শিক্ষা, শিক্ষিত ও মূল্যবোধ

পিয়ালী দত্ত চক্রবর্তী

এই বিপুল ভারী বিষয়টা নিয়ে লিখতে বসে, শিক্ষা.. শিক্ষিত.. মূল্য.. বোধ.. সব কটা শব্দ মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে সে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা! শেষে বাংলা অভিধান নিয়ে বসলাম। যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। ‘শিক্ষিত’র কাটা ছেঁড়া করা যায় না… মানে সন্ধি-বিচ্ছেদ আর কী!  শিক্ষিত শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ হচ্ছে, ‘শিক্ষা পেয়েছে এমন’। অর্থাৎ কেমন শিক্ষা পেয়েছেন… ‘সু’ না ‘কু’… সেটাই আসল পার্থক্য।

আমাদের পাড়ার মোড়ে ছোট্ট চায়ের দোকানের মালিক ধনঞ্জয় কাকা, ছোটো বড়ো সবারই ইউনিভার্সাল ‘ধনাদা।’ শান্ত, সদা হাস্যময় মানুষটি আমার বাবার থেকেও বয়সে কিছুটা বড়ই হবেন। ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে বহুবার ওই চায়ের দোকানে গেছি আর লক্ষ্য করেছি বাবার এই ‘ধনাদা’ সবাইকেই ‘আপনি’ সম্বোধন করেন। এদিকে পাড়ার তথাকথিত বিশিষ্ট বাসিন্দাদের অনেকেই, যাঁরা ওই দোকানে আড্ডার ঠেক জমান, তেনাদের বেশিরভাগের মুখেই শোনা যায় “এ ধনা, এক কাপ চা দে না রে।” এমনকি প্রায় ওনার ছেলের বয়সী কিছু উঠতি ছোকরা এসেও বেশ ঝাঁঝিঁয়ে বলে “এই ধনা, ফিল্টার উইলস্ রাখিস নি কেন রে? দোকান তুলে দে না!”… ইত্যাদি ইত্যাদি। পরে জেনেছিলাম এই ধনঞ্জয় কাকা, যিনি সবাইকে ‘আপনি’-‘আজ্ঞে’ করেন, আসলে পাস দেওয়া তো দূরের কথা, স্কুলের গণ্ডিটুকুও নাকি পেরোতে পারেন নি, সংসারের হাল ধরতে এই চায়ের দোকান চালানোর কারণেই। এটা জানার পর থেকেই ওনার প্রতি এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা জাগত। যদিও মুখ ফুটে কখনও সেটা জানানো হয়নি। এদিকে আমাদের পাড়ার এক সম্মানীয় অধ্যাপক, যাঁকে পাড়ার মোড়ে রিক্সাওলার উদ্দেশ্যে নাম ধরে চিৎকার করে বলতে শুনেছি “এই অমুক… যাবি না কি রে?” কোনওদিন কেউ গন্তব্যে নিয়ে যেতে অস্বীকার করলে, তার কপালে বেশ কিছু চোখা চোখা শব্দও জুটত। এসব দেখে মাঝেমধ্যে মনে হয় শিক্ষার সঙ্গে বিনয়ের একটা মারাত্মক ঝগড়া থাকলেও, অহংকারের কিন্তু একটা দারুণ বন্ধুত্ব আছে।

সেদিন একটা দোকানে কিছু কিনতে গিয়েছিলাম, হঠাৎই শুনি পাশ থেকে এক শিশুকণ্ঠ “পাপা… পাপা… চকলেটটা কিনে দে না !” কানে খট্ করে লাগতেই পাশে তাকিয়ে দেখি পরিপাটি পোশাক পরিহিত এক বাবা তাঁর পাঁচ ছয় বছরের শিশু সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে এবং শিশুটি সমানে বাবার কাছে ওই ভাষায় আবদার করে চলেছে। ভাবলাম এই কথাগুলোই যদি কেউ ইংরেজিতে বলে তাহলেই তো আর সমস্যা থাকে না। তার মানে সমস্যাটা হচ্ছে ভাষার। এই যে সব আপনি/তুমি/তুই/তোরা/আমরা-র বিভাজন… এ তো এই ভাষারই সৃষ্টি। শিশুটির মাতৃভাষার গোড়াতেই গলদ বুঝে ভাবনার বেশি গভীরে যাওয়ার আর সাহস হল না।

