো আমরা সম্পূর্ণ পাচ্ছি না। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার যে, গোটা দেশ জুড়ে করোনার প্রকোপ সমানভাবে এখনও পড়েনি। দেশব্যাপী লকডাউন শুরু হয়েছিল ২৪ মার্চ। অনেকগুলো দিনই তারপরে অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ে গোটা দেশজুড়ে যে সমান ভয়ংকরভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়েনি, তা কিছুটা হলেও লকডাউন যে অনেকখানি (আমাদের হাজারো অনিয়ম সত্ত্বেও) কার্যকরী হয়েছে, সেটি বুঝিয়ে দিচ্ছে। যেমন এই লেখাটি যখন লিখছি তখন (৮ এপ্রিল ২০২০ সন্ধে ৬.৩৬ মিনিটে) কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রকের ওয়েবসাইট দেখাচ্ছে যে, সারা দেশে ‘কনফার্মড’ করোনা কেসের সংখ্যা ৫২৭৪। এর মধ্যে ‘অ্যাক্টিভ’ করোনা কেস ৪৭১৪। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১৪৯ জন। সেরে উঠে বাড়ি চলে গেছেন ৪১০ জন। সন্দেহ নেই যে, আমেরিকা, ইতালি বা স্পেনের তুলনায় এই পরিসংখ্যান সন্তোষজনক। কিন্তু আবার ভিয়েতনামের মতো দেশের নিরিখে তেমন স্বস্তিদায়ক নয়। হু-এর রিপোর্ট বলছে সেই দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২৫১। নতুন করে আর করোনা-আক্রান্ত পাওয়া যায়নি। আরও আশ্চর্যের বিষয়, সে-দেশে করোনা কেড়ে নিতে পারেনি এমনকি একটি প্রাণও! আমাদের দেশের রাজ্যগুলির দিকে যদি চোখ রাখি তাহলে দেখব যে, সবচেয়ে খারাপ অবস্থা মহারাষ্ট্রের। আক্রান্ত একহাজার ছাড়িয়েছে। ভাল নয় তামিলনাড়ু, দিল্লি বা তেলেঙ্গানার অবস্থাও। কেরল প্রথমদিকে খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে থাকলেও এখন একটা স্থির জায়গায় দাঁড়িয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কেরলে আক্রান্তের সংখ্যা (এই লেখার সময়) ৩৩৬। তুলনায় কতগুলি রাজ্যের অবস্থা কিন্তু বেশ ভাল। যেমন অরুণাচল প্রদেশ, ত্রিপুরা আর মিজোরামে আক্রান্তের সংখ্যা মাত্র ১। মণিপুরে ২। ঝাড়খণ্ডে ৪। পুদুচেরিতে ৫। যে গোয়াতে হামেশাই বিদেশিদের আনাগোনা সেখানে আক্রান্ত মাত্র ৭। পশ্চিমবঙ্গও মোটের ওপর ভালই করেছে। আমাদের অবস্থা এখনও মহারাষ্ট্র বা তামিলনাড়ুর মতো তো নয়ই। দিল্লি বা রাজস্থান বা অন্ধ্রপ্রদেশের মতোও নয়। এখানেই মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে, তাহলে কি পার্শিয়াল লকডাউনে যাওয়া সম্ভব? সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেল যে, এই পার্শিয়াল লকডাউনের কথা কেউ কেউ নাকি বলেছেন আজ প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে মিটিংয়ে।

লকডাউনে যে দেশের অর্থনীতি দুমড়ে গেছে একেবারে তা পরিষ্কার। বিশ্বের অন্য দেশগুলির মতোই প্রচুর মানুষ আমাদের দেশেও ইতিমধ্যেই কাজ হারিয়েছেন। সংখ্যাটা প্রায় ৯০ লক্ষ। জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে কাজ হারিয়েছেন এঁরা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আরও অনেকে কাজ হারাবেন। সবচেয়ে মুশকিলে পড়েছেন দিন-আনি-দিন-খাই যাঁদের জীবন সেই মানুষেরা। তাঁদের নিয়ে ইতিমধ্যেই লেখালেখিও হয়েছে বিস্তর। মহিলা কমিশন জানিয়েছে যে, লকডাউনের ফলে বেড়ে গেছে গার্হস্থ্য হিংসাও। সমাজেও হিংসার একটি দু’টি ঘটনা ঘটেছে। একটি স্কুলকে কোয়ারেন্টিন সেন্টার বানানো নিয়ে বীরভূমে বোমা পড়েছে। মারা গেছেন একজন মানুষ। দীর্ঘদিন যদি মানুষ অন্তরিন থাকতে বাধ্য হন, তাহলে হিংসার এই রকম প্রকাশ ঘটবেই। মুখ্যমন্ত্রী একটি কথা বলেছেন আজকের সাংবাদিক সম্মেলনে। কথাটি প্রণিধানযোগ্য। উনি বলেছেন যে, লকডাউন যাতে মানবিক হয়, সেটি দেখতে হবে। কথাটি কিন্তু সব ক’টি রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র সরকারকেই মাথায় রাখতে হবে। লকডাউন দীর্ঘায়িত হলেও শ্রমিকদের ওপর আর যেন ব্লিচিং জল স্প্রে করা না হয়। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, মৃতের সংখ্যা নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখাও কিন্তু এই ‘মানবিক’ লকডাউনের একটি অংশ। যেভাবে স্টেট ব্যাংক অবশ্য সুদের হার কমিয়েই চলেছে, যেভাবে গোটা বিশ্বের বাজারে তেলের দাম কমলেও এদেশে বেড়ে গেল (রান্নার গ্যাসের দাম অবশ্য কমেছে খানিকটা) তাতে গরিব মানুষদের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষদের একাংশও আক্রান্ত হবেন। পাল্টা বলা যেতে পারে যে, কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই তার ‘মানবিক’ মুখ দেখিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সহ সমস্ত সাংসদের মাইনে তিরিশ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি একটি সাধু উদ্যোগ। কিন্তু এই উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে দেশজুড়ে সাধারণ চাকুরিজীবী মানুষদের একটি বিপুল অংশ প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীদের রিলিফ ফান্ডে তাঁদের একদিনের মাইনে দেওয়ার পরে। মন্ত্রী-সাংসদরা এই সিদ্ধান্ত আরও আগে নিলেই তা আরও বেশি ‘মানবিক’ ও শোভন হত।

