লকডাউনে প্রশিক্ষণ

বাইরে ‘সুখ’। বাইরেই অসুখ। করোনা এফেক্ট। বাধ্যতামূলক ঘরে অন্তরিন। অমান্য মানে বিপদকে নেমন্তন্ন করে আনা। তাই সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ঘরে সেই স্বস্তি। ঘরেই অস্বস্তি। তবে উপায়? চিন্তাকে চিন্তামণির ওপর ছেড়ে মন হালকা রাখাই সবচেয়ে ভাল উপায়। এই ‘জরুরি অবস্থা’র দিনে আপনাদের জন্যেই ‘দ্য ওয়াল’ এনেছে হাসির লেখা ‘বারোয়ারি নকশা’। পড়ুন, মন ভাল রাখুন।

তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

ফোন ছাড়া এখন আর গতি নেই। ‘সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং’-এর বাজারে যোগাযোগ যা কিছু সবই এই ফোনে। সকাল সকাল ধরেছিলাম এক শিক্ষক বন্ধুকে। গলার স্বরে বুঝলাম বেশ ব্যস্ত। ছোট্ট কথায় শেষ হল ফোনালাপ। বলল, “দাদা এখন ট্রেনিংয়ে আছি। দুপুরে আছে অনলাইন ক্লাস। রাতে কথা হবে।”
খটকা লাগল। অনলাইন ক্লাস না হয় বুঝলাম। এই লকডাউনে আবার ট্রেনিং কীসের? ভোটের ঝামেলা এখন নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তো সেই কবে থেকেই তালা। তাও ডাক্তারদের কলেজের স্যার হলে কথা ছিল, করোনা ট্রেনিংয়ে টান পড়তেই পারে। স্কুলমাস্টার ধরে টানবে কেন?
রাত্রে শিবুর ফোন আসতে তাই ট্রেনিংয়ের কথাটাই প্রথমে পাড়লাম। “কী ট্রেনিংয়ে আছিস রে ভাই?”
শিবু বলল, “মিলিটারি ট্রেনিং দাদা, তবে চুল ছাঁটতে হয়নি।”
একটু থমকে আছি দেখে সে হাসতে হাসতে বলল, “মিলিটারি অফিসার আর কেউ নয়, সহধর্মিণী। লকডাউনে কাজের মাসি নেই, তাই ডোমেস্টিক ট্রেনিং চলছে।”
আমি হাসিতে যোগ দিতে সে বলল, “বেশ জমে উঠেছে ট্রেনিং পর্ব। ট্রেনার একেবারে হাতে ধরে শেখাচ্ছে।”
‘হাতে ধরে শেখানো’-র একটা আলাদা ইজ্জত। কার-ড্রাইভিংয়ের ট্রেনাররা এ কথা খুব বলেন, “চিন্তা করবেন না দাদা, একেবারে হতে ধরে শেখাব।” হাতে ধরে পিক-পকেটিং শেখানো হয়। বাসে-ট্রেনে শিক্ষানবিশ চোর গুরুর অভিভাবকত্বে পকেট কাটে। ধরা পড়লে গুরুরা পাবলিক সেজে চড়-কিল-ঘুঁষি দিতে দিতে বাঁচিয়ে দেয় শিষ্যকে। তবে গিন্নিকে গুরু হিসেবে পাওয়া এক বড়সড় ব্যাপার। গিন্নি হাতে ধরে কেমন শেখাচ্ছে জানতে ইচ্ছে হল।
“তা কী কী শিখলি বল?” প্রশ্ন ছুড়তেই সে বলল, “তার আগে বলো, ঝাঁটা দেওয়া আর ন্যাতা দেওয়ার আসল তফাতটা কোথায়?”
