গাঁধীর নামে রিগিং প্রথম নির্বাচন ও সুকুমার সেন

পার্থজিৎ চন্দ

ভোটের ঢাকে কাঠি পড়লেই আমাদের দেশে শয়ে শয়ে হাজারে হাজারে মহাত্মাদের দেখা মিলতে শুরু করে। রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী মানেই অসাধু এমন ভাবনার কারণ নেই। অন্তত ভাবতে ভাল লাগে যে এই বিপুল সংখ্যক নেতা-নেত্রীদের মধ্যে বেশিরভাগই মহান। জনগণের সেবার জন্য তারা শপথ নিতে চলেছেন। 

কিন্তু প্রতিটি নির্বাচনে আরেকজন ‘মহাত্মা’র ছায়া অনিবার্যভাবে দীর্ঘ হয়ে দেখা দেয়। তিনি আর কেউ নন, ভারতের আত্মার মধ্যে প্রবেশ করা ‘বাপুজী’; কারণটা যদিও বেশ অদ্ভুত। আমাদের দেশের ভোটের প্রথম রিগিং সম্ভবত তাঁর নামেই হয়েছিল।

গল্পটা অনেকের জানা, বহু যায়গায় প্রায় একই ভাষ্য সামান্য এদিক-ওদিক করে শোনা ও পড়া। দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন, এক নেতা গ্রামের গরিবগুর্বো নিরক্ষর মানুষগুলোকে এই বলে তাঁর পক্ষে ভোট দিতে প্রভাবিত করেছিলেন যে, ব্যালট-বাক্সের ভিতর ‘গাঁধীবাবা’ বসে আছেন। তিনি দেখছেন কে কাকে ভোট দিচ্ছে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে এটিই প্রথম ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’ হয়তো।

পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি’র দিকে কম আক্রমণ ছুটে যায়নি স্বাধীনতার পর থেকে; এটিকে ‘শুয়োরের খোঁয়াড়’ থেকে শুরু করে ‘গণতন্ত্রের বধ্যভূমি’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে কেউ কেউ। কিন্তু যাবতীয় সমালোচনা একদিকে সরিয়ে রেখেও বলা যায়, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের মধ্যে এমন এক শক্তি আছে যা বছরের পর বছর নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করে, শাসক ও বিরোধীপক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয় ভোটপ্রার্থীদের। 

কিন্তু সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের প্রথম সাধারণ নির্বাচন ঠিক কেমন ছিল? একটি নবীন স্বাধীন রাষ্ট্র, বয়স মাত্র তিন বছর। সে কোমর বেঁধে নেমে পড়ল সাধারণ নির্বাচন করবে বলে। আজ সে দিকে তাকালে সে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টিকে ‘অষ্টম আশ্চর্য’ বলে মনে হয়। মনে হয় প্রথম চিফ ইলেকশন কমিশনার শ্রী সুকুমার সেন নিশ্চিত ‘দেবদূত’ ছিলেন, ভারতের প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের মাধ্যমে নির্বাচন পদ্ধতির যে মহাবৃক্ষ, তা নিজে হাতে রোপন করেছিলেন তিনি। একদিন অমর্ত্য সেনের মতো সংশয়ী মানুষও যে লিখবেন, ‘প্রয়োগের অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও গণতন্ত্র ভারতকে স্থৈর্য এবং নিরাপত্তা দান করেছে। ১৯৪৭-এ স্বাধীনতা অর্জনের সময়ে অনেক নিরাশাবাদীদের ভয় ছিল এ সম্বন্ধে। …অথচ অর্ধশতাব্দী পরে আমরা দেখতে পাই যে, ভালমন্দ মিলিয়ে বিচার করলে গণতন্ত্র এখানে কার্যকর হয়েছে’, তার স্ক্রিপ্ট যেন রচিত হতে শুরু করেছিল সুকুমার সেনের হাত ধরেই।

সুকুমার সেন

এবার প্রথম সেই সাধারণ নির্বাচন ‘গ্রাউন্ড রিয়ালিটি’ ও রোমহর্ষক বেশ কিছু তথ্য ও বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া যাক। 

জনপ্রতিনিধিত্ব আইন বলে ঠিক হল, একুশ বছর (১ জানুয়ারি, ১৯৪৯ হিসাবে) বা তার উর্ধে সবাই ভোটাধিকার পাবে। সমস্যা তীব্র হয়েছিল ভারতবর্ষের পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। দেশভাগ ও শরণার্থীদের স্রোতের কারণে বদলে যাচ্ছিল জনবিন্যাস। ইলেক্টোরাল রোলস বা ভোটার-লিস্টে নাম নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে এ এক পাহাড়প্রমাণ সমস্যা।

