কিছু কি শিখলাম আমরা?

সন্দীপন চক্রবর্তী

 

জয়দেব বসু একবার লিখেছিলেন – ‘মৃত্যু বিরতি মাত্র। দুখানি কোয়ান্টা-মধ্যে আপাতশূন্যতা’, কারণ যে কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের ক্ষেত্রে, মৃত্যুর পরেই তো আসলে শুরু হয় তাঁর এক ‘দ্বিতীয় জীবন’। তাই ‘মৃত্যু কোনো শেষ নয়, মানুষের স্মৃতিলোকে / মৃত্যু এক নব উদ্বোধন’। আর শঙ্খ ঘোষ নিজেও তো জানতেন – ‘আমি যদি না-ও থাকি তবুও আমিই পড়ে থাকে’। তাই সেদিক থেকে ভাবলে, সাহিত্যিক শঙ্খ ঘোষের কাজ নিয়ে, তার দার্শনিক প্রস্থানভূমি আর যাত্রাপথ নিয়ে, আবার নতুন করে বিচার ও বিশ্লেষণ এখন খুবই জরুরি। কিন্তু তার জন্য যোগ্য লোক আমি নই। তাছাড়া আমার সামান্য অভিজ্ঞতায় যেটুকু দেখেছি বা বুঝেছি শঙ্খ ঘোষকে, তাতে আমার মনে হয়েছে আরও অন্য কিছু কথা। সাহিত্যিক হিসেবে তিনি বিরাট মাপের হলেও, বাংলা সাহিত্যে তাঁর মাপের সাহিত্যিক হয়তো তাঁর আগেও কয়েকজন এসেছেন, হয়তো পরেও কয়েকজন আসবেন। কিন্তু তাঁর মাপের কোনও মানুষ আর আসবেন কি? নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন করি। ভরসা পাই না। আমরা সত্যিই কি কিছু শিখতে পেরেছি তাঁর জীবনচর্যা থেকে? শিখতে চেয়েছি কি আদৌ? নাকি শুধুই গদগদ স্তুতির মালায় তাঁর বিগ্রহ সাজিয়ে, তাঁকে সরিয়ে রেখেছি এক সম্মানের দূরত্বে? আমাদের বাঁচার ভিতর তাঁকে গ্রহণ করেছি কি? কিন্তু না, সেসব নিয়েও আজ কথা নয়। আজ মনে পড়ছে, অন্য এক শঙ্খ ঘোষের কথা।

অনেকেরই ধারণা, রীতিমতো এক গুরুগম্ভীর মানুষ ছিলেন তিনি। খুব একটা ঠাট্টা ইয়ার্কি করতেন না। কিন্তু আদতে তার উল্টো। মানুষটি ছিলেন আদ্যন্ত রসিক। অথচ সেই রসিকতা কখনওই শালীনতার সীমা ছাড়াত না। কথা কম, কিন্তু যেটুকু বলতেন, সেটুকু অব্যর্থ। অনেকসময়ে খানিক দুষ্টুমিও মিশে থাকত তাঁর রসিকতায়। সে দুষ্টুমি অন্যকে আঘাত করত না, কিন্তু বেশ জব্দ করে দিতে পারত সামনের মানুষটিকে। হয়তো খানিক হতভম্বও হয়ে যেত সে। এইরকমই ছিলেন শঙ্খ ঘোষ – আমাদের ‘স্যার’। এই ‘স্যার’ ডাক নিয়েও আমরা হয়তো ইয়ার্কি মেরেছি – ‘বাঙালি লেখকদের মধ্যে, রবীন্দ্রনাথের পর, এরকম ‘স্যার’ উপাধি বোধহয় শুধু আপনার কপালেই জুটেছে। তাই না?’ সঙ্গে সঙ্গেই সপাট জবাব– ‘কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সেটা ত্যাগ করতে পেরেছিলেন। আমি আর তা পারলাম কই?’ অথবা এই তো, বছর পাঁচেক আগেই একদিন, কথায় কথায় হাত দেখার প্রসঙ্গ উঠেছে। বললেন– ‘আমার হাত দেখে অনেকেই বলেছিল, আমার হাতে নাকি স্পষ্ট লেখা আছে দুটো বিয়ে। অনেকদিন সেই আশায় আশায় ছিলাম। এখনও যে আশা পুরো ছেড়ে দিয়েছি, এমন নয়।’  

