“আমার অপমানের প্রয়োজন আছে”

বেবী সাউ 

 

অপমানের জন্য বার বার ডাকেন
ফিরে আসি
আমার অপমানের প্রয়োজন আছে!
ডাকেন মুঠোয় মরীচিকা রেখে
মুখে বলেন বন্ধুতারবিভূতি
আমার মরীচিকার প্রয়োজন আছে।
অপমানের জন্য বার বার ডাকেন
ফিরে আসি
উচ্চৈঃশ্রবা বিদূষকসভায়
শাড়ি স্বভাবতই ফুরিয়ে আসে
আমার যে
কার্পাসের সাপ্লাই মেলে না।
অপমানের জন্য বার বার ডাকেন
ফিরে আসি…”
(অপমানের জন্য ফিরে আসি, কবিতা সিংহ, ১৯৩১১৯৯৯)

 

ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন প্রত্যেক কবি বা লেখকের একটা নির্দিষ্ট ঘর থাকা আবশ্যিক, যেখানে সে নিজের মতো অন্তত থাকতে পারে। সে ঘর হবে সম্পূর্ণ তার একার। সেখানে তার নিজস্ব বই থাকবে। লেখার উপকরণ থাকবে। একাকী নীরবে কাটানোর স্বাধীনতাও থাকবে। কিন্তু কেউ যদি এমন ভাগ্যবান  বা ভাগ্যবতী না হয়

ভার্জিনিয়া উলফ

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় না। পুরুষ বা নারী সে যাই হোক না কেন, তাকে এই সমস্যার মধ্যে দিয়ে তো যেতেই হয়। তার উপর অতিরিক্ত সমস্যা তৈরি হয়, যদি সে মেয়ে হয়। লেখালেখি, বিজ্ঞান সব কিছুর ক্ষেত্রেই মেয়েদের অংশগ্রহণকে কেউই প্রথমে ভাল চোখে মেনে নেয়নি। আমাদের প্রথম মহিলা ডাক্তার কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়কেই কতো প্রতিকূলতা সহ্য করতে হয়েছে! আগে তো মেয়েদের পড়াশুনোর ক্ষেত্রেই বাধাবিপত্তি চলে আসত। মেয়েদের করে রাখা হত অক্ষর পরিচয়হীন। কিন্তু তারা সেই সব প্রতিকূলতা নিজেদের শক্তিতেই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। আসলে, যত বিপরীত শক্তি বাধা দেয়, তত তাকে কাউন্টার করার শক্তিও মনের মধ্যে গড়ে ওঠে। 

পুরুষতান্ত্রিক ধারণা এমনই লিঙ্গবৈষম্যের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত, যে এর প্রভাব যেমন পুরুষদের উপরে পড়ে, তেমন মেয়েদের উপরেও পড়ে। কোনও একটি মেয়ে যদি উঠে দাঁড়াতে চায় অন্যরকম ভাবেতাহলে তাকে প্রথম যে বাধাগুলো অতিক্রম করতে হয়, সেগুলো আসে তার পরিবার থেকেই। মেয়েটি বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত, এই বাধাগুলি আসবেই। কারণ তার পরিবারেই যে মহিলারা আছেনতারা পুরুষতান্ত্রিক ধারণায় বড় হয়েছেন, অত্যাচারিত হয়েছেনমেনে নিয়েছেন এবং নিজেদের স্বপ্নগুলিকে বিসর্জন দিয়েছেন।

আশাপূর্ণা দেবীরপ্রথম প্রতিশ্রুতি‘, ‘সুবর্ণলতাএবংবকুলকথাএই ঘটনার এক জ্যান্ত বিবরণ। কিন্তু তা শুধুই অত্যাচারিত হওয়ার নয়। একটি মেয়ের আজীবনের লড়াইয়েরও। এমনিতেই আমাদের সমাজ যত ভোগবাদী তথা পণ্যবাদী হয়ে উঠেছে, তত মেয়েদের বস্তু হিসেবে মূল্যায়ন করার প্রবণতাটিও বেড়েছে। আর সে বস্তু যদি তথাকথিতআনপ্রোডাক্টিভলেখালেখির ভাবনায় বা সৃজনে দিনযাপন করে, তা কারো পক্ষেই সহজভাবে মেনে নেওয়ার বিষয় হয় না। এই সমস্যা যেমন এদেশের, তেমন বিদেশেরও। আমাদের  বাংলা ভাষার এক অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় কবি ঘোষণা করেন মাঝেমাঝেই যে মেয়েরা কবিতা লিখতে পারে না বা মেয়েদের পক্ষে কবিতা লেখার সূক্ষ্মতাকে অর্জন করা সম্ভব নয়। আবার আরেক ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক স্বঘোষিত প্রধান কবি আছেন, যিনিও ফেসবুকে ঘোষণা করেন প্রকৃতি মেয়েদের সন্তান পালন এবং সংসার ধারণের জন্যই জন্ম দিয়েছেন। তাঁদের কেন কবিতা লেখা?

