দূরের পথ দিয়ে ঋতুরা যায়, ডাকলে দরজায় আসে না কেউ

অংশুমান কর

“বাঁ পায়ের হাঁটুর ওপরের ছাল উঠে গেছে। সেদিকে দিয়েছ নজর কোনওদিন?”
কে বলল কথাটা? সংসারী মানুষ হিসেবে আমি খুবই উদাসীন। ঘরের কোনও কাজই প্রায় করি না। কিন্তু কেউ অসুস্থ হলে তো সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাই। এইটুকু তো করি। কে বলল কথাটা?
মিনিট দুয়েকের মধ্যেই অবশ্য পরিষ্কার হল রহস্য। কথাটা বলেছে আমার বই রাখার স্টিলের আলমারি। দেখলাম সত্যিই তিন নম্বর তাকের কাছে পাল্লার বাঁদিকের রঙ চটে গেছে। ওহ, এই ব্যাপার! ঘাবড়ে গিয়েছিলাম খুব। এবার খানিকটা আশ্বস্ত হলাম। আমার হাবভাব দেখে আলমারিটা বুঝে গেল যে, তেমন বিচলিত হইনি। এবার বেশ রেগে রেগেই বলল, “পাত্তা দিলে না? মানুষ হলে পারতে এই অবহেলাটুকু করতে? এই তো মাত্র ক’টাদিন ঘরে বন্দি হয়ে আছ, তাতেই হাঁফাচ্ছ। ভেবে দেখেছ কখনও আজ প্রায় আঠেরো বছর ধরে আমি এই একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। অন্তরিন। সেটা নিয়ে তো মাথাই ঘামাওনি। আর এখন বলছি যে, হাঁটুর ছাল উঠে গেছে, তাতেও পাত্তা দিচ্ছ না। তুমি আসলে বেসিক্যালি স্বার্থপর। নিজের প্রয়োজনটুকুই কেবল বোঝো। টিভিটার কিছু হলে, এসিটার কিছু হলে, পারতে এভাবে ফেলে রাখতে? ”

এইবার নড়েচড়ে বসলাম। সত্যিই তো অন্তরিন হয়ে আছি মাত্র ক’টা দিন তাতেই প্রাণ হাঁফিয়ে উঠেছে। বসন্ত চলে যাচ্ছে বাইরের পথ দিয়ে। দেখছি পলাশ ঝরে ঝরে পড়ছে। বৃন্তছিন্ন অশোকে ছেয়ে যাচ্ছে তারাবাগের রাস্তা। কিন্তু ওদের যে কুড়িয়ে ঘরে নিয়ে আসব, সেই সাহসটুকুও নেই। আর কতদিন! সকলেই ভাবছি আর কতদিন এইরকম দূরের পথ দিয়ে ঋতুরা চলে যাবে আর আমরা গৃহবন্দি থাকব? আমরা এতটুকুতেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি আর ঘরের আসবাবেরা তো গৃহবন্দি হয়ে আছে কত কত বছর! নড়াচড়াটুকুও নেই। তার ওপরে যে অভিযোগ স্টিলের আলমারি করল তা তো মারাত্মক। সত্যিই তো টিভি খারাপ হয়ে গেলে মুহূর্তের মধ্যে মেকানিককে ফোন লাগাই। এসি খারাপ হলে তো কথাই নেই। অথচ পড়ার বই আর পুরনো লেখা ঠাসা আছে যে আলমারিতে, তার স্বাস্থ্যের দিকে তেমন নজরই দিইনি! মাস্টারমশাই নই, ছাত্র নই, আমি কি শেষে হয়ে উঠেছি নিছকই একজন মধ্যবিত্ত কনজিউমার? উচ্চবিত্ত হওয়ার স্বপ্নে যে বিভোর?

ক্ষমা চাইতে হবে। বললাম, “শোনো, ক’টা দিন যাক, তার পর তোমার হাঁটুর মেরামতির ব্যবস্থা করব”। কী বুঝল কে জানে! কিন্তু চুপ করে গেল স্টিলের আলমারি। কিন্তু আমার মনে হল তার সাদা মেরুন রঙের মধ্যে কোথাও একটা লুকিয়ে রয়েছে নীল রঙ। সে রঙ বেদনার।