বিয়ের প্রসঙ্গে অন্য একটা কথা মনে পড়ল। তখন শীতকাল। ডিসেম্বর মাস। ২০০৯ সাল। আমার বিয়ে। বৌভাতের দিন স্যার এসেছেন জেঠিমাকে নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই এইসব অনুষ্ঠানের দিন পাত্র বা পাত্রীকে খানিক সাজতেই হয়। আমারও পরিধানে তাই উজ্জ্বল এক সোনালি রঙের শেরওয়ানি সেদিন, সঙ্গে বাহারি উড়নি। স্যার আর জেঠিমার সঙ্গে খানিক কথাবার্তার পর, পাশেই দাঁড়ানো সৌরীন ভট্টাচার্যের সঙ্গে একটু কথা বলছি। হঠাৎ পাশ থেকে, কানের খানিক কাছে মুখ এনে, স্যার আস্তে আস্তে বললেন– ‘শুধু এইরকম, এইরকম একটা পাঞ্জাবি পেলাম না বলেই, টিপু সুলতানের ভূমিকায় আর অভিনয় করাটা হয়ে উঠলো না আমার।’ ভাবুন, ওই পরিস্থিতিতে, শঙ্খ ঘোষের মুখে এইরকম একটি সংলাপ শুনলে কী অবস্থা হতে পারে একজনের! 

এরও বছর চারেক আগে, একবার এই বিয়ে নিয়েই আরেক মজার কাণ্ড ঘটেছিল। একদিন স্যারের বাড়িতেই রবিবার সকালের আড্ডা। সেদিন ওখানে হাজির সবাই আমার থেকে অনেকটা সিনিয়র। জয়দেবদা সেদিন, কী জানি কেন, স্যারকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, প্রত্যেক মানুষেরই জীবনে বিয়ে করাটা কেন জরুরি, বিয়ে না করলে কী কী অসুবিধা হতে পারে, প্রত্যেকেরই তাই সময়মতো বিয়ে করে নেওয়া উচিত ইত্যাদি। বেশ খানিকক্ষণ শোনার পর স্যার বললেন– ‘বুঝলাম। কিন্তু এখানে যারা আছে, তারা সকলেই তো বিবাহিত। তারা এগুলো জানে। একমাত্র সন্দীপন ছাড়া।’ তারপরেই আচমকা আমার দিকে ফিরে– ‘তা, সন্দীপন, তোমার কি এক্ষুনি এইগুলো জানা খুবই দরকার?’ আচমকা এরকম এক মন্তব্যে ঘাবড়ে গিয়ে ‘না, না’ করতে থাকি আমি। তখন জয়দেবদার দিকে ঘুরে– ‘বরং বিয়ের অপকার নিয়ে বললে হয়তো এর মধ্যে কেউ কেউ আগ্রহী হতে পারেন।’ হাসির রোল ওঠে পুরো আড্ডা জুড়ে। 

তবে এইসব তাৎক্ষণিক রসিকতা ছাড়াও, বলতেন ওঁর যৌবনের নানা মজার মজার অভিজ্ঞতা। ওঁদের বিয়ের সময়ে নাকি প্রতিমা জেঠিমার বাড়ির লোকেরা প্রবল হতাশ হয়েছিলেন ওঁর চেহারা দেখে। প্রতিমা ঘোষ তখন রূপে আর গুণে – দু’দিক থেকেই ওই তল্লাটের অদ্বিতীয়া মহিলা। তাঁকে নাকি বিয়ে করতে এসেছে এইরকম একটা হাড়জিরজিরে চেহারার কুচকুচে কালো একটা ছেলে! হ্যাঁ, তখন অসম্ভব রোগা আর কালোই ছিল তাঁর চেহারা। কিন্তু কী আর করা যাবে, মেয়ের নিজের পছন্দ! তবে সেই হতাশা তাঁরা আর চেপে রাখতে পারেননি তাঁদের আচরণে। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরদিন, বর যখন কনেকে নিয়ে চলে আসার কথা, তখন প্রতিমা জেঠিমার মা নাকি সান্ত্বনার সুরে বলেই ফেলেছিলেন স্যার’কে– ‘চিন্তা কোরো না, বাবা। এবার থেকে আমার মেয়ের সঙ্গে থাকতে থাকতে, আস্তে আস্তে তুমিও ফর্সা হয়ে যাবে।’ আর স্যার নাকি তখন মুচকি হেসে জবাব দিয়েছিলেন – ‘কিন্তু ধরুন, আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে যদি উল্টোটা হয়ে যায়?’

