‘মাল্যবান’ সম্পর্কে যে দু’একটি কথা আমি জানি

গৌতম মিত্র
মাল্যবান বলছে,স্বপ্নের কী জানেন ফ্রয়েড? হ্বিয়েনা শহরে বসে গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে স্নায়ুরোগীদের স্বপ্ন নিয়ে কোনও স্বপ্নতত্ত্ব বানানো যায় না।চড়কের মাঠে কোনওদিন তো আর যাবেন না ফ্রয়েড সাহেব,স্বপ্নের আর কী বুঝবেন।কী ভয়ঙ্কর রকমের আধুনিক একজন চিন্তক জীবনানন্দ দাশ, ভেবে অবাক হই।
ঠিক এখানেই ফ্রয়েডেরই শিষ্য কার্ল গুস্তাভ ইয়ুঙও ফ্রয়েডের থেকে আলাদা হয়ে যান। ইয়ুঙও মনে করেন,শুধু ব্যক্তি নির্জ্ঞান নয়, স্বপ্নের ক্ষেত্রে যৌথ নির্জ্ঞানেরও একটি ইতিবাচক ভূমিকা আছে। আর সেজন্যই কি জীবনানন্দ চড়কের ইঙ্গিত করেন? ফলিত বিজ্ঞানের ফ্রয়েড থেকে তত্ত্ব বিজ্ঞানের ইয়ুঙ কি বেশি কাছের হবে জীবনানন্দর?
আমাদের কাছে জীবনানন্দ দাশের উপন্যাসগুলো দুর্বোধ্য মনে হয়, একঘেয়ে লাগে, রিপিটেডিভ মনে হয়। একটু লক্ষ করে দেখবেন, জীবনানন্দ দাশের অনেক গল্প-উপন্যসের পটভূমি ঠিক যেন বাস্তব নয়, স্বপ্ন-স্বপ্ন। ডায়েরিতে আমরা দেখি, অনেকসময়ই কী স্বপ্ন দেখছেন তার এন্ট্রি করে রাখছেন। মোদ্দা কথা,জীবনানন্দ খুব সচেতন ভাবে স্বপ্ন নিয়ে ভাবছেন। এতে আমার কোনও সংশয় নেই।
ফ্রয়েড পড়েছেন কোনও সন্দেহ নেই,জীবনানন্দ কী তবে ইয়ুঙও পড়েছেন। সেয়ানা লোকটা যে আর কী কী করেছেন, তার ঠিকুজি তৈরি করা এখনও শুরুই হয়নি! ইয়ুঙ তো তাঁর ‘সাইকোলজি অ্যান্ড লিটারেচার’ সন্দর্ভে বলেছেন:
“মহৎ লেখার গঠন-কাঠামো অনেকটা স্বপ্নের মতো।”
আসলে আমরা তো নিজেদের স্বপ্নকেও বিশ্লেষণ করিনা। করতে শিখিনি। নিজেদের স্বপ্নও তো আমাদের কাছে একপ্রকার দুর্বোধ্য। আমরা কীভাবে জীবনানন্দ দাশের চরিত্রের মনোপ্রকৃতি বা লিখন-বিশ্বকে বিশ্লেষণ করব! কিংবা ডায়েরির এন্ট্রিগুলি ধরে ধরে জীবনানন্দর মানসিক গঠনকে বুঝে নেব!
‘মাল্যবান’-এর কথাই যদি ধরি,আমাদের কী মনে হয় না,মাল্যবান তো বটেই,উৎপলাও জীবনানন্দ দাশেরই একটি সত্তা! ইয়ুঙ দেখিয়েছেন দৈহিক গ্রন্থিগত কারণে, পুরুষের নারী সত্তা ও নারীর পুরুষ সত্তা আছে।পুরুষের নারী সত্তাকে বলে এ্যানিমা ও নারীর পুরুষ সত্তাকে বলে এ্যানিমাস।এই এ্যানিমা ও এ্যানিমাসের নির্জ্ঞান প্রভাবে মনের গঠন তৈরি হয়। এছাড়া আছে ব্যক্তির নির্জ্ঞানের ছায়াছন্ন দিক ও নির্জ্ঞান মানসের আত্মন.

