কবিতার পথ থেকে গদ্যের প্রান্তরে, বিদগ্ধ শঙ্খ ঘোষ

উত্তম দত্ত

এক অলোকসামান্য স্নিগ্ধ ও মরমি গদ্যের জাদুকর শঙ্খ ঘোষ। তাঁর কবিতা আমাদের শিখিয়েছে প্রেম, প্রতিবাদ ও আত্মব্যবচ্ছেদের ভাষা কতখানি লক্ষ্যভেদী হতে পারে। আর তাঁর গদ্য পাঠ করে আমরা অনুভব করতে শিখি জীবনের বহুবর্ণময় বিস্তারকে কীভাবে প্রসাদগুণের আধারে ব্যক্ত করা সম্ভব। সেদিক থেকে মনে হয়, কবি শঙ্খ ঘোষ এবং গদ্যশিল্পী শঙ্খ ঘোষ একে অপরের পরিপূরক। তাঁর কবিতায় রয়েছে প্রগাঢ় দ্যোতনাময় বীজ আর গদ্যের ছত্রে ছত্রে খুঁজে পাই তারই অপার বিস্তার। কোমলে ও কঠিনে অপরূপ সেই বিস্তার।

অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষকে কবিতা পড়ে ঠিক চেনা যায় না। কবিতা বৈদগ্ধ্য প্রকাশের উপযুক্ত ক্ষেত্রও নয়। কিন্তু গদ্যকার শঙ্খ ঘোষকে পাঠ করে বিস্ময়ের সঙ্গে ভেবেছি বৈদগ্ধ্য ও রসবোধের স্নিগ্ধতা কত অনায়াসে পাশাপাশি বসবাস করতে পারে। যাঁরা শুধুই তাঁর কবিতার মুগ্ধ পাঠক তাঁরা তাঁর বিপুল গদ্য সংগ্রহ না পড়লে এক অসামান্য অমৃতভাণ্ডার থেকে আজীবন বঞ্চিত থেকে যাবেন।কোন্ রহস্যময় সূচনাবিন্দু থেকে একটি কবিতা উঠে আসে তা পাঠকের কাছে জানানোটা কবির কাজ নয়। এ নিয়ে বিস্তর বিতণ্ডা হয়েছে। পাঠকদের বোধ ও ব্যাখ্যার বিচিত্র ভিন্নতা ও বৈপরীত্য দেখে নিরুপায় রবীন্দ্রনাথকেও একদা ‘সোনার তরী’ কাব্যের নাম-কবিতাটির একটি মর্মসংকেত দিতে হয়েছিল। শঙ্খ ঘোষের বিখ্যাত কবিতা ‘যমুনাবতী’ পাঠ করে এক তরুণ পাঠকের মনে হয়েছিল : ‘কোনো সত্য ইতিহাসের বিন্দুকে হয়তো-বা ছুঁয়ে আছে ওই লেখা। সে ইতিহাস কি জানা যায় কোনওভাবে? ‘

তারই উত্তরে যেন লেখা হয়ে যায় ‘কবিতার মুহূর্ত’। এই গ্রন্থ কোনওমতেই কবিতার নোটবই নয়, ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ নয়। কেবল আলতো হাতে এক একটি কবিতার উৎসমুখ খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা : ‘সম্ভাব্য পাঠককে মনে রাখতে বলি, সে-পথের অনুষঙ্গে যে কথাগুলি এসেছে এখানে, সেটাই কবিতাগুলির পরিচয় নয়, সে হল এর সূচনাবিন্দু মাত্র।’

ভাগ্যিস এই সূচনাবিন্দুগুলি হাতে পেয়েছি আমরা, নইলে কি কোনওমতে জানা সম্ভব ছিল ১৯৫১ সালে খাদ্যের দাবিতে কোচবিহারে এক ষোল বছরের কিশোরীর পুলিশের হাতে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই রচিত হয়েছিল : ‘নিভন্ত এই চুল্লিতে মা একটু আগুন দে/আরেকটুকাল বেঁচেই থাকি বাঁচার আনন্দে!’

