বামদলগুলির এই বিপর্যয় হল কেন?

অংশুমান কর

২০২১-এর বিধানসভা ভোটের ফলাফলে বামদলগুলির এইভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় অনেকেই অবাক। তলিয়ে ভাবলে কিন্তু অবাক হওয়ার তেমন কারণ নেই। বরং এটা বোধহয় খানিকটা প্রত্যাশিতই ছিল। মূলত তিনটি কারণে বামেদের এই  বিপর্যয় হল।

তৃণমূল এবং বিজেপিকে একাসনে বসিয়ে ‘বিজেমূল’-এর যে তত্ত্ব সিপিআই (এম) সহ প্রধান বামদলগুলি খাড়া করেছিল তা মানুষের কাছে আদৌ গ্রহণযোগ্য হয়নি। একথা ঠিক যে, চক্ষুলজ্জাহীন ভাবে তৃণমূল ছেড়ে বেশ কিছু নেতা নির্বাচনের ঠিক আগে আগেই বিজেপিতে নাম লেখান। কিন্তু এই দলবদল সেইভাবে ‘বিজেমূল’-এর তত্ত্বটিকে মান্যতা দেয় না। সত্যি বলতে কি, বামপন্থীদেরও কেউ কেউ যে বিজেপিতে যাননি এমনটা তো নয়। কাজেই দলবদল করলেই যে, এক দল থেকে অন্য দলে যাঁরা যাচ্ছেন সেই দল দু’টির মধ্যে গোপন আঁতাত আছে, বা সেই দল দু’টি একটি দলেরই দু’টি মুখ– এই তত্ত্বগুলি মান্যতা পায় না। বামদলগুলি এই সাধারণ কথাটি বুঝেও বোঝেনি যে, এবারের নির্বাচনে মানুষ রায় দিতে যাচ্ছেন কেবল তৃণমূলের ‘অপশাসনে’র বিরুদ্ধে নয়, বরং মূলত বিজেপির বাংলা দখলের বিরুদ্ধে। বামদলগুলির যত স্পষ্ট করে, এই পরিস্থিতিতে, বিজেপিকে আগে রোখার আহ্বান দেওয়া উচিত ছিল, তা তারা করেনি। তাদের বিজেপি বিরোধিতা এ কারণেই মানুষের কাছে তেমন বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি। সেই কাজটি কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেছেন। বিজেপিকেই আক্রমণের মূল নিশানা করেছেন তিনি। মোদী-শাহের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছেন নিজেকে। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় দেখেছি যে, অনেক বামপন্থী মানুষের কাছেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অবস্থান অনেকখানি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। জোটে যাঁরা ছিলেন বা থাকতে পারতেন সেই বাম দলগুলির নেতাদের মধ্যে একমাত্র দীপঙ্কর ভট্টাচার্য খুব স্পষ্ট করে বিজেপি বিরোধিতার প্রসঙ্গে তাঁর দলের মত জানিয়েছিলেন। বাকি বামদলগুলি এই কাজ করেনি। করেনি বলেই তার খেসারত তাদের দিতে হয়েছে। ‘লেসার ইভিল’-এর তত্ত্বটিকে তারা বাতিল করলেও, বামপন্থী মানুষদেরই অনেকেই গ্রহণ করেছেন। এঁদের অনেকেই যে তাঁদের ভোট এই প্রথম বার তৃণমূলকে দিয়েছেন এটা অনুমান করাই যায়। সমস্ত পরিসংখ্যান সামনে এলে এই অনুমান প্রমাণে রূপান্তরিত হবে।

দ্বিতীয় যে বড়ো ভুলটি বামদলগুলি করেছে তা হল আব্বাসের সঙ্গে জোট। ওয়াল-এর একটি লেখাতেই আমি এই প্রশ্ন তুলেছিলাম যে, এই জোট কি এক ঐতিহাসিক ভুল হল? বলেছিলাম যে, সময় এর উত্তর দেবে। বলেছিলাম যে, আব্বাস নির্বাচনী ময়দানে যে-কথাগুলি বলছিলেন তা অসাম্প্রদায়িক, কিন্তু তাঁর অতীতে বলা চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক কথাগুলি তাঁর এবং তাঁর সঙ্গে হাত মেলানো দলগুলির পিছু ছাড়বে না। সাধারণ জনমানসে আব্বাসকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ প্রমাণ করা বেশ মুশকিলেরই হবে। তাই হয়েছেও। কট্টর সিপি আই (এম) সমথর্কদের কেউ কেউ এই প্রশ্ন তখন তুলেছিলেন যে, যদি তহ্বা সিদ্দিকির সমর্থন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধারাবাহিক ভাবে পেতে পারেন, তাহলে বামদলগুলি কি দোষ করল? তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন যে, বামদলগুলির কাছে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে মানুষের প্রত্যাশা একটু ভিন্ন রকমের। কোনও রকমের অস্বচ্ছতা ও দ্বিচারিতা এই প্রশ্নে উদার ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ মেনে নেবেন না। হয়েছেও তাই। আব্বাসের সঙ্গে জোটের ফলেই বামেদের ভোটের একটা অংশ যে তৃণমূলের দিকে চলে গেছে এ বিষয়টিও পরিষ্কার হবে পরিসংখ্যান সামনে এলেই।

