অচলায়তনে ধাক্কা

অংশুমান কর

২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআই(এম) সহ বামদলগুলি কেমন ফল করবে তা জানার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবেই আগামী ২ মে পর্যন্ত। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বামেদের অংশগ্রহণ প্রবলভাবে আলোচিত হচ্ছে। আব্বাসের সঙ্গে জোট করা ঠিক হল নাকি ভুল, ব্রিগেডে আব্বাসের সরব উপস্থিতি বামদলগুলির পালে হাওয়া যোগাবে নাকি কেড়ে নেবে– এই আলোচনার আগেও তুমুল তর্কবিতর্ক শুরু হয়েছিল ব্রিগেডের প্রচারে টুম্পা গানটির প্যারডি নিয়ে। গোঁড়া বামপন্থীরা তো বটেই, এমনকি সিপিআই(এম) দলটিরও সমর্থকদের অনেকেই মেনে নিতে পারেননি এই প্যারডি। একটা বেশ ‘গেল গেল’ রব উঠেছিল। হেমাঙ্গ-সলিলের উত্তরাধিকারের এই হাল হল কেন– উঠেছিল এই প্রশ্ন। এরপরে শুরু হল ফ্ল্যাশমব। জয়রাজ আর অর্কর যুগলবন্দির সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে নেচে উঠল এক ঝাঁক তরুণ-তরুণী। কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে দাপাল তারা, ব্রিগেডের প্রচারে। টুম্পা গানটি অপছন্দ করেছিলেন যাঁরা তাঁদের অনেকের এইবার ভাল লেগে গেল এই উপস্থাপনা। কেননা, তাঁদের মনে হল যে, হেমাঙ্গ-সলিলের উত্তরাধিকারের যথার্থ আধুনিকীকরণ হয়েছে এই নির্মাণে। কিন্তু এল সমালোচনাও। যাঁরা অংশ নিলেন এই প্রচারে সেই ছেলেমেয়ে থেকে জয়রাজ-অর্কর শ্রেণি-অবস্থান নিয়ে উঠল কিছু কথা। প্রশ্ন উঠল যে, মেহনতী মানুষদের নিয়ে যে গান রচনা হল, সেই গানে মেহনতী মানুষদের অংশগ্রহণ তেমনটা হল কই! একটি দু’টি মেহনতী মানুষের মুখ এই নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে বটে, তবে তা কি যথেষ্ট হল ওই প্রযোজনাটির শ্রেণি-অবস্থান নির্ণয়ে? বিতর্ক চলতে থাকল। বিতর্কের মধ্যেই এইবার চলে এল প্রচারের নতুন অস্ত্র। লোকাল ট্রেনে, পাবলিক টয়লেটে বশীকরণের যে সব হলুদ-গোলাপি বিজ্ঞাপন সাঁটা থাকে, সেই ফর্মটিকে ব্যবহার করে বামজোটকে ভোট দেওয়ার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হল। একটি বিজ্ঞাপনে যেমন বলা হল, সাম্প্রদায়িক বশীকরণ থেকে, জাতপাতের জাঁতাকল থেকে মুক্তির অব্যর্থ ওষুধ হল বাম জোটকে দেওয়া ভোট। সন্দেহ নেই যে, প্রচারের এই ধরণটি অভিনব। কিন্তু আবারও প্রশ্ন উঠছে যে, এ কি তরলীকরণ নয়? শেষে বামপন্থীদেরও ভরসা করতে হচ্ছে বশীকরণের বিজ্ঞাপনের ফর্মে?

প্রচারের এই সবক’টি ধরণ ব্যক্তিগতভাবে আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। সিপিআই (এম) -এর প্রার্থী তালিকায় যেমন এক ঝাঁক নতুন মুখের দেখা মেলায় বোঝা গেছে যে, পালে লেগেছে নতুন হাওয়া, তাকে আবার অমল ধবল করে তুলতে, তেমনই প্রচারের এই নতুন ধরণগুলি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, অচলায়তনে জোর ধাক্কা লেগেছে। সামগ্রিকভাবে যদি প্রচারের এই সমস্ত আঙ্গিক এবং উপাদানগুলিকে লক্ষ্য করা যায় খুঁটিয়ে তাহলে বোঝা যায় যে, যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করে এবার প্রচারে নেমেছে সিপিআই(এম)। প্রচারের নতুন এবং অভিনব পন্থাগুলিকে ব্যবহার করে চেষ্টা করছে সমাজের নানা অংশের মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে। প্রচার আর একমুখী নেই। যে-অংশের মানুষ যে-ভাষা বুঝবেন, প্রচারে সেই অংশটির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে সেই ধরনের ভাষা ও উপাদান। যেমন, টুম্পা গানটির প্যারডিটি নিশ্চয়ই লক্ষ্য রেখেছিল তরুণ প্রজন্মের সেই অংশটির দিকে, যাঁরা দাদাদের নিষেধ সত্ত্বেও মূল টুম্পা গানটি শুনেছেন এবং সেই গানের তালে কোমরও দুলিয়েছেন।

