লুজ ক্যারেক্টার

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন।অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে একটি বিভাগ ‘হাসো তো দেখি’। সেখানে আছে হাসির ছবি। এবার এল হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

সুন্দর মুখোপাধ্যায়

বিষয়টা এমন গুরুতর যে, এ নিয়ে লিখতে যাওয়া যে সে কম্মো নয়। যারা প্রতিষ্ঠিত লুজ ক্যারেক্টার তাদের কথা বাদই দিন, যেগুলো উঠতি, তারাও হাফ দার্শনিক। আপনি কিছু বলার আগেই তারা সেটি লুফে নেয়। অনেক ভেবেচিন্তে দেখেছি, লুজ ক্যারেক্টার কোনও মানুষ না, এটা একটা ইজম। বা এখনকার চালু কথায়, ভাইরাস। এবং ভীষণ ছোঁয়াচে। তাই কোনও গপ্পো লিখতে বসলে অর্ধেক শুনেই বহু মানুষ বলে উঠবেন, ‘বাকিটা জানি।’ তবে আমার বন্ধুবান্ধব, হিতৈষীজন, এমনকি বউও বলল, ‘এ আর এমনকি ভারী সাবজেক্ট, নিজের আত্মজীবনী লিখে ফেলো…।’
তাই অগ্রসর হইলাম। সে পুরাকালের কথা। কোএড স্কুলে তখন ক্লাস এইট কী নাইন। সহপাঠিনীকে প্রপোজ করার অপরাধে বিল্টুকে হেডস্যার ডেকে পাঠালেন। প্রাথমিক ধমকের পর বাজখাঁই গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর বাবার নাম কী, ঠিকানা বল…।’
প্রাণের তাগিদে বিল্টু বলে বসল, ‘স্যার, শুধু শুধু বাবার নাম নিয়ে কী করবেন, বাবা তো আর লাইন মারেনি…।’
এরপর একটা বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় এবং সারাদিন টিচার্স রুমে নিলডাউন।
এ গপ্পো করেছিলাম এক জামাইষষ্ঠীর সন্ধেতে নেহাতই একটা কমিক রিলিফ দেওয়ার জন্য। বউ হেসে উঠল, শ্যালিকা বলল, ‘এ বোধহয় আপনার নিজের গল্প। বিল্টুর নামে চালাচ্ছেন…।’
আমি অনেক ভেবে জবাব দিয়েছিলাম, ‘ঠিক মনে পড়ছে না গো…।’

গল্প যারই হোক, তা এখানেই শেষ নয়। টিচার্স রুমে দু’চার পিরিয়ড নিলডাউন থাকার পর হঠাৎ দেখা গেল ঘরটা প্রায় ফাঁকা। এককোণে চেয়ারে বসে আছেন সদ্য জয়েন করা অসম্ভব সুন্দরী বাংলার টিচার ছন্দা মিস। এবং অত বড় রুমটাতেও দূরে না বসে একেবারে পাশের চেয়ারে বিকাশ স্যার। ছন্দা মিস গুনগুন করে একটা গান গাইলেন, বিকাশ স্যার মাথা দোলাচ্ছিলেন। গান শেষ করে ছন্দা মিস বললেন, ‘টিফিন করবে তো?’
বিকাশ স্যার ফের মাথা দোলালেন। ছন্দা মিস ব্যাগ থেকে বের করলেন টিফিন বাক্স। বিশেষ কিছু নেই– রুটি আলুভাজা। রুটি ছিঁড়ে আলুভাজা দিয়ে রোল হল। টিচার্স রুমের পর্দা টানা। ভেতরে এক উচ্চিংড়ে কিশোর ও দুই শিক্ষক।
ছন্দা মিস রুটি তুলে দিলেন বিকাশ স্যারের মুখে। তিনি চিবোতে লাগলেন। কিশোরটি হাঁ। পরের টুকরোটা রোল হল, ফের ছন্দা মিস হাত উঁচু করে খাওয়াতে যাবেন, বিকাশ স্যার বলে উঠলেন, ‘উঁহু, ওইটে খাব…।’
ছন্দা মিস হেসে রুটির টুকরো একবার আলতো করে নিজের ঠোঁটে ঠেকিয়ে বিকাশ স্যারকে খাইয়ে দিলেন। পরের বার আবার ‘ওইটে খাব…’, ছন্দা মিস রুটি সমেত হাতখানা বুকে ছুঁইয়ে খাইয়ে দিলেন।
কিশোরটি আর থাকতে পারে! উঠে দাঁড়িয়ে বলে বসল, ‘খিদে পেয়েছে, আমিও ওইটে খাব…।’
ক্লাসরুমে নয়, স্কুলের বারান্দায় নয়, টিচার্স রুমে কেন সারাদিন ব্যাপী নিলডাউন এতক্ষণে নিশ্চয়ই ক্লিয়ার হয়েছে। হেডস্যার এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঢিল যে এত ঢিলে তিনি জানবেন কী করে!

