গামছা

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন।অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে একটি বিভাগ ‘হাসো তো দেখি’। সেখানে আছে হাসির ছবি। এবার এল হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

সুন্দর মুখোপাধ্যায়

হাতিবাগানে বরদাচরণ সরকার প্রতিষ্ঠিত একটা প্রাচীন দোকান ছিল। তাতে বিক্রি হত লুঙ্গি, গেঞ্জি, গামছা ও খাদি বস্ত্রাদি। সাইনবোর্ডে জ্বলজ্বল করে লেখা ছিল ‘ইস্টেড ১৯৩৬। প্রোঃ স্বাধীনতা সংগ্রামী শ্রী বরদাচরণ সরকার’। সঙ্গত কারণেই দোকানের নামটা দেওয়া যাচ্ছে না। সে দোকান আছে, না কি মল হয়ে গেছে জানি না। বরদাচরণের পর কুলদা। এরপর কুলদার পুত্র মৃত্যুঞ্জয়বাবু পর্যন্ত আমি জানতাম। বছর দশেক কোনও যোগাযোগ নেই। মৃত্যুঞ্জয়বাবুর কাছ থেকে একবার একটা গামছা কিনে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘টেকসই তো?’

তিনি কিছুক্ষণ হাঁ করে থেকে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘আচ্ছা… ঠিক কতদিন টিকলে একটা গামছাকে টেকসই বলা যেতে পারে?’

আমি পড়লাম ফাঁপড়ে। আমতা আমতা করে জবাব দিলাম, ‘ওই ধরুন বছরখানেক…।’

এবার তিনি গলাখাকারি দিয়ে নড়েচড়ে বসে শুরু করলেন, ‘আমার দাদু স্বর্গীয় শ্রী বরদাচরণ সরকার মহাশয় বলতেন, ‘একখান গামছা ছয় মাস ব্যবহার করলে একটি ছিদ্র হয়। এক বৎসর ব্যবহার করলে হয় দুইখান ছিদ্র। ততদিনে প্রথম ছিদ্রটি একটু বড় হয়ে ওঠে। এরপর প্রতিমাসে একখান করে ছিদ্র আত্মপ্রকাশ করতে থাকে। তবু পরের তিন মাস পর্যন্ত গামছাখান ব্যবহারযোগ্য বলে ধরা হয়, অন্তত পুরুষদের শ্লীলতাহানি হয় না…।’

তবে বরদাচরণই এ ব্যাপারে শেষকথা নন। আমার পাশের ফ্ল্যাটের মজুমদারবাবুকে দেখলে আপনারাও সেটা মেনে নিতেন। মজুমদার মশাইয়ের দুই ছেলে বাইরে বাইরে, ফ্ল্যাটে কেবল কর্তা-গিন্নি। দু’জনের দু’টি গামছা। বলা বাহুল্য, গিন্নিরটা নতুন এবং কর্তারটা সেকেন্ড হ্যান্ড। অর্থাৎ গিন্নির বাতিল করে দেওয়া গামছাখানা। সকালবেলা, তখনও পেট পরিষ্কার হয়নি, মজুমদার মশাই অসংখ্য ছিদ্র সম্বলিত গামছাখানা পরে ঘরের ভেতর অস্থির পায়চারি করছেন। গিন্নি সংসারের কাজে ব্যস্ত। মাঝেমাঝে কর্তার দিকে নজর পড়লে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিচ্ছেন। একসময় থাকতে না পেরে বলে উঠলেন, ‘ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন, বাথরুম যাবে তো যাও…।’

মজুমদারবাবু অন্যমনস্কভাবে জবাব দিলেন, ‘দাঁড়াও… দাঁড়াও…।’

এরপর আরও কিছুক্ষণ কেটে গেছে। মজুমদারবাবুর একটা গোটা বিড়ি প্রায় শেষ হতে চলল। গিন্নি এবার ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, ‘ছি ছি, তোমার সর্বস্ব দেখা যাচ্ছে… লজ্জায় তাকাতে পর্যন্ত পারছি না…।’

মজুমদারবাবু থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। নির্বিকারভাবে গামছাখানা একবার দেখে বললেন, ‘দাঁড়াও ওটিপি আসুক…।’

‘ওটিপি! সে আবার কী?’