এইখানে বলে রাখা ভাল যে, বামপন্থায় বিশ্বাসী সমাজের কিছু বিশিষ্ট মানুষের মূল টুম্পা গানটির সঙ্গে নাচের দৃশ্যও ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। মানে, বলার কথা এইটিই যে, মূল গানটিকেও বামপন্থীদের সকলে অশ্লীল মনে করেননি। এর একটা কারণ এই যে, গানটির মধ্যে যেমন একটি নিগূঢ় অন্তর্ঘাত আছে, তেমনই আছে যাকে বলা হয় ‘পিওর ননসেন্স’, সেই ননসেন্স, আছে ভাসানের গানে কোমর দোলাতে পারার মতোই ছন্দতরঙ্গ। মূল গানটিকেও তাই বাতিল করে দেওয়ার আগে একবার গানটির জনপ্রিয়তার কারণ নিয়ে ভাবা যেতেই পারে। আর, এই গানটির প্যারডিতে, সত্যি বলতে কি, অশ্লীলতার নামগন্ধও ছিল না। বরং ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য। হয়তো আর একটু সবল হতে পারত প্যারডিটির লিরিক। কিন্তু সেই কাজটিও মনে হয় ইচ্ছে করেই সম্পাদিত হয়নি, কেননা, একটু দুর্বল লিরিক সমাজের সেই অংশটির কাছে বেশি আবেদন রাখে যাঁরা সুমনের নামই শোনেননি, কিন্তু বাঁকুড়া-পুরুলিয়ায় স্থানীয়ভাবে নির্মিত ভাসানগীতি শোনেন, কোমরও দোলান তার ছন্দে। ফ্ল্যাশ মব আবার সমাজের এই অংশটির মানুষের জন্য নির্মিত হয়নি। স্পষ্টতই, গণসঙ্গীতে যাঁদের কান অভ্যস্ত আবার যাঁরা হার্ড রকও শোনেন আর দেখেন, এই দৃশ্যশ্রাব্য নির্মাণটির লক্ষ্য ছিলেন তাঁরাই। বশীকরণের বিজ্ঞাপন যেমন সমাজের সেই অংশটির মানুষের জন্যই নির্মিত, যাঁরা ট্রেনে বা পাবলিক টয়লেটে সাঁটানো এই ধরনের বিজ্ঞাপনগুলির ওপর ভরসা রাখেন। বলা বাহুল্য, তাঁদের চেতনা এক প্রবল ধাক্কা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই বিজ্ঞাপনের আকারে নির্মিত প্রচার-উপাদানগুলি ধাক্কা দিচ্ছে এলিট বামপন্থী চেতনাতেও।

শ্রেণির প্রসঙ্গটি যাঁরা তুলছেন, তাঁরা রীতিমতো চিন্তিত হয়েই যে এই প্রসঙ্গটির অবতারণা করছেন, বুঝতে পারছি তা। কিন্তু, শ্রেণির ধারণাটিও তো আর অনড় নেই। আমাদের মতো একটি দেশে, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে নিয়ত শ্রেণিবিন্যাসের পরিবর্তন ঘটেই চলেছে। এই প্রথম, মনে হচ্ছে, তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরে, এ বঙ্গে প্রায়োগিক পরিসরেও শ্রেণির এই চলমানতাকে মান্যতা দিচ্ছে সিপিআই(এম)। আরও একটি কথা এই প্রসঙ্গে বলাই যায়। পশ্চিমবঙ্গের অতীত কিন্তু দেখিয়েছে যে, শ্রেণি অবস্থানের নিরিখে এমনকি যাঁকে মনে হচ্ছে শত্রু, সেই ব্যক্তিটির মধ্যেও বামপন্থী চেতনা কিন্তু থাকতেই পারে। এঁদেরকে অনেকেই ‘সুখী বামপন্থী’ বলেছেন, নবারুণের মতো কেউ কেউ বারবার আক্রমণের নিশানা বানিয়েছেন এঁদের। কিন্তু, এই অংশটির বামপন্থী চেতনার একটি মূল্য আছে। কৃষকদের আন্দোলনকে যাঁরা অতীতে এবং বর্তমানে সমর্থন জানিয়েছেন বা জানাচ্ছেন তাঁদের অনেকেই দামি গাড়ি, জুতো ছাড়া এক পাও নড়তে পারেন না। তাই বলে তাঁদের সেই সমর্থনকে ‘দেখনদারিত্ব’ বলা সঙ্গত হবে না। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে এই অংশটির মানুষের ভোটের একটা বড় অংশ কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছিলেন। তবে, এখনও পর্যন্ত যা প্রচার করেছে সিপিআই(এম) তাতে মনে হচ্ছে যে, দলটি এই অংশের মানুষের কাছে নিজেদের বার্তাকে নিয়ে যাওয়ার মতোই (কিংবা হয়তো বা তার চেয়েও একটু বেশিই) গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে অন্ত্যজ মানুষের কাছে, তাঁদের ভাষায়, তাঁরা বুঝতে পারেন এমন ফর্ম ব্যবহার করে দলের কথা পৌঁছে দেওয়া। এটি একটি অত্যান্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, এই বাংলায় আগামীদিনে বাম-আন্দোলনের রূপরেখায় যে পরিবর্তন আসতে চলেছে তার ইঙ্গিত কিন্তু এবারের নির্বাচনে সিপিআই (এম)-এর  প্রচারের পদ্ধতি থেকে বেশ বুঝতে পারা যাচ্ছে। 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More