অতিরিক্ত টলিউড-নির্ভরতা বুমেরাং হবে না তো

অংশুমান কর

সংযুক্ত মোর্চা আর তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা ঘোষিত হয়েছে। মোর্চার প্রার্থী তালিকা পূর্ণাঙ্গ নয়। এই তালিকা নিয়ে তেমন আলোচনাও নেই। যেটুকু আলোচনা তা বাম দলগুলির কমবয়সিদের প্রার্থী করা নিয়েই। তৃণমূলের তালিকা নিয়ে কিন্তু আলোচনার শেষ নেই। যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের অনেকেই কান্নাকাটি করেছেন। ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়ে গেছে সেই ক্রন্দনদৃশ্যগুলি। তবে যাঁরা রাজনীতিকে একটু সিরিয়াসলি নিয়ে থাকেন তাঁরা বিচলিত বোধ করছেন ভোটের ময়দানে বিনোদন দুনিয়ার একাধিক ব্যক্তির অনুপ্রবেশে। বড় এবং ছোট পর্দার একাধিক মুখ এবার জায়গা পেয়েছে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায়। অবশ্য এবারেই যে টলিউডের সেলেবরা প্রথম জায়গা পেলেন তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় এমনটা নয়। তবে এবারে প্রার্থী তালিকায় বিনোদন দুনিয়ার লোকেদের উপস্থিতি একটু বেশিই চোখে পড়ছে বই কী! এই যে এতখানি ভরসা তৃণমূল সুপ্রিমো রাখলেন টলিউডের ওপরে–- তা বুমেরাং হয়ে যাবে না তো?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটা কথা স্পষ্ট করে বলে নেওয়া ভাল। বিনোদন জগতের মানুষেরা রাজনীতির জগতে প্রবেশাধিকার পাবেন না–- এইরকম কোনও ফতোয়া দেওয়া মূর্খামো। তাঁদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকারও সংবিধান স্বীকৃত। কিন্তু বিনোদনের দুনিয়া থেকে রাজনীতির জগতে প্রবেশের একটা প্রেক্ষিত থাকা উচিত। মোদ্দা কথাটি হল এই যে, সেই প্রবেশকে যেন কিছুতেই ‘অনুপ্রবেশ’ মনে না হয়। যেমন মনে হয়নি ব্রাত্য বসু বা বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে। এঁদের রাজনৈতিক বীক্ষা ছিল। ব্রাত্য গণ-আন্দোলনের মাধ্যমেই প্রবেশ করেছিলেন রাজনীতির অঙ্গনে। অবশ্য ব্রাত্যর উদাহরণ দিয়ে এমনটাও দাবি করা অসঙ্গত হবে যে, বিনোদন জগতের যে-মানুষটি নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন তাঁকে অবশ্যই গণ-আন্দোলনের শরিক হতেই হবে। এটুকু বলাই যায় যে, তাঁর রাজনৈতিক চেতন ও বীক্ষা থাকা খুবই জরুরি। আজ যদি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় জীবিত থাকতেন এবং কোনও একটি বামদলের প্রার্থী হতেন তাহলে কেউ এই প্রশ্ন মনে হয় তুলতেন না যে উনি প্রার্থী হলেন কেন। এর কারণ ওঁর রাজনৈতিক বীক্ষা, যে-বীক্ষার সঙ্গে বাঙালি পরিচিত। কিন্তু, তৃণমূল গত কয়েকটি নির্বাচনে বিনোদন জগতের এমন কিছু মানুষকে প্রার্থী করেছে যাঁদের এই বীক্ষা আছে বলে মনেই হয়নি। তৃণমূলের সভা বা সমাবেশে তাঁদের হঠাৎ উপস্থিতি এবং তার পরেই প্রার্থী তালিকায় স্থান তাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ঠিক যে, বাঙালি গৃহস্থ ঘরের এইসব চেনা মুখগুলিকে নির্বাচনের রাজনীতিতে ব্যবহারের লাভ তৃণমূল ষোল আনা পেয়েছে। দেবশ্রী রায়ের কাছে পরাজিত হয়েছেন কান্তি গাঙ্গুলি। বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য হেরে গিয়েছেন মিমি চক্রবর্তীর কাছে। জিতেছেন দেব আর নুসরত। আশু লাভ হলেও রাজনৈতিক বীক্ষাহীন এইসব মুখগুলির ব্যবহার বাংলার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে দিচ্ছে। এঁদের নির্বাচন প্রচারে প্রায়শই রাজনীতির কথা অনুপস্থিত থাকছে। কেবল তারকা বলেই সাধারণ মানুষদের ভোটের একটা বড় অংশ এঁরা পাচ্ছেন। শতাব্দী রায় তো এমনকি সেই কুখ্যাত উক্তিটিও করেছিলেন যে জনতা তাঁকে ফ্রি-তে দেখতে পাবেন বলেই জনতার উচিত তাঁকে ভোটের বৈতরণী পার করে দেওয়া। পার তিনি হয়েওছিলেন। ভোটের আঙিনায় এই যে রাজনীতিহীনতার চর্চা, এই চর্চা কিন্তু এমন একটি ক্ষত তৈরি করছে বাংলার রাজনৈতিক শরীরে যার নিরাময় অসম্ভব। মানুষের প্রধান দাবিগুলির থেকে আলো সরে যাচ্ছে। আলো কেড়ে নিচ্ছেন তারকা প্রার্থীরা, সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক কারণে। সমষ্টির যে রাজনৈতিক চেতন থাকে, আঘাত নেমে আসছে সেই চেতনের ওপরেও। এই আঘাত তৈরি করছে এমন এক ক্ষত, জন্ম দিচ্ছে এমন এক শূন্যস্থানের যা ভরাট করে দেওয়া সম্ভব যে কোনও মতবাদ আর দর্শন দিয়ে।