একটু স্থির হয়ে বসতেই আবার কথা। এবার মুখ খুলেছে আমার বই রাখার কাঠের র‌্যাকগুলি। আমাদের মতো মানুষদের বাড়িতে বইপত্র রাখা তো এক বড় সমস্যা। তাও আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোয়াটার্সে থাকি, তা ঢাউস। দু’টি ঘরের দেওয়াল জুড়ে বিশাল বিশাল কাঠের র‌্যাক বানিয়ে তাতে ঠেসে ধরানো আছে বই। আলমারিকে কথা বলতে দেখে সাহস পেয়ে গেছে তারাও। সমস্বরে প্রায় চেঁচিয়ে বলল, “স্টিলের আলমারি সত্যি কথা বলেনি। ওকে তো দেওয়ালের সঙ্গে আটকে দাওনি। পুরনো কোয়াটার্স থেকে যখন এই কোয়াটার্সে এসেছিলে, তখন ওর একটু হলেও বেড়ানো হয়েছিল। আগের কোয়াটার্সে যেখানে ও ছিল, এই বাড়িতে সেখানে ও নেই। কিন্তু আমাদের তো বানিয়েছ এই নতুন বাড়িতে এসে। মিস্ত্রি ডেকে তারপরে দেওয়ালের সঙ্গে এঁটে দিয়েছ। আমাদের বুঝি কষ্ট হয় না? সেই একভাবে রয়েছি আজ আট বছর!” বললাম, “শোনো, তোমাদের তো অন্য কোনওভাবে রাখা যাবে না। একটু বোঝার চেষ্টা করো প্লিজ।” আগুনে ঘি পড়ল যেন। এক সঙ্গে এবার সকলে মিলে বলে উঠল, “তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু আমাদের জীবনে কি ভ্যারাইটি চাই না ভাবছ? বললাম, “মানে? কী করে পাবে ভ্যারাইটি?” এইবার মুখ খুলল বাঁদিকের দেওয়ালের সঙ্গে আটকে রাখা র‌্যাক, “কেন মাঝে মাঝে তো এক র‌্যাকের বইগুলোকে অন্য র‌্যাকে রেখে দিতে পারো। তুমি ঠিক যেখানে যে বইটা সেই আট বছর আগে রেখেছ, সেখানেই রাখতে চাও। নতুন বই এলে কিছুদিন বিছানায় মেঝেতে ছড়িয়ে রাখো ওদের, তারপরে আবার নতুন র‌্যাক বানাও। ওই যে, উলটো দিকের দেওয়ালে ঝোলানো র‌্যাকের লাল টুকটুকে বইটার দিকে আমি তো শুধু তাকিয়েই থাকি। ওও তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। তুমি বোঝো? কেন এনে দাও না ওকে আমার কাছে? একটু ছুঁতে পেতাম তাহলে। শুধু চোখ দিয়ে কি আর সবকথা বলা যায়?” এইবার একটু লজ্জাই লাগল। সত্যিই তো! বইগুলো মাঝে মাঝে এদিক ওদিক করে দিলেও তো হয়। কিন্তু এইসব করার সময় কোথায়? আর বইয়ের জায়গা বদলে দিলে যদি আর তাদের খুঁজে না-পাই!

ভাবছি এসব, আর এরই মধ্যে ভেসে এল আক্রমণ। “শোন, ওকে এইসব বলে কোনও লাভ নেই। আমাদের কষ্ট ও কোনওদিন বুঝবে না”। কথা বলছে এক সাঁওতাল পুরুষের মাটি দিয়ে বানানো মুখ। “দেখছিস না, ও ওই শ্রমিক-মজদুরদের নিয়ে লেখা লিখছে আর নিজে ঘরে বসে বসে পড়ছে, লিখছে, খাচ্ছে-দাচ্ছে। এই লোকগুলোই এইরকম। নিষ্ঠুর আসলে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে গল্প-কবিতা লিখবে, কিন্তু তাদের জন্য সত্যিই কিছু করবে না”। কী বলি? কবি-শিল্পীরা শিল্পচর্চার ক্ষেত্রটিতে সত্যিই নিষ্ঠুর। কিন্তু তাঁরা তো কেউ কেউ সত্যিই সত্যিই মানুষের জন্য কিছু কিছু কাজ করার চেষ্টাও করেন। লেখাটাও কি সেই রকম একটা কাজ নয়? বলা যেত, কিন্তু তর্ক করতে ইচ্ছে করল না। কেননা চোখ পড়ল ডানদিকের দেওয়ালে টাঙানো একটা কাঠের হরিণের মাথার দিকে। উপহার হিসেবে পেয়ে যখন এই হরিণের মাথাটিকে দেওয়ালে আটকে ছিলাম, তখন ওর চোখ দু’টি দেখে মনে হয়েছিল ওই চোখে রয়েছে চাপ চাপ রাগ। যেন গহীন অরণ্যের অন্তর থেকে ওকে ছিনিয়ে নিয়ে আসার বিরুদ্ধে ও বিদ্রোহ করছে। আজ কিন্তু মনে হল, ওর চোখ দু’টি করুণ। বড়ই করুণ। সেই রাগ নেই আর। মনে হল পৃথিবীজোড়া মানুষের এই অসহায় অবস্থা দেখে ওর হৃদয় আর্দ্র হয়ে আছে।
আমি স্টিলের আলমারি, সাঁওতাল পুরুষের মুখ, আর কাঠের র‌্যাকগুলিকে বললাম, “আমার দোষ আমি স্বীকার করছি। কিন্তু এখন ঝগড়া করার সময় নয়। দেখো, ওই হরিণের দিকে চেয়ে দেখো। ওর দু’চোখে বরফ হয়ে আছে বিষণ্ণতা। তাই ঝগড়া না-করে চলো আমি বরং পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথন থেকে একটু পড়ি, তোমরা শোনো:
তোমার বন্ধু কে? দীর্ঘশ্বাস?
আমারও তাই।
আমার শূন্যতা গণনাহীন,
তোমারও তাই?

দূরের পথ দিয়ে ঋতুরা যায়
ডাকলে দরজায় আসে না কেউ
অযথা বাঁশি শুনে বাইরে যাই
বাতাসে হাসাহাসি বিদ্রুপের।”
এইটুকু পড়ে থামলাম। তারপরে বললাম, “আবার যখন ডাক দিলে ঋতুরা আসবে, তখন আমি আমার সব ভুল শুধরে নেব”।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More