যাদবপুরের প্রিয় ছাত্র তিমিরবরণ সিংহ নকশাল আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের অপরাধে পুলিশের হাতে মার খেয়ে মারা গেলে কবির চোখ ময়দানের মাটিতে পড়ে থাকা কৃষ্ণচূড়ার মধ্যে খুঁজে পায় তিমিরের ছিন্ন শির : ‘ময়দান ভারী হয়ে নামে কুয়াশায়/ দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্চ/ তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া? / নিচু হয়ে বসে হাতে তুলে নিই/ তোমার ছিন্ন শির, তিমির।’ কবিতাটির সূত্র ধরিয়ে দিতে গিয়ে শঙ্খ ঘোষ তাঁর অননুকরণীয় গদ্যে লিখেছেন : ‘নির্বিশেষ আবার বিশেষ হয়ে ওঠে। একা তিমিরই তো নয়, কয়েক বছরের মধ্যে কতই-তো এমন অবিশ্বাস্য নৃশংসতা ঘটে গেল আমাদের অন্ধ ইতিহাসে, আরো কত এমন কিশোরযুবার কাহিনী চাপা পড়ে রইল সময়ের ডানায়।’

এরকমই আরও বহু পরিচিত ও প্রিয় কবিতার উৎসমুখ অক্লেশে খুলে দেওয়া হয়েছে ‘কবিতার মুহূর্তে’। যাঁরা কবিতার সৃজন-রহস্যকে চিরকাল পাঠকের কাছে গোপন করে রাখতে চান, তাঁদের অবশ্যই একবার অন্তত পড়ে দেখা উচিত এই চমৎকার বইটি।

শঙ্খ ঘোষের গদ্য অনেকের মতোই আমারও অত্যন্ত প্রিয়। বারংবার মুগ্ধ হয়েছি তাঁর গদ্যের ঈর্ষণীয় প্রসাদগুণে। ভ্রমণকাহিনি বা গমনকাহিনি থেকে আরম্ভ করে সুখপাঠ্য সব স্মৃতিচারণা পড়ে মনে হয়, কবিতার পাশাপাশি পুরোদস্তুর ঔপন্যাসিক হতে চাননি বলে আমাদের আর কোনও দুঃখ নেই, আক্ষেপ নেই। তাঁর সমস্ত গদ্যসম্ভার যেন এক শাশ্বত আনন্দনগরী। ওরকম গম্ভীর ও স্বল্পবাক মানুষের মধ্যেও যে একজন সুরসিক মানুষ বাস করেন সেকথা অজানাই থেকে যেত ‘ইছামতীর মশা’ নামের গদ্যসংকলনটি না পড়া থাকলে।

দুই কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে শঙ্খ ঘোষ সস্ত্রীক ট্রেনে চড়ে যাচ্ছিলেন আলমোড়া পাহাড় দর্শনে। সংরক্ষিত কামরা। চারটি টিকিট। কোলের শিশুটির জন্যেও টিকিট কাটা হয়েছে, যাতে একটু হাত পা ছড়িয়ে যাওয়া যায়। কিছুদূর যাবার পরেই দেখা গেল সংরক্ষিত কামরায় হুশহাশ করে উঠে পড়ছে লোক। একজন এসে বাচ্চা মেয়েটিকে বসিয়ে দিল মায়ের কোলে। এবং নিজে বসে পড়ল সেই শূন্য আসনে। বিস্মিত কবি জানতে চান : ‘ এটা কী হলো?’
অতি অম্লান বদন থেকে উত্তর আসে : ‘জায়গা হল।’
ওটা রিজার্ভ করা আসন শুনে কামরাভর্তি আগন্তুকেরা হো হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে আরও কয়েকজন এসে বসে পড়ে সেখানে।

সেই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা নিয়ে কবির বর্ণনা এইরকম : ‘সংকুচিত হতে হতে আমরা পিষে যাই কোণের দিকে, আর ভোর হবার আগে, কাঠগোদামে গাড়ি ঢোকবার অনেক অনেক আগে, লক্ষ করি যে আমি আছি দাঁড়িয়ে, আর কন্যাদুটি চেপ্টে আছে তাদের মায়ের কাঁখে।’
ব্যক্তিগত দুর্দশাকে নিয়ে এমন নৈর্ব্যক্তিক হিউমার সৃষ্টি করা নিঃসন্দেহে বড় শিল্পীর লক্ষণ।

