ভারত-অস্ট্রেলিয়া সিরিজ: বুক চিতিয়ে লড়ে যাওয়ার সহ্যশক্তি এবং হৃদয়টাই প্রকৃত বিজয়ী

হিন্দোল ভট্টাচার্য

এ যেন জীবনের শিক্ষা! এ যেন পিঠে আলগা করে হাত দিয়ে কেউ বুঝিয়ে দিল, ভেঙে পড়ে যাওয়া সহজ, হাল ছেড়ে দেওয়াও সহজ, কিন্তু যা সহজ নয়, তা হল ঘুরে দাঁড়ান। এই সব কথা সকলেই জানেন। কিন্তু জীবনের মঞ্চে তা করে দেখাতে সকলে সক্ষম হন না। জিততে চেওনা, কিন্তু তাই বলে হেরেও যেও না তুমি কখনও। মনে পড়ে ভাস্কর চক্রবর্তীর ‘শয়নযান’। কিন্তু তার চেয়েও বড় একটি বিষয় ভারত-অস্ট্রেলিয়ার এই চার টেস্টের সিরিজে আমাদের শিক্ষা দিল। সেটা কী? তুমি যত অপমানিত হবে, যত আহত হবে, যত তোমার অবস্থা সঙ্গীন হবে,তুমি ততই অপ্রত্যাশিত হবে। অপ্রত্যাশিত হতে পারার চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কিছুই নেই। ভাবুন, আপনি একটা দেওয়াল ঘড়ির মতো। রোজ ছটা থেকে বারোটা বেজেই চলেছেন। আপনাকে রোজ দেখছে সকলেই। কিন্তু আপনি আর নতুন কিছু নন কারো কাছেই। কেন? কারণ আপনি বেঁধে দেওয়া বৃত্তের মধ্যে ঘুরছেন। আপনি অপ্রত্যাশিত নন। তাই, যখন আপনি বিপন্ন, হেরে যাওয়ার মুখে, তখন ঘুরে দাঁড়াবার মানসিকতাই আপনার নেই।

কিন্তু মতি নন্দীর উপন্যাস তো আমাদের অন্য গল্প বলে। বলে, ‘ফাইট, কোনি, ফাইট।

‘ কিন্তু, পড়া এক, বোঝা এক, কিন্তু জীবনের মঞ্চে লড়া আরেক বিষয়। কারণ লড়ে যাওয়ার সহ্যশক্তি সকলের থাকে না। এই ‘সহ্যশক্তি’ শব্দটির উপর আমি একটু বেশি জোর দিচ্ছি। কারণ, এই সিরিজ জয় আবার সহ্যশক্তির জয়। একটার পর একটা তীব্র গতির বল আছড়ে পড়েছে ভারতীয় খেলোয়াড়দের বুকে, পিঠে, হাতে। কারোর আঙুল ভেঙেছে, কারো পিঠে বুকে কালশিটে পড়েছে। কখনও হ্যামস্ট্রিঙে চোট, কখনও কনুইয়ে। কিন্তু সব সহ্য করে, তাঁরা দাঁড়িয়ে থেকেছেন আরুণির মতো।

এই ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইটা শুরু হয় রাহানের হাত ধরেই দ্বিতীয় টেস্টে। তৃতীয় টেস্টে ভিহারি এবং অশ্বিন তার একটা রূপকথাই তৈরি করেন। চতুর্থ টেস্টে আবার নীলকণ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন পূজারা। যে তরুণ ব্রিগেডের হাত ধরে ব্রিসবেনের চতুর্থ টেস্টে ৩২৮ রান তাড়া করে টেস্ট ও সিরিজ জিতল ভারত সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশে, তা সম্ভব হত না সহ্যশক্তির এই মহাকাব্যগুলি রচিত না হলে। এই সহ্যশক্তি এবং সহিষ্ণুতার সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানো কাহিনি সহজে রচিত হয় না। রচিত হয় বুক-পিঠ-মাথা লক্ষ করে প্রবল গতিতে বল ছুটে এলে, রচিত হয় বর্ণবৈষম্যের শিকার হলে, রচিত হয় ক্রমাগত স্লেজিং-এ, রচিত হয় ক্রমাগত অপমানিত হতে হতে। চোয়াল শক্ত না হলে, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে না গেলে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেক্ষাপটটাই তো আর থাকে না।