 

‘মাল্যবান’-এ যে রূঢ়,কঠোর, নির্দয় ও মুখরা উৎপলাকে দেখি তা কি জীবনানন্দ দাশেরই আরেকটি সত্তা নয়!
নিজের অজান্তেই, তিলতিল করে, প্রথমে মুনিয়া,তারপর Y ও শেষে লাবণ্যর দ্বারা নিষ্পেষিত ,ব্যবহৃত ও প্রত্যাখ্যাত হতে হতে উৎপলা চরিত্রটি গড়ে তুলেছেন!
বিস্মিত হয়ে একটি গল্পে আমরা দেখি, একজন মহিলাকে কীভাবে সামান্য লুচি-মাংসের আস্বাদ, ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া আসন্ন যৌনতার আস্বাদকে ভুলিয়ে দেয়। জীবনানন্দর মহিলারা প্যাসিভ না অ্যাকটিভ এটা নিয়েও অনেক ভেবেছি।যেমন ‘গ্রাম শহরের গল্প’-এ শচীর আগ্রাসী ভূমিকার বিপরীতে নায়কের মনে হয়,যা একদিন উন্মুক্ত প্রান্তরে হয়েছিল তা এই ‘সোফা’-তে সম্ভব নয়!
আসলে ব্যক্তি জীবনের মহিলারা যেমন মা কুসুমকুমারী,বোন সুচরিতা,মাসী হেমন্তবালা দেবী, মেয়ে মঞ্জুশ্রী, মনিয়া, খুড়তুতো বোন শোভনা,স্ত্রী লাবণ্য, মাসতুতো বোন খুন্টি,শালী ছুটু কিংবা ব্রাহ্মসমাজের কিছু মহিলা শুধু নয়, কবির নির্জ্ঞান মানসও জীবনানন্দের অরুণিমা সান্যাল,বনলতা সেন, শেফালিকা বোস, সুরঞ্জনা, উৎপলা, বিভা, কল্যাণীদের গড়ে তুলেছে।
এত গূঢ় ও তির্যক উচ্চারণ বাংলা কবিতা কি আর কখনও দেখেছে, যেখানে এখন শুধু শেল্ফের চার্বাক ও ফ্রয়েড জানে,কবির প্রক্ষিপ্ত সত্তা সুজাতাকে ভালোবেসেছিল কিনা। নির্জ্ঞান এমনই গোঁয়ার,কোনও বিধিনিষেধ মানে না,তল্লাট তার দখলে নেওয়া চাই।
সত্যিই তো! জীবনানন্দ দাশের মনে হবে,স্বপ্নের কী জানেন ফ্রয়েড! পিকাসোর আগে একজন পিকাসো ছিলেন, আইনস্টাইনের আগে একজন আইনস্টাইন, জীবনানন্দ দাশের আগে একজন জীবনানন্দই শুধু ছিলেন।
ইতিহাস যেখান থেকে শুরু হয়।
কুন্দেরার মতে সেই ইতিহাসের ‘এইচ’ বড়ো অক্ষরের।
২.
জীবনানন্দ দাশ মনে করতেন জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’-এর নেপথ্যে প্রেরণার জায়গাটি প্রচলিত ধারণার হোমারের ‘ওডিসি ‘ নয় বরং দান্তের ‘ইনফার্নো’। এত কনফিডেন্স কোথা থেকে পান জীবনানন্দ?
কনফিডেন্স পান, কেননা আমরা দেখি ১৯৩২-এর ডায়েরিতে লাবণ্যর সঙ্গে মলি ব্লুমের তুলনা করছেন। ১৯৫৩-এর ডায়েরিতে প্রিয় বইয়ের তালিকায় জয়েসের  ‘ফিনেগানস ওয়েক’-এর নাম।
বাসে বাড়ি ফিরতে ফিরতে জীবনানন্দ তাঁর লেখায় বিদেশী লেখকদের প্রভাবের প্রসঙ্গে ভূমেন্দ্র গুহকে বলেছিলেন, ‘যে-সব সাহচর্য তোমাকে ঘিরে থাকে,তারা তোমার চারিত্র্যও কোনও- না কোনও ভাবে কাটে-ছাঁটে; তুমি যে-সমাজে বাস করতে শুরু কর,তার কথ্যভাষার টানটাও তোমার জিভে এসে যায়।’এমনই ‘জিভে এসে যাওয়া’ একটি বিষয় হয়তো ‘ইউলিসিস’।