মিথ থেকে শুরু করে আজকের প্রকৃত সমাজের দিকে তাকালে যে বৈষম্য চোখে পড়ে, তা থাকলেও, মেয়েরা চিরকাল লড়াই করেই লেখালেখি করেছেন আর সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। রাসসুন্দরী দেবী, স্বর্ণকুমারী দেবী ছাড়াও পরে আশাপূর্ণা দেবী, মহাশ্বেতা দেবী, কবিতা সিংহ, বিজয়া মুখোপাধ্যায়, মল্লিকা সেনগুপ্ত সহ এমন কত লেখিকা আছেনযাঁরা এই লিঙ্গবৈষম্যের দেশে কলম হাতেই গর্জে উঠেছেন। প্রসঙ্গে মল্লিকা সেনগুপ্তরস্ত্রী লিঙ্গ নির্মাণগ্রন্থটি বিশেষভাবে স্মরণ করা যায়।

সুইডেনের বিখ্যাত লেখিকা এলসি ইউহানসন কর্মজীবনে ছিলেন এক ধরনের শ্রমিক। বেশিরভাগ সময় কাজ করেছেন ডাক বিভাগে। তিনি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন ৪৭ বছর বয়সে। তাঁর প্রথম উপন্যাস প্রকাশ করেছেন ৫৪ বছর বয়সে। এত দেরিতে কেন? এর উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “আমি দেরিতে প্রথম বই প্রকাশ করেছি, তার মানে এই নয় আমি দেরিতে লেখালেখি শুরু করেছি। আমার শৈশবে আমাদের বাড়িতে কোন বই ছিল না। আমি বই পড়ার সুযোগ পাইনি। আমাদের বাড়িতে কোন চিত্রকর্মও ছিল না। আমি প্রাচুর্যের মুখ দেখিনি। আমার মনকে প্রকাশ করার জন্যে লেখালেখিই ছিল সহজ এবং একমাত্র সম্ভাব্য উপায় যদিও তারও কোন সুযোগ ছিল না। আর্থিক টানাপোড়েন, বিয়ের পরে সাংসারিক চাপ লেখালেখির প্রতি অস্বীকৃতিমূলক মনোভাব আমার বই প্রকাশে বড় বাধা ছিল। সন্তানের পোষণ যত্নআত্তি, সংসারের দৈনন্দিন কাজ, পাশাপাশি ডাক বিভাগের মজুরিগিরির কারণে আমি লিখতে বসতে পারিনি বা লিখে উঠতে পারিনি। যখন আমার সন্তান বড় হয়ে উঠলআমি ফুরসত পেলাম, লেখালেখিতে বসতে পারলাম। বই প্রকাশ পেল। কিন্তু প্রকৃত সত্য হল কৈশোর থেকে শুরু করে সাতচল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিদিন আমার মাথায় লেখালেখি চলত। সেই অর্থে আমি সারাজীবন ধরে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ লিখেছি।” আজ তাঁর বয়স ৮৮। তিনি এখনও লিখে চলেছেন। 

আমাদের এই আধা-সামন্ততান্ত্রিক দেশে মেয়েদের সম্মানই যেখানে নেই, সেখানে মেয়েদের লেখালেখির সম্মান যে থাকবে, এ কথা কল্পনা করাও যায় না। যিনিই লেখালেখি করতে আসছেন তিনি তো বটেই, যিনি দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করছেন, তিনিও, অপমানের এই চিরন্তন কুঠারের সামনে নিজেকে বলিপ্রদত্ত করার জন্যই লিখতে আসেন। আর সে অপমানের মধ্যে মিশে যায় লেখক হিসেব অপমান, কবি হিসেবে অপমান, মেয়ে হিসেবে অপমান এব হয়তো আগামী দিনে আরও কঠিন কিছু। কিন্তু আমরা তো থেমে যাব না। পুরুষতান্ত্রিক এই বিশ্বে মেয়েদের লেখালেখি যে বিশ্বকে পরিবর্তন করেও দিতে পারে, তার প্রমাণ একাধিক রয়েছে। আমাদের দেশেই আগে শিক্ষিত নারীদের জনপদবধূ বলা হত। তার প্রমাণ বিভিন্ন  সংস্কৃত নাটক এবং পুরাণের কাহিনি। কিন্তু এত সব কিছুর মধ্যেও, যখন মৈত্রেয়ী যাজ্ঞবল্ককে বলেন, “যা নিয়ে আমি অমৃত লাভ করব না, তা নিয়ে আমি কী করব?” তখন বোঝা যায়, প্রজ্ঞায় এবং চেতনায় তিনি কত এগিয়ে। মহারাষ্ট্রের যেসব সন্ত মহিলা কবির গান এখনও গীত হয়, তখন বোঝা যায় তাঁদের ভূমিকা। অন্ত্যজ শ্রেণির মহিলা এবং কবি বলে কত কষ্টেই কাটিয়েছেন। প্রাণ পর্যন্ত দিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গীত থামেনি, কাব্য থামেনি। 

কারণ, নিজেকে রক্তাক্ত কুঠার করে তোলার জন্য ‘আমার অপমানের প্রয়োজন আছে’। 

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More