‘ও তুমি বুঝবে না, অনলাইন কেনাকাটায় দরকার পড়ে। এই ফুটোফাটা গামছা ছাড়া ওটিপি ঠিকমতো রিসিভ করা যাবে না–।’

বলতে বলতেই মজুমদার মশাইয়ের ভুঁড়ি ও ফ্ল্যাট কাঁপিয়ে সশব্দে ওটিপি আছড়ে পড়ল। তিনিও কোনওমতে বিড়িটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে, গামছার গিঁট আলগা করতে করতে দৌড়লেন বাথরুমের দিকে।

আমাদের স্টেশনের গ্যাংম্যান বিন্দুকে দেখেছি, কেবলমাত্র একখানা গামছা সম্বল করেই দূরদূরান্তে চলে যেতে। হাতে না ব্যাগ, না কোনও থলে-টলে। গামছার খুঁটে বাঁধা একঠোঙা ছাতু। রাস্তায় পুকুর-টুকুর দেখলে, ছাতুর ঠোঙাটা সাবধানে কোনও গাছের নীচে রেখে সে পুকুরে কয়েকটা ডুব দিয়ে নেয়। তারপর গামছা নিঙড়ে শুকিয়েও নেয়। শুকনো গামছায় ছাতু ঢেলে খানিক জল মিশিয়ে, মেখে দিব্বি খেয়ে নেয়। এরপর ফের গামছাটা কেচে, শুকিয়ে, টানটান করে মাটিতে পেতে ফার্স্টক্লাস দিবানিদ্রা।

তবে মজুমদারবাবুর গল্প এখনও শেষ হয়নি। তিনি যখন স্নানটান সেরে নিজস্ব গামছাখানা পরে ব্যালকনি থেকে সূর্যপ্রণাম সারেন, আশপাশের ফ্ল্যাটের কেউ আর বের হতে সাহস করে না।

কিন্তু হলে কী হবে, গামছা আটকে যেন গামছাতেই– একদিন নিমীলিত নয়নে তিনি মন্ত্রোচ্চারণ শেষ করে চোখ মেলে দেখেন, কোথায় সূর্য! বদলে সামনের আটতলার ফ্ল্যাটে ঝুলছে তারই মতো একখানা শতশ্ছিদ্র সম্বলিত গামছা।

আমাদের ঠেকের সুপ্রাচীন মদ্যপ বংশীবাবু। আগের রাতে বউয়ের কাছে বেধড়ক ঝাড় খেয়ে সখেদে বলেছিলেন, ‘অনেক ভেবে দেখেছি, পুরুষমানুষ মরে গেলে পরের জন্মে গামছা হয়– কী টাফ লাইফ! একটুও সহানুভূতি নেই রে…।’

গামছা-কাহিনি শেষ করব এক উদ্যোগী বৃদ্ধ শ্যামবাবুকে দিয়ে। রিটায়ারের পর মাত্র দু’শো টাকা দিয়ে জনৈক পুরুতমশাইয়ের কাছ থেকে তিনি দশখানি গামছা কিনে নিলেন। পুরুতমশাই খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত গামছা কী করবেন?’

শ্যামবাবু সেই মুহূর্তে কোনও জবাব দিলেন না ঠিকই, তার পরের দিন তাকে দেখা গেল দশখানা গামছা নিয়ে বাসস্ট্যান্ডের পাবলিক শৌচালয়ের সামনে। না, বিক্রি করতে নয়, ভাড়া দিতে। পনেরো মিনিটে একটাকা।

অভিজ্ঞজন মাত্রই জানেন, বাসে ওঠার পূর্বমুহূর্তে অনেকেরই পেট যেন একটু মোচড় দেয়। ঈশানকোণে মেঘ দেখে ইচ্ছে হয় ব্যাপারটা মিটিয়ে নিতে। স্রেফ একখানা গামছার অভাবে তা আর হয়ে ওঠে না।

শ্যামবাবুর ব্যবসা ভালই চলছিল। কোনও কাস্টমার কমপ্লেন নেই। কেবল একদিন, জনৈক কাস্টমার বললেন, ‘দু’দিন ধরে কিচ্ছু হচ্ছে না। আপনি বরং দু’টাকা রাখুন, আমার একটু দেরি হতে পারে…।’

প্রায় পঁচিশ মিনিটের মাথায় ভদ্রলোক মাথা নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে এলেন, ‘নাঃ, আজও বিশেষ কিছু হল না–।’

কাস্টমার খুশি না হলে কার আর ভাল লাগে! শ্যামবাবু বললেন, ‘কেন, আপনাকে তো পয়া গামছাখানাই দিয়েছিলাম। এই গামছা সকাল থেকে যতবার গেছে পাঁচমিনিটের বেশি সময় নেয়নি…।’

ভদ্রলোক দুঃখিত হয়ে বললেন, ‘কী আর করব, সবই ভাগ্য! একেই বোধহয় বলে, এক গামছায় পৃথক ফল!’

আরও বারোয়ারি নকশা…

বিজ্ঞাপন লাইভ

সিনিয়র সিটিজেন

প্রেমপত্র

স্বাস্থ্যবিধি

প্রশ্নোত্তরে বিবাহিত জীবন

লুজ ক্যারেক্টার

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More