ভাষার সাম্য, সাম্যের ভাষা

সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায় 

নারী দিবস এগিয়ে এলেই সকলের মাথায় জট পাকাতে থাকে নানান বিষয়। শর্ট ফিল্ম থেকে বিজ্ঞাপন, ফেসবুক পোস্ট থেকে ক্যাফে টেবিল, নারী দিবস জাঁকিয়ে বসে সর্বত্র। তর্ক শুরু হয়, গয়নার ডিসকাউন্ট?  শপিং মলের ভাউচার? এই কি তবে নারী দিবসের উদযাপন? তবে একইসঙ্গে আমরা যারা মানবীবিদ্যা চর্চা করেছি, অস্বীকার করতে পারি না যে নারী দিবসের সঙ্গে জুড়ে থাকা যে দীর্ঘ ইতিহাস, তার জন্য এই দিনটি উদযাপনের মূল্য আছে বৈকী! সেই ইতিহাস পার করে আসা হয়েছে বলেই, আজ আমরা কোনও লেখার সামনে এসে বসতে পারছি, চর্চা করতে পারছি নিজেদের জ্ঞান, বিপ্লব ও প্রতিবাদের। নিজেদের একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর নাগরিক ভাবতে পারছি, পূর্ব নারীদের কাছে তাই আমাদের অশেষ ঋণ। 

তবে বলতে দ্বিধা নেই, প্রবন্ধ, চিত্রনাট্য বা থিসিসে যে প্রতিবাদ করা যায়, কবিতার কাছে সে প্রতিবাদ নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কবিতার সামনে ‘পলিটিকাল কারেক্টনেস’এর কোনও জায়গা থাকে না। নিজের নগ্ন আত্মাকে নিয়ে যখন সাদা পাতার সামনে বসি, তখন বহু সময়ই সাম্যের হিসেব আমি নিজেই নড়িয়ে ফেলছি, সমর্পণের ভেলায় ভেসে যেতে চাইছে মন। তাই কবিতার সামনে কোনও জোর চলে না, আর তাই আটকাইও না তাকে। 

সমর্পণ ছাড়া কোনো সাম্য আসে কিনা সে তর্কও আমার মনের ভিতরে আছে। তবে সে প্রসঙ্গ ভিন্ন। এই ‘সমর্পণ’, ‘সাম্য’ এইসবই বোধহয় ‘বিষয়ের’ কথা। কিন্তু ভাষা? কোন ভাষায় লিখিত হয় কবিতা? এ কথা ভাবতে গিয়ে আমার মনে হল, বাংলা ভাষার সঙ্গে আমার বেশ কয়েকরকম ভাবে দেখা হয়। কবিতা লেখবার সময় যেমন দেখা হয় এক অবচেতনের বাংলা ভাষার সঙ্গে, কথা বলবার সময় হয়ত বা দেখা হয় সচেতন অবচেতনের মিশ্রিত কোনও স্তরের বাংলা ভাষার সঙ্গে। সংলাপ বা চিত্রনাট্য লেখবার সময় দেখা হয় এক ফরমায়েসি বাংলা ভাষার সঙ্গে, আবার বিদেশিদের বাংলা ভাষা শেখাতে গিয়ে দেখা হয় এক অতিরিক্ত সচেতন মস্তিষ্ক থেকে উঠে আসা বাংলা ভাষার সঙ্গে। এই এতরকম ভাবে একটি ভাষার সঙ্গে জুড়ে থাকা গেলে, কাছ থেকে দেখা যায় সেই ভাষার নানান কারুকাজ। যেমন আমাদের ভবানীপুরের লাল মেঝেতে কোনও ফাটল এলেও আমি খুঁজতে চাইতাম সেই কারুকাজের নকশা। ভাষাকেও আমার তেমন মনে হয়। ভাষাকে নানাভাবে দেখতে গিয়ে, উচ্চারণ করতে গিয়ে , পড়াতে গিয়ে আমার বুঝতে পারা যে ছোটোবেলায় যখন ‘ইন্টিউটিভলি’ আমরা ভাষাকে শিখি তখন তাকে ভেঙে দেখবার অবকাশ থাকে না আমাদের। তারপর সারা জীবন ধরে সেই ভাষাকে আমরা ‘পারফর্ম’ করি। আমাদের মন বদলায়, মনন বদলায়, বদলায় ছবি থেকে সাহিত্যের বিষয়বস্তু, কিন্তু বদলায় না – ভাষা। তাহলে? তাহলে কি ভাষা সেই নতুন ‘কনটেন্টকে’ ধারণ করবার জন্য প্রস্তত থাকে? এইখান থেকেই আসলে আমার গবেষণার কাজের সূত্রপাত। এই লেখাটিতে আমি মূলত তারই একটি ক্ষুদ্র অংশ আলোচনা করার চেষ্টা করব। নারী দিবসে ‘বিষয়’ থেকে যদি ‘ভাষা’র দিকে তাকাই, বাংলা ভাষার দিকে, কী দেখব তবে সেখানে? ভাষা কি আমাদের এই লিঙ্গের সাম্য নেওয়ার জন্য প্রস্তুত? বাংলা ভাষা কি আদপেও সাম্যের ভাষা? এ প্রসঙ্গে একটি সহজ যুক্তি হল এই যে বাংলা ভাষায় ‘সে’ সর্বনামটি আছে, আর তাই আপাতভাবে এ ভাষা সাম্যের। কিন্তু বহিরঙ্গের সঙ্গে কি মেলে অন্তরঙ্গ?