আমতা আমতা করছি। থিওরিটিক্যালি জানি। একটায় স্ট্যান্ডিং মোড অন্যটায় স্টুপিং। স্বচ্ছ ভারত অভিযানে সেই যখন সেলিব্রিটিরা রোজ ঝাঁটা ধরছিলেন তখন আমিও ধরেছি। তবে পার্থক্যটা সেভাবে গুছিয়ে মাথায় এল না।
বিশু বলল, “পারলে না তো? তবে শোনো, ঝাঁটা দেওয়া হল বীরের কাজ, আর ন্যাতা কাপুরুষের।”
ঝাঁটার সঙ্গে বীরত্ব? পরিষ্কার হল না। হ্যারি পটার ঝাঁটায় চেপে বীরত্ব দেখায় জানি। কিন্তু আলেকজান্ডার দি গ্রেট, নেপোলিয়নের সঙ্গে ঝাঁটার কি আদৌ যোগাযোগ কিছু ছিল? ইতিহাসের জ্ঞান আমার অবশ্য খুব বেশি নেই।
শিবু বলল, “মানেটা হল গিয়ে, ঝাঁটা দিতে দিতে এগিয়ে যেতে হয়। আর ন্যাতায় হল পিছিয়ে আসার গল্প।”
হাসতে হাসতে বললুম, “তা তোর ভাগে কোনটা পড়েছে?”
“আমি দাদা বীরের ভূমিকায় আর বউ এখন কাপুরুষ, থুড়ি, কানারী।”
কানারী কানে বাজল। আনাড়ি, ধুনুরি, ফুলুরি ছিল, শব্দভাণ্ডারে ‘কানারী’ কানে আসেনি।
বললুম “রান্নাবান্না কিছু শিখলি?”
শিবু বলল, “রান্নায় ডাল আর আলুভাজার ওপারে যেতে পারিনি। গিন্নিই এখন প্রধান হালুইকর, আমি যোগাড়ে। তবে চপার-এক্সপার্ট হয়েছি। চপিং বোর্ডে পটাপট লাশ ফেলছি। লেডিস ফিঙ্গার কুচকুচ নামাচ্ছি, তবে নিজের ফিঙ্গার বাঁচিয়ে। প্রথম দিনেই অবশ্য পিলিং-যন্ত্রণা সইতে হয়েছে। বঁটি ভালোমানুষি করেনি, অচেনা হাত দেখে বুড়ো আঙুল চেঁছে নিয়েছে। তবে হাল ছাড়িনি দাদা। এখন আঙুল সামলাচ্ছি বটে তবে আলু-পটলের চামড়ার সঙ্গে শাঁসও বেরিয়ে যাচ্ছে বেশ কিছুটা করে।”
“তাহলে তো সমস্যা। ট্রেনারের বকুনি খেতে হচ্ছে নিশ্চয়ই।”
বিশু বলল, “না দাদা, বউ বলেছে ভুল করতে ভয় পেয়ো না, ভুল করেই তো শিখবে। তবে শাস্তির ব্যবস্থা আছে। বাড়িতে এখন রোজকার সাইড ডিশ হল খোসা-চচ্চড়ি। বউ বলেছে যতদিন না শিখবে এ জিনিস চলবে।
“ভাল মনে খাচ্ছিস তো, না কি?”
শিবু বলল, “হিসেব করে দেখলুম, শিখতে গিয়ে কিলো পিছু আড়াইশো আলু বাদ যাচ্ছে। মানে ধরো টাকা সাতেক করে লস। সেই লস উসুল হচ্ছে ভেবে খাই, খারাপ লাগে না।”
একটু দম নিয়ে বিশু বলল, “একদিন তো লঙ্কাকাণ্ড হল। লঙ্কা কুচি করা হাতে চোখ কচলে ফেলেছিলাম। গিন্নি ফুঁ দিয়ে সারিয়েছে।”
বিশুর ট্রেনার ভাগ্য বেশ ভাল। খোসা চচ্চড়ির শাস্তি আছে, লঙ্কাকাণ্ডে ফুঁ-ও আছে। ‘গিন্নিং শরণং গচ্ছামি’ করে যে বেশ রসেবশে আছে তা বলাই যায়। কিন্তু আমার পাশের ফ্ল্যাটের দাদাটির সম্পর্কে সে কথা বলতে পারি না।