যদি নিজের মতো করে একবার বুঝে নিতে চাই,জীবনানন্দের কোনও বইতে কি তবে ‘ইউলিসিস’-এর কোনও প্রভাব আছে, তবে জীবনানন্দের যে বইটির কথা প্রথমেই মনে পড়বে তা ‘মাল্যবান’।
যখন ডায়েরি উদ্ধারের কাজ করছি, টানা প্রায় ৮ বছর, ডায়েরি লেখার ধরন দেখে কেন জানি না বারবার মনে হতো, নিছক প্রচলিত অর্থে ডায়েরি এটি নয়, একটা ‘গ্র্যান্ড ন্যারিটিভ’ বা ‘গ্র্যান্ড ডিজাইন’-এর পরিকল্পনা এর পেছনে কাজ করছে।নয়তো কেন, কোনও কলমের বিজ্ঞাপন, টুথপেষ্টের বিজ্ঞাপন, কোন উড়োজাহাজ কোন সাগরে ভেঙে পড়লো, বাইবেলের অসংখ্য মিথ, বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন চরিত্র, কলকাতার দোকানের নাম, ভিখারি ও কুষ্ঠ রোগীকে নিয়ে স্টাডি, মেসের সহবাসীদের অনুপুঙ্খ বর্ণনা, আত্মীয়স্বজনদের চরিত্র বিশ্লেষণ, ঘড়ির কাঁটা বন্ধ হয়ে যাওয়া, জুতোর ফিতে ছিঁড়ে যাওয়া… এমন প্রায় ৩০০০০ এন্ট্রি কেউ ডায়েরিতে লিখে রাখবেন?
সেসময় কত দিন যে আমার জাতীয় গ্রন্থাগারের সংবাদপত্র আর্কাইভে কেটেছে! প্রতিটি বিজ্ঞাপন,সংবাদ,বক্স নম্বর তারিখ অনুযায়ী মিলিয়ে দেখছি,ডায়েরিতে কীভাবে ট্রান্সফরমেশন হয়েছে খবরটি। আমার সম্প্রতি প্রকাশিত বইতে তার উদাহরণ আছে। তবে আমার সংগৃহীত খাতা ভর্তি তথ্যের কাছে তা সামান্য।
শুনেছি জেমস জয়েস ‘ইউলিসিস’ লিখতে গিয়ে সংগৃহীত তথ্যের প্রায় বেশির ভাগটাই বাতিল করেছিলেন বা তার পরিমাণ ছিল অকল্পনীয়।ভলটার বেনিয়ামিনের কথাও জানি।যখন ‘আর্কেড প্রজেক্ট ‘ লিখছেন,রোজ বাসে করে লাইব্রেরি গিয়ে বিভিন্ন তথ্য কার্ডে টুকে আনছেন।সেখানে কত মাইনর লেখকদের কথা।জীবনানন্দও হয়তো বিশ্বাস করতেন সভ্যতা কোনও মহাফেজখানায় থাকে না,থাকে রাস্তার ঠোঙায়-কাগজকুড়ানি বালকের ঝুলিতে।তাই লিখতে পারেন:
“The morning began with that গালের মাংস খাওয়া দাঁত বের করা কুষ্ঠরোগিনী and ছালার চট গায়ে কুষ্টরোগী”
“ময়লা জামা and ধোপার জামা in reference to শীত।”
“ধা করে কিছু হয় না–Telegram অবধি না,wait করতে হয়,খসড়া টাইপ রেজিস্ট্রার… “
“মাথার চুল বাছাচ্ছিল(Niren): not a sexual passion?এই জিনিসটা বউয়ের থেকে চাকর দিয়েই বোধ হয় ভালো হয়।”
৩.
কোথায় মিল তবে জয়েসের ‘ইউলিসিস’-এর সঙ্গে জীবনানন্দের ‘মাল্যবান’-এর। আজ সেই বিষয়ে বিস্তারিত লিখব না।শুধু একটা কথা বলি। কারও কি কখনও মনে হয়েছে ‘মাল্যবান’ নামটি কেন বেছে নিলেন জীবনানন্দ? বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন নাম কেউ কখনও আগে বা পরে ব্যবহার করেছেন? ১৯৪৮- এ লেখা উপন্যাসের এই নাম আমাদের বিস্মিত করে না?