    এইখান থেকে আমি ঢুকে পড়তে চাই বাংলা ভাষার অল্প কিছু শব্দে। দেখাতে চাই তার আদি অর্থের উদাহরণ টেনে যে কিছু ক্ষেত্রে সেইসমস্ত শব্দ বা প্রতীকের সঙ্গে জুড়ে থাকা যে লিঙ্গরাজনীতি তাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা প্রায় অসম্ভব। খুব ছোট্ট পরিসরে আলোচনা করার জন্য যে শব্দগুলি আমি বেছে নিয়েছি তা হল, ছেলেবেলা, ছেলেমানুষ, ছেলেমেয়েরা, শ্বশুরবাড়ি, বাপেরবাড়ি, বেশ্যা, উত্তম, মধ্যম ও প্রথম পুরুষ, পতি, বীর- এইরকম কয়েকটি শব্দকে। 

এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে যে দু’তিনটি শব্দতে মিশে রয়েছে ‘ছেলে’ প্রতীকটি এবং ‘ছেলে’ শব্দটির আদি অর্থর দিকে তাকালে দেখা যাবে যে সত্যই তার অর্থ কেবল পুত্র নয় বরং কন্যা, সন্তান, পুতুল-শিশু এমনকি ভ্রুণও। ফলে এ নিয়ে তর্ক নিশ্চিতভাবে সম্ভব এবং আমার এই পক্ষপাতের দাবিকে কিঞ্চিৎ উগ্র নারীবাদ বলাও হয়ত যুক্তিযুক্ত, তবু আমি নিজের যুক্তির দিকে খানিক নির্ভীকভাবেই এগিয়ে যেতে চাই। অর্থাৎ শুরুতেই যে কথা বলতে চাই তা হল এই যে ভাষার ব্যবহারকে বা পারফরমেন্সকে আমি কিন্তু ডায়াক্রনিকালি দেখব না, দেখব সিনক্রনিকালি। অর্থাৎ আমার আজকের সময়কালে আমি বা আমার সমাজ একটি শব্দকে কীভাবে ধারণ করি কারণ তার দ্বারাই আমরা ব্যক্ত করতে চাই আমাদের মনের ভাব আর সেই শব্দ রেখাপাত করে আমাদের মস্তিষ্কে। 

আমি এর পালটা যুক্তিতে বলতে চাইব যে যদি ‘ছেলে’ শব্দটির মধ্যে নিহিত থাকত ‘মেয়ে’ শব্দটির বা প্রতীকটির বোধ, তাহলে নিশ্চিতভাবে আমরা একটি শব্দ দিয়েই একটি প্রতীক দিয়েই বোঝাতে পারতাম দুটি শরীর ও মনের ধারণাকে। আর তাই, ছেলেবেলা শব্দটি নিয়ে আমার আপত্তি থাকবে, থেকেই যাবে, ‘মেয়েবেলা’ শব্দটির জন্ম দেওয়ার জন্য ঋণ থাকবে তসলিমা নসরিনের কাছে। তবে তারই সঙ্গে একটা নিউট্রালিটির দিকে  আমি এগোতে চাইব, আর চাইব ছেলেবেলা বা মেয়েবেলার থেকে দূরে ‘ছোটবেলার’ ব্যবহার বাড়ুক। তাহলে হয়ত তাতে ধারণ করা যাবে নানান লিঙ্গের মানুষের ছোটবেলার গল্প। 