শঙ্খ ঘোষের সমস্ত গদ্য রচনাতেই লেখকের প্রসন্ন মনের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রয়েছে। যখন তিনি গভীর জ্ঞানের কথা ও নিবিড় ভাবের কথা বলেন তখনও মনে হয় না একজন পণ্ডিতের লেখা পড়ছি। সততই মনে হয় একজন অনুদ্ধত বন্ধুর মুখোমুখি বসে বিচিত্র বিষয়ের আলোচনা শুনছি, যাঁর পঠনপাঠন ও জীবনকে দেখার পরিধি অনেক বেশি, অনেক বড়। অথচ তাঁর কথা বলার ভাষা বন্ধু অলোকরঞ্জনের মতো দুরূহ নয়। একসময় রেডিওতে সমীক্ষা পাঠ করতেন দুই বন্ধু। তা শুনে অলোকরঞ্জনের মা একবার একটা অদ্ভুত কথা বলেছিলেন : ‘অলোক বলে শক্ত শক্ত শব্দ আর তুমি সহজ সহজ, কিন্তু তোমাদের কারও কথাই যে বুঝতে পারে না কেউ’।

কবি অলোকরঞ্জন

এই যে আপাত সহজ অথচ ভাব ও চিন্তার গভীরতায় ওজস্বিনী, তেমন গদ্যও প্রভূত পরিমাণে পাওয়া যায় শঙ্খ ঘোষের রচনায়। বলা বাহুল্য তেমন গদ্যের সংখ্যাই বেশি। কালের মাত্রা ও রবীন্দ্রনাটক, উর্বশীর হাসি, ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ, এ আমির আবরণ, নির্মাণ আর সৃষ্টি, কবির অভিপ্রায়, ছন্দোময় জীবন, দামিনীর গান, কল্পনার হিস্টিরিয়া, নিঃশব্দের তর্জনী, শব্দ আর সত্য, ছন্দের বারান্দা, জার্নাল, ঘুমিয়ে পড়া এলবাম… এইসব মহার্ঘ সৃষ্টিতে ওই জাদুকরি গদ্যের নিত্য সাক্ষাৎ পাওয়া যায়।

নিঃশব্দের তর্জনীতে মাঝে মাঝেই পাই উপমাময় কাব্যিক গদ্য : ‘কেউ কারো চোখে তাকাই না কিন্তু সবাই সবার মুখ দেখি। আর সেটা খুব জানা হয়ে গেছে বলে, যেমন করে বিকেলের সাজ সাজে মেয়েরা, আমরা সব লোকপুরাণের গুঁড়ো মেখে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসছি। হতে চাচ্ছি স্বয়ং পুরাণ।… তাই মনে হয় লিখতে হবে নিঃশব্দে কবিতা, এবং নিঃশব্দ কবিতা। শব্দই জানে কেমন করে সে নিঃশব্দ পায়। ঐশ সূত্র না ছিঁড়েও। তার জন্য বিষম ঝাঁপ দেবার দরকার আছে দুঃসহ আড়ালে থেকে।’

এই গদ্য পড়ে মনে হয়, এর জন্য পাঠককে অনেকখানি তৈরি হতে হবে। এই ভাষাকে আত্মীকরণ করতে হলে দীর্ঘ অনুশীলন প্রয়োজন। এই আশ্চর্য ঐশ্বর্যময় গদ্যেই শঙ্খ ঘোষের যথার্থ পরিচয় নিহিত আছে। এসব পড়তে পড়তে সহসা মনে পড়ে কৌতুকের ছলে বলা অলোকরঞ্জনের মায়ের কথাগুলি।

কবিতায় চিরাচরিত ছন্দের প্রতি যাঁদের পক্ষপাতিত্ব তাঁরা ছন্দের সামান্য অনটনে ও নতুন নিরীক্ষায় আহত হন। লরেন্স তাঁদের উদ্দেশ্যে সক্ষোভে বলেছিলেন : ‘Well I don’t write for your ears.’
আর শঙ্খ ঘোষ খুব শান্ত ও স্থির ভঙ্গিতে বললেন : ‘ছন্দের সমস্যা আসলে ব্যক্তিত্বেরই সমস্যা, সে তো কেবল ছান্দসিকের শুকনো পুঁথি নয়। ব্যক্তিরই মুক্তির জন্য ছন্দের ক্রম-উন্মোচনের প্রয়োজন ঘটে, দরকার করে তার অনড় চলৎশক্তিহীনতার বাইরে বেরিয়ে আসা।’ ( নিঃশব্দের তর্জনী)

