বুথ ফেরত সমীক্ষাকে আর ভাঁওতা বলা যাবে কি?

চৈতালী চক্রবর্তী

স্মৃতি বড়ই ক্ষণস্থায়ী! তাই টাটকা হিসাব মিলিয়ে নেওয়াই ভাল।

সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের শেষ দফার ভোট হয়েছে গত রবিবার। তার পর সে দিন বিকেলেই কমবেশি প্রায় ১৪টি বুথ ফেরত সমীক্ষা প্রকাশ হয়েছিল। দ্য ওয়াল কোনও বুথ ফেরত সমীক্ষা করেনি। তবে মোটামুটি ভাবে চার পাঁচটি মুখ্য বুথ ফেরত সমীক্ষার ফলাফল তুলে ধরেছিল দ্য ওয়াল। তারা হল,- টুডেজ চাণক্য, অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া, সি ভোটার এবং এসি নিয়েলসেন।

আবার এই চারটি সমীক্ষার মধ্যে টুডেজ চাণক্য এবং অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার বুথ ফেরত সমীক্ষাকে তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল দ্য ওয়াল। টুডেজ চাণক্য বলেছিল, গোটা দেশে এনডিএ ৩৪০টি আসন পেতে পারে। বিজেপি একা পেতে পারে ৩০০টি আসন। এর কমবেশি ১৪টি হের ফের হতে পারে। সেই সঙ্গে চাণক্য এও বলেছিল, বাংলায় বিজেপি পেতে পারে ১৮টি আসন, তৃণমূল ২৩টি এবং কংগ্রেস ১টি আসন। এবং বামেরা খাতাই খুলতে পারবে না পশ্চিমবঙ্গে।

আবার অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার সমীক্ষার দাবি ছিল, এনডিএ পেতে পারে ৩৩৯ থেকে ৩৬৫টি আসন। আর বাংলায় বিজেপি পেতে পারে ১৯ থেকে ২৩টি আসন। তৃণমূল পেতে পারে ১৯ থেকে ২২টি আসন। তাঁদের এও পূর্বানুমান ছিল পশ্চিমবঙ্গে বামেদের ভোট কমে পাঁচ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

দ্য ওয়ালে এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই অনেকে মন্তব্য করেছিলেন, বুথ ফেরত সমীক্ষার কোনও ভিত্তি নেই। এগুলো ভাঁওতা। আবার অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেন দ্য ওয়ালে টুডেজ চাণক্য-র বুথ ফেরত সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়নি। কেউ কেউ আবার সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় বুথ ফেরত সমীক্ষার বিপর্যয়ের দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে চেয়েছেন।
বুথ ফেরত সমীক্ষা নিয়ে দ্য ওয়ালের প্রতিবেদনে একটা বিষয় স্পষ্ট লেখা হয়েছিল। তা হল, বুথ ফেরত সমীক্ষা অতীতে ভুল হয়নি তেমন নয়। কিন্তু ইদানীং কালে বেশ কিছু সমীক্ষা কমবেশি সঠিক পুর্বানুমান করতে পেরেছে। তা ছাড়া বুথ ফেরত সমীক্ষা একটি বা দু’টি ভুল হতে পারে। যদি তা গুরুত্ব দিয়ে করা না হয় বা স্যাম্পেল সাইজ ছোটো হয়। তবে অধিকাংশ বুথ ফেরত সমীক্ষা যদি একই ফলের ইঙ্গিত করে তা হলে তা থেকে জনমতের আন্দাজ পাওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞদেরও মত হল, বুথ ফেরত সমীক্ষা থেকে যে ভোট শতাংশ পাওয়া যায় তা থেকে ভোটারদের মুড বোঝা যায়। ওই ভোট শতাংশ থেকে আসন সংখ্যা নিরূপণের প্রক্রিয়া অবশ্য সব সময় ত্রুটিমুক্ত হয় না।
এখন প্রশ্ন হল, কেন দ্য ওয়াল টুডেজ চাণক্য এবং অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার সমীক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল?

তার কারণ একটাই, গত দশ বছরে চাণক্য এবং অ্যাক্সিস যে বুথ ফেরত সমীক্ষাগুলি করেছে, তা সিংহভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক ফলাফলের ইঙ্গিত করেছে। ২০০৯, ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে চাণক্য সমীক্ষার ভিত্তিতে সঠিক পূর্বানুমান করেছিল। তা ছাড়া গত দশ বছরে অধিকাংশ বিধানসভা ভোটে তাদের বুথ ফেরত সমীক্ষা কমবেশি সঠিক হয়েছিল। একমাত্র ২০১৫ সালে বিহার নির্বাচনে তাদের সমীক্ষা ডাহা ফেল করে। তারা বলেছিল, বিহারে ফের সরকার গড়তে চলেছে। কিন্তু ফল হয়েছিল একেবারে উল্টো।

মজার ঘটনা হল, ২০১৫ সালে বিহার ভোটের সমীক্ষা থেকে নবরূপে অ্যাক্সিসের উদয়। ওই ভোটে অধিকাংশ বুথ ফেরত সমীক্ষা যখন বিজেপি উজ্জ্বল সম্ভাবনার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, তখন অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া তাদের সমীক্ষায় দাবি করেছিল যে বিহারে লালু প্রসাদ-নীতীশ কুমার-কংগ্রেসের জোট সুইপ করতে চলেছে। প্রায় দুই তৃতীয়াংশ আসন জিততে পারে তাঁরা। অ্যাক্সিসের সেই পূর্বানুমান হুবহু সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল।

এ বারও গোটা দেশ এবং সেই সঙ্গে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে এই দুই সমীক্ষায় মোটামুটি ভাবে জনমত সঠিক প্রতিফলন পাওয়া গিয়েছে। ভোট ফলাফলে তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।
এর পরেও আগামী দিনে বুথ ফেরত সমীক্ষা মানেই নিশ্চিত ভাবে সঠিক হবে বলে মনে করার কারণ নেই। কিন্তু এও ঠিক তা পুরোপুরি ভাঁওতাও বলা যাবে না। অন্তত চাণক্য এবং অ্যাক্সিসের বুথ ফেরত সমীক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

আরও পড়ুন:

মিলল বুথ ফেরত সমীক্ষা, লাইভ টিভিতে হাউহাউ করে কাঁদলেন অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার সেফোলজিস্ট

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More