কৃষকরাই পারবেন এই অচলায়তন ভাঙতে

হিন্দোল ভট্টাচার্য 

কৃষকরা অন্যায় করেছেন। কিন্তু করসেবকরা করেননি। এই দুটি বাক্য পড়েই নিশ্চয় মনে হচ্ছে এ কেমন তুলনা? কৃষকরা তো শান্তশিষ্ট, মাটির মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে ধরে মহাজন, জমিদার, পার্টি আর দালালদের হাতে পিষ্ট। মহারাষ্ট্রে প্রায় দশহাজারের উপর কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। মধ্যপ্রদেশে, কর্নাটকে, অন্ধ্রে, উড়িষ্যায় সংখ্যাটি কাছাকাছি। কিন্তু করসেবকের প্রশ্ন এল কেন? সাধারণ বিষয়। অত্যাচারিত হতে হতে হতে একদিন কৃষকদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। তাঁরা লালকেল্লা অভিযান করেন। আর জাতীয় পতাকার একবিন্দু ক্ষতি না করে নিজেদের পতাকা জাতীয় পতাকার পাশে অনেক নীচুতে টাঙিয়ে দেন। কী ধ্বংস করেন? ফ্যাসিস্ট শাসকের অহং। কী ধ্বংস করেন? স্বৈরাচারী শাসকের চোখরাঙানি। কী প্রমাণ করেন? প্রজাতন্ত্র প্রজাদের, শাসকদের নয়। অথচ, আজ থেকে বেশি দিন আগের কথা নয়। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় উন্মাদ করসেবকদের আচরণ সম্পর্কে আমরা জানি। তাঁরা একটি ঐতিহাসিক সৌধ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলেন। আশা করি, এই ধ্বংসকার্য গণতান্ত্রিক ছিল। আর তাই, আজ সেই ধ্বংস নিন্দনীয় নয়। বরং রামমন্দিরের জন্য ‘করসেবক’-দের ক্যাম্পেন অব্যাহত। কোনও রামায়ণেই ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি না থাকলেও, আজ তা ‘হাইল হিটলার’-এর মতোই রাষ্ট্রের মন্ত্রধ্বনিতে পরিণত ও আগামী দিনে এই ফ্যাসিস্ট শাসক থাকলে এই মন্ত্র উচ্চারণ করলে তুমি দেশপ্রেমিক ও উচ্চারণ না করলে তুমি দেশদ্রোহী। 

তো, এ হেন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে ধরনা দেওয়ার পরে ট্র্যাক্টর প্যারেড করতে গিয়ে কিছু কৃষক যদি জঙ্গী হয়ে লালকেল্লা অভিযান করেন ও লালকেল্লায় নিজেদের পতাকা ওড়ান, তাহলে তা অগণতান্ত্রিক হবে কেন? কীসের গণতন্ত্র? কাদের গণতন্ত্র? কারা ঠিক করবে কোনটা গণতন্ত্র আর কোনটা নয়? আমেদাবাদে পুলিশ দিয়ে ঘিরে লোক ঢুকিয়ে দাঙ্গা করাটা গণতন্ত্র? বাক-স্বাধীনতা হরণ করতে গৌরী লঙ্কেশ, সুজাত বুখারি, কলবুর্গীকে হত্যা করাটা গণতন্ত্র? ভারভারা রাওকে বন্দি করে রাখাটা গণতন্ত্র? নিজেদের ইচ্ছেমতো কৃষিবিল প্রণয়ন করা ও কৃষকদের এতদিন আন্দোলন চললেও সেই আইন প্রত্যাহার না করাটা গণতন্ত্র? কার গণতন্ত্র? দেশের মানুষের গণতন্ত্র? দেশের প্রজাদের প্রজাতন্ত্র না কি শাসকদের প্রজাতন্ত্র? এই প্রজাতন্ত্র কি প্রজাদের না কি শাসকের একনায়কতন্ত্রের? ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি কি ভারতবর্ষের না কি হিন্দুরাষ্ট্রের? 

