গৃহবন্দির জবানবন্দি ৩

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন। অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে একটি বিভাগ ‘হাসো তো দেখি’। সেখানে আছে হাসির ছবি। এবার এল হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

জয়দীপ চক্রবর্তী

মর্কটের মতো চেহারা, বাঁশকাঠি চালের মতো মুখ আর ক্যাবলা ক্যাবলা লুক বলে ছোটবেলা থেকে কেউ কখনও আমার প্রেমে পড়তে চায়নি চট করে। তখন ইস্কুলে পড়ি। চড়কের মেলায় একজন ম্যাজিশিয়ান ভাগ্য গণনা করছিল গাছতলায় বসে। আমি সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। জাদুকর বলল, ‘একটা কাগজ তুলে নাও আমার হাত থেকে।’
তার হাতের অনেকগুলো ভাঁজ করা কাগজের একখানা তুলে নিলাম চিন্তাভাবনা না করেই। হাতের চেটোর আড়ালে কাগজের ভাঁজ খুলে দেখলাম লেখা আছে— ‘কে তোমাকে সব থেকে বেশি ভালবাসবে?’
সেই বয়েসে ‘ভালবাসা’ শব্দটা উচ্চারণ করলেই ভাবসমাধি হয়ে যেত আমাদের। মনে মনে বীজমন্ত্রের মতো ওই চার অক্ষরের মহামন্ত্র জপ করতাম সকলের অগোচরে। একা একা। গার্লস ইস্কুলের কেউ এগিয়ে এসে বন্ধুদের কারও সঙ্গে কথা বললেই আমাদের চোখে সে হিরো হয়ে যেত। গল্প আরও একটু এগোলে আমাদের ভাগ্যে আলুকাবলি কিংবা কম দামের কাঠি আইসক্রিম।
জাদুকর আমার হাতের কাগজটাকে একপলক দেখে নিয়ে মুচকি হেসে চোখ মটকে জিজ্ঞেস করল, ‘জানতে চাও?’
‘কে?’ চারদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলি।
লোকটা আমার দিকে হাত বাড়াল, ‘আগে হাতের চেটোয় চার আনা ফেলো…’
দিলাম।
জাদুকর ঝোলা থেকে আগের মতোই একগুচ্ছ ভাঁজ করা কাগজ তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে হাতের চেটোয় মেলে ধরে বলল, ‘একখানা তুলে নাও চোখ বন্ধ করে। তারপর আড়ালে গিয়ে খুলে দেখো।’
আমি কাগজটা হাতের মধ্যে চেপে ধরে দুরু দুরু বুকে ষষ্ঠীতলার পুরনো অশ্বত্থ গাছের নীচে ছায়া ছায়া সন্ধ্যায় সেই কাগজ খুললাম সন্তর্পণে। ধড়াস ধড়াস শব্দ হচ্ছে বুকের মধ্যে। দুটো-তিনটে নাম ঘাই মেরে উঠছে মনের পুকুরে। কে, কে? জাদুকরের ভোজবাজিতে কার নাম ভেসে উঠবে কাগজের ওপরে?
কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরেই সারা শরীর চিড়বিড় করে উঠল। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আছে— ‘মেয়েরা গোরুর প্রেমে পড়ার মতো বোকা নয়।’