তৃতীয় যে-ভুলটি মূলত সিপি আই (এম) করেছে তা হল তার ইয়ং ব্রিগেডকে মাঠে নামিয়েছে একেবারে ভোটের মুখে মুখে। আরও একটু আগে এই চমৎকার পদক্ষেপটি নেওয়া যেতে পারত। তরুণ এই নেতৃত্বকে তাঁদের নিজেদের এলাকা ছেড়ে অন্য মেরুতে ভোট লড়তে পাঠানো হয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। এটিও খুব সঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি। নতুন এলাকাগুলিতে এই প্রার্থীরা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার সময়টুকুও পাননি। তার ওপরে আগের দু’টি প্রতিবন্ধকতা তো ছিলই।

তবে, এই ফলাফলে বামপন্থীদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এভাবে ভাবলেই বরং ভালো যে, এই ফলে উল্লসিত না-হওয়া গেলেও, সাময়িক স্বস্তি তো পাওয়া যাবেই। এই নির্বাচনে সিপি আই (এম)-এর সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি তরুণ নেতৃত্বের সামনের সারিতে উঠে আসা। যেসব অভিনব পন্থাগুলি ব্যবহৃত হয়েছে বামেদের প্রচারে, তাও অতীতে আগে কখনও হয়নি। সাধারণ মানুষের ভাষায় অনেকখানিই কথা বলা গেছে প্রচারে। এই ছোটো ছোটো প্রাপ্তিগুলিকে আগামীদিনে সংহত করতে হবে। হতাশায় ভেঙে না পড়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যে-অতিমানবিক লড়াই ‘রেড ভলান্টিয়ার’রা লড়ছে– জারি রাখতে হবে সেই লড়াইও।

এ কথা ঠিক যে, আগামীদিনে বামদলগুলির জন্য লড়াই খুব কঠিন হয়ে গেল। বিধানসভায় তারা তাদের কথা বলতে পারবেন না। বিজেপির প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে আসায় সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে এখন অনেক দিন শ্বাস নিতে হবে বাঙালিকে। বাম দলগুলিকে লড়তে হবে এই অসুস্থতার বিরুদ্ধে, ভান এবং সমস্ত দ্বিচারিতা ছেড়ে। শাসক দলের ওপরেও নানা আন্দোলনের মাধ্যমে নিরন্তর চাপ রেখে যেতে হবে কর্মসংস্থান ও সুশাসনের প্রশ্নে। এই কাজগুলিতে নেতৃত্বে থাকতে হবে তরুণদেরই। বাম সমর্থকদেরও আরও অনেক দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দিতে হবে। এই ফলে কেউ স্বস্তি প্রকাশ করলেই তাঁকে ‘তৃণমূলী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া একেবারেই অনুচিত হবে এখন। বাম নেতৃত্ব এবং সমর্থকদের এই কথাটিও মনে রাখতে হবে যে, সাধারণ মানুষের প্রজ্ঞা তাঁদের থেকে কম নয়।

তবে মূল কথাটি হল এই যে, হতাশ হলে চলবে না। শূন্যের ভেতরে কিন্তু অনেক ঢেউ থাকে। সেই তরঙ্গগুলির সংবেদ গ্রহণ করাই এখন বামপন্থীদের প্রধান কাজ।

লেখক বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলের সচিব। পেয়েছেন কৃত্তিবাস, বাংলা আকাদেমি, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রভৃতি পুরস্কার। কবিতা পড়তে গিয়েছেন আমেরিকা, স্কটল্যান্ড, জার্মানি ও বাংলাদেশে।

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More