আরেকবার, এক গল্পকারের মুখেই শুনেছিলাম তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। সেটাও শীতকাল। সন্ধে পেরিয়ে, বইমেলা থেকে বেরিয়েছেন স্যার। তখন বইমেলা হত ময়দানে। সঙ্গে সেই তরুণ গল্পকার। মেলার গেট পেরিয়ে, ভিড় আর যানবাহনের হট্টগোল এড়ানোর জন্য, পাশের এক নির্জন রাস্তা ধরেছেন দুজন। হাঁটছেন গল্প করতে করতে। ধোঁয়া, অন্ধকার আর ল্যাম্পপোস্টের আলো মিলেমিশে, খানিক দূরের দৃশ্যও একটু যেন আবছা। উল্টোদিকে, বেশ খানিকটা দূর থেকে, দেখা যাচ্ছে, এক ভদ্রলোক হেঁটে আসছেন তাঁর সঙ্গিনীর কাঁধে হাত দিয়ে। খানিক কাছে আসতেই, বোঝা যায় যে, তিনি দুজনেরই পূর্বপরিচিত এক প্রখ্যাত নাট্যসমালোচক। তিনিও স্যারদের দেখতে পেয়েই সঙ্গিনীর কাঁধ থেকে নামিয়ে নেন হাত। মুখোমুখি হয়ে, শারীরিক কুশল আর সামান্য কিছু কথা বিনিময় হয় তাঁদের। তারপর পরস্পরকে পেরিয়ে আবার উল্টোদিকে হাঁটতে থাকেন তাঁরা। এবার সেই গল্পকার হাঁটতে হাঁটতেই জিজ্ঞাসা করেন স্যারকে– ‘আচ্ছা, স্যার, ওঁর ব্যাপারটা কী বলুন তো? যখনই দেখি, তখনই দেখি ওঁর সঙ্গে নতুন নতুন সব সুন্দরী বান্ধবী। নিত্যনতুন এত সুন্দরী বান্ধবী উনি জোটান কী করে?’ কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর স্যার সেই অননুকরণীয় ভঙ্গিতে, ধীর লয়ে বলে ওঠেন – ‘তা যদি আমি জানবোই, তাহলে কি আর আমাকে, তোমার সঙ্গে হেঁটে বেড়াতে হয়?’ 

মাঝেমাঝেই বলতেন, ওঁর অভিন্নহৃদয় বন্ধু অলোকরঞ্জনের সঙ্গে জড়ানো নানা মজার ঘটনা। বলতেন অন্যান্য বন্ধুদের গল্পও। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর এক ভাই হীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছিলেন স্যারের সহপাঠী আর ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন। তিনি চেইন স্মোকার। একবার, ছাত্রজীবনেই, তিনি এক চায়ের দোকানে স্যারের সঙ্গে বসে আড্ডা মারতে মারতে জিজ্ঞাসা করেছিলেন– ‘আচ্ছা, তুমি সিগারেট খাও না কেন? তোমার কি ধারণা সিগারেট খেলে কেউ খারাপ ছেলে হয়ে যায়?’ স্যার জানান – ‘না, সে ধারণা হবে কেন? তোমায় কি খারাপ ছেলে ভাবি? আমার দাদাও তো সিগারেট খান। তাঁকে কি খারাপ ভাবি? ইচ্ছে হয় না, তাই খাই না।’ হীরেনবাবু গম্ভীরমুখে জানান– ‘বুঝেছি, আসলে তুমি পিউরিটান।’ সেসময়ে নাকি স্যারদের কাছে কাউকে ‘পিউরিটান’ বলা ছিল মারাত্মক গালাগাল। ফলে স্যার সেই গালাগাল শুনে, ক্ষেপে গিয়ে, হীরেনবাবুর মুখ থেকে তাঁর জ্বলন্ত সিগারেটটি ছিনিয়ে নেন। আর তাতে বড় বড় দুটি টান মেরে সে ধোঁয়া ইনহেল করেন। অথচ একবারও কাশেননি। সেই দেখে অবাক হীরেনবাবু বলেছিলেন – ‘তুমি তো একবারও কাশলে না! ও, তাই বল, বুঝেছি, তুমি নিশ্চয়ই লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খাও, প্রকাশ্যে খাও না।’ 