কম বয়েসে মানুষের অভিজ্ঞতা কম থাকে। আমারও ছিল। ‘গোরু’ শব্দটি যে কালে এ দেশে মারাত্মক মর্যাদা পাবে এবং বহু অর্থে ব্যবহৃত হবে তখন বুঝিনি। সেই অপরিপক্ক বয়েসে সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, ওই বেয়াড়া ম্যাজিশিয়ানের মাথা ভেঙে ঘিলু বের করে ছেড়ে দিই। কিন্তু আমার প্যাংলা শরীর। মারপিটে কারও সঙ্গেই পেরে উঠব না জানি। অতএব রণে ভঙ্গ দেওয়া ছাড়া গতি খুঁজে পেলাম না কোনও।
‘মেয়েরা বোকা নয়’— ম্যাজিশিয়ানের এই কথাটা অবিশ্যি আমি তখনও মানতাম, এখনও মানি।
পড়ার কথা নয় বলেই আমার প্রেমে কেউ পড়েনি কখনও। কিন্তু স্বভাবদোষে বসন্ত এলেই আমার মন উড়ু উড়ু হয়ে যায়। বাড়ির লোকজনকে তখন কেমন যেন অচেনা মনে হতে থাকে। মনে হয়, নিজেকে বিলিয়ে দিই। বসন্ত এলেই একা একা রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে আমার। ইচ্ছে করে, রাত্তিরবেলা ফাঁকা মাঠে শুয়ে আকাশের তারা গুনি একা একা। মাঝে মাঝে ঝোলা কাঁধে বেরিয়ে যেতেও শখ হয় ঘর ছেড়ে বিবাগী হয়ে।
এ বছরেও তেমনটাই হচ্ছিল। কিন্তু বাধ সাধল এই কমপালসারি কোয়ারেন্টাইন। চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে হাঁফ ধরে যাচ্ছে। চার পাশে চেনা মুখের জঙ্গল। আয়নায় নিজের মুখের দিকে চোখ পড়লেও বিরক্তি আসে আজকাল। বাধ্য হয়ে বিকেল যখন সন্ধের দিকে গড়াতে শুরু করে, ঘর ছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়াই। আমার বাড়ির সামনেই রাস্তা। রাস্তার পাশেই একচিলতে ফাঁকা মাঠ। মাঠের একধারে কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছের মাথায় লালচে রঙ ধরেছে সবে। এই ধু ধু নির্জন, হঠাৎ একা হয়ে যাওয়া পৃথিবীতে আমি আর সেই গাছটি নীরবে দাঁড়িয়ে থাকি কিছুক্ষণ। গাছ নির্বিবাদী। তার থেকে সংক্রমণের ভয় নেই। তার সামনে দাঁড়াতে মাস্কে মুখ ঢেকে ফেলতেও হয় না আমাদের।
আজ সেই গাছের তলায় দেখি আমাদের পাড়ার নীপা দাঁড়িয়ে আছে। হলুদে আর সবুজে ছাপানো সালোয়ার কামিজে কী মিষ্টি যে দেখাচ্ছে তাকে! কপালে ছোট টিপ, ঠোঁট রাঙিয়েছে যত্ন করে।
নীপা আমারই আসার পথের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি রাস্তা পেরিয়ে মাঠে নামতেই নীপা লঘু পায়ে এগিয়ে এল। মাথা নিচু করে মৃদু গলায় বলল, ‘তোমার জন্যেই দাঁড়িয়ে আছি। জানি তুমি রোজ এই সময়ে একা একা গাছের কাছে আসো।’
‘আমার জন্যে?’ অবাক হয়ে বলি।
‘হ্যাঁ তোমারই জন্যে’, নীপা আমার এক্কেবারে কাছে সরে আসে।
বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতির ঢেউ উঠছে। তিরতির করে ঠোঁট কাঁপছে আমার। মনে মনে বলছি, ‘বড্ড দেরি করে ফেলেছ নীপা। তোমার বন্ধুদের অনেকেই আমাকে কাকু ডাকে আজকাল…’
নীপা খপ করে তার নরম উষ্ণ হাত দিয়ে আমার কনুয়ের কাছটা চেপে ধরল, ‘তুমি বড্ড ভাল, আমি জানি, তোমাকেই একমাত্র ভরসা করা যায়…’
‘কী হয়েছে নীপা?’ প্রায় ফিসফিস করে আমি বলি।
‘এতদিন ধরে একটানা লকডাউন ভাল লাগে, তুমি বলো? বাড়ি থেকে বেরোতেই পারছি না। না আমি, না মুকুল। কত্তদিন দেখিনি ওকে…’ কথার শেষটায় মেনি বিড়ালের মতো আদুরে আর ঘড়ঘড়ে হয়ে উঠল যেন নীপার গলাটা।
‘মুকুল— ’
‘আমার বি এফ গো… মাই সুইট গাই…’ বলতে বলতেই ঝপ করে ইয়াব্বড় স্মার্ট ফোনের লক খুলে ব্যস্ত হয়ে পড়ল নীপা। ‘সারাক্ষণ বাড়িতে বসে আছে। বাবা-মা রয়েছে বলে ভিডিও কল করতে পারছি না। ওর বাবা-মা হেবি কুচুটে জানো তো, ওর ফোন এলেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কার ফোন জানা চাই…’
‘আমি কী করব তার জন্যে?’ এইবার বিরক্ত হয়ে বলি।
‘আমি ভিডিও কল করব। আশপাশে কেউ এসে গেলেই তোমাকে ইশারায় ডেকে নেব। ঝপ করে নিজের হাতে ফোনটা নিয়ে যা হোক কিছু কথা বলে ম্যানেজ করে দিয়ো তুমি। ব্যস, ওর বাড়ির লোক ভাববে একটা ছেলেই ফোন করেছিল ওকে।’ বলেই আমার ওপরে একেবারে ঢলে পড়ল নীপা, ‘এইটুকুই তো। পারবে না কাকু?’
কাকু! কাকুই! নীপাও! বিরক্ত হয়েও কিছুই বলতে পারলাম না। আমার জীবনে বসন্ত ফিকে হয়ে এলেও নীপাদের বসন্ত তো এখনও রঙিন, এখনও উজ্জ্বল। টানা এতদিনের লকডাউন সত্যিই ওদের বসন্ত কেড়ে নিয়েছে এ বছর।
কোভিড ভয়ংকর শুধু নয়, বড় বিচ্ছিরি রকমের বেরসিকও…

আরও পড়ুন…
গৃহবন্দির জবানবন্দি

গৃহবন্দির জবানবন্দি ২

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More