জলের অক্ষর পর্ব ২

কুলদা রায়

পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজ কোনটি?

প্রশ্নটি করেছেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। উত্তরটিও তিনি জানেন।  তিনি লেখক মানুষ। তার উত্তরও তাই স্বভাবত লেখক ঘরাণারই হবে। তিনি বলছেন, মানুষকে নিয়ে কিছু লেখাটাই হল সবচেয়ে কঠিন কাজ।

প্রথমে মানুষকে গভীরভাবে জানতে হবে। নানা কোণ থেকে আলো ফেলে মানুষকে জানতে হবে। আলো ফেলতে হবে দূর থেকে, কাছ থেকে, সামনে থেকে,  পেছন থেকে, পাশ থেকে। জানতে হবে ভেতর থেকে – বাইরে থেকে। একা মানুষটিকে জানার সঙ্গে বহু মানুষটিকে বুঝতে হবে। দেখতে হবে হ্যাঁ-মানুষটিকে, না-মানুষটিকেও।

দিনের যে মানুষটিকে চিনি আমরা, রাতে সে মানুষটি পালটে যায়। এক রকম নয় কায়া মানুষটি আর ছায়া মানুষটি। স্থান, কাল ও পরিস্থিতি মানুষকে অচেনা করে ফেলে। এই চেনা ও অচেনা মানুষের সঙ্গে থাকতে হবে ঘনিষ্ঠ পরিচয়। জানতে হবে, একটি পুকুর পাড়ে হেলেঞ্চা শাক তুলতে গিয়ে কী করে একটি মানুষ অকস্মাৎ প্রকৃত ঈশ্বর হয়ে ওঠে। তখন ‘চোখ মুছিলে জল মোছে না/বল সখি, এ কোন জ্বালা।‘

তারপর জানতে হবে – কী করে সেই জানা মানুষের গল্পটি লেখা যাবে…

একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছেন পাপা হেমিংওয়ে। দূরে সমুদ্র জলে পাখি উড়ছে। বালকটি ঘুমিয়ে পড়েছে। কয়েকটি হাঙর ঘোরাফেরা করছে। দস্তয়েভস্কি’র পা থেকে লোহার বেড়ি খুলে ফেলা হয়েছে। যিশুর মতো ক্লান্তিতে মাথা নুয়ে তাকে নেওয়া হচ্ছে সাইবেরিয়ায়। সোনার জ্যাঠামশাই গোপাট ধরে নেমে যেতে যেতে বলছেন, গাৎচোরেৎশালা…..।

আর পাপা বলছেন, হায়, এই দুটি কাজ শিখতে শিখতে সারা জনম কেটে যায়।

………..

 

আমার কত লেখা যে অসমাপ্ত পড়ে আছে! সেগুলো পড়তে পড়তে আবার লিখতে ইচ্ছে করে। মনে হয় হেলেঞ্চা শাকের কথাটি লিখতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। এই শাক আমি পুকুরে নিজে হাতে লাগিয়েছি। আমার আজিমা ভাউতা টাকি মাছ দিয়ে রেঁধেছে। সঙ্গে কয়েকটা রসুনের কোয়া।

এই আজিমা একদিন বাড়ির পূব দিকে দাঁড়িয়ে আছেন। তখনও ভোরের আলো ফোটেনি।  অচিরেই ফুটি ফুটি করবে করবে ভাব উঠেছে। একটা শ্যামল হাওয়া উড়ে এসে হোগলা ঝোপকে দুলিয়ে দিয়ে আজিমার মুখে এসে লেগেছে। সেই মুখ পোড়া মাটির মতো নিথর–নিস্তব্ধ। সেখানে খুব মিহি কেরানির মতো কাঁপা কাঁপা অক্ষরে বয়স লেখা আছে। আমরা কেউ পড়তে পারি না। পড়ার দরকারও নেই। তিনি আছেন বহুকাল ধরে। বহু জন্ম ধরে আছেন। থাকবেন আরো বহুদিন।

