বাংলার হেঁশেল- শাপলার তিন পদ

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

এখন এই বর্ষায় নদী নালায় বৃষ্টির জল থৈ থৈ করছে। খাল বিলের যৌবন যেন উপচে পড়ছে। সে কী খোলতাই রূপ! বদ্ধ জলাশয়েও ঢেউ নেচে নেচে খেলে বেড়াচ্ছে। সে রূপ আরও বেড়েছে শাপলার ফুটে ওঠাতে। মছলি যদি জলের রানি হয়, তাহলে এই ভরা শ্রাবণে সাদা, লাল, গোলাপি, হালকা নীল বা বেগুনি শাপলারা কী? তারা হল নদীনালার অলংকার বা অহংকার।
ভরা যৌবনে নারীরও একরকম অহংকার থাকে। ঠিক বর্ষার নদীর মতো। গায়ের রং শ্যামবর্ণ হোক বা গমের মত সোনালি, নাক বোঁচা হোক বা টিকালো… যৌবনবতী হলেই নারীর অন্যরকম রূপ। যে রূপ একবার দেখলে আশ মেটে না। আড়চোখে বারবার দেখতে হয়।
সেটা নারী বোঝে বলেই তার চলনে বলনে রূপের দেমাক, যৌবনের দেমাক আছড়ে পড়ে।
সে দেমাক কর্মজীবনে বা সংসারে প্রবেশ করার পরে অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যায়। চাপ কী আর একরকম! চাকরি করতে গেলে কাজের জায়গায় হাজার রকম চাপ। শোষণ এবং শাসনের মধ্যে দিয়ে কাজ করতে করতে হতাশা বাড়ে। ওদিকে যারা ‘জয় মা’- বলে কোমরে আঁচল পেঁচিয়ে সংসারে ঢুকল, তাদের অবস্থাও তথৈবচ। বিয়ের চোদ্দ দিনের মাথাতেই ক্লিয়ার হয়ে যায় সোয়ামিকে নিয়ে খালি দিল্লাগি করার জায়গা নয় সংসারটা। সংসারে রোমান্টিকতা পোস্তর একটা দানার মতো অতটুকুই। বাদবাকিটা খালি অসুখ বিসুখ, হিসেবনিকেশ আর চাওয়া-পাওয়া।সংসারের সার জিনিসটা যখন চোখের সামনে স্পষ্ট হয়, ততদিনে পাপ্পু আর গুল্লু এসে গেছে। দুবার সিজার, একবার গলব্লাডার অপারেশন। সঙ্গে খুচখাচ নানান ব্যারাম। মাথার যন্ত্রণা, পা ব্যথা, দাঁত দিয়ে রক্ত পড়া। আরও আছে। চুল ওঠা, মাঝেমধ্যে চোখ কড়কড় করা, সন্ধের দিকে পেট ভার, ভোরের দিকে দুঃস্বপ্ন দেখে আচমকা ঘুম ভেঙে যাওয়া। এখনও শেষ হয়নি। বুকটা হঠাৎ ধস ধস করে ওঠা, জল ঘেঁটে ঘেঁটে আঙুলে ঘা হওয়া, বসে থাকলে সহজে উঠতে না পারা, দাঁড়িয়ে থাকলে তাড়াতাড়ি বসতে না পারা। খোঁপা বা বিনুনি বাঁধার সময় হাতে খিল ধরে যাওয়া।
চৌকাঠে অপেক্ষা করছে হব হব সুগার, উচ্চ রক্তচাপ। মোটামুটি এইসবের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে কখন যে পঞ্চাশের ঘরে পৌঁছে যাবেন, টেরটিও পাবেন না। সময় হেবি খতরনাক জিনিস। আপনি যখন অফিস পলিটিক্স আর সংসারের পলিটিক্স সামলাতে গিয়ে ল্যাজেগোবরে হচ্ছেন, রক্তাক্ত হচ্ছেন, একবার জিতছেন তো দুবার হারছেন… সময় তখন আপনাকে বুড়িছোঁয়া করে ছুঁয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
অনেকদিন পর ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে দেখার মত ফুরসত পেলে আপনার কান্না পাবে। কী ছিলেন! আর কী হয়েছেন! নিজের যত্নটুকুই নিতে ভুলে গিয়েছেন। যেটা সবচেয়ে বেশি জরুরি ছিল। সবার জন্য সব করতে গিয়ে নিজের জন্যই আর সময় রাখা হয়নি।

