নির্বাচন কমিশন কিন্তু মূল দায় এড়াতে পারে না

অংশুমান কর

মাদ্রাজ হাইকোর্টের সম্মাননীয় প্রধান বিচারপতির একটি পর্যবেক্ষণ নিয়ে শোরগোল পড়ে গেছে। তিনি বলেছেন যে, করোনার এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য একমাত্র দায়ী নির্বাচন কমিশন। সন্দেহ নেই যে, এটি একটি অত্যন্ত কড়া মন্তব্য। মাদ্রাজ হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ বাংলার জন্য প্রযোজ্য নয়–- হাইকোর্টের এক্তিয়ার ঠিক কতটুকু সেই বিষয়টি জানিয়ে এমন কথাও বলেছেন কেউ কেউ। ভোটগণনা বন্ধ করে দেওয়ার যেকথা মাননীয় বিচারপতি বলেছেন, সেটিও তিনি পারেন না–- এই মতও শোনা গেছে। এইসব কূট তর্ক-বিতর্ক চলবে এখন দিনকয়েক। কিন্তু, মাননীয় হাইকোর্টের বলা মূল কথাটির গুরুত্ব এই তর্ক-বিতর্ক কমাতে পারবে না।

একটা কথা প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল যে, এই যে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হল দেশে, এর দায়, স্বাস্থ্যকর্মীরা ছাড়া, আমাদের সবার। রাষ্ট্র তার কাজ ঠিকমতো পালন করেনি। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করিনি। এখনও অনেকেই মাস্ক পরছি না। পরতে অনুরোধ করলে তর্কে জড়াচ্ছি যিনি অনুরোধ করছেন তাঁর সঙ্গে। রাজনৈতিক দলগুলির কথা যত কম বলা যায় ততই মঙ্গল। নির্বিচারে সমস্ত করোনা-বিধিকে উপেক্ষা করে সভা-সমাবেশ, পদযাত্রা করেছে সব দলই। সিপিআই (এম) কেবল একটু আগে এই কর্মকাণ্ডে খানিকটা রাশ টেনেছে এই যা। রাজনৈতিক দলগুলির দায় আছেই। কিন্তু সত্যিটা হল এই যে, এই পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য মূল দায়টি কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ওপরেই বর্তায়।

পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কী করতে পারত নির্বাচন কমিশন? প্রথম কথাই হল এই যে, এই গভীর সংকটের সময়ে এতগুলি দফায় নির্বাচন পরিচালনার দরকার ছিল না। বিশেষ করে তখন, যখন এটা জানা ছিল যে, দ্বিতীয় ঢেউ অনিবার্য ও অবশ্যম্ভাবী। তাও যদি বা দফায় দফায় নির্বাচন মেনেও নেওয়া যায়, যখন দেখা গেল যে, প্রতিদিন লাগামহীন হচ্ছে সংক্রমণ, তখন কেন শেষ কয়েক দফার ভোট এই বাংলায় অন্তত একত্রে করে নেওয়া হল না? জানি, এই কাজটি সহজ ছিল না। এর জন্য অনেকখানি প্রস্তুতি ও আয়োজনের প্রয়োজন। সহজ ছিল না। কিন্তু, একেবারে অসম্ভব ছিল কি? শেষ কয়েক দফা নির্বাচনের সময়ে তো আর কোনও রাজ্যে ভোটও ছিল না। কেন্দ্রীয় বাহিনি পাওয়া কি অতই কঠিন হত? মানুষের মৃত্যুমিছিলকে গণতন্ত্রকে সুরক্ষার কোনও দোহাই দিয়ে যদি অগ্রাহ্য করা হয়, তাহলে এই কাজটি যাঁরা করছেন, তাঁদের সুচেতনার ওপর বিন্দুমাত্র আস্থা রাখা যায় না। অনেক প্রাণের মূল্যে যে গণতন্ত্রকে রক্ষা করা হচ্ছে তা কি আদৌ গণতন্ত্র?

