গৃহবন্দির জবানবন্দি ৮

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন। অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে একটি বিভাগ ‘হাসো তো দেখি’। সেখানে আছে হাসির ছবি। এবার এল হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

জয়দীপ চক্রবর্তী

বাংলা বছরের দ্বিতীয় দিন। দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডার বদলে গিয়েছে গতকাল। পয়লা থেকে নতুন পাঁজি। গতপরশু রাত বারোটা বাজার পর থেকেই ফোনে নেট অন করা যাচ্ছিল না। হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারে নতুন বছরের শুভেচ্ছা সুনামির মতো আছড়ে পড়েছে। চিরকালই কিছু অতি উৎসাহী লোক থাকেন, যাঁদের কোনও কিছুতেই তর সয় না। আমাদের পাড়ার গেনুদা তার কলেজপড়ুয়া ছেলে প্রেমে পড়েছে খবর পেয়েই নাতি-নাতনির নাম ঠিক করে ফেলেছিল। অবশ্য যাঁরা সূর্যোদয়ের ঢের ঢের আগেই, বাঙালির নতুন দিনের সংজ্ঞা না মেনেই এমন শুভেচ্ছায় ভাসান তাঁদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। বছরে দুটোই মাত্র বাংলা তারিখ মনে রাখতে হয় তাঁদের। দুটোই বছরের একেবারে গোড়ায়। প্রথম মাসে। একটা পয়লা আর একটা পঁচিশ। ব্যাস। বাংলা ক্যালেন্ডারের আর দরকার নেই সারাবছর। কাজেকাজেই এই দুটো দিনের কোনওটাকেই বেখেয়ালে ফসকে যেতে দেওয়া যায় না। একবার ঘুমিয়ে পড়া মানে সকাল হবে কিনা জানি না। নিশ্বাসে বিশ্বাস নেই। চার মাস পরের ট্রেনের টিকিট বুক করে রাখি বটে, কিন্তু জানি না রাতের ঘুম আদৌ সকালে আর ভাঙবে কিনা। আর যদি ভাঙেও, ঘুম ভাঙামাত্র হাজার হ্যাপা। থলে হাতে বাজারে ছোটো। মাংসের দোকানে লম্বা লাইন। মাছের বাজারে ঠেলাঠেলি। বাড়ি ফিরে নতুন জামাকাপড় পরে বউ-ছেলেমেয়ের সঙ্গে সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোডের হ্যাপা আছে। বেশি দেরি করলে কী ক্যাপশন দেব তাই নিয়ে মহাচিত্তির। পয়লা বৈশাখের সঙ্গে দিব্বি খাপ খেতে পারে এমন যে ক’টা গান বা কবিতার যুৎসই লাইন জানি সব তখন অন্যেরা দিয়ে দিয়েছে। নিজের জন্যে কিছু আর পড়ে থাকতে দেখা যাবে না।

পয়লাতে সাধারণ গেরস্ত মানুষদের মধ্যে যাঁরা খুব একটা ‘আধুনিক বা প্রগতিশীল’ নন, তাঁরা আবার এই দিন সকাল-সকাল চানটান করে মন্দিরে-টন্দিরেও যান। সেখানেও গা গলানো মুশকিল। এই দিনে মন্দির মূলত ব্যবসায়ীদের দখলে। থরে থরে লক্ষ্মী-গণেশ আসছে। সঙ্গে লাল মলাটের জাবদা খাতা। মন্দিরে মন্দিরে ধূপধুনো রজনীগন্ধার সুবাস উড়ছে। খুশি খুশি মানুষের বুকের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে সেই গন্ধ। আর এই পুজো পুজো গন্ধ একবার ভেতরে ঢুকে গেলেই কিছুক্ষণের জন্যে অন্তত মনের মধ্যেটা সাদাটে হয়ে যায়। তখন হাতের লাড্ডুর প্যাকেট খুলে নিজের জন্যে একটাও না রেখে অন্যদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। ‘জড় মূর্তির মিথ্যে দেবতা কিছুই খান না, সবই বামুনের কারসাজি’, এই আপ্তবাক্য আউড়ে আর মনুসংহিতার পিন্ডি চটকে চলে আসার আগেই নিজের অজান্তেই হাত চলে যায় মানিব্যাগে, মন্দিরে দেবার জন্যে প্রণামির টাকা বের করার জন্যে।