মাঝে মাঝে চুরি করা ভালো। সময় চুরির কথা বলছি। নিজের জন্য একমুঠো সময় তুলে রাখুন প্রতিদিন। যেভাবে আপনি একমুঠো চাল সরিয়ে রাখেন ভবিষ্যতের জন্য। যেভাবে অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও বুবুনের জন্য এক পিস মাছভাজা তুলে রাখতে ভোলেন না, সেভাবে নিজের জন্য একটু সময় তুলে রাখুন। আলমারির তলা থেকে যেভাবে আপনি তন্ন তন্ন করে ময়লা আর ঝুল বের করেন, সেভাবে অতোটা মরিয়া হয়েই নিজের জন্য সময় বের করুন।
একটু গান শুনুন। বই পড়ুন। গাছের পরিচর্যা করুন।
ঘরোয়া পদ্ধতিতে নিজের ত্বকের যত্ন নিন। চুলে যে নারকেল তেল ব্যবহার করেন, সেই নারকেল তেলের মধ্যে কতগুলো কাঁচা আমলকি টুকরো টুকরো করে কেটে মিশিয়ে নিন। পাঁচ-ছটা জবা ফুল, কুচি কুচি করে কাটা অ্যালোভেরার পাতা আর এক মুঠো কারিপাতাও দিয়ে দিন তেলের মধ্যে। তারপর তেলটা ফুটিয়ে নিন। ওই তেল ঠান্ডা হলে শিশিতে ভরে রাখুন। তেলটা ব্যবহার করলে উপকার পাবেন।
বারে বারে জল দিয়ে ধুলে মুখ ভালো থাকবে। পাকা পেঁপের রস স্কিনের জন্য খুব ভালো। অনেক সময় পাকা পেঁপে বা পাকা কলা একটু গলাগলা বা থসথসে হয়ে যায়। ফেলে দেবেন না। চটকে মুখে লাগিয়ে রাখুন আর মিনিট কুড়ি পর জল দিয়ে ধুয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ান। পরিবর্তনটা বুঝতে পারবেন। যতবার এটা করবেন, ততবার দেখবেন মুখটা একটু একটু করে ঝলমলে হয়ে উঠছে।
মুখ ঝলমলে থাকলে, মনটাও খুশি খুশি থাকে।
অথবা মন খুশি থাকলে মুখটা ঝলমলে হয়ে ওঠে।
মন আর মুখ যেন উত্তম আর সুচিত্রা। আলাদা আলাদা পারফরমেন্স কিন্তু একজন আর একজনকে উজ্জ্বল করে তোলে। ফলে দুজনেই আলোকিত হয়ে ওঠে।