এই গদ্য অধ্যয়নের জন্য দীক্ষিত পাঠকের প্রয়োজন। একজন ধীশক্তিসম্পন্ন সাহিত্যের অধ্যাপকের মননের ও বোধের বিচ্ছুরণ ফুটে ওঠে এইসব লেখায়।

তরুণ কাব্যপিপাসু যাঁরা, তাঁদের কাছে শঙ্খ ঘোষের সাহিত্য-বিষয়ক নিবন্ধগুলি এক একটি আলোকিত মাইলস্টোন। কবিতায় তো নয়ই এমন কী নিবন্ধেও তিনি একটিও অতিরিক্ত শব্দ, যা বাহুল্য মনে হতে পারে, ব্যবহার করেন না। শব্দের এমন সুচারু এবং সংযত প্রয়োগও তরুণ কবিদের জন্য শিক্ষণীয়। শুধু তরুণ কেন, দীর্ঘকাল ধরে যাঁরা কবিতার উপল-সৈকতে সময় যাপন করেছেন তাঁরাও আপাদকুন্তল ঋদ্ধ হবেন তাঁর কবিতা ও সাহিত্যবিষয়ক রচনাগুলি পাঠ করলে :

★ ‘ কবির কাছে তাঁর কবিতা হলো নিজেকে জানবার পথ, জীবনকে জানবার পথ, তাঁর আমি আর না-আমির মধ্যে একটা সম্পর্ক বুঝে নেবার পথ। এই পথের মধ্যে বেরিয়ে পড়লে থেকে-থেকেই দেখা দিতে পারে কোনো দ্বন্দ্ব।… এরই মধ্যে দিয়ে স্তরে স্তরে খুলে যেতে থাকে পথ। অপূর্ণ থেকে সম্পূর্ণের দিকে চলমান সেই দ্বন্দ্বের ইতিহাসই একজন কবির মনের ইতিহাস।’ (ধ্বনি-প্রতিধ্বনি)

★ ‘পূর্ণটানের একটা কোনো আকর্ষণ আছে কোথাও, তারই দিকে চলতে চাই আমরা। কিন্তু প্রতিদিনের অভ্যাসের গণ্ডি তো কেবলই বেঁধে রাখতে চায় আমাদের টুকরো টুকরো করে, ছোটো ছোটো হীনতায় তুচ্ছতায়।’ (ছন্দোময় জীবন)

এমন চমৎকার দার্শনিক উপলব্ধিকে মনোমুগ্ধকর গদ্যে অবলীলায় দীর্ঘকাল ধরে উপস্থাপন করতে পেরেছেন যিনি তাঁর নাম শঙ্খ ঘোষ। তাঁর কবিতা ও গদ্য একই সঙ্গে চিরকালের ও সমকালের। নন্দীগ্রামে গণহত্যার প্রতিবাদে তিনি সাম্মানিক সরকারি পদ থেকে সরে আসতে দ্বিধা করেননি। গুজরাটের বীভৎস দাঙ্গার সময় ‘ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা’ নামক নিবন্ধে তিনি বলিষ্ঠ ভাষায় অকুতোভয়ে লিখেছিলেন :
‘গুজরাত জ্বলছে। আমরা জানি, গুজরাতের মানুষদের সঙ্গে সঙ্গে সে-আগুন নেভাবার দায়িত্ব আজ আমাদেরও; এই রাজ্যের মানুষদেরও। কিন্তু এই নেভানো বলতে কী বুঝব আমরা? কতদূর বুঝব? এই মুহূর্তে বন্ধ হোক এ গণহত্যা, একথা বলবার জন্য সাধ্যমতো চাপ তৈরি করতে পারি আমরা, দেশের কোটি কোটি মানুষ। অপরাধীদের কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা হোক বলে দাবি করতে পারি আমরা সবাই।… এইআমাদের আশু করণীয় আজ।’