আমি স্কুলে পড়াই। ‘পড়াই’ শব্দটায় আবার একদল মানুষ রে-রে করে তেড়ে আসতেও পারেন। চোখকান খোলা রাখলেই শোনা যায়, এই বাংলায় মাস্টারদের চেয়ে নচ্ছার জীব আর কেউ নেই। এই সৎ, কর্মনিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষকরাই একমাত্র বিশ্বফাঁকিবাজ এবং ভীষণরকম অযোগ্য। স্কুলে কাজ করতে নয়, ঘুমোতে এবং আড্ডা মারতে যান তাঁরা দল বেঁধে। তাঁদের বছরে অন্তত ছ’মাস ছুটি আর প্রচণ্ড বেশি মাইনে। ফলে যা হবার তাই ঘটছে চোখের সামনে। মন্দিরে বছরের প্রথম দিনের ভিড় দেখলেই তাঁদের স্কোরশিটটা চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়। কেননা আধুনিক মানুষমাত্রেই জানেন, ‘কেবলমাত্র নাস্তিকরাই শিক্ষিত!’
অর্থাৎ এত মানুষের মন্দিরে যাতায়াতে আমারও ব্যর্থতা আছে, এই কথাটা প্রত্যেক বছর একবার করে মনে পড়ে যায় প্রত্যেক পয়লা বোশেখের সকালে।

এই বছরেও অবশেষে চৈত্র শেষে বৈশাখ এসেছে। পুরনো ক্যালেন্ডার নেমে পড়েছে দেওয়াল থেকে। নতুন ক্যালেন্ডার আসেনি বলে শূন্য দেওয়ালে চলে যাওয়া বছরের নিঃসঙ্গ দাগটুকুই শুধু অর্ধবৃত্তাকারে জেগে রয়েছে। ক্যালেন্ডার নেই ঠিকই, কিন্তু ক্যালেন্ডার মেনে গরম পড়ে গেছে জাঁকিয়ে। বাজারে ফলমূল উঠছে। গাছের ডালে আমের গুচ্ছ ডাঁসা হয়ে উঠেছে। পাকতে বেশি দেরি নেই। গাছে গাছে এঁচোড় ঝুলে আছে। তাদের দিকে চোখ পড়লেই জিভ ভিজে আসছে। আগেই বলেছি, পরশু রাত থেকে ধেয়ে আসা মোবাইলবাহিত শুভেচ্ছাস্রোতেরও বিরাম নেই। তবু এই বৈশাখ এবছর অন্যরকম। একেবারেই অন্যরকম। মন্দিরে মন্দিরে ভিড় নেই। রাস্তা শুনশান। বাজারেও হামলে পড়া ভাব নেই। নতুন বছরের সকাল বড় বিষণ্ণ। একটা চোখে দেখা যায় না এমন ছোট্ট ভাইরাস আমাদের জীবনকে থামিয়ে দিয়েছে। হিন্দু-মুসলিম, ধনী-দরিদ্র, ডান-বাম, আস্তিক-নাস্তিক সকলেই যেন একচক্রা গ্রামের মানুষের মতো প্রহর গুনছেন আতংকে। এইবার কার পালা? কে কবে যাবেন করোনার গ্রাসে? নিজের অজান্তেই কে কখন হয়ে পড়বেন মারণরোগের বাহক? অতএব উৎসবও এবারে ঘরবন্দি।

