ফোনালাপ

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন। অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে একটি বিভাগ ‘হাসো তো দেখি’। সেখানে আছে হাসির ছবি। এবার এল হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

সুন্দর মুখোপাধ্যায়

আপনাদের আশ্বস্ত করছি, এবার আর তরল বা আপাত সরল কিন্তু ভেতরে কুটিল ও জটিল কোনও গদ্যাংশ আপনাদের সহ্য করতে হবে না। আপনাদের কাছে এবার কেবল তিনটি ফোনালাপ তুলে দিচ্ছি। এর দায়, ফোনের দু’প্রান্তে যে দু’জন ছিলেন, শুধুমাত্র তাদের।
‘পাত্র চাই’ বিজ্ঞাপন সংবাদপত্রে বের হবার পর প্রথম ফোন–
পাত্রপক্ষ: ‘নমস্কার, আমি হাওড়া থেকে বলছি। আপনারা কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছেন…।’
পাত্রীপক্ষ: ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করার জন্য ধন্যবাদ। অ্যাডটা নিশ্চয়ই ভাল করে পড়েছেন?’
পাত্রপক্ষ: হ্যাঁ, মানে… কেন বলুন তো…?’
পাত্রীপক্ষ: ‘আমরা দাবিহীন পাত্র চেয়েছি, দাবিদাওয়া থাকলে কথা এগিয়ে লাভ নেই।’
পাত্রপক্ষ: ‘সে তো নিশ্চয়ই, এ যুগে আবার দাবি কী! তবে… এই শর্ত কি আফটার ম্যারেজও লাগু থাকবে?’
পাত্রীপক্ষ: ‘নিশ্চয়ই।’
পাত্রপক্ষ: ‘এটা নিশ্চয়ই দু’পক্ষের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য?’
পাত্রীপক্ষ: ‘তাই তো হওয়া উচিত।’
পাত্রপক্ষ: ‘যাক, তাহলে নিশ্চিন্ত। বিয়ের পর শাড়ি, গয়না, বেড়াতে যাওয়া– এসব দাবি থেকে আমাদের পাত্র মুক্তি পেয়ে গেল।’
পাত্রীপক্ষ: ‘হুম।’
পাত্রপক্ষ: ‘আচ্ছা, শারীরিক ও মানসিক দাবিও কি এর মধ্যে ইনক্লুডেড?’
পাত্রীপক্ষ: ‘কী বলতে চাইছেন আপনি?’
পাত্রপক্ষ: ‘সেরকম কিছু না… এই ধরুন, যখনতখন বাপের বাড়ি যাবার ইচ্ছে বউমার হতে পারে, সেটা যেমন একটা মানসিক দাবি।’
পাত্রীপক্ষ: ‘ওটা থাকবে।’
পাত্রপক্ষ: ‘যাক, একটু নমনীয় হয়েছেন। আর… শারীরিক দাবি বলতে আপনি যা বুঝছেন, তা তো আছেই, না হলে সংসার করা কেন! তাছাড়াও… ভালমন্দ খেতে চাওয়া, এও তো শরীরের জন্য…।’