        এই প্রসঙ্গে আর একটি ভাবনার কথায় পৌঁছতে চাই, অর্থাৎ এই ‘ছেলেবেলা’ শব্দটির মধ্যে যেহেতু মিশে আছে ছোটবেলা অর্থাৎ সারল্যর ছোঁয়াচ, তাই কি সেই শব্দ থেকে দূরে রাখা হল ‘মেয়ে’দের?  কেন বলছি এ কথা? তাহলে চলে আসি আমার পরের শব্দ অর্থাৎ ছেলেমানুষ’-এ। এই ছেলেমানুষ শব্দটির মধ্যে নিহিত আছে এক সারল্যের বোধ। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি “খুকি তোমার কিচ্ছু বোঝে না মা/খুকি তোমার ভারি ছেলেমানুষ” । ছেলেবেলা ও মেয়েবেলা নিয়ে আলোচনার পর এই পংক্তিতে এলে স্বাভাবিকভাবে আমি একবার দেখার চেষ্টা করব যে যদি এই ছেলেমানুষের পরিবর্তে মেয়েমানুষ বলতাম, কী ভাবে পরিবর্তিত হত এর অর্থ ? বিস্ময়ের কথা এই যে ‘মেয়েমানুষ’ এমনিতেই একটি প্রচলিত শব্দ, কিন্তু সেই শব্দের মধ্যে কোথাও নিহিত নেই কোনও সারল্যের বোধ। বরং এই প্রতীক আমার মস্তিষ্কে, আমাদের মস্তিষ্কে যে অবয়বের জন্ম দেয়, তা একটি প্রাপ্তবয়স্ক নারীর। তাহলে কি এই ভাষার রাজনীতিতে মেয়েদের বঞ্চিত করা হচ্ছে একধরণের সারল্যের অধিকার থেকে?

চলে আসি পরের শব্দে। ‘ছেলেমেয়েরা’- এই শব্দটি তৈরি হয়েছে দুটি বিশেষ্য পদের সংযোগে। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে যে এই সংযোগের একটি নির্দিষ্ট পারম্পর্য আছে। যদি ধরে নিই এই পারম্পর্য আপতিক, তাহলে একবার দেখা যেতে পারে সেই পারম্পর্যকে উলটে দিলে অর্থের কোনো পরিবর্তন ঘটছে কিনা ও ঘটলে কীভাবে। তবে তার আগে উদাহরণ হিসেবে একটি বাক্য নেওয়া যাক।  রবীন্দ্রনাথের ‘শিক্ষা’ প্রবন্ধে উনি এক জায়গায় লিখছেন  

“কিন্তু কাপড়জুতাকে একটা অন্ধ সংস্কারের মতো জড়াইয়া ধরা আমাদের এই গরম দেশে ছিল না। এক তো সহজেই আমাদের কাপড় বিরল ছিল, তাহার পরে, বালককালে ছেলেমেয়েরা অনেকদিন পর্যন্ত কাপড়জুতা না পরিয়া উলঙ্গ শরীরের সঙ্গে উলঙ্গ জগতের যোগ অসংকোচে অতি সুন্দরভাবে রক্ষা করিয়াছে” 

 এই বাক্য পড়লে উলঙ্গ শব্দটির উপস্থিতি সত্ত্বেও আমাদের অসুবিধে হয়না কোথাও, তা কেবল উলঙ্গ জগতের দর্শনের কারণেই নয় বরং ছেলেমেয়েরা শব্দটির মধ্যে আবারও নিহিত আছে ভারী কমবয়সী কিছু ছেলে ও মেয়েদের কথা। যাদের উলঙ্গ ভাবতে সামাজিকভাবে আমাদের মস্তিষ্কের কোনও অসুবিধে হয় না। এইবার এই একই বাক্যে ছেলেমেয়েরা শব্দটির পারম্পর্যকে উলটে দিয়ে মেয়েছেলেরা করে দেখা যাক। বাক্যটি তাহলে এইরকম দাঁড়ায় 

