ওল্ড নর্মাল থেকে ‘নিউ নর্মাল’ আমাদের উত্তরণ, না অবরোহণ

১৯৯১। প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও। অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং। সে বছর ২৪ জুলাই ভারতের সংসদে মনমোহন তাঁর পেশ করা বাজেটে দেশকে অর্থনীতির নয়া সড়কে চালিত করার কথা বলেছিলেন। যার মূলে ছিল উদার নীতি, বিলগ্লিকরণ, বিশ্বায়ন, লক্ষ্য ছিল নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দায় কমিয়ে আনা। সাদা চোখেই বোঝা যায় ’৯১ পরবর্তী ভারত সম্পূর্ণ পৃথক এক দেশ। উদার অর্থনীতির তিন দশকের সফরে কোথায় পৌঁছল সেদিনের ভারত। চোখ রাখুন দ্য ওয়াল-এ…

 

স্থবির দাশগুপ্ত

পুঁজিবাদের প্রতি আমাদের যতই উষ্মা থাক, সে কিন্তু অন্তত কিছু মানুষের কল্যাণের কথাই ভেবেছে, কীভাবে তাকে আরও স্বাচ্ছন্দ্যে আরও আনন্দে রাখা যায় তার কথাই ভেবেছে। সেই জানিয়েছে, প্রকৃতির সম্পদ সকলের জন্য না, কারোর কারোর জন্য; তাই দরকার হলে প্রতিবেশকেও দলন করতে হবে, ধরিত্রীর গভীর তলদেশ থেকে কীভাবে তুলে আনতে হবে সম্পদ। কিছু মানুষের হাতে বৈভব তুলে দিতে গিয়ে কীভাবে বাকিদের ক্রমশ ঊনমানব করে দিতে হয়, সেই নব নব উন্মেষশালিনী প্রতিভার জন্ম দিয়েছে, আধুনিক পুঁজিবাদ। তার সন্ধানবৃত্তির অন্ত নেই, অসীম ক্ষুধারও নিবৃত্তি নেই। সে চায় মুনাফা, তার জন্য যত উৎপাদন যত ভোগ তত ঊনমানুষের ভোগান্তি। এই মুনাফাবৃত্তিতে কখনও হয়তো কমা থাকে, কিন্তু দাড়ি পড়ে না।

তার জয়যাত্রায় মাঝে মাঝে কমা পড়ে, কেননা মানুষের চাহিদার বৈচিত্র আছে, জোয়ার-ভাটা আছে। চাহিদায় ঘাটতি পড়লে বা নকল চাহিদা ‘নির্মাণ’-এর ছলাকলা করেও যখন কুল পাওয়া যায় না, উৎপাদন নিজেই তখন বোঝা হয়ে যায়। সেই বোঝা ঘাড় থেকে নামাতে গিয়ে তাকে অন্য বোঝা ঘাড়ে নিতে হয়, ঋণের বোঝা। ঋণের সংস্থান আছে সরকারের কাছে, তাই বোঝা বইবার দায় নেয় সরকার, প্রকারান্তরে জনমানুষ। সকল দায় থেকে মুক্ত হয়ে ছিমছাম বিচরণের জন্য, নব কলেবরে বিকশিত হওয়ার আশায় পুঁজি নিজেই রাজনীতি-অর্থনীতির নতুন নতুন পাঠ তৈরি করে দেয়, নতুন নতুন পথ খনন করে নেয়। এই সাত কাণ্ড রামায়ণ চলতেই থাকে, বারবার, নতুন নতুন ব্যাকরণে। এইভাবে পুঁজিবাদ তার আয়ুষ্কাল দীর্ঘায়িত করে যায়। তাতে দোষ কীসের? বরং তার সদগুণ এই যে, সে এক ভুল বারবার করে না। 