পাত্রীপক্ষ: ‘হুম।’
পাত্রপক্ষ: ‘আসলে ম্যাডাম, আমাদের পাত্র একটু খাদ্যরসিক…।’
পাত্রীপক্ষ: ‘ওটা ভাল বাংলা। চালু কথায় বলুন, পেটুক। আমার হাজব্যান্ড, মানে এবাড়ির বড়জামাই ওই চরিত্রের। বাড়িতে অলরেডি একটা পেটুকের অনুপ্রবেশ ঘটে গেছে। আবার…?’
পাত্রপক্ষ: ‘কী বললেন, বুঝলাম না।’
পাত্রীপক্ষ: ‘ও আপনি বুঝবেন না, পেটুক মানুষ ভীষণ স্বার্থপর হয়।’
পাত্রপক্ষ: ‘মানে?’
পাত্রীপক্ষ: ‘মানে, যা বললাম তাই। পেটুকরা কখনও রিকোয়েস্ট করে না, অর্ডার দেয়। সেগুলোও ভীষণ জ্বালা ধরানো… যাকগে, কাজের কথায় আসুন।’
পাত্রপক্ষ: ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, একটু ক্যান্ডিডেটকে দেবেন?’
পাত্রীপক্ষ: ‘ক্যান্ডিডেট!’
পাত্রপক্ষ: ‘ওই হল, পাত্রী…।’
ওপ্রান্তে ফোন বদল হল।
নরম ও সরু গলায় কেউ বলল, ‘নমস্কার। বলুন।’
এপ্রান্তেও কেশেটেশে, গলার স্বর খানিক ভারী করে প্রশ্ন করা হল, ‘তুমি ভাপা ইলিশ করতে পারো নাকি, মা?’
পাত্রী: ‘ভাপা ইলিশ! সে তো খায়, রাঁধে নাকি?’
পাত্রপক্ষ: ‘তার মানে, জানো না। আচ্ছা বেশ, শিখিয়ে নেবখন। এবার বলো তো, ইলিশের মাথা দিয়ে পুঁইশাক?’
ওপ্রান্তে কান থেকে ফোন সরিয়ে মেয়েটি বলল, ‘দিদি, কী সব উল্টোপাল্টা জিজ্ঞেস করছে…।’
এবার দিদি এল ফোনে, কঠিন স্বরে বলল, ‘বলুন।’
পাত্রপক্ষ: ‘দেখুন, দুটো আইটেম জিজ্ঞেস করলাম, একটাও তো জানে না!’
পাত্রীর দিদি: ‘আপনারা কি কেবল রান্নাবান্নাই জিজ্ঞেস করবেন?’
পাত্রপক্ষ: ‘কী করব, রন্ধনেই তো প্রকৃত বন্ধন…।’
পাত্রীর দিদি: ‘রান্না সংক্রান্ত কোনও প্রশ্নের জবাব দেওয়া হবে না।’
পাত্রপক্ষ: ‘তাহলে বাড়িসুদ্ধ লোক খাবে কী?’
পাত্রীপক্ষ: ‘বাড়িসুদ্ধ মানে, কতজন আছে বাড়িতে? বিজ্ঞাপনটা ভাল করে দেখুন, আমরা ছোট ফ্যামিলি চেয়েছি। পে প্যাকেজ ভাল, নির্ঝঞ্ঝাট ফ্যামিলি, দায়দায়িত্বহীন…।’
পাত্রপক্ষ: ‘সে তো বাড়িভাড়া দিলে লোকে চায়। আপনারা ভাড়াটে চাইছেন, না বর?’
ওপ্রান্ত ফোন কেটে দিল।