বাইরে বেরোলে নাকেমুখে মাস্ক বাঁধা বাধ্যতামূলক হয়েছে। নইলে জরিমানা। জেলও হতে পারে। কোভিড নাইন্টিনের অসভ্যতায় বছরের প্রথম দিনে এবারে দেশের বাড়িতে যাওয়া হল না। মন্দিরে পুজো-শেষে মায়ের ভোগপ্রসাদ নেবারও উপায় নেই। মৃদু আওয়াজ উঠেছিল, বাড়িতেই আছি যখন, বছরের শুরুতে মাংস-ভাত হোক। আমি মাস্কের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে গেলাম। বললাম, ‘দোকানে খদ্দের নেই। নতুন পাঁঠা কাটছে কি আর? কবেকার বাসি মাংস হয়তো গছিয়ে দেবে। নাকে মাস্ক বাঁধা, পচা গন্ধটন্ধ যদি থাকেও টের পাব না কেউ…।’
‘ধ্যাৎ, যত্ত বাজে কথা। বাড়িতে শুয়ে-বসে থেকে আলস্য বেড়ে গেছে তাই বলো’, হাল্কা প্রতিরোধ ভেসে এল। কিন্তু সে প্রতিরোধে ঝাঁঝ নেই, বরং প্রশ্রয়। নিজেই বলল, ‘থাক। চারদিকে এমনিতেই আজকাল যেন বড্ড মৃত্যু-মৃত্যু গন্ধ। টিভি খুললেই বিশ্বজোড়া মৃত্যুর খবর। আমরা তবু দু’বেলা পেট ভরে খেতে পাচ্ছি যা পাই দু’মুঠো। কিন্তু কত মানুষ কিচ্ছু পাচ্ছে না…।’
‘ঠিকই’, মাথা নাড়ি আমি, ‘কিছু বোকা মানুষ তাঁদের কথা ভেবে কোনও স্বার্থ ছাড়াই নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে বাইরে বাইরে ঘুরে মরছেন। সেবা করছেন সেইসব অসহায় মানুষের…।’
‘বোকা মানুষ?’
‘আজকাল ভালমানুষদের ওই নামেই ডাকা হয় যে। তুমি হয়তো খবর রাখো না…।’
‘যেদিকে চোখ যায় যেন এক অদ্ভুত বোবা অসহায়তা। সকলেই মনে মনে কাঁপছেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই কাঁপন কি শুধুই মানুষেরই হয় বলো? ওদের হয় না?’ ওর চোখ দিঘির জলের মতো টলমল করে ওঠে, ‘যখন আমরা মাংসের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকি লাইন দিয়ে আর খুঁটিতে দড়ি দিয়ে বাঁধা পাঁঠাগুলো চিৎকার করে ডাকে… আগে মনে হত না জানো… কিন্তু এখন মনে হচ্ছে…।’
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
ও বলল, ‘কী দেখছ অমন করে?’
‘তোমায়’, গাঢ় গলায় বলি, ‘আমার জন্যেও তো মাঝেমাঝে এমনি করে ভাবতে পারো। এমনই কাদার মতন নরম তুলতুলে মন নিয়ে। জানোই তো আমিও ওই পাঁঠাগুলোরই মতন, খুঁটিতে বাঁধা। সংসারের যূপকাষ্ঠে মাথা গলিয়ে দেবার অপেক্ষায় আছি রাত্রিদিন…।’

চিত্রকর: রাজ রায়

জয়দীপ চক্রবর্তীর ‘বারোয়ারি নকশা’র আগের পর্বগুলি…

গৃহবন্দির জবানবন্দি

গৃহবন্দির জবানবন্দি ২

গৃহবন্দির জবানবন্দি ৩

গৃহবন্দির জবানবন্দি ৪

গৃহবন্দির জবানবন্দি ৫

গৃহবন্দির জবানবন্দি ৬

গৃহবন্দির জবানবন্দি ৭

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More