তাই সময়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পুঁজি বারবার তার যাত্রাপথ পাল্টে নিয়েছে; কিন্তু কখনও দিশা হারায়নি, মুনাফার দিশা। নিজের সংকট থেকে পরিত্রাণের আশায় সে যুদ্ধের ভূমি তৈরি করে, দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ। তাতেও লাভ নেই; বরং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে জন্ম নিল সোভিয়েত রাষ্ট্র, দ্বিতীয় যুদ্ধের শেষে তৈরি হল আরও কিছু সমাজবাদী রাষ্ট্র, তারপর মহাচিনের উদয়, আরও পরে ভিয়েতনাম। তাহলে অমন যুদ্ধের পথ ভুল। এল শীতল যুদ্ধের কাল, পরপর মিথ্যা যুদ্ধের কুনাট্য। এইভাবে চলছিল বেশ; কিন্তু পুঁজির প্রাণভোমরা সর্বদা গুণগুণ করে, ‘ভাল হত আরো ভাল হলে’! তাই গেল শতকের আশির দশক থেকেই আবার তার আত্মানুসন্ধান। আমরা তাকালাম ইংল্যান্ডে, মার্গারেট থ্যাচারের দিকে; শুনলাম সেই বাণী, ‘রাষ্ট্রের গায়ে হেলান দেওয়া ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়াও’; শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যের বন্দোবস্ত, কোনওকিছুতেই আর সরকারের মুখাপেক্ষী থেকো না, নিজের বন্দোবস্ত নিজে কর।

নিজে মানে কী? জনমানুষের সম্বল-সহায় তো সরকারই। কিন্তু না! এখন থেকে অন্যভাবে ভাবতে শেখ, অন্য পথে চলতে শেখ, অসরকারই এখন মন্ত্র। আসলে কিন্তু এসব ছিল কথার কথা। থ্যাচার সরকারকে লোপাট করেননি, তাকে শুধু অসরকারি বাণিজ্যের হাতিয়ারে পরিণত করে দিয়েছিলেন। সেটা ছিল মুক্ত বাণিজ্যের পটভূমি রচনার দিন, তারই পরিণতি আমরা দেখলাম, পরের দশকে এসে। এতদিন ঊনমানুষ কষ্টেসৃষ্টে চালিয়েছে, কিন্তু প্রতিবাদও জানিয়েছে, দাবিদাওয়া পেশ করেছে, কর্তৃপক্ষের কাছে। নব্বুইয়ের দশকে এসে সেই আন্দোলনমুখিতা থমকে দাঁড়াল, শুরু হল সস্তা শ্রমের যুগ। কর্মসংস্থানের নিরাপত্তার দিন শেষ। শুরু হল, বিশ্বায়ন; রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিগুলো হয়ে গেল বিশ্ব অর্থনীতির একটা অংশমাত্র। রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি এবং স্বাস্থ্যনীতিতেও শুরু হল বিশ্বায়নের চর্চা। আমরা নিঃশব্দে এক নতুন যুগে ঢুকে পড়লাম, তাতে নতুন নতুন উপাদান, যা আমরা আগে কখনও দেখিনি, ভাবিওনি।

কালক্রমে এই উদারনীতি প্রসব করল এক অতিসচ্ছল, নব্য মধ্যবিত্তের দল, তাদের হঠাত যেন আঙুল ফুলে কলাগাছ; এমন কলাগাছ সে নিজেও কল্পনা করেনি। তারা দাঁড়িয়ে থাকে পুবের মাটিতে, তাকিয়ে থাকে পশ্চিম আকাশের দিকে। তাদের কাছে সেটাই উৎকৃষ্ট যা নতুন আর বড্ড বেশি দামি; গুণ না, পরিমাণই নমস্য। সমাজে বিত্তের অসাম্য প্রকট হতে হতে তখন লাগামছাড়া। অসাম্য যত বাড়ে জনমানুষের স্বাধীনতা তত খর্ব হয়, তাদের উপর নজরদারি তত হিংস্র হয়, আর একইসঙ্গে রমরমা হয় একচেটিয়া বাণিজ্যের। এই বাণিজ্যের প্রধানতম উপাদান দেশের শিক্ষা আর স্বাস্থ্য, কেননা এগুলোই মানুষের মনোভূমির দুর্বলতম স্থান। ক্রমশ বহুজাতিক সংস্থাগুলোই এক-একটা দেশে শিক্ষা আর স্বাস্থ্যের নীতি নির্ধারণ করে দেয়, সেই নীতির প্রয়োগের পথ বাতলে দেয়। জনশিক্ষা আর জনস্বাস্থ্যের সংজ্ঞা থেকে ‘জন’ কথাটাই ক্রমশ ব্রাত্য হয়ে যায়; নতুন ব্যাকরণে আমরা উদ্ভাসিত হয়ে উঠি।

