অনির্বাণ প্রদীপের আলোয়

শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী

১৯৭৩ সালের শীতের সকাল। কলকাতা তখন আড়মোড়া ভেঙে সবে জেগে উঠেছে। ঘরে ঘরে উনুনের ধোঁয়া জেগে উঠেছে, আপিসের তাড়া। এক বছর ত্রিশেকের যুবক সরু একঠেঙে আনোয়ার শাহ রোড ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে চলেছে এক প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীতশিল্পীর বাড়ি। এ বাড়িতে যাতায়াত যদিও তার অনেক দিনের, তবুও এখনও ঢুকতে গেলে শ্রদ্ধায় আপনিই মাথা হেঁট হয়ে আসে। হাঁটতে হাঁটতে সে তখন ভাবছে, যে অনুরোধ নিয়ে সে এসেছে, যাঁর কাছে এসেছে, সেটা সে তাঁর সামনে রাখবে কী করে! যদিও সে তাঁর স্নেহধন্য, এতদিনে তারাপদ বাবু থেকে মেশোমশাই হয়ে গেছেন। আপনার জন বলেই মনে করেন। তবুও এ অনুরোধ তো সে নিজে থেকে করতে আসেনি, আজ সে এই বাড়িতে ঢুকছে সরকারের প্রতিভূ হয়ে। তাই কুণ্ঠা তার মগজে মনে সর্বত্র। তবুও তথ্য-সংস্কৃতি মন্ত্রক তাকেই এ দায়িত্ব দিয়েছেন যখন, তখন তো কর্তব্য করতেই হবে।

এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সে যখন বাড়ির সামনে এসে পৌঁছলো, গেটের সামনেই দেখা হয়ে গেল মানসের সঙ্গে। মানস তখন তারাপদ কলেজ অফ মিউজিকের কোনও একটা কাজে বেরোচ্ছে। দেখা হতেই হাসিমুখে এগিয়ে এল। প্রদীপ জিজ্ঞাসা করলেন “মেসোমশায়ের সঙ্গে দেখা হতে পারে একটু?” মানস বলল- “হ্যাঁ, আছেন তো! তুমি যাও না উপরে।” প্রদীপ ভাবলেন এই সুযোগে মানসের সঙ্গে কথা বলে ওনার মনটা একটু বুঝে নিতে পারলে ভালো হয়। বললেন “তোমরা কি কথা বলে দেখেছ? উনি কি মনস্থির করেই ফেলেছেন?”  মানস বলল, “হ্যাঁ, প্রদীপ। আর আমাদের কিছু বলার চেয়ে ওনার মন কী বলছে সেটাই তো আসল কথা।” প্রদীপ বললেন “কিন্তু ওরা যে আমাকে পাঠিয়েছে একবার কথা বলে দেখতে…” মানস বোধ করি তার মনের কুণ্ঠা বুঝতে পেরেই ঠোঁটের কোণে একটু হাসি এনে বলল, ” তুমি বলে দেখতে পারো, তবে আমার মনে হয় না খুব একটা লাভ হবে ।” প্রদীপ মনে মনে জানতেন, তবুও খানিকটা বুঝেই গেলেন যে কি উত্তর পাবেন।

সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাঁদিকে গানের ঘর। দরজার কাছে পৌঁছে দেখতে পেলেন মানুষটি বসে আছেন চেয়ারে হেলান দিয়ে। অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢুকে প্রণাম করলেন। সহাস্যে আশীর্বাদ করলেন তারাপদবাবু। “আমাকে মাফ করবেন মেসোমশাই, আজ কিন্তু আমি সরকারের তরফে একটা আবেদন নিয়ে এসেছিলাম। ওঁরা খুবই আন্তরিকভাবে চান আপনি এই উপাধিটা গ্রহণ করুন। ” প্রদীপের অজান্তেই দুটি হাত আপনিই জড়ো হয়ে এসেছে সামনে। সামনে বসে আছেন সঙ্গীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী। শান্ত সৌম্য চেহারা, কিন্তু কথাটা শুনে চোয়ালটা যেন একটু শক্ত হয়ে গেল। শুধু চোখ দুটি তুলে বললেন “তুমি নিশ্চয়ই চাও না এই সম্মান নিতে গিয়ে আমি অসম্মানিত হই।” প্রদীপ ততক্ষণে পায়ের কাছে বসে পড়েছেন। মুখ নীচু করে মাথা নাড়লেন। প্রদীপের কাঁধে হাত রেখে তিনি এবার বললেন “তবে আমায় এ অনুরোধ রাখতে বোলোনা। সকাল সকাল এসেছ, চা জলখাবার না খেয়ে যেও না, তাহলে তোমার মাসিমা কিন্তু মনঃক্ষুন্ন হবেন।”  এর কয়েক দিনের মধ্যেই দস্তুরমতো চিঠি দিয়ে সঙ্গীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী পদ্মশ্রী খেতাব প্রত্যাখ্যান করেন।