ফুটি ফুটি আলো ফোটার আগেই আজিমার সামনে কলাগাছের শুকনো খোলপাতা পুড়ছে । আজিমা লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝে মাঝে সেই আগুন খুঁচিয়ে দেন। আরো জোরে জ্বলে ওঠে। কলার খোলপাতা পুড়ে ছাই হয়। সেই পোড়া ছাই থেকে ক্ষার হবে। সেই ক্ষার গোলা জলে কাপড় ধোয়া হবে। ঝকঝকে হবে কাপড়চোপড়। আজিমা সেই কাপড় পরে সন্ধ্যায় তুলসীতলায় বসবেন। ফিসফিস করে বলবেন, কমল, কমল—

 

এ কমল কে? – আমরা জানি না। হয়তো জানতাম – ভুলে গিয়েছি। হয়তো কমল নামের কেউ কোনোদিন ছিলই না। অথবা ছিল। ছিল কি ছিল না, তা দিয়ে কী আসে যায়! শুধু বুঝতে পারি কলার খোলপাতার ক্ষারে কাপড় সিদ্ধ করা কাজটি শেষ হয়ে গেলে আজিমা সেগুলো রোদে দেবেন। তারপর ঘাটে যাবেন। এক হাঁটু জলে নেমে তুলবেন হেলেঞ্চা শাক। আর বড়শি পেতে ধরবেন কয়েকটি ভাউতা মাছ।  রসুনের কোয়া দিয়ে রান্না শেষ হলে আবার যাবেন ঘাটে। এক বাটি হেলেঞ্চা শাকের তরকারি জলে ভাসাবেন। ধীরে ধীরে মৃদু স্বরে বলবেন, কমল, কমল – এই নে, এবার পেটে ভরে খেয়ে নে মা।

তখনই মনে হয় এই কমলকে আমরা চিনি। সে একদিন ঘাটে ডুবে গিয়েছিল। জলের অক্ষর হয়ে ভেসে গিয়েছিল।

– শিশু কমল কি হেলেঞ্চা শাক তুলতে ঘাটে এসেছিল?

আমাদের এই প্রশ্ন শুনে এই ফুটি কি ফুটি না ভোরে আধো আলো আধো অন্ধকারে আজিমা হু হু করে কেঁদে ফেললেন। আলো ফুটতেই তিনি আবার হেসে উঠেছেন।

আজ বরফ স্তুপের দিকে তাকিয়ে টের পাই, আমার আজিমার চুল রাত্রির মতো কালো। এই চুল আর রাত্রির কথাটাও যেন লিখি।

…….

 

দেশ ছাড়ার আগে মা দিন দশেক এসেছিল আমার কাছে। প্রতিদিন রান্না করেছে। একদিন হেলেঞ্চা শাক রাঁধল রসুন দিয়ে -পুঁটি মাছ দিয়ে। সঙ্গে কয়েকটি আলুর টুকরো। মা তখন রান্না করতে করতে বলেছিল – আলু কেটে দিলে হেলেঞ্চা আর উচ্ছে তিতা লাগে না। মা খেতে দিয়ে বলেছিল -মাঝে মাঝে হেলেঞ্চা শাক রান্না করে খাবি।

আমি জানি, আজও কখনও আমার মা ঘুম ভেঙে গেলে পায়ে পায়ে ঘাটে যায়। হেলেঞ্চা শাক তোলে। ভাউতা মাছ আর রসুন দিয়ে রান্না করে। ফিসফিস করে বলে, কমল-কমল।

-না কমল নয়।

মা বলে – খোকন, খোকন-  ।।

 

বহুদিন দেশ ছেড়ে এসেছি। দেশ আমাকে ছাড়ে নি। যতই দিন যায়, বুঝতে পারি– হেলেঞ্চা শাক হয়ে দেশ আমার পিছনে পিছনে চলে এসেছে।

 

(লেখক নিউইয়র্ক নিবাসী গল্পকার)

(স্কেচটি করেছেন তাজুল ইমাম)

পরের পর্ব আগামী  সংখ্যায়…

জলের অক্ষর পর্ব ১

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More