লক্ষ করুন এই প্রতিবাদী নিবন্ধের ভাষার আগ্নেয় সারল্য। আমাদের মনে পড়ে যায় এভাবেই একদিন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে পৌষ উৎসবের ভাষণে জাপানি সৈন্যদের চিনের প্রতি আক্রমণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেছিলেন : ‘আমাদের মেশিনগান নেই কিন্তু আমাদের মন আছে। তার শক্তি যতটুকুই হোক তাকে আমরা মহতের দিকে প্রয়োগ করব।’

সেদিন জাপানি কবি নোগুচিকে তিনি টেলিগ্রাম করে লিখেছিলেন : ‘আমি জাপানিদের ভালোবাসি কিন্তু তাদের যুদ্ধজয়ের সাফল্য কামনা করতে পারি না। অনুশোচনার মধ্যে দিয়ে তাদের প্রায়শ্চিত্ত হোক।’

সামাজিক সংকটের আগুনকে আড়াল করে যে সব কবি এসকেপিস্টের মতো প্রেম, প্রকৃতি ও আত্মগত সংকটের মধ্যে ডুবে থাকেন শঙ্খ ঘোষ তাঁদের দলভুক্ত নন। তিনি আমাদের জাগ্রত বিবেক। তিনি সংগ্রামী মানুষের কানে কানে তূর্যনাদ উচ্চারণ করে চলেছেন নির্ভয়ে। আর অত্যন্ত লক্ষণীয় যে সেই তূর্যনাদের ভাষা মাটি ও রৌদ্রের মতো সরল সুন্দর ও সবল। সৈনিকের পোশাকের মতো ভারমুক্ত সেই ভাষা :
‘ধ্বংসকে বিধিলিপি ভেবে আমরা চুপ করে থাকব না আর।’

বস্তুত শঙ্খ ঘোষ আমাদের ‘সব পেয়েছির দেশ’। তিনি আমাদের আত্মার শান্তি প্রাণের আরাম। তাঁর গদ্য ও কবিতার জগৎ সব শ্রেণির পাঠকের জন্য উন্মুক্ত, অবারিত। যাঁর যেমনভাবে খুশি, যাঁর যতদূর সাধ্য ততখানিই অবগাহন করতে পারেন শঙ্খ-সমুদ্রে। এক সম্পূর্ণ মানুষ তিনি। কল্লোলোত্তরকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি, গদ্যকার, সাহিত্য-আস্বাদক ও সামাজিক বিবেকবান মানুষ তিনি।

কেউ যদি আজীবন শুধু কবিতার মধ্যেই ডুবে থাকতে চান তবে তিনি সেই নিমজ্জনের দুর্নিবার হাতছানি দেখতে পাবেন কবিতার পাশাপাশি তাঁর মেদুর গদ্যে। আমেরিকার আয়ওয়া শহরে একটি সাপ্তাহিক ট্যাবলয়েডে ছাপা হয়েছিল : ‘মনে রাখবেন, এখানে প্রতি দুজন লোকের মধ্যে একজন কিন্তু কবি’।

এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি লিখেছিলেন : ‘প্রতি দুজন লোকের মধ্যে একজন যে কবি হতে পারেন না, তা আমরা জানি। কয়েকটা লাইন মিলিয়ে বা না মিলিয়ে, নিজের বা অন্যের আবেগ খানিকটা প্রকাশ করতে পারলে সঙ্গে সঙ্গেই যে তিনি কবি হয়ে যান না, সবাই তা জানি। আমরা জানি চারধারে যতকিছু লেখা হয়, সেসব লেখার অনেকটা হারিয়ে যায়, অনেকটা ফুরিয়ে যায়, তুচ্ছতার মধ্যে গড়িয়ে যায় তার অনেকটাই। ব্যর্থতার এই বিপুল প্রবাহের মধ্যে অল্প কয়েকজনই হয়তো খুঁজে পান তাঁদের নিজস্ব স্বর, অনেকের মনে অনেকদিনের জন্য তাঁরা চিহ্নিত করে দিতে পারেন সেই স্বর।’ ( কবিতালেখা কবিতাপড়া)