অনেকসময়ে বলতেন, পঞ্চাশের সেই দামাল কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়ানো নানা মজার অভিজ্ঞতাও। যেমন, সুনীলদার তুখোড় উপস্থিত বুদ্ধির কথা বলতে গিয়ে, একবার বলেছিলেন কোনো এক বছরের বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনের অভিজ্ঞতার কথা। তখন সেই সম্মেলন বসতো মার্কাস স্কোয়ারে। সেখানে স্টল দিয়েছে কৃত্তিবাস। সন্ধেবেলা ঘুরতে ঘুরতে সেই স্টলে এসে হাজির স্যার। এসে দেখলেন, কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর কেউই নেই সেখানে। জিজ্ঞাসা করে জানা গেল যে, তারা মাঠেই কোথাও আছে। আড্ডা মারছে। ফলে বেরিয়ে পড়েন স্যার তাদের খোঁজে। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ চোখে পড়ে, খানিক অন্ধকার আবছায়ামতো একটা জায়গায়, গোল হয়ে বসে আছে তারা। পুরো কৃত্তিবাসের দলবল। আড্ডা মারছে। তাদের সঙ্গে গল্প করতে স্যারও দাঁড়িয়ে পড়েন। আর কথা বলতে গিয়েই টের পান, তারা সবাই অল্পস্বল্প নেশা করে আছে। ওই বৃত্তে তারাপদ রায়কে দেখতে না পেয়ে, সুনীলদাকে জিজ্ঞাসা করেন – ‘তারাপদকে দেখছি না তো। ও আসেনি?’ সুনীলদা জানান – ‘না না, আমাদের ফুরিয়ে গেছে তো। তাই ও একটু আনতে গেছে।’ গল্প চলছে। খানিক পরেই ফেরেন তারাপদ রায়। এক হাতে দড়ি দিয়ে ঝোলানো একটা মাটির কলসি। মুখ সরা দিয়ে ঢাকা। আর আরেক হাতে অনেকগুলো মাটির খুরি। তাকে ফিরতে দেখেই উল্লাসে হইহই করে ওঠে বাকিরা – ‘ওই তো তারাপদ এসে গেছে’! কলসি থেকে খুরিতে খুরিতে ঢালা হয় মদ। শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় তাঁর খুরিটি নিয়ে উঠে আসেন স্যারের কাছে – ‘অন্তত একটা চুমুক আপনি খান। তারপর আমরা খাবো।’ খানিক বিব্রত অবস্থায় একটু বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, উনি মদ খান না। কিন্তু শরৎদা নাছোড়। ওসব কথা শুনতে রাজি নন। খানিক পীড়াপীড়ির পর অন্য রাস্তা ধরেন স্যার। বলেন – ‘আচ্ছা, আপনারা খেতে থাকুন। আমি একটু পরে, ঘুরে এসে বসছি আপনাদের সঙ্গে।’ কিন্তু তাতেও রাজি না শরৎদা। বারবার বলতে থাকেন – ‘না, না, আপনি আগে একটু পেসাদ করে দিন। একটু… একটু খেতেই হবে…একটা চুমুক…অন্তত এক চুমুক মাত্র…’। স্যারের বিপদে পড়া এই অবস্থা দেখে, পিছনে বসা সুনীলদা গম্ভীরভাবে বলে ওঠেন – ‘শরৎবাবু, উনি কিন্তু খেলে, মাত্র এক চুমুকে থামেন না। পুরোটাই খেয়ে নেবেন কিন্তু।’ এইবার আতঙ্কিত শরৎদা পিছিয়ে আসেন এক লাফে – ‘ও… তাই? তাই?’ বোঝা যায় সুনীলদার ওষুধে কাজ হয়েছে। আর হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন স্যার। 