সেদিনের সেই বছর ত্রিশেকের যুবকের কাছ থেকেই বহুযুগ পরে এ গল্প শোনা। তাঁরই তখন বরফসাদা চুল, চোখের পুরু চশমা আরো পুরু হয়েছে, কিন্তু সেদিনের সেই নম্রতা ভদ্রতা শ্রদ্ধাবোধ কোনদিনই হারিয়ে যায়নি। বরং নিজের কাজে যত বড় হয়েছেন, ততই গাঢ় হয়েছে সে বোধ। প্রবাদপ্রতিম আবৃত্তিকার প্রদীপ ঘোষ, যাকে ছোটবেলা থেকে প্রদীপ জেঠু বলেই জেনেছি। আর আজ যখন তিনি এই পৃথিবীর মঞ্চ থেকে শারীরিক বিদায় নিয়েছেন, অজস্র স্মৃতি ভিড় করে আসছে বাড়ির, আসরের। কত গল্প, কত পাঠ, কত গান! সব মনে পড়ে যাচ্ছে। মনে পড়েই থাকে আসলে। তাঁর সাথে যে হৃদ্যতা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধার সম্পর্ক আমাদের পরিবারের চিরকাল ছিল, তাকে কথায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। বাবাকে যেমন ভালোবাসতেন, তেমনই শিল্পী হিসেবে অসীম শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন প্রদীপ জেঠু। বাবাও তাই। দাদুর স্মৃতিতে যে তারাপদ মিউজিক কনফারেন্স হত, তার উপস্থাপকের ভূমিকায় তিনি ছিলেন অপরিহার্য। তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের শীর্ষে থাকাকালীনও কোনওদিন তার গরিমার কোনো দৃষ্টিকটু প্রকাশ দেখিনি। বাচিক শিল্পী হিসেবে তিনি ছিলেন অননুকরণীয়, অপ্রতিরোধ্য। ম্যানারিজম-বিহীন পাঠ, অথচ সহজ সঠিক ভাবাবেগ তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল।

কাজী সব্যসাচী যখন মধ্য গগনে তখন ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন প্রদীপ ঘোষ। কাজটা সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি যেরকম মানুষ ছিলেন, তাতে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতার থেকেও পারস্পরিক অনুপ্রেরণায় প্রাণিত হওয়ায় বেশি বিশ্বাস করতেন। অতি নাটকীয়তা নয়, কণ্ঠস্বরের প্রাবল্য নয়, কবিতার বোধকে ফুটিয়ে তোলাই তাঁর পাঠের প্রধান উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা, এমন ব্যক্তিত্ববান অথচ সহজ, ভালো মনের মানুষ আমি আক্ষরিক অর্থেই খুব কম দেখেছি। মুহূর্তে আপন করে নিতে পারতেন। আজকের এই অতিরিক্ত আলো চাওয়ার জগতে তিনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি নিজের কাজেই তার ঔজ্জ্বল্য রেখে গেছেন। আসলে শিল্পের প্রতি ভালবাসা যদি কারো কাছে শেষ কথা হয়, তাহলে আপনিই সে শিল্পীর মুখে আলো এসে পড়ে। তিনি ছিলেন সে রকমই একজন শিল্পীমানুষ।

বাবা চলে যাওয়ার পরও কতবার এসেছেন বাড়িতে। আমার কবিতার বই, গানের সিডি, কুণ্ঠাভরে হাতে তুলে দিয়েছি। কী উচ্ছ্বসিত আনন্দে আশীর্বাদ করেছেন! বাড়ি নিয়ে গিয়ে পড়ে, শুনে, ফোন করে মতামত দিয়েছেন। মনে আছে ফোন করে বলেছিলেন “বাবার যোগ্য সন্তান হয়েছ তো তুমি! এত ভালো গাও, এত অপূর্ব লেখো!”  উত্তেজনায় আমার একখানা লেখা নিজেই পড়ে শোনালেন। আমার তো লজ্জায় মাটিতে মিশে যাওয়ার অবস্থা। আর কোনওদিন তো সে ফোন আসবেনা। আর তাঁর পায়ের কাছে বসে গল্প, কবিতা শোনা হবেনা আমার। মারণ রোগ আমাদের কাছ থেকে যে সম্পদ কেড়ে নিয়ে গেল তা পূরণ হবার নয়। তবু আপনি থাকবেন প্রদীপ জেঠু, আপামর শ্রোতাদের আত্মীয়-বান্ধবের মনের মধ্যে চিরকাল। আপনার কণ্ঠস্বর কোনও দিন আমাদের ছেড়ে যাবেনা। বাবা চলে যাওয়ার পরে অনেক সাহস যুগিয়েছেন আমায়। যখনই আসতেন, দুজনে বসে কথা বলতাম। বাবাকে অনুভব করতাম আমাদের দুজনের মাঝে। আর যে’দুটি পংক্তি প্রথম বইয়ে লিখে আপনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম,  ঘুরে ফিরে সেই পংক্তি দুটিই বারবার মনে পড়ছে যেন…

“স্তব্ধতার বৃত্ত ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার কথা ভাবি –

যে গেছে, সে থেকে গেছে – এই বিশ্বাসে হাত রাখি।” 

 

(লেখিকা সঙ্গীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তীর নাতনি, মুম্বই নিবাসী ইন্ডিয়ান আইডল একাডেমির মেন্টর, স্বনামধন্য সঙ্গীতশিল্পী এবং কবি)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More