ধর্মনিরপেক্ষা রাষ্ট্রের পোশাকে হিন্দুরাষ্ট্রের এবং গণতন্ত্রের আড়ালে এক তীব্র একনায়কতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ এখানে যে চলছে তা তো সকলেই এখন বুঝতে পারছেন। তাহলে এই রাখঢাকগুলি আর কেন? ফ্যাসিস্ট একটি দেশের শাসকরা যা করার সেটিই করছেন। তাঁদের রাষ্ট্রমন্ত্র এবং স্লোগান চাপিয়ে দিচ্ছেন, প্রতিষ্ঠিত করছেন, সবরকম আন্দোলন ও বিক্ষোভকে বিকৃত করতে টাকা ছড়িয়ে চ্যানেল ও সংবাদমাধ্যমগুলিকে কিনে রেখেছেন। ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলি হয়ে উঠেছে ভারতীয় রাষ্ট্রের কথা বলা পুতুল। যা নির্দেশ আসবে, তাকেই পালন করতে হবে তাদের। ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসে কৃষকদের প্যারেড এবং লালকেল্লা অভিযানের সময় বারবার চ্যানেলগুলি থেকে আর্তনাদ শুনতে পেলাম। এটা কি গণতন্ত্র? এই কি গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন? এই কি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন? আপনারা তো সবই ঠিক করে দিচ্ছেন মশাই। আপনারা বলছেন দেশকে কীভাবে ভালবাসতে হবে, দেশপ্রেমিক কীভাবে হতে হবে, কী করলে আমি দেশের জন্য একজন সাচ্চা দেশভক্ত হনুমান, আর কী করলে আমি দেশদ্রোহী। আপনারা সব ঠিক করে দিচ্ছেন এবং ভাবছেন আপনারা যেভাবে ভাবাতে চেষ্টা করছেন, আমরা সেভাবেই ভাবব, আর অন্যভাবে ভাববো না। 

দেশকে আপনারা ‘একত্ববাদের’ আওতায় নিয়ে আসতে চাইছেন। এক ভাষা, এক সংস্কৃতি, এক সুর, এক রং ইত্যাদি প্রভৃতি। কিন্তু ভারতবর্ষ কোনওদিন তা ছিল না। ভারতবর্ষের সত্তাতেই রয়েছে বহুত্ববাদ। আর আমাদের সংবিধানে সেই বহুত্ববাদকে সম্মান এবং মর্যাদাই দেওয়া হয়েছে,পাশাপাশি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে মৌলিক অধিকারকে। আপনারা তো সেই মৌলিক অধিকারকে খর্ব করছেনই, পাশাপাশি বহুত্ববাদকে অস্বীকার করে, নিজেদের মত অনুযায়ী এক একত্ববাদ সৃষ্টি করতে চাইছেন। প্রজাতন্ত্র দিবসে তাহলে আপনাদের প্রজাতন্ত্র মানে কি সেখানে প্রজার অস্তিত্ব আছে, না কি আপনাদের প্রচারিত এবং প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রতন্ত্র আছে? আপনাদের এই প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রজাতন্ত্র কোথায়? এ তো শাসকতন্ত্র।

কৃষকরা আমাদের অন্নদাতা। আমাদের পথ দেখাচ্ছেন। আমাদের মনে করাচ্ছেন এই দেশটা আসলে কাদের। এই দেশটা আসলে তাঁদের, যাঁরা এই দেশের জন্য প্রাণ দেন, এই দেশের জন্য অন্ন দেন, এই দেশের জন্য রক্ত জল করে শ্রম দেন, এই দেশের জন্য হাসপাতালে, স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। এই দেশটা তাদের যাঁরা এই সামগ্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিনাবাক্যব্যয়ে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তাঁরা আছেন বলেই দেশটা চলছে। আপনারা আছেন বলে নয়। আর সে কারণে, প্রজাতুন্ত্র দিবস মানে, এই মানুষদের প্রজাতন্ত্র। এই মানুষদের মৌলিক অধিকার রক্ষার দিন এটি। 

কেউ কেউ বলছেন, সারা বিশ্বের কাছে নাকি দেশের মাথা হেঁট হয়ে গেল কৃষকদের লালকেল্লা অভিযানে। বেশ। কৃষকদের আন্দোলনে তো মাথা হেঁট হবেই আপনাদের। কারণ কৃষকদের আপনারা শুধুই সহ্য করতে দেখতে প্রস্তুত। তাঁদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বলেই, তাঁরা আপনাদের ঘেরাও করে আছেন, তা আর আপনারা বুঝছেন না। তাঁদের ট্র্যাক্টর প্যারেড একটি প্রতীকমাত্র। আর তা ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রতীক। আপনাদের মাথা হেঁট হয়নি বিশ্বের কাছে, যখন এনআরসি চালু করলেন, ডিটেনশন ক্যাম্প চালু করলেন, সিএএ-এর কথা বললেন, আপনাদের মাথা বিশ্বের কাছে হেঁট হয়ে যায় না, যখন একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের গুন্ডা দাঙ্গা বাঁধায় আপনাদের মদতে, আপনাদের মাথা বিশ্বের কাছে হেঁট হয় না, যখন জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। আপনাদের মাথা উঁচু থাকে, যখন আম্বানি-আদানিদের হাতে দেশটাকে বেচে দিয়ে এদেশের শাসকরা আরামে ৮০০০ কোটি টাকা খরচ করে কেনা নিরাপদ একটি জেট প্লেনে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়াতে পারেন। 