এতকাল যা ছিল স্বাভাবিক, ‘নর্মাল’, তা হয়ে গেল অস্বাভাবিক, পুরনো, অকেজো। নব্বুই দশকের সেই উদারনীতিবাদের কলরব দুই দশক পরে আমাদের নিয়ে এল ‘নিউ নর্মাল’ যুগের দ্বারপ্রান্তে। এখন আমরা ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’-এর কথা বলি। যেদিন আমরা জল আর বাষ্পের উন্নততর ব্যবহার আবিষ্কার করতে পেরেছি, পেয়েছি বাষ্প শক্তির সন্ধান, এসেছে স্টিম ইঞ্জিন, সেইদিন শুরু হয়েছিল ‘প্রথম’ শিল্প বিপ্লব। এই বিপ্লব উৎপাদনের উপায় আর রূপ পালটে দিয়েছিল। শারীরিক শ্রমের জায়গা নিয়ে নিল নতুন নতুন যন্ত্র; উৎপাদনের গতি আর পরিমাণ, দুইই বেড়ে গেল। সামাজিক অর্থনীতিতে প্রভুত্ব করার দায় বণিকদের হাত থেকে চলে গেল ‘শিল্পপতি’দের হাতে। এরপর এল ‘দ্বিতীয়’ শিল্প বিপ্লবের যুগ, বিদ্যুৎ আবিষ্কার। উৎপাদন ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি হল। শিল্পপুঁজিতে এল মুনাফার জোয়ার, তারই হাত ধরে এল ‘লগ্নী পুঁজি’। তার হাতেই চলে এল অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ক্ষমতা।

এর পর এসেছে ‘মাইক্রোচিপ’ আর ‘ইন্টারনেট’; আমরা তাকে বলেছি, ‘তৃতীয়’ শিল্প বিপ্লব। শারীরিক, মানসিক, যাবতীয় শ্রমের কেন্দ্রভূমি হয়ে দাঁড়াল, ‘কমপিউটার’। একে বিপ্লব না-বলে মহাবিপ্লবও বলা যায়, কেননা কম্পিউটারই হয়ে গেল সর্বেসর্বা। বিশ্বময় তার জাল ছড়ানো, অন্তর্জাল। এইভাবে, এক অস্বাভাবিক দুরন্ত গতিতে, বৈদ্যুতিন ব্যবস্থা (‘ইলেকট্রনিক’) এবং তথ্য-প্রযুক্তির (‘ইনফরমেশন টেকনোলজি’) হাত ধরে আজ আমরা এখন একটা নতুন যুগে প্রবেশ করছি। এ এমন এক যুগ যেখানে ‘নকল বুদ্ধিমত্তা’ (‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’) আমাদের চালনা করে। এরই নাম, ‘ডিজিটাল’ যুগ, – এরই নাম, ‘চতুর্থ’ শিল্প বিপ্লব। এখন আমাদের যাবতীয় তথ্য জমা থাকে মেঘের আড়ালে – ‘ক্লাউড’। পুঁজিও এখন ‘ডিজিটাল’, সে লগ্নী পুঁজিকেও শাসন করতে পারে। এই অনন্য অবস্থাকে আমরা ‘নিউ নর্মাল’ বলে ভাবতে, মানতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। মেনে নেওয়ার গতি শ্লথ হলে ডিজিটাল পুঁজি অস্থির হয়ে ওঠে।