কিন্তু সেখানেও ভারতের প্রথম নির্বাচন প্রক্রিয়া কতটা সার্থক তার কিছু নমুনা দেওয়া যাক। ১৯৫১ সালের সেন্সাস অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ছিল পঁয়ত্রিশ কোটি ছেষট্টি লক্ষের কিছু বেশি। তার মধ্যে ২১ বছর বা তার থেকে বেশি বয়সি নাগরিক আঠারো কোটির সামান্য বেশি। এর মধ্যে সতেরো কোটি বত্ত্রিশ লক্ষের নাম নথিভুক্ত হয়েছিল। এটা ঠিক যে সত্তর লক্ষ মানুষের নাম ভোটার-লিস্টে ওঠেনি। কিন্তু মনে রাখা উচিত, দেশ প্রায় তিন-টুকরো হয়ে গেছে… উদ্বাস্তু মানুষের স্রোত সীমান্ত পেরিয়ে যাতায়াত করছে। 

আরেকটি মজার ঘটনা (কিন্তু সামাজিক দিক থেকে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ) ঘটেছিল। সুকুমার সেন ও নির্বাচন কমিশনের নজরে পড়েছিল দেশের এক বড় অংশের মহিলারা নিজেদের নামে ভোটার-লিস্টে নথিভুক্ত হচ্ছেন না। তারা নথিভুক্ত হচ্ছেন ‘ওমুকের স্ত্রী’ বা ‘ওমুকের মা’ হিসাবে। সুকুমার সেন ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের কড়া নির্দেশ দিলেন এই বিষয়টি বন্ধ করতে। 

এর ফলে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল, সেন্সাস রিপোর্ট অনুযায়ী সে সময়ে প্রায় আট কোটি মহিলা ভোটার। ‘নিজের নাম পরিচয়ে’ নথিভুক্ত হবার বাধ্যবাধকতার কারণে প্রায় আঠাশ লক্ষ মহিলার নাম ভোটার লিস্টে নথিভুক্ত হল না। ভারতবর্ষের কী বিপুল সংখ্যক মহিলা যে ‘ওমুকের স্ত্রী’ বা ‘ওমুকের মা’ হয়ে বেঁচে ছিলেন (এবং আজও থাকেন) তার এক দলিল হতে পারে এই তথ্য।

স্বাধীন দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন (হাউস অফ পিপল) শুরু হয়েছিল ২৫ অক্টোবর,১৯৫১ ও শেষ হয়েছিল ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। বিশাল দেশের কোণে কোণে বুথ তৈরি করতে হবে, মূল ভূখণ্ড থেকে কয়েকশো মাইল দূরের দ্বীপে পাঠাতে হবে ব্যালট বক্স। সে এক দক্ষযজ্ঞ… পৃথিবী এর আগে এত বড় নির্বাচন আর দেখেনি। 

সব মিলিয়ে এক লক্ষ বত্রিশ হাজার পাঁচশো ষাট’টি ভোট-গ্রহণ কেন্দ্র ও দু’লাখের কাছাকাছি বুথ। 

প্রিসাইডিং অফিসার নিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ মজার এক মানদণ্ড ধার্য করা হয়েছিল। সরকারি বা সরকার-পোষিত কোনও কর্মচারী মাসিক ষাট টাকা বা তার বেশি মাইনে পেলে তাকে প্রিসাইডিং অফিসার হিসাবে নিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। 

সুকুমার সেনের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন কমিশন যে বাস্তব জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছিল তা ভারতের গণতন্ত্রের পক্ষে আশীর্বাদ হয়েছিল।

সে সময়ে পুরুষ ও নারীর সাক্ষরতার হার যথাক্রমে ২৭ ও ৯ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে শুধু প্রার্থীর নাম ব্যালট পেপারে ছাপা থাকলে ভোটদাতাদের একটা বড় অংশ দিশাহারা হয়ে পড়বে। তাই কমিশন প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য আলাদা আলাদা ব্যালট বক্স ব্যবহার করবার উদ্যোগ নিয়েছিল।

 সর্বভারতীয় দলগুলির ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক ‘সিম্বল’ ও আঞ্চলিক দল, নির্দল প্রার্থীদের জন্য পৃথক সিম্বল (আবেদনের ভিত্তিতে) অনুমোদন করে নির্বাচন কমিশন। তথ্যের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যেতে হয়, প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ডাকা মিটিং-এ কংগ্রেস, ফরোয়ার্ড ব্লকের দুটি গ্রুপ, অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা, কিষাণ মজদুর প্রজা পার্টি, অখিল ভারতীয় রামরাজ্য পরিষদ ও সোসালিস্ট পার্টির নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন। 

প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য নিজস্ব প্রতীক সাঁটা পৃথক পৃথক ব্যালট বক্স ব্যবহার করা হয়েছিল প্রথম নির্বাচনে।

যে দলগুলি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে তাদের পাঠক সহজেই চিহ্নিত করতে পারছেন। কিন্তু এক সময়ে নিশ্চয় এই দলগুলির বেশ রমরমা ছিল। পরে বেশ কয়েক কিস্তিতে বেশ কয়েকটি বামপন্থী পার্টি, সিডিউলড কাস্টস ফেডারেশন-সহ চোদ্দটি দলকে জাতীয় স্তরের প্রতীক দেওয়া হয়। 