আপনারা ঠিক কী চান বলুন তো? আপনারা যা বলবেন, দেশের মানুষ তা-ই শুনে ঠিক ঠিক ঠিক বলতে বলতে আপনাদের হস্তচুম্বন করবে? আপনাদের সঙ্গে শুয়ে পড়বে? আপনারা বলবেন, তবে নাচবে। আপনারা বলবেন, তবে চুমু খাবে, তবে সে বাথরুম যাবে, তবে সে ক্রুদ্ধ হবে ইত্যাদি? কী চান আপনারা? আপনারা একের পর এক আইন করবেন আর ভারতবর্ষের মানুষ বিনাদ্বিধায় সেগুলি মেনে নেবেন? 

গর্বের বিষয়, আমাদের পথ দেখাচ্ছেন কৃষকরাই। যেভাবে তাঁরা দিনের পর দিন ধরে সব সহ্য করে ধরনায় বসে আছেন, অনড় প্রতিজ্ঞা থেকে একবিন্দু বিচ্যুত হচ্ছেন না, তাতে তাঁদের আন্দোলন হয়ে উঠেহে এক নতুন ধরনের অভ্যুত্থানের প্রতীক। প্রজাতন্ত্র কাকে বলে, আজ তাঁরা দেশের শাসকদের টের পাইয়ে দিলেন। টের পাইয়ে দিলেন এ কথাও যে ভারতবর্ষ কোনও শাসকদের দেশ নয়। ভারতবর্ষ কৃষকদের দেশ, খেটে খাওয়া মানুষদের দেশ। লালকেল্লা কারো বাপের দুর্গ নয়। এ দেশের দুর্গ। ভারতীয় পতাকা সকলের। ভারতীয় সংবিধান সকলের। মৌলিক অধিকার সকলের।

বিশ্বের কাছে আপনাদের বরং মাথা হেঁট হয়ে গেছে তো বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময়, গুজরাত দাঙ্গার সময়, এনআরসি আইনের সময়, কৃষিবিল প্রণয়নের সময়, আজ আন্দোলনরত কৃষকদের উপর পুলিশি অত্যাচারের সময়। কিন্তু এই গৃহযুদ্ধ তো হবেই। কৃষকরাই এই গৃহযুদ্ধের পথিকৃৎ। ইতিহাস থেকে তো আমরা জানি, কোনও ফ্যাসিস্ট শাসককে নির্বাচনে পরাস্ত করা যায়নি। পরাস্ত করতে হয় গৃহযুদ্ধ নয় যুদ্ধের দরকার পড়েছে। অভ্যুত্থানের দরকার পড়েছে। 

আজকের মতো অভ্যুত্থান তাই ভারতবর্ষের গর্ব। এ দেশের মানুষের বেঁচে থাকার গর্ব। হেরে না যাওয়ার গর্ব। প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্রের নয়। প্রজাতন্ত্র প্রজার। আর প্রজা আপনাদের শাসনে শ্বাসরুদ্ধ। তাদের তো বাঁচতেই হবে। কত কণ্ঠরোধ করবেন? কত অত্যাচার করবেন?

কৃষকরা কিন্তু ভারতবর্ষের সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। ধর্ম দিয়ে তাদের মধ্যে বিভাজন করতে আপনারা পারেননি। আগামীদিনেও পারবেন না। সব ফ্যাসিস্ট শাসকের একটা এক্সপায়ারি ডেট থাকে। একদিন শেষ হবেই এই অপশাসন। 

একদিন আবার প্রতিষ্ঠিত হবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষের প্রজাতন্ত্র। 

(লেখক কবি, অনুবাদক ও গদ্যকার। পেশায় বিজ্ঞাপনকর্মী। লিখেছেন পনেরোটি কাব্যগ্রন্থ, দুটি গল্প সংকলন ও একটি উপন্যাস। পেয়েছেন বীরেন্দ্র পুরস্কার (২০০৯) ও অনিতা- সুনীল বসু পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমি (২০১৮)।)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More