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। সেই কথাটিও বলেছেন মাননীয় বিচারপতি। নির্বাচন যখন চলছিল তখন কী ভূমিকা ছিল নির্বাচন কমিশনের? এই বাংলায় আমরা দেখেছি, কমিশন অনভিপ্রেত মন্তব্য করার জন্য নেতা-নেত্রীদের প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু, করোনা-বিধি উপেক্ষা করার জন্য এই শেষবেলায় তৎপর হওয়া ছাড়া আর কোনও পদক্ষেপ কমিশন নিয়েছে কি? কেন অনেক আগেই সমস্ত প্রচারের ওপর রাশ টানা হল না? কেন প্রচারকে বাধ্যতামূলকভাবে ভার্চুয়াল করে দেওয়া হল না? পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে যদি শেষ কয়েক দফার ভোট পিছিয়ে দেওয়া হত, তাও কি খুব অসঙ্গত হত? তদারকি সরকারগুলি শাসন পরিচালনা করতেই পারত। আসলে, রাজনৈতিক দলগুলি নিয়মকানুন মানবে না–- এ আমাদের ভবিতব্য। আমরা অভিভাবকত্ব আশা করেছিলাম নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকেই। কমিশনের কর্তাব্যক্তিরা আমাদের অভিভাবক হয়ে ওঠেননি। কিছু মানুষকে বরং এই কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন যে, কমিশন ক্ষুদ্র স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে। প্রশ্নের মুখে পড়েছে কমিশনের নিরপেক্ষতা। এ যতখানি কমিশনের ততখানিই আমাদেরও দুর্ভাগ্য।

কেউ কেউ এমনটা বলছেন যে, যেসব জায়গায় নির্বাচন নেই, সেখানে এই প্রবল দ্বিতীয় ঢেউ এল কীভাবে? বা এর জন্য নির্বাচন কমিশনের আদৌ কি দায় থাকতে পারে? মানুষের আন্তঃরাজ্য চলাচলে যখন কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই, তখন এই রাজ্যগুলির সঙ্গে নির্বাচনের প্রক্রিয়াটির ভেতর দিয়ে যাওয়া রাজ্যগুলির কি যোগাযোগ ছিল না? এখন নেই? এক রাজ্য ছেড়ে মানুষ নানা প্রয়োজনে যাননি অন্য রাজ্যে? একজন ব্যক্তিই তো একটি গোটা রাজ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর পক্ষে যথেষ্ট! একজন ব্যক্তি প্রায় সাড়ে চারশো মানুষকে সংক্রমিত করার ক্ষমতা রাখছেন এই দ্বিতীয় ঢেউয়ে। এই তথ্যটি ভুলে গেলে চলবে না। কাজেই কী থেকে যে কী হয়েছে তা বোঝার জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে নেই। যে সংবেদন এই কঠিন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে আশা করা গিয়েছিল, তা পাওয়া যায়নি। ভোটকর্মীদের অভিজ্ঞতাও খুব একটা সুখকর নয়। শেষ দফার নির্বাচনে তো একজন মহিলা ভোটকর্মী মারা গেলেন প্রায় বিনা চিকিৎসাতেই। এর দায়ও কি নির্বাচন কমিশনের ওপরে বর্তায় না?

তাই, দায় সবার। কিন্তু মূল দায়টি কিছুতেই নির্বাচন কমিশন এড়িয়ে যেতে পারে না। কমিশনকে আমরা এই সংকটে পেতে চেয়েছিলাম অভিভাবকের মতো। পাইনি। কমিশনকে একটিবারের জন্যও সংবেদনশীল মনে হয়নি। মনে হয়েছে যান্ত্রিক। তবুও ভোটগণনার দিন অন্তত কমিশন আরও দায়িত্বশীল এবং সংবেদী ভূমিকা নেবে এই আশা করতেই হয়। তবে তা করলেও, ইতিহাসে এই নির্বাচনে কমিশনের ভূমিকা সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে না।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More