যে-উদারপন্থার রিহার্সাল শুরু হয়েছিল আশি আর নব্বুইয়ের দশকে সেই পর্বের সমাপ্তি ঘটেছে, এখন চলছে মঞ্চাভিনয়ের পালা। তাই এখন বলা হচ্ছে, এই একবিংশ শতকে, শিল্প সভ্যতার ‘চতুর্থ’ যুগের উন্নত নাগরিক হতে গেলে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে, এখন হবে নতুন গবেষণা। যাবতীয় পুরনো ধারণাগুলোকে বাতিল করে নতুন করে ভাবতে হবে, জীবনের যাপনধারা পালটে ফেলতে হবে। ক্রমশ সেটাই হয়ে যাবে, ‘নিউ নর্মাল’। এই প্রেক্ষিত থেকে শিক্ষা আর জনস্বাস্থ্যের হাল দেখতে চাইলে বোঝা যায়, আমাদের হাহাকারে পুঁজির কোনও হেলদোল নেই; সে চলে নিজের ছন্দে, নিজের তালে। সে জানিয়েছে, যা-ঘটছে তা নতুন কিছু না; এক-একটা শিল্প বিপ্লব মানুষের জীবনযাপনের ধরন এক-একভাবে পালটে দিয়েছে। এখন আবার তাই ‘নিজেকে পালটাও, দুনিয়াটাকে পালটেও’!

কেমন দুনিয়া? শোনা যায়, ‘কোভিড’-এর দংশনে ভারতে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, অপুষ্টি-জনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। তাহলে? মানুষ পালটাতে জানে; কিন্তু যদি প্রশ্ন ওঠে, পালটে যাওয়া রূপটা ঠিক কেমন হবে, তার উত্তর কারোর জানা নেই।

এখন কথা, এই নতুনতম বিপ্লবকে কি আমরা সমাদর জানাব না? মনে আছে, শিল্প সভ্যতার ‘তৃতীয় বিপ্লব’ যখন আমাদের দুয়ারে কড়া নেড়ে তার উপস্থিতি জানিয়েছিল, আমরা ভয়ে শিউড়ে উঠেছিলাম। তাকে প্রাণপণে ঠেকিয়ে রাখার জন্য পরিত্রাহী চেষ্টা চালিয়েছিলাম। তাতে লাভ হয়নি; জোয়ারের জল হুড়মুড় করে আমাদের অঙ্গন ভাসিয়ে দিয়েছিল। এই বেলা তাহলে কী করা? আমরা কি ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’ মানব না, ‘নিউ নর্মাল’ মেনে নেব না? এই প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে গেলে নতুন পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে, আজকের পরিস্থিতি, যাকে বলা হচ্ছে, ‘কোভিড’-এর কাল। ‘কোভিড’ কী, সে কতটা ‘মারী’ আর কতটা কল্পকথা, কী তার চিকিৎসা, তার টিকায় কার, কবে, কতটা উপকার হবে বা অপকার, এসব কথা থাক। আমরা বরং তার অভিঘাতগুলোর দিকে তাকাই।