রাজনীতির প্রাঙ্গণে এই ফসল আশু ঘরে তোলার লোভ তাই এমন এক ক্ষতি করছে যাতে জমির ফলনশীলতা যত দিন যাবে ততই কমতে থাকবে। উল্টো এক বিপদও আছে। নির্বাচনে সোলেবদের ব্যবহারে যে প্রাথমিক চমক থাকে তার জৌলুস ম্লান হতে সময় লাগে মাত্র কিছু বছর। সেই জৌলুস অন্তর্হিত হলে কিন্তু জনতার এক অংশ সেলেবকে আর সেলেব হিসেবে দেখেন না। বরং তার সমস্যা মেটাতে কী ভূমিকা নেবেন সেই তথাকথিত তারকাটি, বুঝে নিতে চান সেই হিসেব। একজন তারকার ‘নন-পারফরমেন্স’ও কিন্তু এই ক্ষেত্রে বাকি তারকাদের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে। রাজনৈতিক বীক্ষাহীন সেলেবদের নির্বাচনের আঙিনায় ব্যবহার তাই একদিন বুমেরাং হতে বাধ্য। এবারের নির্বাচনেও এই সেলেবদের জয় অতখানি সহজ হবে না। এর কারণ যে-মুখগুলিকে এইবার ব্যবহার করা হয়েছে তাঁরা কেউ শতাব্দী রায় বা মুনমুন সেন নন। নন এমনকি মিমি বা নুসরতও। পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তায় এঁরা মিমি-নুসরতের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। এঁদের প্রার্থী করায় খুশি নন তৃণমূলের নীচুতলার কর্মীদের একাংশও। সেই ক্ষোভ হয়তো ওপরে ওপরে চাপা দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু যে-দল রেজিমেন্টেড নয়, সেই দলের কর্মীদের ভোট কতখানি শেষ পর্যন্ত সেলেবদের পক্ষে যাবে তা নিয়ে সংশয় থাকছেই।

মনোরঞ্জন ব্যাপারী।

রাজনৈতিক বীক্ষা আছে বলেই কিন্তু মনোরঞ্জন ব্যাপারীর মনোনয়নকে রাজ চক্রবর্তীর মনোনয়নের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত হবে না। মনোরঞ্জনের সমস্যা হবে বরং অন্য জায়গায়। বাম রাজনীতিতে তাঁর বিশ্বাসের জন্য তিনি পাঠকের কাছে পরিচিত। তাঁর লড়াকু জীবন ও সাহিত্য সমাদর পেয়েছে পাঠকের। দেখার এটাই যে, তৃণমূল যদি সরকার গঠন করে আর মনোরঞ্জন যদি জয়লাভ করেন তাহলে ক্ষমতার অংশ হয়ে তিনি তাঁর যে-কোনও ধরনের অন্যায় ও আগ্রাসন-বিরোধী লড়াকু ইমেজটি কতখানি রক্ষা করতে পারেন। তবে ভোটের ফল যাই হোক না-কেন মনোরঞ্জনের জীবনব্যাপী লড়াই এবং সাহিত্যকৃতি পাঠক সমাদর থেকে বঞ্চিত হবে না বলেই মনে হয়।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More