গবেষণার প্রয়োজনে বেশ কয়েকবার আমাকে ফ্রান্সের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে যেতে হয়েছে। সত্যি বলতে কি… প্রথম যেবার দেশের মাটি ছেড়ে বিদেশে পা রাখি, ওদের চাল-চলন, আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাস সব কিছুই খুব অদ্ভুত ঠেকেছিলো। Professor Santarelli হলেন Bordeaux University-র বায়োটেকনোলজির Head of the Department. প্রথম সাক্ষাতে সঙ্গত কারণেই অত্যন্ত বিনীতভাবে তাঁকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করেছিলাম। আর এখানেই হল বিপদ। ওই প্রায় সত্তরোর্ধ মাস্টারমশাই বলেন কী? “Don’t call me Sir.. Call me Xavier”. আমি প্রায় বাকরুদ্ধ! আমতা আমতা করে বললাম.. “Ok.. Xavier Sir”। ভদ্রলোক আরও বিনয়ের সঙ্গে বললেন “only Xavier.. No Sir please”. আমি তখন আকাশ পাতাল ভাবছি… লোকটার কি আবার অন্য কোনও ব্যামো ট্যামো আছে নাকি রে বাবা। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে এসে এ তো মহা গেরোয় পড়লাম। আসলে মন তো জলের মতো, সর্বদাই নিম্নগামী।

ভুল ভাঙল পরের দিন সকালে ওনার ল্যাবে পৌঁছে। দেখি sweeper থেকে শুরু করে students, professors সবাই ওনাকে Xavier বলেই সম্বোধন করছেন। বিষয়টা বুঝতে পেরেই প্রথমে দেশের কথা মনে হল… আর প্রমাদ গণলাম এটা ভেবে, দেশে ফিরে আমার senior professor কে নাম ধরে ডাকলাম, আর তার পরমুহূর্তে আমার কী অবস্থা হতে পারে! নাহ্… এই নিয়ে বেশি না ভাবাই মঙ্গল। আসলে নামে কী-ই বা আসে যায়! পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গাটা যেন ঠিক থাকে। আমি বস্, তাই মাচায় উঠে তোমাদের কাদা জলে হাবুডুবু খেতে দেখে জ্ঞানগর্ভ বাণী ঝাড়বো, এই concept-এর অবসান হওয়া অবশ্যই উচিত।

আমাদের ছোটবেলায় যে মাস্টারমশাই বাড়িতে পড়াতে আসতেন তিনি ছিলেন অনেকটা ‘গুরুমশাই’ টাইপ। যাঁকে আবার অনেক বাড়িতে আড়ালে ‘মাস্টার’ বলেও সম্বোধন করা হত। এখন অবশ্য বিষয়টার সম্যক পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষক ছাত্রের মধ্যে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরী হওয়ায়, এখন তো শুনি ছাত্র শিক্ষককে ‘বস্‌’ আর শিক্ষক ছাত্রকে ‘ডুড’ বলেও সম্বোধন করে। বেশ মজাই লাগে শুনতে।