এই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে শঙ্খ ঘোষের সম্পর্ক যে কী অগাধ পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর ভরসার ছিল আজীবন, তা আরেকটা ঘটনা বললে বোঝা যাবে। একবার তালপাতা প্রকাশনা থেকে একটি বই বেরোয় ‘সুনীলকে লেখা চিঠি’। এই বই করার পিছনে স্যারেরও যে কী গোপন অবদান ছিল, তা শুনেছি তালপাতার গৌতম সেনগুপ্তর থেকে। সেটা সুনীলদা নিজেও জানতেন। যাই হোক, সে বই করার সময়ে, একবার গৌতমদা জিজ্ঞাসা করেন সুনীলদাকে – ‘আচ্ছা সুনীলদা, আপনার তো তিন জায়গায় তিনরকম জন্মসাল দেখছি। আপনার নানা বইয়ের ব্লার্বে লেখা আছে ১৯৩৪। আবার আপনার আধার বা ভোটার কার্ডে আছে আরেকরকম। আবার পাসপোর্টে আছে তার থেকেও আলাদা। তাহলে সঠিক কোনটা?’ সুনীলদা অবাক হয়ে বলেন – ‘ও… তাই নাকি? তুমি ওগুলোও সব দেখেছ?’ গৌতমদা জানায় ‘হ্যাঁ, দেখেছি বলেই তো বললাম’। ‘হ্যাঁ… তাই তো…’ – খানিক থেমে থেকে সুনীলদা বলেন– ‘এ বিষয়ে উল্টোডাঙা কী বলে?’ গৌতমদা জানায়, ‘ওঁর মতে ১৯৩৪’। সুনীলদা হেসে বলেন – ‘তাহলে ওটাই হবে।’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

এইরকম এক রসিক মানুষকে আমরাও শোনাতাম আমাদের অভিজ্ঞতার নানা মজার ঘটনা। কিন্তু দু-একবার সেরকম শোনাতে গিয়ে কিছু বিপত্তিও ঘটেছে। এই তো বছর তিনেক আগেই একবার, স্যারকে শোনাচ্ছিলাম আমাদের স্নেহের এক অনুজ বন্ধুর কিছু অভিজ্ঞতা। সে তখন সদ্য ভর্তি হয়েছে যাদবপুরে বাংলা অনার্স নিয়ে। তাদের ক্লাস করাতে এসেছেন যে অধ্যাপক, তিনি স্যারেরই এক প্রিয় ছাত্র। ক্লাস চলতে চলতেই তাঁর মোবাইল ফোনে একটি ফোন আসে। তিনি ফোনে কথা বলছেন কয়েক মিনিট, আর…। এটুকু বলতেই থামিয়ে দেন স্যার। তাঁর চোখে বিস্ময় – ‘কী বললে? ও ক্লাসে পড়ানোর সময়ে ফোন ধরেছে? আর তাতে কথা বলছে?’ খানিক ঘাবড়ে যাই আমি। একটু থেমে, থতমত খেয়ে বলি – ‘না… মানে… সেইরকমই তো শুনলাম।’ কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো চুপ। তারপর বিষাদভরা গলায় বলে ওঠেন – ‘কিছুই শেখাতে পারিনি, জানো তো, সারা জীবন ধরে কিছুই শেখাতে পারলাম না।’ এই বাক্যের সামনে স্তব্ধ হয়ে যাই আমি। বিমূঢ়। বাকি গল্প বলা হয় না আর। কোনো কথা বলারই সাহস হয় না। খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকি দুজনেই। তারপর শুধু অস্ফুটে বলতে পারি – ‘আজ আসি। পরে কথা হবে।’ পায়ে পায়ে বেরিয়ে আসি ঘর থেকে।                                                       

Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More