আমরা ‘লকডাউন’ নামে এক শব্দবন্ধের সঙ্গে রাতারাতি পরিচিত হয়ে গেলাম আর দেখলাম, রাতারাতিই যেন কতকিছু পালটে গেল! রাতারাতি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির কত কী বিক্রিবাটা সুসম্পন্ন হয়ে গেল, শ্রম আইন পালটে গেল, ভূখা মিছিল গা-সওয়া হয়ে গেল, ছোট আর মাঝারি ব্যবসাপাতি প্রায় লোপাট হয়ে গেল, কেউ এমনভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল যেন মনে হয়, আর উঠবে না। সবই হয়ে গেল, রাতারাতি, আমরা যখন ‘মগন গহন ঘুমের ঘোরে’! একচেটিয়া পুঁজি আমাদের কাছে নতুন না, কিন্তু প্রযুক্তিকে বাহন বানিয়ে তার অমন দুর্বার গতি নতুনই, আমরা আগে দেখিনি। একচেটিয়া পুঁজির মুখপাত্র হয়ে বিশ্ব আর্থিক সংস্থা (‘ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম’) জানিয়ে দিল, জীবনধারণের জন্য দেশে সব কিছু মজুত আছে, তবে যার যখন যতটা দরকার ততটা সে পাবে ঋণ হিসেবে, – সহজ হিসেব। একচেটিয়া পুঁজিই আমাদের সব সমস্যার সমাধান জানে, কেননা তার হাতে উন্নত প্রযুক্তি।

মুখপাত্র আমাদের জানিয়েছে, ‘কোভিড’ থেকে বাঁচতে গেলে ‘টিকা’ ছাড়া গতি নেই, নানান ধরনের, নানান মশলার টিকা, একবার, দুবার, তিনবার… যতবার দরকার হবে। টিকা আমাদের নতুন যুগের উপযুক্ত করে দেবে, ‘নিউ নর্মাল’-এর ‘নিউ ম্যান’। এসব নিয়ে যদি কারোর সংশয় থাকে তার উপর ‘বিপণনের তত্ত্ব’ খাটাতে হবে, নতুন নতুন গবেষণার কথা শোনাতে হবে। এমন এমন গতিময় গবেষণা যা আমরা এতকাল কল্পনাও করে উঠতে পারিনি। টিকা নিয়ে, এত এত গবেষণার কথা জেনেও যারা সংশয়মুক্ত হবে না তাদের জন্য আছে হুমকি, ‘অভয় দিচ্ছি, শুনছ না যে’! তাতেও কাজ না-হলে আছে প্রলোভন, আছে আদিম, উৎকোচ প্রথা। এইসব চমৎকার উপদেশ এসেছে সেই মুখপাত্রের কাছ থেকে যার সম্পর্কে আমরা একসময় কত কীই না ভেবেছিলাম! ভেবেছিলাম, তার কাছেই তো আছে আধুনিক অর্থনীতির রহস্যময় চাবিকাঠি। ভেবেছিলাম, পরিবেশ দূষণ থেকে মুক্তির মন্ত্রও আছে তারই কাছে।

একটা লকডাউন আর উদ্ভট বাধানিষেধের পুরিয়া যেভাবে এক-একটা দেশের অর্থনীতি আর সমাজনীতিকে পালটে দিল তা ঐতিহাসিক, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গবেষণার বস্তু হয়ে থাকবে। মাত্র দেড় বছরের ‘কোভিড’ চক্রেই দুনিয়ার গরিব আর প্রায়গরিব দেশগুলো ‘আইএমএফ’ আর বিশ্ব ব্যাংকের কাছে হাত পাততে শুরু করেছে, ঋণের আর্জি। ঋণ তারা পাবে, শুধু দেশীয় অর্থনীতির হালচাল আমূল পালটে ফেলতে হবে, এটুকুই শর্ত। থাকবে কর্পোরেট শিল্প-বাণিজ্য, কর্পোরেট শিক্ষা, কর্পোরেট হাসপাতাল; বাকি সব যাবে অন্তর্জলি যাত্রায়। তবেই সার্থক ‘চতুর্থ’ বিপ্লব। নব্বুইয়ের দশকে উদারনীতিবাদের উত্থান দেখে উল্লসিত অনেকে ভেবেছিলাম, বেশ তো, বাজার মুক্ত হলে প্রতিযোগিতাও মুক্ত হয়। তাতে কতজন মুক্তকাছা হল আর কতজন অসহ্য জীবনযন্ত্রণা থেকে চিরতরে মুক্তি পেল সেই হিসেব এখন স্পষ্ট। এও স্পষ্ট যে, এখন একচেটিয়া আধিপত্য থাকবে আমাজন, ফেসবুক, ওয়ালমার্ট, গুগল ইত্যাদি কিছু দানবের হাতে, তারাই ভবিষ্যতের অভিমুখ রচনা করে দেবে। নিজের তৈরি সংকট থেকে উত্তরণের আশায় পুঁজির এই আধুনিকতম পরীক্ষানিরীক্ষা চেয়ে চেয়ে দেখবার মতো।