প্রায় চার লক্ষ রিম কাগজ খরচ করে ব্যালট পেপার ছাপা হয়েছিল, দেশজুড়ে ব্যবহৃত হয়েছিল প্রায় পঁচিশ লক্ষ ব্যালট বক্স। 

কিন্তু এত বড় নির্বাচন, সারা পৃথিবী চেয়ে আছে নবীন এক রাষ্ট্রের দিকে, সেখানে একটি দুটি মজার ঘটনাও ঘটে ছিল। পাঞ্জাবে সম্ভবত কোনও এক বিচিত্র খেয়ালের বশবর্তী হয়ে এক প্রিসাইডিং অফিসার বরফপাতের অজুহাতে ভোট বন্ধ করে দেন। পরে দেখা যায় যে এমন কোনও ঘটনা সেদিন ওখানে ঘটেনি। পাঞ্জাবের আরেক প্রিসাইডিং অফিসার একজন প্রার্থীর জন্য নির্ধারিত ব্যালট বক্স বুথে রাখতেই ভুলে যান।

কিন্তু ভোট হবে অথচ পশ্চিমবঙ্গ ‘রেকর্ড’ করবে না এটা হতেই পারে না। সে ভোটেও আমাদের ‘রেয়ার’ কিছু অর্জন (অ্যচিভেমেন্ট!) আছে। যেমন নূরপুরের একটি বুথে একটিও ভোট পড়েনি। এবং সারা দেশের নিরিখে শতাংশের হিসাবে সব থেকে বেশি ভোট পড়েছিল শীতলা এম.ই স্কুলে’র বুথে। তেরশো ছেষট্টি জন ভোটারের মধ্যে তেরশো একষট্টি জন ভোট দিয়েছিলেন। এই সময়ে হলে নিশ্চিতভাবে অবাধ ছাপ্পার অভিযোগ উঠত।

নির্বাচনের খুঁটিনাটি নিয়ে কাজ করেন এমন একজন এই তথ্য শুনে হাসতে হাসতে বলছিলেন, শীতলা এম.ই স্কুলে এ ভোট পড়ার পিছনে দুটি কারণ থাকতে পারে – হয়তো রটিয়ে দেওয়া হয়েছিল ভোট না-দিলে মা শীতলা রাগ করবেন অথবা এই ভোটের হার পশ্চিমবঙ্গের মানুষের চিরাচরিত রাজনীতি-সচেতনতাকে সূচিত করে। যদিও নূরপুরের হিসাব শুনে তিনি চুপ করে গেছিলেন। 

প্রথম নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা অধিকাংশ দলের আজ আর কোনও অস্বিত্ব নেই। প্রতীকের পথ দিয়ে বহু গাড়িঘোড়া চলে গেছে। ফরওয়ার্ড ব্লক(রুইকার গ্রুপ)-এর প্রতীক ছিল ‘হাত’। ক্রমে সেই ‘হাত’ কংগ্রেসের প্রতীক হয়ে উঠল। সিডিউলড কাস্টস ফেডারেশনের ‘হাতি’ হয়ে উঠল বহুজন সমাজ পার্টির প্রতীক। 

প্রথম নির্বাচনে যে দলের অস্তিত্ব ছিল না সেই দল পরবর্তী সময়ে প্রবল ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছে, এমন নজির ভুরি ভুরি।

এটিই ভারতীয় গণতন্ত্রের সব থেকে বড় সম্পদ ও শক্তি। 

১৯৫১-৫২ সালে দাঁড়িয়ে দেশজোড়া এমন একটি নির্বাচন আয়োজন করার কৃতিত্ব চাঁদে রকেট পাঠানোর থেকে কম কিছু নয়। সেই ভিতের উপর ভর করে পৃথিবীর সব থেকে বড় গণতন্ত্রের ভোটপ্রক্রিয়া আজও সম্পন্ন হয়। 

মানুষের অধিকার প্রয়োগের এই নিদর্শন বিরল। এমন একটা কাজের পুরোধা হিসাবে শ্রী সুকুমার সেন’কে কি মরণোত্তর ‘ভারতরত্ন’ প্রদান করা যায় না?  

 

তথ্যসূত্র- ১।Report on the First General Election in India(1951-52)/ Election Commission of India

২।উন্নয়ন ও স্ব-ক্ষমতা / অমর্ত্য সেন

   

লেখক পার্থজিৎ চন্দ পেশায় স্কুলশিক্ষক। হাওড়ার শিল্পাঞ্চলে জন্ম, বড় হয়ে ওঠা। কবি, প্রাবন্ধিক ও আলোচক হিসাবে সুপ্রসিদ্ধ।  সাহিত্যকীর্তির জন্য পেয়েছেন ‘বড়ু চণ্ডীদাস’ পুরস্কার সহ একাধিক সম্মাননা।প্রকাশিত হয়েছে বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ। এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু গল্প ও সমাজ-সাহিত্য বিষয়ক গদ্য। অবসর বিনোদন- গান শোনা ও ছবি দেখা

 

Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More