আঁতেলনামা

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন। অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

জিন্‌সের সঙ্গে পাঞ্জাবি। এক হাতে সিগারেট, অন্য হাতে লাল চা। চৈত্রের এক বিকেলে চা-ড্ডায় মজে উঠতে দেখা গেল বেশ কিছু তরুণ বোদ্ধাকে। বিষয় অতি গম্ভীর— ‘বাঙালিয়ানার পুনরুজ্জীবন’।
চা-সিগারেটের কম্বো। সঙ্গে চৈত্রের বেগুনপোড়া গরম। বাঙালিয়ানা টগবগিয়ে ফুটে উঠতে বিশেষ দেরি হল না। দাদাঠাকুর থেকে রবিঠাকুর, সত্যজিৎ থেকে সৃজিত— আলোচনার সিঁড়িতে সেকাল-একালের গলাগলি হল বেশ কিছুক্ষণ। সেরা বাঙালিদের নামে বেশ কিছু ‘জিইইইইও’ ধ্বনি দেওয়া হল। পাশাপাশি ‘বাংলাটা ঠিক আসে না’ বলা বেয়াদবদের উদ্দেশে প্রাণ খুলে গালাগালি। উপসংহার পর্বে উঠে এল সিদ্ধান্ত। কী সেটা? তা হল— পয়লা বৈশাখের দিনে বাঙালিয়ানার নবজাগরণ হবে এক মহাভোজের হাত ধরে। উর্বর মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে এল ষোল আনা খাঁটি বাঙালি মেনু— পান্তা ভাত আর শুঁটকির কারি।
না, কোনও আষাঢে গপ্পো নয়। এই শহরের প্রাণকেন্দ্রের এক সাংস্কৃতিক আড্ডার গপ্পো। ‘চল ভাই বাঙালী সাজি’ বলে জল খাওয়া গরম তেলের মতো চিড়বিড়িয়ে ওঠা এই বাঙালি ‘জোশ’ নতুন কিছু নয়। এই তুফানি আড্ডা, সংস্কৃতির ব্যবচ্ছেদ, তুড়ি মেরে বিরোধী মুণ্ডপাতের এই আখ্যান— এ আমাদের একান্ত আপন ট্র্যাডিশন। কিন্তু তাই বলে শুঁটকি-প্রেমে বাঙালিয়ানা? হান্ড্রেড পারসেন্ট ছাপিয়ে আরও ফিফটি পারসেন্ট চেপে গেল না কি? ভাল করে ভেবে দেখুন, এই শুঁটকি এপিসোডে শুঁটকিকে ছাপিয়েও একটা ফাউ গন্ধ কিন্তু নাকে এল। সবিনয়ে বলি, এ হল আঁতলামির গন্ধ।
আসলে এই ফাউ ফিফটি পারসেন্টটা কিন্তু দরকার। না হলে জমে না আঁতলামির আখ্যান। সত্যজিৎ রায়কে ‘মানিকদা’, অপর্ণা সেনকে ‘রীনাদি’ বা তরুণকুমারকে ‘বুড়োদা’ না ডাকলে বাঙালির আঁতলামি প্রাণ পায় না। জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ যে আসলে সুচিত্রা সেন, সে কথা আঁতেল ছাড়া আর কার মুখেই বা পাবেন।