পঁয়তাল্লিশ পেরোলেই নতুন নতুন শারীরিক সমস্যা। সবার সঙ্গে থেকেও যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বাস করা মানুষ। এই সময়টাকে লঘু চালে পার করতে হবে। কষ্ট, অভিমান, কান্না, একাকীত্ব কার নেই? তবুও যতটা পারা যায় ভালো থাকার চেষ্টা করতে হবে। শরীরটাকে ভালো রাখতে হবে। রোজ অল্প এক্সারসাইজ করলে ভালো হয়। আধ ঘণ্টা হাঁটলে উপকার পাবেন। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পাড়ার গলি ধরে সবচেয়ে কাছের বাজারটা ঘুরে এলে হাঁটাও হয়, আবার কিছু কেনার থাকলে কেনাটাও হয়ে যায়। বাজার মানেই সবসময় আঁশটে গন্ধ, হট্টগোল, বিরক্তির তীর্থক্ষেত্র নয়। সকালের বাজারটা আপনাকে বিরক্ত হতে দেবে না। লক্ষ্য করে দেখবেন এক এক ঋতুতে বাজারে সবজি ছাড়াও ফুলের মেলা বসে। যেমন এই সময়টায় বাজারে গুচ্ছ গুচ্ছ শাপলা আপনার মন ভালো করার দায়িত্ব নিয়ে নেবে। ফুল দেখলে এমনিতেই তো মন ভালো হয়ে যায়! তার ওপর শাপলা দেখলে কত স্মৃতি ভিড় করবে মনে। ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে যাবে। গ্রামের বাড়ির উঠোন ছুঁয়ে যাওয়া নদীটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে আপনার স্মৃতিতে। নদীর সঙ্গে মনে ভেসে উঠবে এক বাল্যবন্ধুর মুখ। কী সরল সেই মুখ! স্মৃতির গন্ধে আপনি তলিয়ে যাবেন। কিছুটা সময় সব রকম জ্বালা যন্ত্রণা থেকে মুক্তি ঘটবে আপনার।মানসচক্ষে দেখতে পাবেন ঘাটে নৌকা লেগেছে। সেই নৌকো থেকে নামছে বড় পিসিমণি, পিসেমশাই আর বোন। বোনের হাতে গোছা গোছা সাদা শাপলা। বাড়িতে আনন্দের ধুম পড়ে গেছে। তখন আত্মীয়স্বজন বাড়িতে এলে বাড়িটা আনন্দে হাসতো।
মা পিসিমণির আনা শাপলার লতি কাটতে বসত বারান্দায়। সবচেয়ে সুন্দর ফুলটা মা ননদিনীর মস্ত খোঁপাটাতে আহ্লাদ করে গুঁজে দিত।
সেদিন দুপুরের মেনুতে ডিম, মাছ থাকলেও শাপলাই আধিপত্য বিস্তার করত।
২০ টাকার শাপলা আপনার মন ভালো করে দিতে পারে। আমার কথাটা বিশ্বাস করে দেখুন। ঠকবেন না।

শাপলা ইলিশের মাখামাখি

উপকরণ: ৩ টুকরো ইলিশ মাছ, এক আঁটি শাপলা, কালো জিরে ১ চা চামচ, সর্ষে বাটা ২ টেবল চামচ, আদা বাটা ১ চা চামচ, কাঁচালংকা বাটা ১ চা চামচ, আস্ত কাঁচালংকা ৪ টে, হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, লংকা গুঁড়ো আধ চা চামচ, নুন, চিনি, ৩ টেবিল চামচ সর্ষের তেল।