এই কথাগুলি এমন অমোঘ দৈববাণীর মতো উচ্চারিত হলো যা আজীবন মনে গেঁথে থাকবে একজন কবিতা-মগ্ন মানুষের মনের মণিহর্ম্যে।

আবার কোনও পাঠক যদি নিছক মনোরম স্মৃতির মধ্যে পদচারণা করতে চান তাহলেও শঙ্খ ঘোষ তাঁদের ফেরাবেন না। বিপুল ও বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার এক রত্নভাণ্ডার তিনি। ‘ছেঁড়া ক্যাম্বিসের ব্যাগ’এর মতো ব্যক্তিগত গদ্যগ্রন্থ তাঁদের জন্য এক অতি প্রিয় রচনা-সংকলন।

একদিন শঙ্খ ঘোষের মাস্টারমশাই প্রমথনাথ বিশী একটি চিঠিতে ছাত্রকে জানান : ‘ বিপদে পড়েছি। অবিলম্বে তোমার সাহায্য চাই। ‘
শঙ্খ তাঁর বাড়িতে পৌঁছতেই তিনি তাঁর হাতে তুলে দিলেন তরুণ কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি হুমকি-চিঠি। সুনীলের বিনা অনুমতিতে তিনি ‘কাব্যবিতানে’ তাঁর একটি কবিতা ছেপে দিয়েছিলেন। ঘটনাচক্রে সেটা চোখে পড়ে সুনীলের। তারপরেই এই ভয়ংকর পত্রাঘাত :

‘আমি জানতে চাই, এ কবিতা আপনি কার অনুমতি নিয়ে ছেপেছেন। কোনো কবির কবিতা কোনো সংকলনে নিতে হলে কবির অনুমতি যে নিতে হয় এ নিশ্চয়ই আপনার জানবার কথা। আপনার কাছে আমি নগণ্য হতে পারি, কিন্তু মনে রাখবেন, যতই দরিদ্র কিংবা তুচ্ছ হোক, কবিমাত্রেই ব্রাহ্মণ। যে একটাও কবিতা লিখেছে জীবনে, সে কবি, তাকে অপমান করার অধিকার নেই কারো।’

চিঠির শেষে রয়েছে উকিলের চিঠি দেবার হুমকি। তাতেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন প্রমথনাথ বিশী। অগত্যা ছাত্রের সাহায্য চাই।

বাড়ি ফিরে এসে তৎক্ষনাৎ সুনীলকে খবর দেন শঙ্খ ঘোষ। সুনীল এসে সহাস্যে জানালেন : ‘ মামলার কোনো কথাই ওঠে না… ও আমি একটু মজা করবার জন্যই লিখেছিলাম, আর কিছু নয়। একটু বুঝিয়ে বলবেন।

ছাত্রও তাঁর মাস্টারমশাইকে সেই মুহূর্তে অভয় দান করে আশ্বস্ত করেন। আর দুশ্চিন্তামুক্ত প্রমথনাথ বিশী আরও একবার বললেন : ‘ ভয় দেখিয়েছে বটে, তবে দেখো, লিখেছে কিন্তু ভালো। লেখার সত্যিই হাত আছে এর।’ ( কবিমাত্রেই ব্রাহ্মণ)

এই অসামান্য স্মৃতিলেখ থেকে কত অনায়াসে উঠে এল সেকালের কবিদের পারস্পরিক সম্পর্কের রসায়ন ও গুণগ্রাহিতার পরিচয়। হুমকি চিঠির মধ্যেও একজন বর্ষীয়ান লেখক আবিষ্কার করলেন এক তরুণ লেখকের রচনার প্রসাদগুণ।
এরকম অসংখ্য রত্নসম্ভারে পরিপূর্ণ হয়ে আছে ‘ছেঁড়া ক্যাম্বিসের ব্যাগে’র মতো শঙ্খ ঘোষের আরও বহু গদ্যগ্রন্থ।

কবির নব্বইতম জন্মদিনে তাঁকে জানাই আমাদের প্রাণের ভক্তি ও মুগ্ধতাময় প্রণতি।

কবি, প্রাবন্ধিক, ছোটোগল্পকার এবং বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক। একাধিক কবিতাসংকলন ও গবেষণামূলক গ্রন্থের রচয়িতা। ইউ জি সি-র প্রাক্তন ফেলো

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More