ফরচুন তেলের বিজ্ঞাপন করে সৌরভ কি ভুল করেছেন

অংশুমান কর

সেলেব্রিটিদের মহা বিপদ। বিতর্ক তাঁদের পিছু ছাড়ে না। মৃত্যুর পরেও না। অসুস্থ হলেও না। যেমন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। অসুস্থ হয়ে পড়ার পরে যখন সারা পৃথিবী জুড়েই অগণন মানুষ তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করছেন, তখন কেউ কেউ এই প্রশ্নকে সামনে এনে ফেলেছেন যে, তাঁর কি আদৌ এতদিন ফরচুন তেলের বিজ্ঞাপন করা উচিত হয়েছে? সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিউতি এই প্রশ্ন উঠছিল, কিন্তু আগুনে ঘি পড়েছে প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং বর্তমান কংগ্রেস সাংসদ কীর্তি আজাদের করা একটি টুইটে। কীর্তি সৌরভকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, কিন্তু সেই শুভেচ্ছা নিষ্কণ্টক নয়। সৌরভ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন এই বার্তা দিয়েও তিনি দাদাকে ‘টেস্টেড’ এবং ‘ট্রায়েড’ পণ্যের বিজ্ঞাপন করতেই উপদেশ দিয়েছেন। বোঝাই যায় যে, এই খোঁচাটির মধ্যে রাজনীতি আছে। কেননা কীর্তি তো আর জনসাধারণের একজন নন। তিনি হলেন কংগ্রেস সাংসদ। তিনি জানেন যে, ফরচুন ভোজ্য তেলের মালিক হলেন গৌতম আদানি, যিনি বিজেপির ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত এবং করোনার ক্রান্তিকালেও যাঁর ব্যবসায় মন্দা তো নামেইনি, বরং দৃষ্টিকটুভাবে তা আরও ফুলেফেঁপে উঠেছে বলেই খবর। সৌরভের অসুস্থতাকে স্পষ্টতই রুচিহীনভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছেন কীর্তি। তাঁকে সেজন্য এই টুইটটির পরে পড়তে হয়েছে সৌরভের ফ্যানদের আক্রমণের মুখেও। কিন্তু প্রশ্ন জাগে যে, সাধারণ যে-সমস্ত মানুষেরা মনে করছেন যে, সৌরভের ফরচুন তেলের বিজ্ঞাপনটি করা উচিত হয়নি, তাঁরা কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকেই এমনটা বলছেন? মনে হয় না। তাঁদের এই প্রশ্ন বরং সেলেব্রিটিরদের সমাজ কীভাবে দেখে সেই  বিষয়ে একটি ধারণা দেয়।

ফরচুন ভোজ্য তেলের বিজ্ঞাপনে সৌরভকে এই বার্তা প্রচার করতে দেখা যায় যে, রান্নায় এই তেলটি ব্যবহার করলে হৃদযন্ত্রটি চল্লিশের পরেও ভাল থাকে। প্রশ্ন উঠেছে যে, তাই যদি হবে তাহলে সৌরভের হার্ট অ্যাটাক হল কেন? যাঁরা এই প্রশ্ন করছেন তাঁরা দু’টি জিনিস ভুলে যাচ্ছেন। এক, ডাক্তারদের অনেকেই ইতিমধ্যেই বলেছেন যে, সৌরভের পারিবারিক ইতিহাস তাঁর হার্ট অ্যাটাকের একটা বড় কারণ হতেই পারে। তাঁর খেলোয়াড় জীবনে এবং তার পরেও তাঁকে বিপুল মানসিক চাপ নিতে হয়েছে। আর কে না জানে, পারিবারিক ইতিহাস আর মানসিক চাপ হার্ট অ্যাটাকের জন্য একেবারে রাজযোটক! সাধারণ কোনও এক ভোজ্য তেলের সাধ্য কী লৌহবাসরে সেই কালনাগিনির প্রবেশ রোধ করে! দুই, সৌরভ একটি পণ্যের বিজ্ঞাপন করছেন মানেই যে, তিনি ওই পণ্যটি নিজের জীবনেও ব্যবহার করছেন তার নিশ্চয়তা কোথায়? এটা আসলে বিজ্ঞাপনের মায়া। বিজ্ঞাপনে আমজনতা যা-দেখে তাকেই সত্যি বলে মনে করে। সেলেব্রিটিদের সত্যিকারের জীবন যেহেতু তাদের কাছে আড়ালেই থাকে, তাই তারা স্ক্রিনে বা খবরের কাগজের পাতায় যা-দেখে, তাকেই সত্যি বলে মনে করে। সেই সত্যর সঙ্গে আসল সত্যের হয়তো কোনওদিনই দেখা হয় না। যাঁরা বিজ্ঞাপন বানান তাঁরাও এটা জানেন। এই বিভ্রমটুকুই তাঁদের ইউএসপি। তাই তাঁদের এমন মুখ প্রয়োজন হয় যাঁদের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে আমজনতা খুব বেশি কিছু জানতে পারে না। এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। যাঁকে আমরা বিজ্ঞাপনে দেখছি একটি পণ্যকে ‘প্রমোট’ করতে সেটি যে তাঁর একটি কাজ, এর বিনিময়ে যে তিনি অর্থ পান, এই সরল সত্যটিই আমজনতা বিজ্ঞাপনগুলি দেখার সময়ে বিস্মৃত হয়। ক্যামেরার সামনে তিনি যা-করছেন, ব্যক্তিজীবনে তিনি যে তা না-করতেই পারেন–এই সত্যটিও তারা ভুলে যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষদের মধ্যেও যাঁরা পেশাদার, তাঁদের পেশার জীবনও কি সবসময়ই তাঁদের ব্যক্তিজীবনের প্রতিবিম্ব? সেটি কাঙ্ক্ষিতও কি? আসলে, আমাদের দেশে আজও আমরা পেশাদারিত্বকে সঠিকভাবে বুঝে উঠতে ও সম্মান জানাতে শিখিনি। 