এ হল, উদারনীতিবাদের চরমতম রূপ। এখন যে-অসাম্যের সৃষ্টি হবে, ইতিমধ্যেই যার নমুনা পাওয়া যাচ্ছে তা তুলনারহিত। ভাইরাসের আতংক ছড়িয়ে এই যে অসাম্যের বুনিয়াদ তৈরি হল, এমন আরও কত আতংকের নকশা কার কার আস্তিনে লুকিয়ে আছে, আমরা জানি না। আর সব নকশাই দাঁড়িয়ে আছে নব নব প্রযুক্তির উপর। প্রযুক্তিই আমাদের শাসক, যেমন নকল বুদ্ধিমত্তা (‘এআই’)। এখন বাস্তব মানে, ছায়াবাস্তব (‘ভার্চুয়াল রিয়েলিটি’), আমরা মানি বা না-মানি। আসলে পুঁজি এখন তার দেহপ্রকৃতি পালটাচ্ছে, যাকে বলে ‘রিস্ট্রাকচারিং’। তাতে পুঁজির উত্তরণ ঘটছে বটে, কিন্তু একইসঙ্গে চলছে জনজীবনের অবরোহণ পর্ব। কোটি কোটি মানুষ নেমেছে রাস্তায়, মুখে মুখোশ, পকেটে ‘স্যানিটাইজার’ আর মনে নিরাপদ ‘দূরত্ব’ রচনার অঙ্গীকার। আমরা ভাবছি, আমরা মানুষ; আর কর্পোরেট ভাবছে, কোটি কোটি নির্জীব বস্তুর মিছিল, যেভাবে বলব, এরা সেই ভঙ্গিমায় থাকবে। এই ছায়াবাস্তবই কর্পোরেটের মৃগয়াভূমি।

এমতাবস্থায় আমরা কী করি? আমরা কি টিকার গুণমান নিয়ে তর্জা চালাব, নাকি ভাইরাস-এর ‘মিউটেশন’ নিয়ে? ‘ডুবন্ত জাহাজে পণ্যের চুলচেরা হিসেব নিয়ে মাথা ঘামানো মূর্খামি’, বহু পুরনো প্রবাদ। পুরনো ইতিহাসও আমাদের জানা। রোম সাম্রাজ্যের সংকটকালে সম্রাট কনস্টানটাইন রোমের আর্থিক, সামাজিক আর সামরিক ব্যবস্থার খোলনলচে পালটে দিয়েছিলেন। তারপর শুরু হয়েছিল এক নতুন স্বৈরতন্ত্রের যুগ, বাইজানটাইন সাম্রাজ্য। একইভাবে, আজ এক-একটা রাষ্ট্র গণতন্ত্রের পুরনো ধারণাগুলোকে সমূলে পালটে দিচ্ছে, নাগরিক অধিকার, জন-আন্দোলন ইত্যাদি ক্রমশ ইতিহাসে পরিণত হতে চলেছে। তার জন্য তাকে লোকসভা বা রাজ্যসভা ভেঙে দিতে হয়নি, সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয়নি; সবই আছে, কিন্তু অথর্ব। পুঁজি এখন এক নতুন সাম্রাজ্য চায়, সেখানে পুরনো নিয়মগুলো চলে যাবে আস্তাকুঁড়ে, আর ব্যতিক্রমগুলোই হয়ে যাবে নতুন নিয়ম। এটাই ‘নিউ নর্মাল’। একই পরিবর্তন, প্রায় একইভাবে ঘটেছিল হিটলারের জার্মানিতে, ১৯৩৩ সালে, সফলভাবে চলেছিল বারো বছর।