এই দুই পাত্রপাত্রীর মিলন হয়েছিল কিনা আমার জানা নেই। ধরে নিন হয়েছিল। আজকাল অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে কথাবার্তা ফাইনাল হয়ে গেলে মাস দু-তিনের একটা অ্যাপ্রেনটিশিপ টাইম থাকে। তখন তারা প্রবেশনারি হাজব্যান্ড-ওয়াইফ। সেসময়কার একটি ফোনালাপ–
হবু বর (কারেন্ট প্রেমিক): ‘নতুন যে ছবিটা আপলোড করেছ. দারুণ… ঝক্কাস…।’
হবু বউ (কারেন্ট প্রেমিকা): ‘কোনটা… ওই জিনস পরা?’
প্রেমিক: ‘হ্যাঁ গো…। দেখেই আমার পাগল পাগল অবস্থা। আমায় জিনে ধরল বুঝতে পারছি…।’
প্রেমিকা: ‘আহা ঢঙ! যেদিন দেখতে এলে মুখখানা এমন গম্ভীর রেখেছিলে যেন রসকষহীন।’
প্রেমিক: ‘আমি ভেজা তোয়ালে গো, দূর থেকে বুঝবে না।’
প্রেমিকা: ‘ভেজা তোয়ালে, না বাসি নিমকি?’
প্রেমিক: ‘কী– কী-ই-ই?’
প্রেমিকা: ‘তোমার ওই বুড়োটে মার্কা ডিপিটা সরাও তো। একটা ভাল ছবি দাও।’
প্রেমিক: ‘আসলে ফটোতে আমি ঠিক ফুটি না।’
প্রেমিকা: ‘তা ঠিক, যাই দাও না কেন ওই চকোলেট ভাবটা লুকোতে পারবে না।’
প্রেমিক: ‘আমি চকোলেট!’
প্রেমিকা: ‘হ্যাঁ গো…।’
প্রেমিক: ‘তুমিও তাই। চকোলেট বোম! (প্রেমিকা চুপ) অ্যাই সোনা… তোমার ওই স্কিনটা, গায়ের রঙ আর কী, ওটাই কি জাম রঙ?’
প্রেমিকা: ‘কী-ই-ই, আমাকে তুমি ওই দেখলে… জাম রঙ!’
প্রেমিক: ‘তবে? বেশ চকচক করছিল…।’
প্রেমিকা: ‘জাম রঙ কেন হবে, গম রঙ।’
প্রেমিক: ‘ওঃ, তুমি জাম গম এসব ফলের নাম বলছ! আমি জাম রঙ মানে বলতে চাইছি, যে রঙ দেখলে ট্র‌্যাফিক জ্যাম হয়ে যায়…। (প্রেমিকা আবার চুপ।) অ্যাই সোনামুনু… তোমার হাইট কত গো?’
প্রেমিকা: ‘কেন?’
প্রেমিক: ‘বন্ধুরা জিজ্ঞেস করছিল। বলল…।’
প্রেমিকা: ‘তোমার কত?’
প্রেমিক: ‘আমার… বিজ্ঞাপনে দেওয়া ছিল পাঁচ আট, আসলে পাঁচ চার।’
প্রেমিকা: ‘স্যালারিতেও আসল-নকল নেই তো?’
প্রেমিক: ‘না গো না। মাইরি বলছি, ওটা সত্যি। তাছাড়া… বললে বিশ্বাস করবে না, এমন গভীর প্রেমে পড়েছি, তোমার সামনে এলেই ভরভর করে সব সত্যি বলে ফেলছি…।’
প্রেমিকা: ‘বুঝেছি। তুমি আগে প্রেম করোনি। আনইউজড।’
প্রেমিক: ‘একদম সত্যি। এই প্রথম কোনও মেয়ের পাল্লায় পড়লাম।’
প্রেমিকা: ‘কী– কী-ই-ই? পাল্লায়, তুমি আমার পাল্লায় পড়েছ?’
প্রেমিক: ‘না, না… পাল্লায়… মানে পাল্লায়… মানে দাঁড়িপাল্লায় গো। একদিকে তুমি, অন্যদিকে ফুল প্রেম নিয়ে আমি…।’
প্রেমিকা ফোন কেটে দিল। এরপর ‘সরি’, ‘দুঃখিত’, ‘ওটা স্লিপ অব টাং’– এরকম টোটাল একত্রিশটা মেসেজ গেছিল।
যথাসময়ে এই দুই প্রেমিক-প্রেমিকা বা পাত্রপাত্রীর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। তারা এখন সুখী দম্পতি, তাদের বিয়ের পাঁচবছর অতিক্রান্ত।
এবার ওই দম্পতির ফোনালাপ। না ঠিক ফোনালাপ নয়, কেবল ফোন বলা যায়–
গিন্নি রিং করল কর্তাকে। ফোন বেজে গেল। বেজেই গেল।
কর্তা রিং করল গিন্নিকে। ফোন বেজে গেল। বেজেই গেল।

চিত্রকর: রাজ রায়

পড়ুন, আগের পর্বগুলি…

বিজ্ঞাপন লাইভ

সিনিয়র সিটিজেন

প্রেমপত্র

স্বাস্থ্যবিধি

প্রশ্নোত্তরে বিবাহিত জীবন

লুজ ক্যারেক্টার

গামছা

ছাতা

সব্বোনাশ

মৌতাত

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More