ইদানীং অবশ্য বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার ব্যাপারটা প্রায় উঠেই গেছে। যাদের বাড়িতে এখনো এটার চল আছে সেসব বাড়ি এবং তাদের শিক্ষাও মিউজিয়ামে রাখার মতোই বিষয়। এমনও দেখি অনেকেই বয়স্ক নিকট আত্মীয়কে দেখে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে বেশ দ্বিধা বোধ করছেন। সেই ‘করতে পারি… কিন্তু কেন করব’ এরকম টাইপের অবস্থা আর কি! আবার অনেককে বলতে শুনি “ধুর.. সবসময় মাথা নীচু করতেই বা হবে কেন?” ঠিকই তো, সারাক্ষণ পরিবেশ পরিস্থিতির সামনে মাথা নীচু করে করে আমাদের এমন অবস্থা হয়েছে যে বয়স্ক মানুষের সামনে মাথা ঝোঁকাতে কোমরে ব্যথা করবে বৈকি! এদিকে আমার এক প্রতিবেশীকে এখনও বলতে শুনি “ও বাবা, তুমি তো ব্রাহ্মণ সন্তান… পায়ে হাত দেবে কী কথা!” ব্যাস… যাকে বলা হলো সেও একটু কলার তুলে নিয়ে পগার পার।

বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে কতটা মানহানির সম্ভাবনা আছে সেটা জানা নেই, কিন্তু বয়স্কদের মধ্যে একটা ইতস্তত ভাব থাকলেও, মুখে যে অদ্ভুত পরিতৃপ্তির হাসিটা দেখতে পাই, সেটাই বোধহয় পরম প্রাপ্তি। বিষয়টা আমার কিশোর পুত্রের মস্তিষ্কগত করার প্রায়শই চেষ্টা করি। অবশ্য সেটা নেওয়া অথবা না নেওয়ার ব্যাপারটা সম্পূর্ণভাবে তার বোধ পরীক্ষণের প্রশ্ন।

আমার বেশ কিছু ‘ছোটোবন্ধু’ আছে… মানে ঐ ছাত্রবন্ধু, পুত্রবন্ধু ইত্যাদিরা। ওদের থেকে আমার শেখার কোনও শেষ নেই। এরা একেক জন বিভিন্ন বিষয়ে বিশারদ। বিশেষত mobile, tab, laptop ইত্যাদি ইত্যাদিতে। সারাক্ষণ ঘাড় গুঁজে কী যে দেখে ওই যন্ত্রগুলোর মধ্যে, বোঝা দায়। ওই বস্তুর দিকে তাকিয়ে কখনও হাসে, কখনও বিরক্তি প্রকাশ করে, কখনও আবার খুব উদ্বিগ্নও থাকে। ওটা একটা আলাদা জগত আর কি। সেখানে স্বশিক্ষায় এরা সবাই শিক্ষিত হয়ে উঠছে। কখনও কখনও খুব বিরক্ত হলেও উপায় কী? আমরা ওদের সবুজ মাঠ দিতে পারিনি খেলার জন্য, সময় দিতে পারিনি গল্প বলার বা গল্প শোনার জন্য… কীসের টানে যেন সবাই নিরুদ্দেশের পথে ছুটছি সঙ্গে ওরাও। হয়তো ওই বস্তুগুলোই ওদের পথ প্রদর্শক আর নির্ধারক ওরা নিজেরাই!

আমার পুত্র যেদিন আমায় প্রথম জানালো যে ওর নাকি একটা চ্যানেল আছে.. আমি আকাশ থেকে পড়েছিলাম। “চ্যানেল আবার কী!” অনেকরকম চ্যানেল তো শুনেছি… খেলার চ্যানেল, মুভি চ্যানেল, চ্যানেল করে স্কুল-কলেজে ভর্তি, চ্যানেল করে ভোটের টিকিট, সরকারি অফিসে কাগজপত্র পাস- এ আবার কেমন চ্যানেল করেছে রে বাবা ছেলেটা এই বয়সে! পুত্র গম্ভীর মুখে বলল… “ঘাবড়ানোর কিছু নেই, এটা একটা You tube চ্যানেল। “এতে নাকি তার প্রচুর subscriber ও আছে। আমি অবশ্য subscription শব্দটাই বছর কয়েক আগে শিখেছি। তাই বিশেষ না ঘাঁটিয়ে একটু নজরদারি শুরু করলাম। সত্যি বলতে সেসব জানার চেষ্টা আমার এখনো চলছে। এটুকুই বুঝেছি পৃথিবীটা ছোটো হতে হতে এখন ওদের হাতের মুঠোয়, আর ওরা পুরো পৃথিবীটাকে একসঙ্গে পেয়ে এটা ওটা হাতড়ে বেড়াচ্ছে। ছোটো বাচ্চার সামনে খেলনার ঝুড়িটা বসিয়ে দিলে যা হয় আর কি। এটা একটা অদ্ভুত নেশাও বটে, তবে যেহেতু মুক্তির উপায় জানা নেই তাই ওদের মূল্যবোধের পাঠ পড়ানোটা খুব জরুরী।

