ক্যাপিটলের ওপর আক্রমণ কি আমাদের জন্যও এক অশনিসঙ্কেত

অংশুমান কর

আমেরিকায় যা হল তা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। সেই কতদিন আগে জয়দেব বসু লিখেছিলেন, “ওরা গণতন্ত্রও মানে/তবে, অন্যের দেশে চায় না”। এমনকী যাঁরা আমেরিকাকে একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত, তাঁরাও মানতেন যে, অন্তত নিজেদের দেশে গণতন্ত্রকে মূল্য দেয় আমেরিকা। এইবার চিড় ধরেছে সেই বিশ্বাসেও। তাই অনেকেই বলছেন, যা ঘটেছে তা অবিশ্বাস্য।
তলিয়ে দেখলে কিন্তু বোঝা যায় যে, ক্যাপিটল-এর ওপর এই আক্রমণ প্রায় অনিবার্যই ছিল। ঘটনার পরে ট্রাম্পের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করেছে টুইটার। জানানো হয়েছে কিছু আপত্তিকর পোস্ট সরানো না-হলে ট্রাম্পের অ্যাকাউন্ট চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। মনে করার কিন্তু কোনও কারণ নেই যে, ট্রাম্পের করা একটি বা দু’টি টুইটের কারণেই ঘটে গেছে এত বড় ঘটনা। ঘটনাটির পরে আমেরিকার বেশ কিছু প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেছেন যে, এই ঘটনা আমেরিকার গণতন্ত্রের ওপর এক ধাক্কা। ঐতিহ্যের অবমাননা। আসলে গণতন্ত্রে সত্যি বলতে কী ঐতিহ্য বলতে কিছু হয় না। গণতন্ত্রকে নিরন্তর চর্চার মধ্যে দিয়ে সতেজ রাখতে হয়। ট্রাম্প এই কাজটি করেননি। বরং গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে সেই কাঠামোটিকেই দুর্বল করার কাজ করে গিয়েছেন ধারাবাহিকভাবে। নির্বাচনপূর্ব বিতর্কগুলিতেও তিনি বাইডেনের মুখোমুখি হননি, সমস্ত গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও ঐতিহ্যকে অস্বীকার করেই। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এই কথাটিও বলেই যাচ্ছিলেন যে, এই নির্বাচনের ফলাফল তিনি মানেন না। ক্যাপিটল আক্রান্ত হওয়ার পরে সারা বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়ে তিনি শেষমেশ বাইডেনের জয় মেনে নিয়েছেন ঠিক, ২০ জানুয়ারি ক্ষমতা হস্তান্তর হবে নির্বিঘ্নেই এই কথাও বলেছেন বটে, তবে একই সঙ্গে এটিও জানাতে ভোলেননি যে, নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে তিনি একমত নন। আমেরিকার আগামী দিনগুলি তাই খুব শান্তির হবে না। যাঁরা হামলা চালিয়েছেন ক্যাপিটলে তাঁদেরকেও ট্রাম্প এবং তাঁর দলের কেউ কেউ বলেছেন ‘দেশপ্রেমিক’। যেন বা দেশ বাঁচাতেই এই হামলা!

এখনও পর্যন্ত যা খবর চারজনের মৃত্যু হয়েছে এই আক্রমণের ঘটনায়। এর মধ্যে একজন মহিলা। তাঁর নাম অ্যাশলি বাবিট। তাঁর প্রাক্তন স্বামী জানিয়েছেন যে, তিনি এয়ারফোর্সের প্রাক্তনী। বলেছেন যে, অ্যাশলি স্বাধীনভাবে ভাবতে জানতেন, যা ভাবতেন তা বলতেও পারতেন। তবে তিনি ছিলেন যত্নশীল, স্নেহময় একজন মহিলা। পড়ে চমকে উঠতে হয়। এয়ারফোর্সে কাজ করেছেন এমন একজন আমেরিকান (নিয়মনীতি মানাই যাঁর স্বভাবগত অভ্যেস হওয়া উচিত) যে ক্যাপিটল আক্রমণের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন তা সত্যিই অভাবনীয়। একইভাবে অভাবনীয় যত্নশীল এবং স্নেহময় একজন মহিলার পক্ষে বিরোধী মতকে সম্মান না-জানিয়ে অগণতান্ত্রিক উপায়ে সেই মতকে নস্যাৎ করার প্রচেষ্টায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করা। অ্যাশলি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, দূর থেকে বসে আমরা যাঁরা ভাবি যে, ট্রাম্পের সমর্থক বোধহয় কেবলমাত্র অন্ধ-জাতিবিদ্বেষী এবং লুম্পেন আমেরিকানরা তাঁরা পুরোটা ঠিক ভাবি না। ভয়টা এখানেই। অন্যের দেশে গণতন্ত্রকে না-মানলেও নিজেদের দেশে যে গণতন্ত্রকে এত বছর ধরে আমেরিকানরা মান্যতা দিতে পেরেছেন তার একটা বড় কারণ হল এই যে, শুধু নোয়াম চমস্কির মত পণ্ডিতরা নন, সাধারণ চিন্তাশীল মানুষেরাও সে দেশে আপত্তি সত্ত্বেও বিরুদ্ধমতকে সম্মান জানিয়েছেন। সেই মানুষদের একটা বড় অংশকে যে ট্রাম্প নির্বাচনে তাঁর পরাজয় সত্ত্বেও বিভ্রান্ত করে রাখতে পেরেছেন, অ্যাশলি তার বড় প্রমাণ। নির্বাচনে হেরে গেলেও এই একটি জায়গায় তিনি জিতে গিয়েছেন। এবং এই জয় কিন্তু নির্বাচনে জয়ী বাইডেনকে আগামী দিনে ভোগাবে। রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি হয়তো আক্রমণকারীদের শাস্তি দিতে পারবেন, তা জরুরিও বটে। কিন্তু আরও জরুরি হল, আমেরিকান জনগণের সেই অংশটির আস্থা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং বিচারব্যবস্থার ওপরে ফিরিয়ে আনা যাঁরা ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগী মিডিয়ার ধারাবাহিক অনৃতভাষণে সেই আস্থা হারিয়েছেন।
আমেরিকায় যা ঘটে গেল, আশা করা যায় আমাদের এই পোড়া দেশে তা ঘটবে না। যদিও অনেকেই সেই অশনিসঙ্কেত দেখতে শুরু করেছেন। এর একটা কারণ এই যে, আমাদের দেশশাসকরা মুখে গণতন্ত্রকে মান্যতা দেওয়ার কথা বলছেন বটে, কিন্তু কাজে অনেক সময়েই তা করছেন না। মিল আরও এক জায়গায়। উগ্র দেশপ্রেম আজ এ দেশেও গণতান্ত্রিক কাঠামোটির ওপরে সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবেই নেমে এসেছে। কে না জানে যে, উগ্র দেশপ্রেম মানুষকে অনিবার্যভাবে অন্ধ ও একগুঁয়ে করে তোলে। কোমলকে কঠিন করে দেয়। একজন ‘স্নেহময়’ মহিলাও তখন অনায়াসে নিষ্ঠুর আক্রমণকারী হয়ে ওঠেন। ভুলে গেলে চলবে না যে, উগ্র দেশপ্রেমের সঙ্গে গণতন্ত্রের এক স্পষ্ট বিরোধ আছে। কারণ একটি মতবাদ বিশ্বাস করে সংকীর্ণতায়, অন্যটি ঔদার্যে। একটির দাবি আনুগত্য, অন্যটির বিরোধিতা।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More