সবকিছু বেচে দিলেই কি অর্থনীতি চাঙ্গা হবে

0

নামটাই যা নতুন, ব্যাপারটা কিন্তু অনেক পুরানো। মোদী সরকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি করার গালভরা নাম দিয়েছে ‘অ্যাসেট মনিটাইজেশন’ (Asset Monetization)। অর্থাৎ সম্পত্তি বেচে টাকা তোলা। অভাবে পড়লে মানুষ যেমন পূর্বপুরুষের গচ্ছিত রাখা সম্পত্তি বেচে টাকা তোলে, আমাদের সরকারও তাই করছে। গত ২৩ অগাস্ট কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন ঘোষণা করেছেন, অ্যাসেট মনিটাইজেশন পাইপলাইনে রাস্তা, গুদাম, তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন, রেল ইত্যাদি বিক্রি করে সরকার ছ’হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। সেই টাকায় ঘুরে দাঁড়াবে করোনা বিধ্বস্ত অর্থনীতি।

দেশের সম্পত্তি বেচে টাকা তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালে। তার আগে দেশে খুব টালমাটাল চলছিল। রাজনীতি, অর্থনীতি, কিছুই স্থিতিশীল ছিল না।

১৯৯০ সালে বিজেপির রামমন্দির আন্দোলনের জেরে ভি পি সিং সরকারের পতন হয়। ততদিনে দেশের আর্থিক অবস্থা এত খারাপ হয়ে পড়েছিল যে, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখরকে দেশের সোনা বন্ধক দিতে হয়েছিল। অত করেও তিনি ক্ষমতায় টিকতে পারেননি। তাঁর সরকার পড়ে যেতে আর একটি লোকসভা নির্বাচন আসন্ন হয়ে ওঠে। তার প্রচারে গিয়ে নিহত হন রাজীব গান্ধী। ভোটে জিতে সরকার গড়েন পি ভি নরসিংহ রাও। তাঁর অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং ‘৯১ সালের ২৪ জুলাই পেশ করেন ঐতিহাসিক বাজেট। তাতেই নেহরুর আমলের অর্থনীতি থেকে সরে এসে আর্থিক উদারনীতি চালু করা হয়। সেই নীতির অঙ্গ হল দেশের সম্পদ বিক্রি করে টাকা তোলা।

‘৯১ সালের পরে দেশে অনেক ওলোট পালট হয়েছে। কখনও কংগ্রেসকে সরিয়ে কেন্দ্রে এসেছে বিজেপি সরকার। মাঝে কিছুদিনের জন্য ক্ষমতা পেয়েছে অকংগ্রেসি, অবিজেপি সংযুক্ত মোর্চাও। কিন্তু উদার অর্থনীতির পথ থেকে সরেনি কেউ। মোদী সরকারও সেই নীতিই মেনে চলছে মাত্র। তার মূল কথা হল, ইন্ডাস্ট্রি চালানো সরকারের কাজ নয়। সরকার কেবল দেশের প্রতিরক্ষা ও অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা দেয় এমন শিল্পগুলি নিজের হাতে রাখবে।

বাকি শিল্পগুলো একে একে তুলে দিতে হবে বেসরকারি হাতে। তাতে অনেক মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠান চাঙ্গা হয়ে উঠবে। দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে।

৩০ বছর ধরে উদারনীতি চালু থাকার পরে বাস্তবে দেশের কতদূর উন্নতি হয়েছে, তা ভাবার বিষয়। পরিসংখ্যান বলছে কয়েক দশকের মধ্যে এখন বেকারত্বের হার এখন সবচেয়ে বেশি। ধনী আর গরিবের মধ্যে বৈষম্যও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। কিন্তু তার পরেও উদার অর্থনীতির রথ চলছে, চলবে। সুতরাং দেশের সম্পদ বেচা ঠেকায় কে?

প্রশ্ন হল, এখনই এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ বিক্রির প্রয়োজন হল কেন? সরকার বলছে কোভিডের ধাক্কায় নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে অর্থনীতি। তাকে ফের মজবুত করে তুলতে হলে অনেক টাকা চাই। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, কোভিডের আগেই, নোটবন্দি, জিএসটি ও শিল্পপতিদের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা কর ছাড় দেওয়ার ফলে অর্থনীতি নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। কোভিডের ধাক্কায় একেবারে শুয়ে পড়েছে। তাই ছ’হাজার কোটি টাকার সম্পদ বেচতে চলেছে মোদী সরকার।
দেশের সম্পত্তি বিক্রি যখন হচ্ছেই, তখন কাজটা স্বচ্ছভাবে হওয়াই ভাল। বিরোধীরা অভিযোগ করেন, যখনই কিছু বিক্রি হয়, সরকার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিল্পপতি সব কিনে নেন। এইভাবে শিল্পে কার্যত তাঁদের একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেজন্য এখন এয়ারপোর্ট বললেই আদানির নাম মনে আসে। টেলিকম ইন্ডাস্ট্রি বললেই মনে পড়ে রিলায়েন্সের কথা।

আর একটা ব্যাপার লক্ষণীয়। রাষ্ট্রীয় যে সম্পদ বিক্রি করা হচ্ছে, কোনটা কিন্তু বিজেপি আমলে হয়নি। মোদী প্রায়ই বলেন, ৭০ বছরে কংগ্রেস কী করেছে? একথার উত্তরে বলা যায়, ৭০ বছরে কংগ্রেস যা যা তৈরি করেছিল, সেগুলিই তিনি এখন বেচছেন।

এইভাবে কিন্তু অভাব ঘোচে না। ঘরের ঘটি-বাটি বেচে কিছুদিনের জন্য অভাবকে ঠেকিয়ে রাখা যায়। কিন্তু তাতে কোনও পরিবারে সমৃদ্ধি আসে না। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। সরকারি সম্পদ বেচে অতিমহামারী পরিস্থিতির ধাক্কা হয়তো সাময়িক সামলানো যাবে। কিন্তু দেশের স্থায়ী সমৃদ্ধির জন্য আয়ের নতুন পথ খুঁজে বার করতে হবে সরকারকে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.