আব্বাসের সঙ্গে জোট বাঁধা কি ঐতিহাসিক ভুল হল

অংশুমান কর

ব্রিগেডের মাঠের উপচে-পড়া ভিড়কে পেছনে ঠেলে দিয়ে আলোচনায় সামনের সারিতে চলে এসেছেন আব্বাস সিদ্দিকি। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, কট্টর বাম এমনকি সিপিআই (এম)-এর সমর্থকদেরও একটি অংশ কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না আব্বাসের সঙ্গে বামপন্থীদের এই রাজনৈতিক সখ্য। একে আর একটি ‘ঐতিহাসিক ভুল’ বলে মনে করছেন অনেকেই। অনেকেই বলেছেন, অতীতের একটি ছবির মতোই ব্রিগেডের জনসভায় বিমান বসুর হাত ধরে থাকা ‘ভাইজান’-এর ছবি আগামীতে ভূতের মতোই তাড়া করবে সিপিআই (এম)-সহ বামপন্থী দলগুলোকে। অনেকেই এই আশঙ্কাও ব্যক্ত করেছেন যে, এরপর বাংলায় সমস্ত নির্বাচনেই প্রধান সমীকরণ হয়ে দাঁড়াবে ধর্মীয় মেরুকরণ। বিলাপ শোনা যাচ্ছে, আর ধর্মনিরপেক্ষ দল বলে এই বাংলায় কিছু রইল না। নোটায় ভোট দেওয়ার আহ্বানও শোনা যাচ্ছে অনেক বাম-সমর্থকদের কণ্ঠেই।

প্রশ্ন হল, আব্বাসের সঙ্গে জোট করা কি সত্যিই ঐতিহাসিক ভুল হল? ভোটের অঙ্কে এই জোট বিপদে ফেলবে মূলত তৃণমূলকেই। এবং এতে সন্দেহ নেই যে, লাভ হবে বিজেপির। বিজেপি-বিরোধী ভোট যত বেশি বিভক্ত হবে ততই লাভ বিজেপির। এ তো সরল অঙ্ক। এটাও ঠিক যে, আব্বাসের সঙ্গে হাত মেলানোয় কট্টর বাম-সমর্থকদের একটা অংশের ভোট বামপন্থীরা পাবেন না। সেই ভোটের কতখানি নোটায় যাবে আর কতখানি বিজেপি বা তৃণমূলের পক্ষে যাবে সে হিসেব করা এখনই বেশ শক্ত। উলটো দিকে এটাও সত্যি যে, আব্বাসের জোটভুক্তির ফলে মুসলিমদের একটা বড় অংশের ভোট কিন্তু বামপন্থীদের দিকে ফিরে আসবে। দিন যত যাবে, তত এই নানাবিধ সমীকরণের ফলে এই জোট থেকে বামপন্থীদের আদৌ কোনও রাজনৈতিক লাভ হবে কি না স্পষ্ট হতে থাকবে সেই হিসেব।

অবশ্য আব্বাসকে জোটে না-নিলে ভোটের অঙ্কে বামপন্থীদের হয়তো লাভের চেয়ে ক্ষতিই হত বেশি। কেননা, সেক্ষেত্রে আব্বাস একাই লড়তেন। টেনে নিতেন মুসলিম ভোটের একটা বড় অংশ। সেই ভোট যেমন তৃণমূলের ঘরেও যেত না, তেমনই বামপন্থীদের ঘরেও আসত না। রাজনৈতিক দিক থেকে, তাই মনে হয়, হয়তো অনেক হিসেব কষেই এই জোট করা হয়েছে। জোট না-করলে ক্ষতি হত বেশি এই দুর্ভাবনা থেকেই, সম্ভবত। বাম সমর্থকদের যে-অংশটি এই জোট নিয়ে ক্ষুব্ধ তাঁরা কিন্তু এই ভোটের অঙ্কের হিসেব নিয়ে আদৌও বিচলিত নন। তাঁদের ক্ষোভ এই জোট গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের ওপর এক বড় আঘাত। বামপন্থা তার চরিত্রভ্রষ্ট হল।

একটি কথা এই প্রসঙ্গে বলে নেওয়া ভাল। বাম আন্দোলন এই দেশে ধর্মের থেকে সম্পূর্ণ মুখ ঘুরিয়ে যে থেকেছে চিরকাল এমনটা নয়। ভারতবর্ষের মতো দেশে সংসদীয় রাজনীতিতে অংশ নিলে ধর্মকে উপেক্ষা করে রাজনীতি করা অসম্ভব। মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে বামপন্থীরাও তো চিরকাল মুসলিম প্রার্থীই দিয়েছেন। হরকিষেণ সিং সুরজিৎ তাঁর পাগড়ি পরিধান করেছেন আমৃত্যু। প্রশ্নটা এইবার অনেক বেশি জোরালো হয়ে উঠেছে কারণ, এইবার, অনেকেই মনে করছেন যা ছিল আড়ালে, তাই চলে এসেছে প্রকাশ্যে। এই বিতর্কে প্রবেশ করার আগে, একবার স্মরণ করতে চাই আব্বাস ঠিক কী বলেছেন ব্রিগেডের সভায়। তিনি বলেছেন যে, তিনি ভারতবাসী হিসেবে গর্বিত। বলেছেন যে, শুধু মুসলিম নয়, পিছিয়েপড়া, দলিত সমস্ত অংশের মানুষেরই অধিকারের কথা বলবে তাঁর দল। খুব জোর দিয়ে বলেছেন বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের কথা। এই কথাগুলো কিন্তু কোনও ধর্মীয় নেতার কথা নয়। পরিপক্ক রাজনীতিবিদের কথাই।

