আয়ারাম-গয়ারাম, গরু-ছাগল, হাম্বা-হাম্বা ও বেয়ানথ্রপি

অমল সরকার

তুলনা টানতে বলা হত ‘হর্স ট্রেডিং’। তারপর এল আয়ারাম-গয়ারামের কাহিনি। সেখান থেকে একেবারে কিনা গরু-ছাগল! দিলীপ ঘোষের সাফ কথা—‘গরু-ছাগল নাকি যে আটকে রাখব।’

মূল ধারার রাজনীতিতে নবীন হলেও রাজ্য (Bengal) বিজেপির (BJP) বর্তমান সভাপতি ইতিমধ্যেই রাজনীতিতে একটি বিষয় সংযোজন করেছেন এবং ফিরিয়ে এনেছেন হারিয়ে যাওয়া একটি ধারা। রাজনীতিকদের শরীর-চর্চার বিষয়টি নিয়ে বছর কয়েক আগে আলোচনায় মুখ্য হয়ে উঠেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই জায়গাটা এখন দিলীপ ঘোষের দখলে। তার মধ্যেও ইউনিক হল, মর্নিংওয়াকে সাংবাদিক সম্মেলন। সাত-সকালে টেলিভিশনের ক্যামেরা-সাংবাদিকদের তাঁর পিছু নেওয়ার কারণ কিন্তু রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাওয়া একটি ধারার তাঁর হাত ধরে প্রত্যাবর্তন। তা হল, রাজনীতির কথা যথাসম্ভব সাধারণ মানুষের ভাষায় বলতে পারা। সেটা জ্যোতি বসুর ছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আছে। জ্যোতি বসুর মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণেও ধার, ভার দুই-ই থাকে।

কিন্তু রাজনীতির কথাকে রসসিক্ত করে বলাতে স্মরণকালের মধ্যে সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং রেজ্জাক মোল্লার জুড়ি মেলা ভার। সুব্রতবাবু যেমন তাঁর বর্তমান নেত্রীকে এক সময় ‘বেদের মেয়ে জোৎস্না’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন। ওই নামে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সিনেমাটির সুবাদে সে দেশের অভিনেত্রী অঞ্জু তথা অঞ্জলি ঘোষের কথা একটা সময় এদেশে মুখে মুখে উচ্চারিত হত। আর ২০১১-তে বামফ্রন্ট সরকারের পরাজয় নিয়ে তখনও সিপিএমে থাকা রেজ্জাক মোল্লার দলের দুই শীর্ষ নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য-নিরুপম সেনদের সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম মার্কা শিল্পায়নকে কটাক্ষ করে কালজয়ী মন্তব্য ছিল, ‘হেলে ধরতে পারে না, কেউটে ধরতে গিয়েছে।’

বেশ কিছু কাল সুব্রতবাবু এবং রেজ্জাক মোল্লা একপ্রকার নীরব। ধারা ফিরিয়ে এনে দিলীপবাবু বলতে গেলে একাই প্রচারের আলোয়। যেমন করোনাকালে মনোবল চাঙ্গা করার সবচেয়ে সহজ এবং কাজের কথাটি তিনিই বলেছিলেন, ‘অনেক কিছু হজম করেছি, করোনাও করে নেব।’ করোনা তাকে রেহাই দেয়নি। তবে লাখ লাখ করোনাজয়ীর মধ্যে তিনিই একমাত্র করোনা হজমকারী।

দিলীপবাবুর ‘গরু-ছাগল নাকি যে আটকে রাখব’, মন্তব্যটি মন্তব্যের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার আগেই ‘পেয়ারে বাবুল’ এক ফুল ছেড়ে জোড়া ফুলের বাগানে চলে গেলেন। যদিও দিলীপবাবুদের সঙ্গে ছিলেন কি ছিলেন না, তা নিয়ে ধোঁয়াশাও ছিল। সাড়ে চারমাস আগে বিধানসভা ভোটে দিলীপবাবুরা জিতেছিলেন সাকুল্যে ৭৭ জন। ইতিমধ্যে সংখ্যাটা কমে হয়েছে ৭১। এবার এরাজ্য থেকে তাদের সাংসদ সংখ্যাও কমে ১৮ থেকে ১৭ হয়ে গেল বলা চলে। দলত্যাগীদের মধ্যে মুকুল রায় যে বড় ক্যাচ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তৃণমূল-বিজেপি-তৃণমূল—এই তিন পর্বেই দল ভাঙানোর খেলায় তিনিই ময়দানের টুটু-অঞ্জন, জীবন-পল্টু, কিংবা এসি মিলানের লুই বার্লুসকোনি।