 

আমরা জানি জয়েসের ‘ইউলিসিস’ নামকরণের পেছনে, এলিয়ট যাকে বলেছেন ‘পৌরণিক পদ্ধতি'( The Mythical Method) কাজ করেছে। হোমারের ‘ওডিসি’র একটি প্রধান চরিত্র ওডেসিয়াস যার ল্যাটিন নাম ইউলিসিস। এই পৌরাণিক চরিত্রটির সমান্তরালে জয়েস তাঁর নায়ক লিওপোল্ড ব্লুমকে রেখে কাহিনীর তাঁত বুনেছেন।সময় কাল চরিত্র কাহিনী-প্রবাহ এভাবেই গড়ে উঠেছে।
জীবনানন্দ তবে কোথায় পেলেন মাল্যবান? আমরা জানি তিন ভাইয়ের কথা। মালী,সুমালী ও মাল্যবান।এই সুমালী রাবণের মামা। রামায়নের চরিত্র। সেখানে মাল্যবানের কথাও আছে। পাতালে থাকতেন।(তাই কি মাল্যবান নীচের ঘরে থাকে,মাঝেমধ্যে ওপরতলায় উৎপলার ঘরে যায়)। লোকটা জীবনানন্দ। এত সহজ তো নন।
ভবভূতি একজন দলছুট নাট্যকার। অষ্টম শতকের। সমকালে যথেষ্ট নিন্দিত হয়েছেন তাঁর প্রথাবিরোধী লেখার জন্য।জীবনানন্দ উল্লেখিত ‘বিদর্ভ’ নগরে তাঁর বাস ছিল। তাঁর একটি নাটক ‘মহাবীরচরিত’। সেই নাটকে মাল্যবান রাবণের মন্ত্রী। এবং যথেষ্ট মানসিক জটিলতা আছে এই মাল্যবান চরিত্রটির। জীবনানন্দ নিশ্চয়ই ‘মহাবীরচরিত’ পড়েছেন।জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর অনুবাদও করেছেন এই নাটক। কে বলতে পারে ‘মাল্যবান’-এর নেপথ্যে প্রেরণা হিসেবে ‘মহাবীরচরিত’ কাজ করেনি! জয়েসের মতো।
মানুষটা ধুরন্ধর জীবনানন্দ দাশ। ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যায় না লোকটার মতিগতি।মার্কেজ যেমন আদরের ‘গাবো’, আমাদের জীবনানন্দ আদরের ‘মিলু’। লোকটার অ্যামবিশন ছিল আকাশছোঁয়া। লিখছেন, শেক্সপিয়ার যা লিখতে পারেননি আমি তা লিখব। তাঁর ভাবনার ঘাট কোয়ান্টাম মেকানিক্স,প্রকৃতির আত্মঘাতী তত্ত্ব ও নক্ষত্র বিজ্ঞানে বাঁধা। চিন্তক ছিলেন মানুষটা।
ফকনার জয়েস সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেছিলেন ‘genius who was electrocuted by the divine fire’।জীবনানন্দ সম্পর্কে এই কথাটি তো আমিও বলতে চাই।
৪.
মাল্যবান বইটা পড়তে পড়তে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। মুগ্ধতা ফুরোয় না। বারবার ফিরে আসি বইটির কাছে। একটি গ্রন্থের পরিসরে এত গোলকধাঁধা, গলিঘুঁজি  ও ঠারেঠোরে কথা ‘ইউলিসিস’ বাদ দিলে অন্য কোনও বইতে পাই নি। দুটো শব্দের অন্তর্বর্তী শূন্যতা, নির্জ্ঞানের বর্ণমালা, গুহাবাসী একজন ভাষাশ্রমিকের সংলাপ বইটির পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়।একটি পৃষ্ঠা ওলটাতে যেন এক যুগ কেটে যায়।আমি চুপ করে বসে থাকি।
