শুনেছি ‘পৃথিবী আবার শান্ত হবে’- কিন্তু কবে?

পিয়ালী দত্ত চক্রবর্তী

আমার সদ্য দশম শ্রেণিতে ওঠা কিশোর পুত্রকে গত দু’বছর ধরে একটু একটু করে বদলে যেতে দেখছি। কেউ বলতে পারেন বদল তো হবেই। একটা বাচ্চা বড় হচ্ছে, সেক্ষেত্রে তার শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন তো অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু আমি সেই বদলের কথা বলছি না। সেটা একটা স্বাভাবিক পরিবর্তন। কিন্তু এই গত দু’বছর ধরে যে অস্বাভাবিক কিছু আচরণগত পরিবর্তন বাচ্চাদের মধ্যে লক্ষ্য করেছেন প্রায় প্রত্যেকটি বাবা মা, আমি সেই পরিবর্তনের কথা বলছি। সেটা মূলতঃ হয়েছে তাদের এই দীর্ঘ ঘরবন্দি জীবনের জন্য। তাদের স্বাভাবিক বিকাশ অনেকাংশেই ব্যাহত হয়েছে এবং হচ্ছেও। আরও কতদিন চলবে সেটাও আমরা কেউ জানিনা। বিশেষ করে সেইসব বাচ্চারা, যারা তাদের বয়ঃসন্ধিক্ষণে রয়েছে।

এই বাচ্চারা স্কুলে শুধুই পড়াশোনা করতে যায় না। স্কুল তাদের কাছে বৃহত্তর জগতের আঙিনায় পা রাখার সামাজিক শিক্ষাও দেয়। সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে মনের কথা খুলে বলার প্রয়োজন হয়, যা তার ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার প্রাথমিক স্তর। যেটা কোনোদিনই মা বাবার পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। আমার মনে পড়ে আমাদের নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ার দিনগুলো। একদিন স্কুলে যেতে না পারলেই প্রাণটা যেন হাঁসফাঁস করত। মনে হত কতদিন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়নি, কথা হয়নি। আজ দীর্ঘ সময় ধরে ঘরবন্দি এই ছোটো ছোটো মনগুলির মনের কথা, যেটা আমাদের অর্থাৎ বড়োদের জানা এবং বোঝার আজ বড়ো বেশি প্রয়োজন।

আবার যে কবে স্কুলে যাব!

আমরা সম্ভবত মানব ইতিহাসের কঠিনতম সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি। কোভিড অতিমারী সারা পৃথিবীতে লক্ষাধিক প্রাণ কেড়েছে, প্রতিনিয়ত কেড়েই চলেছে। ভারতের অবস্থা এখন করুণতম। সর্বত্র মৃত্যুমিছিল আর কাজ হারিয়ে যাওয়া মানুষের যন্ত্রণা! চরম আতঙ্ক চারপাশে!
আমাদের ছাত্রছাত্রীদের অবস্থা তো বলার নয়। কতোদিন স্কুলে যা‍ইনি। বন্ধুদের সামনাসামনি দেখিনি। অনলাইনে পড়াশোনা কি আর স্কুলের মতো মজার হয়? কতোদিন স্কুলের মাঠে ঘাসের ওপর বসে সবাই মিলে গল্প করিনি, টিফিন ভাগাভাগি করে খাইনি! বাবা অফিস থেকে ফেরেন সারা মুখ মাথা ঢেকে। মা কে তো চিনতেই পারি না। আমার মা স্বাস্থ্য পরিষেবায় যুক্ত। কতোদিন মাকে জড়িয়ে ধরিনি! মা বারণ করে। আচ্ছা সত্যি কি ঐ ভাইরাস মাকেও ঘিরে রেখেছে? মা ভ্যাকসিন নিয়েছে বলে হয়তো এখনও শরীরে ঢুকে খুব একটা সুবিধে করতে পারেনি।
আমার খুউব ইচ্ছে করে একদিন সবাই মিলে স্কুলে যাই। স্কুলের মাঠে গিয়ে মাস্কগুলো সব ছিঁড়ে ফেলে সবাই মিলে প্রাণ খুলে হা হা করে হাসি, বুক ভরে নিঃশ্বাস নিই। বন্ধুদের জড়িয়ে ধরি। সবাই মিলে মাঠ জুড়ে খেলা করি। ক্লাসরুমে বেঞ্চে বসে সবাই মিলে টিফিন ভাগ করে খাই। সিদ্ধার্থর মায়ের হাতে বানানো লুচি তরকারি নিয়ে সবাই কাড়াকাড়ি করুক আবার, যেমনটা করতো আগে। পড়া না পারলে দিদিমণি শাস্তি দিলেও একটুও মন খারাপ করব না। কতদিন যে শাস্তি পাইনি। দিদিমণিকে সামনাসামনি পেয়ে ওনার বকুনি খেতেও খুব ভালো লাগবে! আবার হুড়োহুড়ি করে বাড়ি ফেরার সময় আইসক্রিম খাবো, চুল টানাটানি করবো নিজেদের মধ্যে, ঠেলাঠেলি করে স্কুল বাসে উঠে একটা সিটেই চাপাচাপি করে দু’জন দু’জন করে বসবো, পুরোনো ঝগড়া সব কিছু ভুলে গিয়ে!
সত্যিই কি এমন দিন আর আসবে? যেদিন বাতাসে আর করোনা ভাইরাস থাকবে না। অন্যান্য ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াগুলো আগের মতোই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করবে। মাঝে মাঝে অবশ্য আমাদের একটু জ্বালাতন করবে, কিন্তু সেটা প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয় দেখাবে না।
কিন্তু আমরা ছোটোরা যে কবে ভ্যাকসিন পাবো তাও আবার অনিশ্চিত। বড়োরাই সবাই এখনও ভ্যাকসিন পেল না। এই অনিশ্চিত দিন খুব শিগগির কেটে যাক। কোনও এক মন্ত্রবলে এই মহামারীর অবসান হোক। আমরা আবার আগের মতো স্কুলে যাই। পৃথিবী আগের মতো হয়ে যাক, এটাই একমাত্র প্রার্থনা। কবে যে আবার এই পৃথিবীটা সুস্থ হবে সেই আশায় দিন গুনছি জানলার বাইরের আকাশ আর বাড়ির সামনের মাঠটার দিকে তাকিয়ে। কতোদিন যে ফুটবল খেলতে গিয়ে ধুলো মাখিনি ওই মাঠের!

 

লেখিকা পেশায় একজন বিজ্ঞানী যিনি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ কেমিক্যাল বায়োলজি (সি. এস. আই. আর, ইন্ডিয়া), যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োকেমিস্ট্রি ও ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সে পি. এইচ. ডি। কলকাতার এক ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থায় (অ্যালবার্ট ডেভিড লিমিটেড) রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্ট উইং এ গবেষক বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত। এর বাইরেও সমকালীন সমাজ থেকে তুলে আনা বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে সরস ও প্রাঞ্জল ভাষায় লেখালেখির অভ্যাস। তাঁর বেশ কিছু লেখা আন্তর্জাতিক ওয়েবম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।

 

Leave a comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More