বঙ্গদেশের আঁতেল কে বং-আঁতেল বলাই যায়। তবে আঁতেল শব্দটা কতটা বাঙালি তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন আছে। শব্দের বুৎপত্তিতে রয়েছে ফরাসি ছোঁয়া। ইংরেজিতে যা ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ তা ফরাসিতে ‘তেঁলেকচুয়াল’। সেই থেকেই আঁতেল। পবিত্র সরকার মহাশয় বলেছেন, চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে নিত্য কফি হাউসমুখো একদল অতিবোদ্ধাকে বাঙালি আঁতেল বলত।
তবে সনাতন আঁতেলকে দেশকালের গণ্ডিতে বেঁধে ফেলা হয়তো ঠিক নয়। সব দেশে, সব কালেই তাঁরা ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।
মহাভারতের যুগেও যে দু-চারজন আঁতেল পাওয়া যেত তা স্বীকার করেছেন নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী মহাশয়। তাঁর মতে কর্ণ ছিলেন এক মহা আঁতেল। দুর্যোধনকে সবসময় ‘আমি আছি তো’ বলে হাজারো আশ্বাস দিয়েছিলেন এই ভদ্রলোক। কাজের বেলায় কাঁচকলা। কলিতে ‘ম্যায় হুঁ না’ আঁতেলের সংখ্যাটা ঢের বেড়েছে। সমালোচকদের মতে, দিদির অতি প্রশ্রয় পাওয়া শ্যালক, উচ্চপদে আসীন বাড়ির বড়জামাই, থিম বিশেষজ্ঞ পাড়ার ক্লাব-সেক্রেটারি, চামচার এক লেভেল উঁচুতে থাকা নেতার মধ্যে ‘ম্যায় হু না’ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা কিন্তু খুব বেশি।
মহা আঁতেল কোনটা যে ঠিক বোঝেন না সেটা বোঝাই একটা মিলিয়ন ডলার ইস্যু। তিনি ডোভার লেনের সঙ্গীতের আসরে মাথা নাড়েন, ব্ল্যাক কফিতে চুমু দিতে দিতে বেটোভেন বা বাখ আস্বাদন করেন, ক্রিকেট মাঠে সজাগ থাকেন ফোর্থ আম্পায়ারের মতো। যা থার্ড আম্পায়ারের চোখে পড়ে না তা ইনি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে টের পান।
‘Jack of all trades’-এর জ্যাকদের মধ্যে আঁতেলের গন্ধ আছে। চেষ্টা করলে পাড়ার ক্লাবে, রকের আড্ডায় ‘চারটে চা সাতটা’ বা বলা যায় ‘ডবল হাফ’ করে খাওয়া নবীনদের ভিড়ে এদের খুঁজে পেতে পারেন। এঁরা কান মলে দিয়ে মেসিকে ফ্রি-কিক বা বিরাটকে স্কোয়্যার-কাট শেখাতে পারেন। এঁরাই সেই মানুষ যারা লোকসভায় মমতার ভোট-বিপর্যয়ের গন্ধ আগেভাগে পেয়েছিলেন। চন্দ্রযান হঠাৎ কেন ব্রেক কষল তা এঁরা সাইকেলের ব্রেক কষে অনায়াসে বুঝিয়ে দিতে পারেন।
আসল কবিদের ভিড়ে ‘আঁতেল কবি’ মিশে আছেন। চেনা খুব একটা দুঃসাধ্য কাজ নয়। সেকেলে আঁতেল কবির ঘরানা ছিল আলাদা। তাঁরা ঝোড়ো বাতাসকে হয়তো বলে বসতেন, ‘আঃ সমীরণ, কেন বিরক্ত করো!’ একেলে আঁতেলরা স্বতন্ত্র। কল্লোলিনীর প্রাণকেন্দ্রে অলস বিকেলে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ কাঁধে এঁদের দেখা পাবেন। চোখে বিশেষ এক বৈদগ্ধ! বাক্যে বেকেটীয় অ্যাবসার্ডিটি, লেখনীতে অসার বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিংড়ে আনা নির্যাস। হাবভাবে বৈদান্তিকতা। সনেট-লিরিকের যুগ পার হয়ে এঁদের হাত ধরে কবিতায় এখন হিড়িকের যুগ। অণু রূপ ছেড়ে কবিতা জননী তাই ‘পরমাণু রূপেন সংস্থিতা’।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘ঘনাদা’ কিন্তু আঁতেল ঘরানার নন। এঁরা ‘টল-টেলস’-এর সুপারম্যান। এঁদের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারিক বক্তব্যে একটা ‘willing suspension of disbelief’ তৈরি হয়। তৈরি হয় মুচমুচে ভালোলাগা। আঁতেলের কথায় সেই অন্তরঙ্গতা কই? আঁতেল তার স্বভাবগুণে আমজনতা থেকে বিদগ্ধ সকলকেই ঈষৎ উষ্ণ করে তোলেন।
ভট্টোজির লেখায় পড়ছিলাম এক মজার কাহিনি। সেখানে দুই আঁতেলের আলোচনার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন এই বাংলার এক মনীষী। আলোচনার বিষয় ছিল ‘ব্রহ্মজ্ঞান’। দু’জনেই দাপুটে বক্তা। শীতের সন্ধে নেমেছে সবে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। তাদের ব্রহ্মজ্ঞানের ব্যাখায় কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘেমেনেয়ে উঠলেন সেই মনীষী। দু’জনকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এতক্ষণ যা শুনলাম তাতে আমি তৃপ্ত, মহাতৃপ্ত। আর তাই তোমাদের পুরস্কার দেব। জ্ঞানের বিচারে তোমরা দু’জনেই সমতুল্য। আকাশে ভেসে থাকা পূর্ণচন্দ্রটিই তোমাদের উপযুক্ত পুরস্কার বলে আমি মনে করি। কিন্তু যেহেতু তোমরা দু’জন, আর চাঁদ একটি— তাই তোমাদের আমি অর্ধচন্দ্র দিতে চাই।’ এই বলে সেই মনীষী গলাধাক্কা দিলেন তাদের। এই মনীষী আর কেউ নন— বিদ্যাসাগর।
ভেবে দেখুন, মহান আঁতেলদের আলোচনা শুনতে শুনতে মাঝেমধ্যে এমন একটু-আধটু ইচ্ছে আমাদেরও হয় বইকী!

চিত্রকর: রাজ রায়

পড়ুন, আগের পর্ব…
দূরবীনে চোখ

‘বারোয়ারি নকশা’য় সুন্দর মুখোপাধ্যায়ের ১২টি পর্ব পাবেন নীচের লিঙ্কে।

নিখিল ভারত… সমিতি

‘বারোয়ারি নকশা’য় জয়দীপ চক্রবর্তীর ১২টি পর্ব পাবেন নীচের লিঙ্কে।

গৃহবন্দির জবানবন্দি ১২

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More