“কিন্তু কাপড়জুতাকে একটা অন্ধ সংস্কারের মতো জড়াইয়া ধরা আমাদের এই গরম দেশে ছিল না। এক তো সহজেই আমাদের কাপড় বিরল ছিল, তাহার পরে, বালককালে মেয়েছেলেরা অনেকদিন পর্যন্ত কাপড়জুতা না পরিয়া উলঙ্গ শরীরের সঙ্গে উলঙ্গ জগতের যোগ অসংকোচে অতি সুন্দরভাবে রক্ষা করিয়াছে”

 ছাপার ভুলে যদি এমন একটি শব্দ সহ বাক্যটি ছাপা হত তাহলে পাঠকের চক্ষু স্থির হওয়া থেকে আটকাতে পারত না প্রায় কেউই। কারণ আবারও মেয়েছেলে শব্দটির মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক এক মহিলার যৌন শরীরের অবয়বই ভাসে। তবু এসবের মধ্যে রাজনীতি না খুঁজে ভারী সরল আপতিক বলে ধরে নেওয়া যায়, কিন্তু ধরে নেব কিনা সে দায়িত্বও খানিক বর্তায় গবেষকদের উপর। তাই এইবার চলে আসি আমার পরের শব্দ, বা পরের দুটি শব্দে ‘শ্বশুরবাড়ি’ ও ‘বাপেরবাড়ি’। এই দুটি শব্দ নিয়ে আধুনিক সময় চিন্তাশীল মানুষদের মধ্যে আপত্তি থাকবারই কথা। যুক্তিও সহজ। বাড়ি কি কেবল বাপের, বাড়ি কি কেবল শ্বশুরের? ভার্জিনিয়া উলফের ‘আ রুম অফ ওয়ানস ওন’ এর স্বপ্ন বাদ দিলেও বাড়ির একটুকু অধিকার কি মা কিংবা শাশুড়ির নেই? এরও সামাজিক ইতিহাসের দিকে তাকালে লিঙ্গ-রাজনীতি বলে খুব বেশি দোষারোপ করা যাবে না, কারণ সেক্ষেত্রে আবারও প্রশ্ন করতে হয় ‘বিবাহ’ নামক প্রতিষ্ঠানটিকে। তার সঙ্গে যুক্ত এই বাড়ি বদলের রীতিকে, তবেই হয়ত পৌঁছতে পারব এই শব্দের কাছে। হয়ত নতুন করে প্রশ্ন করব কে প্রভাব করছে কাকে? সামাজিক ধারণা বা বিশ্বাস প্রভাব করছে ভাষাকে? না ভাষা প্রভাব করছে আমাদের ভাবনা বা সামাজিক বিশ্বাসকে? কিন্তু এ ক্ষেত্রে আসলে ফিরে তাকাতে হবে ২০০৫ এর হিন্দু সাক্সেসন এক্টের দিকে, যেখানে স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে মহিলারা যে কোনও অবস্থাতেই ছেলেদের সঙ্গে সম্পত্তিতে সমান অধিকারী। তাই রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগে যখন আমরা পড়ি ‘কুমু ঘরে ঢুকতেই মধুসূদন আর থাকতে পারলে না, বলে উঠল

“বাপের বাড়ি থেকে মূর্ছা অভ্যেস করে এসেছ বুঝি ? কিন্তু আমাদের এখানে এটা চলতি নেই, তোমার ঐ নুরনগরী চাল ছাড়তে হবে” 

তখন হয়ত অসুবিধে হয় না আমাদের। কিংবা মিনি ছোটগল্পে যখন আমরা পড়ি 

“বাঙালি ঘরের মেয়ে আজন্ম শ্বশুরবাড়ি শব্দটার সহিত পরিচিত কিন্তু আমরা খানিক একেলে ধরণের লোক হওয়াতে শিশু মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি সম্বন্ধে সজ্ঞান করে তোলা হয় নাই”।