এখন যেমন মাস্ক পরতে বলা হচ্ছে, সে সময় এই ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য মেয়েরা স্কুল বা টিউশন গেলে সঙ্গে যেত জ্যান্ত ঝি। বিল্টু তখন নন্দাকে লাইন মারে। নন্দা চলেছে টিউশন, পিছন পিছন বুড়ি ঝি। মাঝরাস্তায় পানগুমটির আড়াল থেকে বেরিয়ে এল বিল্টু। বুড়ি ঝি তাকে দেখেই একগাল হেসে বলল, ‘যাক, তুমি এসেছ। বাকি রাস্তাটা নিয়ে যাও তো বাবু, আমি একটু জিরোই…।’
প্রেম করাটাকে ক্যারেক্টার লুজের লক্ষণ ধরা যায় না। তবে বছর তিরিশ আগে তাদের ‘এফেক্টেড’ তালিকায় রাখা হত।
একসঙ্গে একাধিক প্রেম অবশ্যই লুজ ক্যারেক্টারের সিম্পটম। কিন্তু সামাজিক কারণে ওটুকু মাঝেমাঝে করতেই হয়।
এক প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনার স্কুলের টোটাল ছাত্র কত?’
তিনি জবাব দিলেন, ‘চারশোর কাছাকাছি।’
‘ওইটুকু স্কুলে এত!’
হেডমাস্টার বললেন, ‘না না, সবাই বেঞ্চে বসে না। দু’শো ছাত্র। তবে… তার সঙ্গে দু’শো মা অ্যাড করুন।’
‘মানে?’
তিনি বললেন, ‘এখন পড়ানোর কায়দাকানুন বদলে গেছে তো। ছাত্রদের পড়াই, মায়েদের পড়া বোঝাই। ওই… একান্তে বোঝাতে গিয়ে তারাও কিছু বোঝে, আমিও একটু-আধটু…, বুঝতেই পারছেন।’

লুজ ক্যারেক্টারদের মোটেই সাপোর্ট করছি না। কিন্তু তারা অত্যন্ত নরম মনের মানুষ হন। মুখে মৃদু হাসি এবং কখনও রাগেন না। এসব আমি রাধাবিনোদবাবুকে দেখে শিখেছিলাম। তিনি গানের মাস্টার। টিউশনে ভক্তিগীতি গেয়ে, এত নরম মনের মানুষ যে, নিজেই কেঁদে ফেললেন। ঝরঝর করে চোখের জল পড়ছে তো পড়ছেই। তিনি নিজের রুমালখানা বের করে ছাত্রীকে বললেন, ‘মুছিয়ে দে, মুছিয়ে দে, নয়তো থামবে না…।’ চোখের জল তো দূর থেকে মোছানো যায় না, ছাত্রীকে ঘনিষ্ঠ হতে হয়।
উল্টোটাও হয়েছে। ছাত্রীর চোখের জল মুছতে তিনি উদ্যোগী হয়েছেন। ছাত্রী গান থামিয়ে বললে, ‘কই আমি তো কাঁদিনি!’
তিনি থমকে গিয়ে কেবল অস্ফুটে বলতে পারলেন, ‘চোখে জল, হৃদয় দুর্বল, না হলে কিছুই হয় না রে…।’ তারপর প্রায় পৌঁছে যাওয়া হাত ফিরিয়ে আনবার আগে গাল টিপে হালকা শাসন।
এই রাধাবাবুর একবার দাঁতের ব্যথা উঠল। আশপাশের ডাক্তারদের ছেড়ে তিনি গেলেন বহুদূরের এক মহিলা ডেন্টিস্টের কাছে। মহিলা ডাক্তার রাধাবাবুকে চেয়ারে বসিয়ে মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন দাঁতটা?’
রাধাবাবু যন্ত্রণাক্লিষ্ট স্বরে বললেন, ‘আর একটু কাছে আসুন…।’
মহিলা আর একটু ঝুঁকলেন। সাদা অ্যাপ্রন বেশ খানিকটা ঝুলে পড়ল। তার ফাঁক দিয়ে আরও সাদা…, না থাক!
রাধাবাবু বলে উঠলেন, আঃ কী আরাম।’
ডাক্তার বললেন, ‘সে কী! আমি তো কিছুই করিনি। কোন দাঁতটা দেখতেও পাইনি।’
রাধাবাবু বললেন, ‘আপনি না পান… আমি তো দেখছি…।’

আমাদের পাড়ার রমণীরঞ্জনবাবু অত্যন্ত সম্পন্ন মানুষ। ওই লুজ নামখানা ছাড়া তার সব কিছুই খুব নিপাট এবং ছাপোষা। তিনি ঢিলেঢালা লুজ পোশাক পড়েন। মুদির দোকানে কখনও ব্র‌্যান্ডেড প্যাকেট কেনেন না। লুজ চাল, লুজ ডাল ও লুজ তেল কিনেই জীবন অতিবাহিত করে চলেছেন।
অথচ দেখুন, পয়সা নয়, হৃদয় দিয়ে একটু লুজ ভালবাসা চাইলে চারপাশের অসংখ্য মহিলা কী রকম সন্দেহের চোখে তাকান।

আরও বারোয়ারি নকশা…

বিজ্ঞাপন লাইভ

সিনিয়র সিটিজেন

প্রেমপত্র

স্বাস্থ্যবিধি

প্রশ্নোত্তরে বিবাহিত জীবন

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More