এই বিষয়ে জানিয়ে রাখি আমার স্বামীর কিন্তু একদম মূল্যবোধ নেই। এখনো প্রায় দিনই বাজার থেকে পচা আনাজ আর মাছ অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে কিনে আনেন। এক্ষেত্রে আমার এইসব ‘ছোটোবন্ধু’ দের মূল্যবোধ কিন্তু প্রবল। দোকানে গিয়ে খুঁজে খুঁজে ঠিক দামি খেলনার দিকে তাদের নজর পড়বেই। একই ব্যাপার gadgets এর ক্ষেত্রেও। কোন প্রস্তুতকারক সংস্থার তৈরি, কী তার specifications এ সবই তাদের কণ্ঠস্থ। আর আমরা মানে আজকালকার বাবা মায়েরাও বাচ্চাদের এই অদ্ভুত প্রয়োজন মেটানোটাকেও একটা ইঁদুর দৌড়ের পর্যায়েই নিয়ে গেছি। কে কার বাচ্চাকে কতো দামি খেলনা বা gadgets কিনে দিচ্ছেন সেটা এখন রীতিমত চর্চার বিষয়। কে কতো ভালো ভালো ব্র্যান্ডেড জামাকাপড় পড়ছেন, কত দামি গাড়ি চড়ছেন, কোন নামী রেস্তোরাঁয় খেতে যাচ্ছেন সেটাই নির্দিষ্ট করছে তার brand equity. তাই এসবের নয় বরং গুরুজনদের সম্মান দেওয়া বা তাদের প্রতি দায়িত্ববোধ কিংবা প্রকৃত বন্ধুত্বের মূল্য অথবা যেটুকু পাচ্ছি তার জন্য সর্বশক্তিমানের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধের পাঠ শেখানো কিন্তু এখনও সেই মা- বাবাদেরই দায়িত্ব। প্রবল প্রতিভাধর এই প্রজন্মকে সঠিকভাবে সঠিকপথে চালিত করার কাজে মা-বাবা, বাড়ির বড়োদের আর সর্বোপরি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দায়িত্ব আজ অনেক বেশি, আর এটা অনুশীলন করতে করতেই প্রকৃত শিক্ষা আর মূল্যবোধের সংজ্ঞাটা হয়তো আরও পরিষ্কার হবে, যে মূল্য আসলে টাকা বা ব্র্যান্ড দিয়ে নির্দিষ্ট করা যায় না।

 

লেখিকা পেশায় একজন বিজ্ঞানী যিনি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ কেমিক্যাল বায়োলজি (সি. এস. আই. আর, ইন্ডিয়া), যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োকেমিস্ট্রি ও ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সে পি. এইচ. ডি। কলকাতার এক ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থায় (অ্যালবার্ট ডেভিড লিমিটেড) রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্ট উইং এ গবেষক বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত। এর বাইরেও সমকালীন সমাজ থেকে তুলে আনা বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে সরস ও প্রাঞ্জল ভাষায় লেখালেখির অভ্যাস। তাঁর বেশ কিছু লেখা আন্তর্জাতিক ওয়েবম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More