বামপন্থীদের আব্বাসের হাত-ধরাকে সমর্থন করছেন যাঁরা তাঁরা আব্বাসের এই কথাগুলিকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, আব্বাসের দলের সভাপতি কোনও মুসলিম নন, বরং একজন আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, শিমুল সোরেন। ঠিক। আব্বাসের দলটির নামও তো ‘ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট’। কিন্তু এটাও একই সঙ্গে ঠিক যে, আব্বাস একজন ধর্মীয় নেতা। ঠিক যে, অতীতে এমন কিছু কথা তিনি বলেছেন যা থেকে মনে হতেই পারে যে, তিনি মুসলিম মৌলবাদকে সমর্থন করেন। বলা-কথা ফিরিয়ে নেওয়া খুব কঠিন। এই কথাগুলি আব্বাস এবং বামপন্থীদের পিছু ছাড়ছে না। আব্বাসের হাত ধরায় তাই যে বামপন্থী বন্ধুরা ‘গেল-গেল’ রব তুলেছেন, তাঁদের আশঙ্কাকে পুরো উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু, অতীতে-বলা কথাগুলির একটিও আব্বাসের কণ্ঠে গতকাল ব্রিগেডের মাঠে শোনা যায়নি। আমার এক পরিচিত মুসলিম বামপন্থী বন্ধু বলেছেন যে, বামপন্থীদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করায় আব্বাসের চেতনার উন্নতি হতে শুরু করেছে। বামপন্থীরা ওঁকে ঠিক গড়েপিটে নেবেন। হতে পারে। একজন মানুষের চেতনা যে চিরকাল একইরকম থাকে না, তা আমি এই জীবনেই দেখেছি। প্লেনের মধ্যেও নামাজ পড়া আমার কট্টর মুসলিম বন্ধু শেষজীবনে হয়ে গেছেন সম্পূর্ণ নাস্তিক–- এ আমার নিজের চোখেই দেখা।

প্রশ্ন হল, চেতনার যে-উন্নতির কথা আমার বন্ধুটি বলেছেন তা কি সত্যিই হয়েছে আব্বাসের ক্ষেত্রে? সত্যি বলতে কি, এক্ষুনি এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও সম্ভব নয়। হতে পারে যে, ব্রিগেডের মাঠে যে কথাগুলি তিনি গতকাল বলেছেন তা তাঁর সৎ উচ্চারণ। হতে পারে যে, এর পুরোটাই অঙ্ক কষে বলা। বাংলার মাটিতে পায়ের তলার রাজনৈতিক জমি আরও একটু পোক্ত হলেই তিনি পুরোদস্তুর ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির পথেই হাঁটবেন। তা যদি হয়, তাহলে তা বামপন্থীদের পক্ষে হবে অশনিসঙ্কেত এবং আব্বাসকে এই বাংলায় রাজনৈতিক জমি দেওয়ার দায় তখন বামপন্থীদেরই বহন করতে হবে। দেখার এটাই যে, বামপন্থীরা কতখানি আব্বাসকে প্রভাবিত করতে পারেন আর কতখানিই বা আব্বাস তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। সত্যি বলতে কী, এই বিষয়েও এক্ষুনি নিদান দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি। তবে যে দলটি আব্বাস তৈরি করেছেন ‘সেকুলার’ শব্দটি ব্যবহার করে, সেই দল কিন্তু তাঁর ওপরে একটা চাপ তৈরি করবেই। কেবল ধর্মীয় পরিচিতির তাসটি খেললে আগামীতে বাংলার বাকি পিছিয়েপড়া মানুষদের যে অংশটিকে আজ তিনি সঙ্গে পেয়েছেন, তাঁদের আর পাবেন না। হতে পারে যে, আব্বাস গায়ে মাখবেন না এই ক্ষতি। সময়ই এই প্রশ্নের উত্তর দেবে। কাগজে-কলমে এক্ষুনি বামপন্থীরা অবশ্য বলতেই পারেন যে, তাঁরা সেই দলটির সঙ্গেই জোট বেঁধেছেন যে দলটি একটি ‘সেকুলার’ দল। বলছেনও।

আমার বরং মনে হয়েছে অন্য একটি কথা। রাজনীতিতে নবীন বলেই, সম্ভবত, আব্বাসের মধ্যে নমনীয়তার অভাব দেখা গিয়েছে গতকাল। যে ভাষায় তিনি কংগ্রেসকে প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তা জোটধর্মের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই মুহূর্তে এই অনমনীয়তাই এই জোটের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More