প্রণালী: শাপলার লতিগুলোকে ধুয়ে আঁশ ছাড়িয়ে আঙুলের মাপে কেটে ভাপিয়ে নিন। জল দেওয়ার দরকার নেই। লতি থেকে জল বেরোবে। একবারে গলিয়ে ফেলবেন না।
ভাপানো হয়ে গেলে জল ঝরিয়ে রেখে দিন।
এবার কড়াইতে ১ টেবিল চামচ সর্ষের তেল গরম করে কালোজিরে আর একটা চেরা কাঁচালংকা ফোড়ন দিন। তারপর আদা বাটা দিয়ে ভাপানো শাপলার লতিগুলো ঢেলে দিন। হলুদ গুঁড়ো, নুন, চিনি দিয়ে নেড়েচেড়ে নামিয়ে নিন।
ওদিকে সর্ষে বাটাটা এক বাটি জলে গুলে নিন। সর্ষে গোলা জলে নুন, হলুদ, লংকার গুঁড়ো আর কাঁচালংকা বাটা ভালো করে গুলে নিন।
এবার গ্যাসে কড়াই বসান। ২ টেবিল চামচ সর্ষের তেল দিন। তেল গরম হলে সর্ষে গোলা জলটা তেলের মধ্যে ঢেলে দিন। ঝোল ফুটে উঠলে নুন হলুদ মাখানো মাছগুলো ঝোলে দিয়ে ঢেকে দিন। এবার অন্য কড়াইতে রাখা শাপলার লতিগুলো মাছে দিয়ে কয়েকটা কাঁচালংকা চিরে দিন। নুন ঝাল দেখে নিয়ে পুরো ব্যাপারটা মাখা মাখা হলে গ্যাস অফ করে দিন।বসার ঘরে একটা চ্যাটালো পাত্রের মধ্যে জল রেখে ওতে কটা শাপলা ফুল ভাসিয়ে দিন। দেখতে ভালো লাগবে। সবচাইতে বড় ফুলটা চুলে গুঁজে কয়েকটা সেলফি তুলুন। দেখুন আপনাকে এই মধ্যবয়সেও কেমন অপরূপা করে তুলেছে শাপলা। বাকি ফুলগুলো দিয়ে বড়া ভেজে ফেলুন।

শাপলা ফুলের বড়া

উপকরণ: শাপলা ফুলের পাপড়ি ১ বাটি, পেয়াঁজ কুচি, কাঁচালংকা কুচি, নুন, হলুদ, ১ চা চামচ কালোজিরে, চালের গুঁড়ি, ময়দা, এক চিমটি খাবার সোডা, সাদা তেল।

প্রণালী: পাপড়িগুলো ভালো করে ধুয়ে ওর মধ্যে পেয়াঁজ কুচি, কাঁচালংকা কুচি, নুন, হলুদ দিয়ে মেখে কিছুক্ষণ রেখে দিন। একটা বাটিতে চালের গুঁড়ি, ময়দা, কালোজিরে আর খাবার সোডা মিশিয়ে একটু জল দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে নিন। এবার কিছুটা করে পেঁয়াজ শুদ্ধ পাপড়ি নিয়ে গোলায় চুবিয়ে বড়ার মত করে ভেজে নিন। গরম গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

শাপলার ভেলা

উপকরণ: আঙুলের মাপে কেটে রাখা শাপলার লতি একবাটি, টুথপিক সাত আটটা, চালের গুঁড়ি আধ কাপ, বেসন ১ কাপ, কাঁচালংকা বাটা ১ চা চামচ, নুন, হলুদ, আধ চা চামচ লংকার গুঁড়ো, সাদা তেল পরিমাণমতো।

প্রণালী: লতিগুলোর আঁশ ছাড়িয়ে নিন। এবার আঙুলের সাইজের পাঁচখানা লতির টুকরো টুথপিক দিয়ে পরপর গেঁথে নিন ভেলার মত করে। নরম করে তোলার জন্য ভেলাগুলোতে নুন মাখিয়ে রেখে দিন। এবার একটা বাটিতে চালের গুঁড়ি, বেসন আর পরিমাণমত জল একসঙ্গে মিশিয়ে একটা গোলা বানান। গোলার মধ্যে নুন, হলুদ গুঁড়ো, লংকার গুঁড়ো, কাঁচালংকা দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে নিন। কড়াইতে তেল গরম করে ভেলাগুলো গোলায় চুবিয়ে ডিপ ফ্রাই করে নিন। মুচমুচে সোনালি করে ভেজে তুলুন। তারপর গরম ভাতের পাতে শাপলার ভেলা ভিড়িয়ে দিন।

লেখিকা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা, ভালোবাসেন রকমারি রান্না আর রন্ধনবিষয়ক আড্ডা।

বাংলার হেঁশেল- পোস্ত দিয়ে কী না হয়

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More