ওপরের ঘরের বাথরুমে মাল্যবানকে স্নান করতে দেয় না উৎপলা। মাল্যবানকে স্নান করতে হবে বাড়ির অন্য মহিলাদের নজরের সামনে নীচের চৌবাচ্চায়। ‘এক-গা লোম নিয়ে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে বৌ-ঝিদের আনাগোনা চোখ-মারা মুখ-টেপার ভেতর’ স্নান করতে ঠিক জুত লাগছে না মাল্যবানের। যেন “শিবলিঙ্গের কাক-স্নান হচ্ছে”। উত্তরে উৎপলা বলে,”তা হলে তুমি কি বলতে চাও দরজা জানলা বন্ধ ক’রে এক-হাত ঘোমটা টেনে তুমি ওপরের বাথরুমে গিয়ে ঢুকবে, আর মেয়েমানুষ হয়ে আমি নিচের চৌব্বাচায় যাব–ওপরের বারান্দায় ভিড় জমিয়ে দিয়ে ওদের মিনসেগুলোকে কামিখ্যে দেখিয়ে দিতে?”
আমরা ‘কামিখ্যে’ আর ‘শিবলিঙ্গের কাক-স্নান’ শব্দদুটোর খাদের দিকে পা বাড়াই। কেননা এই অধ্যায়ে অতঃপর আমরা ‘চৌবাচ্চার ছ্যাঁদার ন্যাতা খসিয়ে’,’খসাবেই তো’,’এক ফোঁটা জলের জন্য মেয়েমানুষের কাছে’,’বাসি জল খালাস’,’একটা পুকুর-ডোবা পেলেই ঝাঁপিয়ে জাপটে চান’ ইত্যাদি শব্দ-খনি আবিষ্কার করব।’চৌবাচ্চা’ কি যৌনতার প্রতীক, নাকি মাল্যবানের নির্জ্ঞানের পাতালঘর?
ফ্রয়েড নয় হয়তো ইয়ুং-কেই বেশি মান্যতা দিয়েছেন জীবনানন্দ দাশ।’মাল্যবান’-এই তো আছে,’স্বপ্নের কী জানেন ফ্রয়েড?’ ইয়ুং-এর মতে মানস(Psyche)  ভৌতসত্তা(Physical Reality) থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এক স্বনিয়ন্ত্রিত সত্তা। আর এই সমগ্র মানসকে নির্জ্ঞান ও সংজ্ঞান এই দুই অংশে বিভাজন করা যায়। নির্জ্ঞানকে ইয়ুং আবার দুই অংশে ভাগ করেছেন।ব্যক্তি-নির্জ্ঞান(personal unconscious) ও জাতি- নির্জ্ঞান(racial unconscious)। ‘মাল্যবান’  যদি ব্যক্তি-নির্জ্ঞানের দৃষ্টান্ত হয় ‘রূপসী বাংলা’ তবে জাতি- নির্জ্ঞানের উন্মোচন হতে পারে। তবে আমার মনে হয় যতটা আলাদা বলা হচ্ছে ততটা আলাদা করা বুঝি সম্ভব নয়।দুই মেরুতে চলাচল হতেই পারে।
সম্ভব নয় জেনেও ইয়ুং মানস-প্রকারের কতগুলো ভাগ করেছেন ‘ব্যক্তি-আমি'( persona), ‘গুপ্ত-আমি’ (shadow), ‘পরিপূরক-নারী’ (anima), ‘পরিপূরক-পুরুষ'(animus) ,  প্রবীণ প্রাজ্ঞজন (old wise man), মাতৃকা(great mother),  ও  ‘আত্মন'(self)।
‘মাল্যবান’ উপন্যাসে মাল্যবান ভাবে,’এ হচ্ছে উপচেতনার সঙ্গে চেতনার ঝগড়া, অবচেতনা ঘুমের দিকে টানে,মৃত্যুর দিকে; চেতনা অবহিত হতে বলে, ঢেলে সাজাতে বলে…’। অমরেশ সাইকেলে তালা লাগিয়ে দোতলায় উৎপলার ঘরে যায়। ওপরের ঘরে এস্রাজ বেজে গেছে, গান হয়ে গেছে, তারপর দেড়ঘন্টা চুপ মেরে আছে সব। অমরেশের সাইকেলটা খুব বেশি ‘ঝিকঝিক চিকচিক’ করছে? ‘তালা খসিয়ে’ সাইকেলটা নিয়ে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে মাল্যবানের।’ছায়া যেমন সারাদিন দেহের আগে-পিছে ছুটে নাগাল পায় না’দেহের,রাতের অন্ধকারে শরীরের সঙ্গে ‘বিনিঃশেষে’ মিশে যায়,তেমনিভাবে এসে পড়ে অমরেশ। অমরেশ কি তবে ইয়ুং কথিত ‘গুপ্ত-আমি’ বা ছায়া।