সকাল-সন্ধে পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলার গলার আওয়াজে টের পাই সেখানেও ট্রেনিং চলছে। তবে খুঁতখুঁতে ট্রেনার। শুনতে পাই, “তুমি বিছানা গুছোলে এই হয়, বালিশগুলো দ্যাখো, একটুও ফুলো ফুলো ভাব আছে? চাদরের হাল দ্যাখো। কক্ষনও টান টান হয় না। চাদরের ডিজাইন যেন সব বেঁকেচুরে আছে। আসলে কাজে মন না থাকলে যা হয় আর কি।” মাঝে মাঝে গৃহকর্তার গলা পাই, “ধুত্তেরিকা।”
গুরুর গাফিলতি নাকি শিষ্যের অমনোযোগ— বোঝা দায়।
তবে লকডাউনে ভাল গুরু অনেকেই খুঁজছেন। উপায় না দেখে ভরসা রাখছেন ইউ টিউব-এ। যদিও সেখানেও ‘হাতে ধরে শেখানো’ বোধহয় সেভাবে হচ্ছে না।
আক্ষেপের সুর শুনলাম মণিদার ফোনে। বললেন, “জানিস, এই প্রথম কেক না কেটে জন্মদিন কাটল।”
আমি বললুম, “কেন, বাড়িতে বানালেই তো পারতেন।”
মণিদা বললেন, “সে চেষ্টা হয়েছিল ব্রাদার। ইউ টিউব ঘেঁটে তোমার বউদি প্রাণপণ লড়েছিলেন। কিন্তু যে জিনিস পেলাম সে তো এক অজাতশ্ত্রু। ছুরি হেরে গেল ভাই। মার্ডার হল না। মিনিট দশেক কেক নিয়ে লড়ে ঘেমেনেয়ে শেষমেশ হাল ছেড়ে দিলাম। কেকের দিকে তাকিয়ে গীতার শ্লোক মনে পড়ল— নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রানি, নৈনং দহতি পাবক…।”
কী বলব ভেবে পাচ্ছি না। মণিদা আবার শুরু করলেন, “বার্থডে তো একরকম গেল। এদিকে বউমা আবার অনলাইন হেয়ার ট্রিমিং ট্রেনিং শেষ করেছে সেদিন। এখন প্র্যাকটিস করবে বলে মাথা খুঁজছে। আর আমার মাথাটাই তার বেশ মনে ধরেছে। মাস দুই সেলুনে না গিয়ে মাথায় হয়েওছে বেশ ঝোপঝাড়। রোজই প্রায় আবদার করছে, বাবা, আপনার চুলটাকে একটু ট্রিম করে দেব। সত্যি বলছি ভাই, অনলাইন ট্রেনিং করেছে তো, তাই আমি যেন ভরসা পাচ্ছি না। রবিঠাকুরের সেই কবিতার লাইন— ‘বেণীর সঙ্গে মাথা’ বারবার মনে পড়ছে। বাঁচার একটা উপায় বলে দে না ভাই।”

চিত্রকর: রাজ রায়

পড়ুন আগের পর্বগুলি…

দূরবীনে চোখ

আঁতেলনামা

লকডাউনে কল্লোলিনী

কান্না-হাসির কথা

‘বারোয়ারি নকশা’য় সুন্দর মুখোপাধ্যায়ের ১২টি পর্ব পাবেন নীচের লিঙ্কে।

নিখিল ভারত… সমিতি

‘বারোয়ারি নকশা’য় জয়দীপ চক্রবর্তীর ১২টি পর্ব পাবেন নীচের লিঙ্কে।

গৃহবন্দির জবানবন্দি ১২

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More