 তখন অসুবিধে হয় না, এমনকী এই শব্দ ব্যবহারের জন্য দোষও দেওয়া যায় না কিন্তু গোল বাঁধে যখন আজকের আধুনিক সময়ের কোনো গল্প বা উপন্যাসে ব্যবহৃত হয় এই ‘শ্বশুরবাড়ি’ বা ‘বাপের বাড়ি’ শব্দগুলি।কেবল গল্প উপন্যাসেই নয় এমনকী সংবাদ পত্রেও। এ ক্ষেত্রে আরও একবার হরিচরণের শরণাপন্ন হয়ে ‘বাপ’ শব্দের আদি অর্থের দিকে তাকালে দেখা যাবে, তা এসেছে ‘বপন’ শব্দটি থেকে। এ ক্ষেত্রে এভেলিন ফক্স কেলারের ‘সায়েন্স এন্ড ফেমিনিসম’ বইটির একটি প্রবন্ধের কথা মনে পড়ে যে প্রবন্ধে বলা হচ্ছে যে বিজ্ঞানও ভাষার এই লিঙ্গ রাজনীতির কারণে এক ভুল ধারণা দিয়ে এসছে আমাদের, যে কেবল বীর্যের ভিতর থেকে শুক্রাণু গিয়েই যেন বপন হয়ে যাচ্ছে গর্ভে, আর ডিম্বানুর যেন কোনও সক্রিয় ভূমিকাই নেই। অথচ একবারও বলা হচ্ছে না যে ডিম্বানুও সমান সক্রিয়, বীজ বপনের মতো করে শুক্রাণুর কোন বপন প্রক্রিয়া ঘটছে না, বরং শুক্রাণু ও ডিম্বানু মিলিত হচ্ছে সক্রিয়ভাবে। এ কথা মনে হতে এও মনে হল যে তবে এই বাপ শব্দটির আদি অর্থের কাছে দাঁড়ালে হয়ত পৌঁছে যাওয়া যায় সামাজিক কিছু মিথের কাছেও। 

আমার পরের শব্দ ‘বেশ্যা’। সমাজ ও হিন্দু বিবাহ প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথ যখন লিখছেন “বৃদ্ধ লোকেরা অবগত আছেন, কিছুকাল পূর্বে অন্যান্য নানা আয়োজনের মধ্যে বেশ্যা রাখাও বড়মানুষির এক অঙ্গ ছিল” । এ কথা বলে দিতে হয় না যে, এই বাক্য থেকে যে ছবি আমাদের মস্তিষ্কে তৈরি হয় তা কিছু বড়লোক পুরুষ এবং বেশ্যা মহিলার। আমার এই বাক্যে ‘বেশ্যা মহিলা’ শব্দটি শ্রোতা বা পাঠকদের কাছে শ্রুতিমধুর লাগবে না, কারণ যেসব ক্ষেত্রে মহিলা শব্দটি ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ে না আলাদা করে আমরা ব্যবহার করে থাকি যেমন মহিলা কবি, মহিলা ডাক্তার প্রভৃতি অথচ এই বেশ্যা শব্দের আগে বা পরে আলাদা করে এই মহিলা শব্দটি ব্যবহার করার কোনও প্রয়োজন বোধ করি না, কারণ আমাদের সেই সমষ্টির ইতিহাস ও স্মৃতি থেকে আমরা শিখে নিয়েছি যে বেশ্যা কেবলমাত্র একটি স্ত্রীলিঙ্গের শব্দ, আর তাই তা আলাদা করে উল্লেখ করায় হওয়ায় আমাদের শ্রুতিতে ব্যাঘাট ঘটে। বলতে দ্বিধা নেই সেই কারণেই ‘চরিত্র’ নামক একটি অলীক ধারণা এসে জুড়ে বসে মেয়েদের সঙ্গে, আর যে ধারণা থেকে খানিক মুক্তি পেয়ে যান বাঙালি পুরুষেরা। ইংরিজিতে যদিও একখানা শব্দ পাওয়া যায় আর তা হল জিগোলো। শব্দের আদি অর্থ দেখতে গেলেও দেখা যায় যে বেশ্যা শব্দটি আসছে ‘বৈবশ্য’ থেকে যা আসলে ক্লীব লিঙ্গ যার অর্থ বিবশভাব, ব্যাকুলতা। যদিও বেশ্যা শব্দে স্পষ্ট করে বলা থাকছে এই ‘আ’ বিভক্তি স্ত্রী লিঙ্গ নির্নায়ক।  আশার কথা এই, যে সঙ্গে একটি তথ্যও আসছে যে পুং লিঙ্গে এই অর্থ ব্যবহার করতে গেলে বলতে হবে বেশ্যারূপ জন। তবে বোঝাই যাচ্ছে বেশ্যা শব্দটি বা এই ধারণাটি মূলত মহিলাদের জন্য, আর সেইরূপ কোনো জন (অর্থাৎ যা আজ আমরা মানুষ বলতে বুঝি) এক্ষেত্রে পুরুষ হিসেবে ব্যবহৃত হল, সুতরাং কোনো পুরুষ তেমন কাজ করলে তাকে বলতে হবে বেশ্যারূপ জন।