নাকি মাল্যবান নিজেই সেই ছায়া। ছায়া তৈরি করে তার চরিত্রের ঔদাসীন্যের, গুটিয়ে থাকার,ন্যাতানো স্বভাবের বিপরীতে তার অবদমিত প্রবল বর্হিমুখী যৌনচেতনার কাটাকুটি খেলায়? অমরেশের লম্বা চেহারায় ‘ঠাঁট’ আছে,তার আহিরিটোলার ঘাটে সাঁতার কাটা দেখতে দলবেঁধে ‘ভদ্দরলোকের মেয়ে’রা যায়,’বেশ্যেরা’ যায়। অমরেশ রাত বারোটায় উৎপলার ঘর থেকে নেমে যাওয়ার পর উৎপলা মাল্যবানের মুখোমুখি হয়ে বলে,’না,না,আর বসতে পারছি না। দুটো পায়ের গিঁটে গিঁটে ব্যথা করছে’।সদ্য সমাপ্ত যৌনমিলনের এর চেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত কোনও মহিলা দিতে পারে কি!
যেহেতু আমরা জীবনানন্দ বা মাল্যবানের চোখ দিয়ে উৎপলাকে দেখছি, এখানে যেমন জীবনানন্দের এ্যানিমা বা নারী সত্তা কাজ করেছে তেমনি আবার উৎপলার অন্তর্নিহিত এয়ানিমাস বা পুরুষ সত্তাও কাজ করেছে।  ‘মাল্যবান’ উপন্যাসে ছড়িয়ে থাকা অজস্র উদাহরণ দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা যায়। জীবনানন্দ মাল্যবান ও উৎপলাকে যৌনকাতর করে গল্প শুনিয়ে। ‘খুব বেশি জাগিয়ে দিয়েছে উৎপলাকে আজ,খুব বেশি নিজে জেগে পড়েছে মাল্যবান আজ।’ তো কী সেই গল্প? এক রূপসী যুবতীকে কবর দেওয়া হলে সন্ধ্যার পর একটি লোক মাটি খুঁড়ে শবদেহ চুরি করে। এত শবকাম (necrophilia)-এর গল্প! এহেন গল্প শুনে মাল্যবানকে উৎপলাকে যৌনকাতর হতে হচ্ছে?  আর তা সহ্য করছে বাংলা ভাষা!
‘মাল্যবান’-এর পরতে পরতে এই কুয়াশা,হারিয়ে যাওয়া পথ,পথের ধারে খাদ। ‘খড়খড়ে আগুন’ হল মাল্যবানের বিবাহ আর ‘অগ্নি-ডাইনি’ হল মাল্যবানের স্ত্রী উৎপলা। খুব সহজ নয় জীবনানন্দ নামক ফাঁদ। একেকসময় মনে হয় জীবনানন্দ ‘মাল্যবান’ লিখছেন, না মাল্যবান ‘জীবনানন্দ’-কে লিখছেন। মাল্যবান কোনওমতেই জীবনানন্দের আত্মজীবনী নয়। লাবণ্য দাশের আশঙ্কার কোনও যুক্তি ছিল না। বাস্তবের সঙ্গে হুবহু মিল থাকলেও নয়। আসলে তো ‘মাল্যবান’-এ বাস্তবে কিছু ঘটেই না, বা যা ঘটে তা ছায়া-আবছায়া।
আসলে তো স্বপ্ন। ইয়ুং-এর স্বপ্ন। নিজস্ব স্বপ্ন। ফ্রয়েডের শিষ্য হয়েও ইয়ুং চ্যালেঞ্জ করেছিলেন ফ্রয়েডকে। জীবনানন্দ ফ্রয়েড পড়েই ফ্রয়েডকে বাতিল করছেন।জীবনানন্দ জানতেন ফ্রয়েড সাহেবের ‘আত্মন'(self) আর আমাদের ‘আত্মা’ এক নয়।আমাদের একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে। আত্মার বিবর্তনের ইতিহাস। আছে যৌনতার নিজস্ব  ইতিহাস।
গ্রাম মফস্বলের ১৩/১৪ বছরের মেয়েদের নিজস্ব একটা যৌনচেতনা গড়ে ওঠে যা কোনও ‘হাইট রিপোর্ট’ দিয়ে বা মিলেট দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। রবীন্দ্রনাথের নিজের স্ত্রীর বয়স বা মেয়েদের কত বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছেন তা নিয়ে ভাবতে বসলে ফ্রয়েড সত্যিই কাজ করবে না।

