সব্বোনাশ

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন। অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে একটি বিভাগ ‘হাসো তো দেখি’। সেখানে আছে হাসির ছবি। এবার এল হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

সুন্দর মুখোপাধ্যায়

দুটো বাংলা শব্দ, প্রায় সমোচ্চারিত এবং প্রায় একই অর্থ বহনকারী– সর্বনাশ ও সব্বোনাশ। অর্থের সামান্য যে প্রভেদ বাংলা অভিধান বা শিক্ষকবৃন্দ বহু চেষ্টা করেও বুঝিয়ে দিতে পারেননি। অথচ সুপ্রাচীন মদ্যপ বংশীবদন সাহা কত সহজে, মাত্র এক ডায়ালগে তা বুঝিয়ে দিলেন। সেদিন একটা বোতল কাগজে মুড়ে অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে বংশীদা আমাদের গলি পার হচ্ছিলেন। আমার সাইকেলের ঘন্টি শুনে বংশীদা  বোতলটা তাড়াতাড়ি এহাত থেকে ওহাতে নিয়ে বললেন, ‘সাবধান, একদম সাইড কলিশন করবি না…।’ এবং তারপরেই দিলেন সেই অভ্রান্ত ডায়ালগ, ‘এ বোতল যদি ভেঙে যায় আমার সর্বনাশ হয়ে যাবে। আর মালটা পুরো খেয়ে নিলে তোর বউদির সব্বোনাশ।’

এ রকম উদাহরণ হাতের কাছেই আরও কতগুলো আছে। বরানগরের মিশকালো পাচু মিত্তিরের বউ বেদম ফর্সা। শোনা যায়, ফুলশয্যার ঘরে ঢুকেই পাচুদার মুখ থেকে অটোমেটিক যে ডায়ালগটা বেরিয়েছিল তা হল, ‘সব্বোনাশ! এত সুন্দরী বউ!’
খেয়াল রাখুন, রবি ঠাকুরের চৈত্রমাসে অনুধাবন করা ‘সর্বনাশ’ নয় কিন্তু।
‘সব্বোনাশ’ খুব ছোঁয়াচে, সংক্রামক একটা অনুভূতি। পাচু মিত্তিরের আর একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা বোঝা যাবে। পাচুদা ছাতা ভুলে বাড়ি এলে, বা পাড়ার কোনও বউদির সঙ্গে কিঞ্চিৎ অধিক তরল কোনও ডায়ালগ আদানপ্রদান করে ফেললে, কিংবা ভিড় বাজারে বউয়ের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে একটু দূরে চলে গেলে, এখনও, বিয়ের এই পঁচিশ বছর পরেও মিসেস পাচু মিত্তিরের একই খেদোক্তি, ‘সব্বোনাশ! এ কার পাল্লায় পড়েছি গো…।’

এ প্রসঙ্গে আর একখানা গপ্পো মনে পড়ে গেল। গপ্পোটা করুণ, না হাসির এখনও ঠিক ক্লিয়ার হয়নি। ভবানীপুরের মধুদা একজন হাফ গায়ক, হাফ ফুটবলার, হাফ কবি এবং এরকম অসংখ্য হাফ। অথচ তার বেটারহাফের চোখে তিনি গুড ফর নাথিং। এই পঞ্চান্ন বছর বয়সে এসে মধুদার বোধোদয় হয়েছে, এ জীবনে তিনি ঠিক বিচার পাননি।
মধু গিন্নি সেদিন কাঁদো কাঁদো গলায় ফোনে বললেন, ‘শিগগির একবার এসো। তোমার দাদার খুব কঠিন রোগ হয়েছে।’
–‘সে কী! কী হয়েছে?’
মধু বউদি বললেন, ‘ওর সব সময় পাত্তা পেতে ইচ্ছে হচ্ছে। বিশেষ করে মহিলাদের কাছে।’
বললাম, ‘তা দিন না একটু পাত্তা…।’
–‘সে তো করলাম… সকালে বললাম, সোনামুনুটা, একটু চা করে খেয়ে নাও। মানিক আমার, এবার একটু বাজার যাও। দুষ্টু ছেলে, এবার বাসন ক’খানা ধুয়ে দাও তো…।’
–‘তারপর?’
–‘সেও আমায় বলতে লাগল… করে দিচ্ছি রিনি। বাজার থেকে ফিরে বলল, ফুলু, তোমার সাইজের একখানা ফুলকপি পেয়েছি গো…। চান করতে যাবার আগে বলে কিনা, পিঠে একটু তেল লাগিয়ে দাও তো নন্দরানি…।’
বললাম, ‘সে তো ভাল, খারাপ কী!’
মধু বউদি ফুঁপিয়ে বলে উঠলেন, ‘আমার কীরকম সন্দেহ হচ্ছিল। দুপুরে ও ঘুমোতেই মোবাইলটা খুলে দেখি নন্দা, ফুলু, রিনি, এই সব ক’টা ওর ফেসবুক ফ্রেন্ড। তাদের সঙ্গে কী বিচ্ছিরি সব চ্যাট…।’
এবার ভেবে দেখুন, সর্বনাশ ও সব্বোনাশ, এদের দু’জনের কার ক্ষেত্রে কোনটা প্রযোজ্য হবে।

এদের ছেড়ে চলুন, ফের মদ্যপ্রেমী বংশীবাবুর কাছে যাওয়া যাক। সর্বনাশ ও সব্বোনাশের একটা ওতপ্রোত সম্পর্ক যে রয়েছে, বংশীবাবু ছাড়া কে আর বোঝাবেন!
বংশী সাহা সদ্য ঘটা করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে মায়ের কাছে মেয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘তোমার জামাইয়ের এমনিতে সব ঠিকই আছে, কেবল সন্ধে হলেই…।’
মা গম্ভীর হলেন। এবং কথাখানা রিলে হল বংশীবাবু পর্যন্ত। শোনা যায়, ব্যাপারটা শুনে বংশী সাহা অনুভূতির আতিশয্যে বলে ফেলেছিলেন, ‘তাই নাকি!’
কিন্তু শুধু শুধু সন্দেহের কারণে কাউকে গুণারোপ করা উচিত নয়।
সন্ধে প্রায় সাড়ে সাতটা নাগাদ বংশীবাবু জামাইকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘কী বাবাজীবন… ওসব খাওয়াটাওয়া হয়?’
জামাই অনেক ভেবেচিন্তে একটা কূটনৈতিক জবাব দিয়ে ফেলল, ‘এটা অনুসন্ধান, না আমন্ত্রণ বাবা…?’
বংশী সাহার আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ল। সর্বনাশ ও সব্বোনাশ এক দেহে হল লীন।

চিত্রকর: রাজ রায়

সুন্দর মুখোপাধ্যায়ের ‘বারোয়ারি নকশা’র আগের পর্বগুলি…

বিজ্ঞাপন লাইভ

সিনিয়র সিটিজেন

প্রেমপত্র

স্বাস্থ্যবিধি

প্রশ্নোত্তরে বিবাহিত জীবন

লুজ ক্যারেক্টার

গামছা

ছাতা

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More