আমার পরের শব্দ ছিল পুরুষ, অর্থাৎ পূর্ব পুরুষ, উত্তম পুরুষ, মধ্যম পুরুষ ,প্রথম পুরুষ।  আবারও আদি অর্থের দিকে তাকালে উগ্র নারীবাদের দোষারোপ বহন করতে হবে , কারণ পুরুষ শব্দের আদি অর্থ মানব, মানুষ। তবু সেই দোষারোপ খানিক নামিয়ে রাখা যাবে কাঁধ থেকে কারণ স্পষ্ট করে উল্লেখ রয়েছে যে এর বিপরীত শব্দ হল স্ত্রী বা নারী। হতাশ হতে হয় এই ভেবেই যে স্ত্রী বা নারী আসলে কেবল পুরুষের বিপরীত নয়, বিপরীত মানুষেরও। আর তাই পূর্ব পুরুষ, বা প্রথম পুরুষ এই সকল কথার মধ্যে আর যাই হোক নারীর কথা নেই। কারণ স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে, নারী এর বিপরীত। 

এই আলোচনার শেষ শব্দ ‘বীর’। মনে রাখা ভালো ‘বীর পুরুষ’ কবিতার কথা  

“ভাগ্যে খোকা ছিল মায়ের কাছে”। 

আবারও বীর শব্দের আদি অর্থ খুঁজতে গিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না আর কোনো। অর্থ যেমন শক্তিমান, শ্রেষ্ঠ, উত্তম তেমনই ‘বীর্য যুক্ত’। ফলে এই বীর রসে স্বাভাবিকভাবেই অধিকার মেলে না নারীর। 

এই আলোচনা চলতেই থাকবে, যা বিস্তারিত ভাবে ধরার চেষ্টা করেছি আমার গবেষণায়। এই লেখায় তার কিঞ্চিত আভাস রাখবার চেষ্টা করলাম। নারী দিবসে নানান বিষয় নিয়ে কথা হবে, লেখা হবে, সেই-ই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের ভাবতে হবে কোন ভাষায় লেখা হবে তা?  কোন ভাষায় কথা হবে? সে ভাষা কি আদপেও এই সাম্যের লড়াইকে ধারণ করতে প্রস্তুত? নারী দিবসের গায়ে এইটুকু প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিলাম, ভাষার। ভাবনার। কারণ ভাষাই পারে সাম্যকে বহন করতে, সমর্পণকে ধারণ করতে। 

 

  • লেখাটির অংশবিশেষ আমার মূল গবেষণাপত্র ‘মেয়েদের ছেলেধরা – বাংলা ভাষায় লিঙ্গবৈষম্যের রাজনীতি ও পিতৃতন্ত্রের পুনর্নিমাণ’ (২০২০)  থেকে নেওয়া

লেখিকা সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার শূন্য দশকের বিখ্যাত কবি। জন্ম ১৯৮৯, ভবানীপুর, কলকাতা। কবিতা লেখার শুরু বালিকাবেলা থেকেই। রয়েছে সাতটি কবিতার বই। প্রথম বই ২০১০ এ। পেয়েছেন ‘কৃত্তিবাস পুরস্কার’ ও ‘সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার’। বর্তমানে বাংলা ভাষার অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। লেখাপড়া করেছেন তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে ও গবেষণা মানবীবিদ্যায়। গবেষণার বিষয় – বাংলা ভাষায় লিঙ্গবৈষম্যের রাজনীতি। কবিতা , গদ্য, ভাষা বিষয়ক প্রবন্ধের পাশাপাশি বর্তমানে যুক্ত হয়েছেন চিত্রনাট্য লেখবার কাজেও।  

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More