তো, যেকথা বলছিলাম, সারা দেশে কি একইভাবে জারি থাকা উচিত লকডাউন? যে রাজ্যগুলি সত্যিই সেইভাবে আক্রান্ত হয়নি, সেই রাজ্যগুলির জন্যও কি আরও দীর্ঘমেয়াদী লকডাউন জরুরি? এইসব রাজ্যগুলির সীমান্তকে ‘সিল’ করে, কড়া নজরদারি চালিয়ে কি রাজ্যগুলির অভ্যন্তরে লকডাউন তুলে দেওয়া যায়? বিশেষজ্ঞরা কী বলেন এই ব্যাপারে জানতে ইচ্ছে করছে। মন ভাবতে চাইছে যে, এ সম্ভব, এ সম্ভব। ইতিমধ্যেই বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ সারা দেশকে তিনটি অংশে ভাগ করে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রতিটি জোনের অবস্থা খতিয়ে দেখে নিয়ে তিনটি জোনের জন্য আলাদা আলাদা করে লকডাউন তোলার সুপারিশ করেছেন। এই মডেল কি অনুসরণ করা যেতে পারে? এইসব কথা ভাবছি কেবল দেশের অর্থনৈতিক দুর্গতির কথা মাথায় রেখেই। তবে একই সঙ্গে একবারে যে পুরো দেশে লকডাউন তোলা যাবে না–- এ নিয়ে কোনও দ্বিমত বোধহয় কারও নেই।

বিষয়টি নিয়ে শেষকথা বলার জায়গায় আমরা নেই। আমরা ছাপোষা মানুষ। কিছু ভাবনা মাথায় এল বলে, বলে রাখলুম কেবল। তবে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, এটা তো নিশ্চিত যে, একদিন এই যুদ্ধে আমরা জয়ী হবই। সেদিন যেন আমরা তারাপদ রায়ের এই কবিতাটির কাছে একবার ফিরে যেতে না ভুলি:

‘আমাদের সাড়ে আটজনের সংসারে

তিনজন মারা গেছে একবছরের মধ্যে

আমরা ভাল আছি।

 

এত স্পষ্ট কিছু বলা যায় না

যারা মারা গেছে তারা কি রকম গেছে

যারা আছে তারা কি রকম আছে

এ বিষয়ে তদন্ত কমিশন দরকার-–

তবু মোজা ছিঁড়ে গেলে কারো কথা মনে পড়ে,

কই মাছ খেতে গেলে কারো কথা মনে পড়ে’।

কবিতাটির নাম “তদন্ত কমিশন”। যে বইয়ে কবিতাটি আছে সেটির নাম “পাতা ও পাখিদের আলোচনা”। আশ্চর্যজনকভাবে দেখছি, বইটি প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৭৫ সালে। সেই বছরেই তো জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। আর আজ প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন যে, পরিস্থিতি যা তাতে মনে হচ্ছে যে, দেশে সামাজিক জরুরি অবস্থা চলছে। ঠিকই। এই নতুন জরুরি অবস্থার অবসান হলে আমরা যেন সকলে মন দিয়ে একটু পাতা ও পাখিদের আলোচনা শুনি।

আগের পর্বগুলি…

দূরের পথ দিয়ে ঋতুরা যায়, ডাকলে দরজায় আসে না কেউ

একটা পূর্বদিক বেছে নিতে হবে

খুব সহজেই আসতে পারে কাছে…

আমি কি এ হাতে কোনও পাপ করতে পারি?

খসে যেত মিথ্যা এ পাহারা…

যতবার আলো জ্বালাতে চাই…

দাদাগিরি ‘আনলিমিটেড’

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More