কথা হল অন্য। আর তা হল এই টেস্ট যদি ভারতীয় তরুণ ব্রিগেড হেরে যেত, তাহলে কি আমরা তাদের জন্য এমন জয়ধ্বনি দিতাম? কারণ আমরা কেবল বিজয়ীদেরই পুজো করি। বীরত্বের প্রতি একটা অকারণ উপাস্য মনোভাব আমাদের মজ্জাগত। কিন্তু বীরের চেয়েও সিংহহৃদয় যার, সে-ই মনে হয় অধিক ভালবাসার পাত্র। শুধু বীরত্ব দিয়ে অসীম সহ্যশক্তি আসে না। ভারতের যে টিম ব্রিসবেন টেস্ট জিতল, তাতে কোহলি, বুমরা, শামি, ইশান্ত, উমেশ, অশ্বিন, জাদেজার মতো ক্রিকেটার নেই। বরং খেললেন শুভমান, সিরাজ, নটরাজন, ওয়াশিংটন, শার্দুলের মতো তরুণ খেলোয়াড়রা, যাঁদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতাও দশটি টেস্ট নয়। খেললেন ঋষভ অসম্ভব চাপের মধ্যে। যেভাবে আধাশক্তির ভারতীয় টিম তৃতীয় টেস্টে লড়াই করল বা নব্বই শতাংশ নতুন টিম নিয়ে পূর্ণশক্তির গর্বের অন্ধকারে মত্ত অত্যন্ত কুশলী ও অভিজ্ঞ অস্ট্রেলিয়াকে ব্রিসবেনের মতো ফাস্ট পিচে হারাল, তাতে আমাদের বাকরুদ্ধ হয়ে আসে। কিন্তু যদি হেরে যেত, তাহলেও এই লড়াইয়ের জন্যই তাঁদের অভিবাদন আমরা কি জানাতাম? কারণ জীবনের প্রথম সিরিজে, কারো কারো প্রথম টেস্টে একেবারে হিংস্র শ্বাপদের হাঁমুখের সামনে তাঁরা লড়াই করেছেন বুক চিতিয়ে। যদি হেরে যেতেন, তাহলেও বা কি? এই লড়াইটা যাঁরা করতে পারেন, তাঁরাই প্রকৃত যোদ্ধা।

মতি নন্দীর উপন্যাসে এমন অনেক চরিত্রই আমরা পেয়েছি যারা তাদের স্বপ্ন পূরণ করেছে হেরে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়িয়ে। এমন অনেক চলচ্চিত্রও দেখেছি, যেখানে জয়সূচক স্ট্রোক বা অনবদ্য গোলের মাধ্যমে লড়াইটাই উদযাপিত হচ্ছে। যেমন চাক দে ইন্ডিয়া, কাই পো চে বা মেরি কম। ডেঞ্জেল ওয়াশিংটনের টাইটানের কথাও বলা যায়। শুধু ক্লিন ইস্টউডের মিলিয়ন ডলার বেবি-তে দেখি এক অন্য গল্প, যেখানে লড়াইটাই এক অন্য জীবনদর্শনে পরিণত হয়। মৃত্যুচেতনার এক বিষণ্ন রঙ মিশে যায় লড়াইয়ের সঙ্গে। কথা হল এটাই। প্রতিটি খেলাই আসলে জীবনযুদ্ধের প্রতিনিধি। ক্রিকেট প্রতি মুহূর্তে জীবনের উত্থান পতনের মতোই। প্রতিটি বল সেখানে অপ্রত্যাশিতর ইঙ্গিত নিয়ে আসে। অনিশ্চয়তা এবং অপ্রত্যাশিতর এই যুদ্ধক্ষেত্রে শিল্পের সঙ্গে মিশে থাকে লড়াইটা করে যাওয়ার এক অদম্য মানসিকতা। সেখানে জেতা-হারা সত্য ঠিকই, কিন্তু শেষ সত্য নয়।

ভারত-অস্ট্রেলিয়ার এই উপন্যাসোপম সিরিজে আমরা সাক্ষী রইলাম এক অসম লড়াইয়ের। মরে যেতে যেতে বেঁচে ওঠার, দুর্ভেদ্য পর্বতশ্রেণি অতিক্রম করার এবং সামগ্রিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে একবার লড়াইটা চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতার। এই যুদ্ধজয়কে তো বটেই, যুদ্ধ করে যাওয়ার সিংহহৃদয়কেই স্যালুট জানাই। এই সিংহহৃদয়ই আমাদের জীবনীশক্তি।

(লেখক কবি, অনুবাদক ও গদ্যকার। পেশায় বিজ্ঞাপনকর্মী। লিখেছেন পনেরোটি কাব্যগ্রন্থ, দুটি গল্প সংকলন ও একটি উপন্যাস। পেয়েছেন বীরেন্দ্র পুরস্কার (২০০৯) ও অনিতা- সুনীল বসু পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমি (২০১৮)।)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More