 

মনোবিদরা রে রে করে তেড়ে আসবেন, যদি বলি,’মাল্যবান’ বাংলাভাষায় রচিত একটি অতি মূল্যবান মনঃসমীক্ষণের বই।তবে যাই হোক আমি মানি, আমার অতি প্রিয় একজন লেখকের মতো, বাংলাভাষার ১০০ টা শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের মধ্যে জীবনানন্দের সবগুলো উপন্যাস অন্তর্ভুক্ত হবে আর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ৫০ টা উপন্যাসের মধ্যে ‘মাল্যবান’।
শেষে ‘ইউলিসিস’- এর শেষ ‘ মাল্যবান’-এর শেষ পংক্তি পাশাপাশি রাখি-
“…I yes to say yes my mountain flower and first I put my arms around him and yes and drew him down to me so he could feel my breasts all perfume yes and his heart was going like mad and yes I said yes I will yes.”
(Ulysses , James Joyce)

 

“কোনোদিন ফুরুবে না শীত,রাত আমাদের ঘুম?
ফুরুবে না।ফুরুবে না।
কোনোদিন ফুরুবে না শীত, রাত, আমাদের ঘুম?
না,না,ফুরুবে না।
কোনোদিন ফুরুবে না শীত,রাত,আমাদের ঘুম?
ফুরুবে না।ফুরুবে না।কোনোদিন–“(‘মাল্যবান’, জীবনানন্দ দাশ)

 

কোনও তুলনা নয়।কোনও খোঁজ নয়।শুধু পাশাপাশি রাখা।একটা হ্যাঁ-এর পাশে একটা না।

 

 

 

(লেখক- কবি ও প্রাবন্ধিক, দুই দশক ধরে জীবনানন্দ চর্চায় মগ্ন)
You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More