সেখানেও আধুনিক ডাক্তারি নিয়ে নতুন নতুন গবেষণার ঢেউ উঠেছিল। সেইসব গবেষোণাগার থেকে এমন এমন বাণী প্রচারিত হয়েছিল যে, ডাক্তারি শাস্ত্র যেন হয়ে উঠল একটা ধর্মগ্রন্থের মতো। ধর্মের বাণী যে মানে না সে অচ্ছুৎ, রাষ্ট্রবিরোধী, দেশদ্রোহী। না-মানা, সংশয়ীদের উপর প্রখর নজরদারির ব্যবস্থা সেখানেও লাগু হয়েছিল, তৎকালীন প্রযুক্তির হাত ধরে। এই ইতিহাস আমাদের জানা। আবার পুঁজির উচ্ছলতাকে ঠেকানর মতো ব্যর্থ চেষ্টার পুরনো ইতিহাসের কথাও আমাদের জানা। তার পুনরাবৃত্তি মানে তো ট্র্যাজেডিই। তাই মনে হয়, পুঁজির পথচারণা, তার মতিগতি আমরা যদি আদৌ বুঝে থাকি তাহলে প্রযুক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা চলবে না, তাকে অবহেলা করাও মূর্খামি হবে। পুঁজিবাদও গণতন্ত্রের কথা বলে, সকলেই সমান, এই কথা বলে। তবে, আমরা তো জানি, সেখানে ‘কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে একটু বেশি সমান’!

তাই ওই গণতন্ত্র আর না, বরং আমাদের দরকার এমন এক গণতন্ত্র যেখানে প্রযুক্তির মালিকানা একচেটিয়া থাকবে না; সরকার যদি ‘অ্যাপ’ বানায়, কর্পোরেট যদি নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসে, আমরাও তার পালটা ‘অ্যাপ’ বানাব, নতুন প্রযুক্তি শিখে নেব। যে-পদ্ধতিতে কর্পোরেট আমাদের শাসন করে আমরাও একই পদ্ধতিতে তার উপর নজর রাখব। প্রযুক্তি সকলের দরকার, কর্পোরেট তা ব্যবহার করে নিজের স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে, আমরা তা ব্যবহার করব জনমানুষের জীবন যাপনের লক্ষ্যে। সেটাই হবে আসল গণতন্ত্র, নতুন যুগের নতুন গণতন্ত্র। আয়ুষ্মান হয়ে, আরও বিকশিত হওয়ার চেষ্টায় পুঁজিবাদ কখনও ক্লান্ত হয়নি। তাহলে আমাদেরই বা ক্লান্তি কীসের? নবজীবনের সন্ধানে বিকশিত হওয়ার চেষ্টায় ক্ষান্তি কীসের?

সেই নতুন গণতন্ত্র কীভাবে সম্ভব, জানি না; আমাদের পুরনো, ব্যর্থ বাগাড়ম্বরের ইতিহাস মনে রেখে, হয়তো বর্তমান প্রজন্মই নতুন কোনও দিশা দেবে। আমাদের আর কিছু না-থাক, জনবল আছে; জনবল মানে তো জনসম্পদ, তাতে যৌবনের ভারই বেশি। সেই যুবসম্পদ আছে, তাই আমাদের বুদ্ধির বৈভব আছে। আর বিজ্ঞানের দরবারে কর্পোরেটের ইজারা নেই, এও আমাদের জানা। তাই মাভৈঃ!

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More