অবশ্য এই প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে যে, অর্থের বিনিময়ে যা-খুশি করা যায় নাকি? রুচিহীন এবং ভুল সময়ে উত্থাপিত হলেও কীর্তি আজাদের খোঁচাটিতে এই প্রশ্নটিই লুকোনো ছিল। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবদ্দশায়, এমনকী তাঁর প্রয়াণের পরেও, তাঁকে এইরকমের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। শুনতে হয়েছে যে, আজীবন বামপন্থী ভাবনায় বিশ্বাস প্রোথিত রাখার পরেও তিনি কী করে এমন পণ্যের বিজ্ঞাপনের সঙ্গে যুক্ত হন, যা অবৈজ্ঞানিক ভাবনা এবং কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেয়? কীর্তি সৌরভকে বলেছেন ‘পরীক্ষিত পণ্য’এর বিজ্ঞাপন করতে। সেটিও কি সম্ভব? কোনও পণ্যের বিজ্ঞাপন করতে গেলে একজন সেলেব্রিটির পক্ষে সেটিকে নিজে ব্যবহার করে তার গুণাগুণ বিচার করে তবে বিজ্ঞাপনের কাজে যুক্ত হওয়া কি সোনার পাথরবাটির মতোই একটি ধারণা নয়? এক্ষেত্রেও সেলেব্রিটিদের বিশ্বাস রাখতেই হয় পণ্যপ্রস্তুতকারকের আশ্বাসবাণীর ওপরেই। হ্যাঁ, জেনেশুনে যদি কেউ নিম্নমানের পণ্য বা অবৈজ্ঞানিক পণ্যের প্রচার করেন, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু সেখানেও একটি জিনিস আমাদের মাথায় রাখা দরকার যে, তথাকথিত সেলেব্রিটিরা আমাদের মতোই মানুষ। তাঁদের জীবনও প্রয়োজন আর ভুলভ্রান্তি-চালিত। নানা ধরনের চাপ, অনুরোধ আসে তাঁদের জীবনেও। সেগুলিকে তাঁরা আমাদের মতোই অনেক সময়েই উপেক্ষা করতে পারেন না। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমাজ স্থিরীকৃত নৈতিকতাকে মেনে নিয়ে কাজ করতে পারেন কতজন মানুষ? পতন তো হয়, স্খলন তো হয়। এ যেমন সাধারণ মানুষের জীবনে সত্য, তেমনই সত্য সেলেব্রিটিদের জীবনেও। বিশ্বব্যাপী পুঁজির যে বিপুল দাপট তাকে অস্বীকার করতে পারাও কি (তা তিনি যতই তাঁর ফ্যানেদের কাছে  অতিমানব হন না কেন) একজন সেলেব্রিটির পক্ষে আজ সবসময় সম্ভব? ফিনান্স ক্যাপিটাল নিয়ন্ত্রিত বাজারে তিনি তো শেষ পর্যন্ত একজন একাকী মানুষই। ভুলে গেলে চলবে না যে, ইতিহাসে একবারই একজন মহাত্মা গান্ধীকে পাওয়া যায়। তাই, মেরুদণ্ড সোজা রাখতে চাইলেও এই কঠিন সময়ে একজন সেলেব্রিটির একক লড়াই কতদূর আর কতক্ষণ পর্যন্ত সফল হতে পারে? অথচ সৌমিত্রর প্রয়াণের পরে তাঁর করা একটি বিজ্ঞাপনের প্রসঙ্গ তুলে কেউ কেউ তাঁকে হেয় করার চেষ্টা করেছিলেন। যদি ধরেও নিই যে, অবৈজ্ঞানিক পণ্যের বিজ্ঞাপনে যুক্ত হওয়া তাঁর একটি স্খলন ছিল, তাহলেও এই প্রশ্ন ওঠে যে, কোনও একটি স্খলন দিয়ে একজন কীর্তিমান মানুষের অতীত অর্জনকে অস্বীকার করা বা বিদ্রুপবিদ্ধ করা যায় কি? কিছু একটা ঘটলেই তাই রে রে করে সেলেব্রিটিদের আক্রমণ না-করে বরং বোঝার চেষ্টা করা উচিত কেন এমনটা হল। দুঃখের বিষয় এই যে, সেই স্থিরতাটুকুই আজকের সমাজে নেই। এই অস্থিরতারও অনেকটাই, ভুলে গেলে চলবে না, নির্মিত। যাঁকে দিয়ে এ-লেখার সূত্রপাত, সেই সৌরভের ক্ষেত্রে অবশ্য সচেতনভাবে নিম্নমানের পণ্যে প্রচার করার প্রশ্নটি আসেই না। ফরচুন তেলটি তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ব্যবহার করতেন কি না, সত্যি বলতে কী আমরা তা জানি না। তাই ফরচুন তেলের সঙ্গে সৌরভের হার্ট অ্যাটাককে জুড়ে দেওয়ার কীর্তিটি আসলে একটি রুচিহীন, শিশুসুলভ অপকীর্তি।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More