রাজনীতিতে দলবদল নতুন কোনও বিষয় নয়। পরাধীন দেশে নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির মধ্যেও বাম-ডান সব শিবিরেই দলাদলি এবং দলবদল—দুই-ই ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তা নয়া মাত্রা পায় লোকসভা ও বিধানসভাগুলিতে সাংসদ, বিধায়কদের দল-শিবির বদলের ঘটনায়। দু’-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তাতে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল মূলত সরকার গঠনের প্রশ্নে নীতির লড়াই। বাড়ির রান্না ভালো লাগছে না, তাই বাইরে খাব, গোছের সস্তা রাজনীতি, এক-দুটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ছাড়া তখন মূল ধারা ছিল না। বাংলায় বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে কোনও গোলযোগের ঘটনা ঘটেনি। ফলে তাদের ৩৪ বছরে দল বদলে কার্যত ইতি পড়ে। কারণ বামফ্রন্ট নামক জোটটিতে সিপিআইএম ছিল একচ্ছত্র।

অন্যদিকে, বিরোধী কংগ্রেস ছিল গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জর্জরিত। দলাদলির বিষয়টি নিয়ে একটি মজার ঘটনা বলি। রাজনীতি থেকে একপ্রকার বনবাসে চলে যাওয়া এক প্রবীণ রাজনীতিক-কাম-আইনজ্ঞ একদিন বিধানসভায় হাজির হয়ে জানালেন, তিনি রাজ্যসভার ভোটে লড়বেন। সাংবাদিক বৈঠকে এক সাংবাদিক সাদামাটা কথায় গভীর অর্থবহ প্রশ্নটি করলেন, ‘আপনি এখন কোন দলে?’ নেতা ভদ্রলোক জবাব দিলেন, ‘আমাদের দলে কোনও কোন্দল নেই। আমাকে জেতাতে সবাই ঐক্যবদ্ধ।’ তখন বাকি সাংবাদিকেরা সমস্বরে জানতে চাইলেন, ‘আগে বলুন আপনি কোন দলের প্রার্থী হতে চলেছেন?’ নেতা ভদ্রলোক তখন খানিক উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘এই কারণেই আপনাদের সামনে আসতে চাইনি। বললাম তো আমাদের দলে কোনও কোন্দল নেই।’ পরে ঘোষণা হল, তিনি কংগ্রেসের টিকিট পাচ্ছেন। অর্থাৎ যে দলে ছিলেন সে দলেই ফের সক্রিয় হচ্ছেন।

আসলে তখন কংগ্রেসে কোন্দলই ছিল একমাত্র রাজনীতি। রাজনৈতিক সাংবাদিকতার মূল বিষয়ও ছিল তাই কংগ্রেসের কোন্দল। কখনও অতুল্য ঘোষ-বনাম প্রফুল সেন শিবির, কখনও প্রিয়-সুব্রত বনাম সোমেন তো কখনও মমতা বনাম সোমেন। ফলে ‘কোন দল’ শব্দ দুটিকে ‘কোন্দল’ শোনা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। তখন তো আর তৃণমূল, বিজেপি ছিল না, যে কংগ্রেস ছেড়ে ওই সব দলে নাম লেখাবে। এখন অনেক অপশন। তখন দলবদলের অপশন না থাকায় দলে থেকে দলাদলিই ছিল বঙ্গ-কংগ্রেস নেতাদের সম্বৎসরের কাজ। আনন্দগোপাল মুখোপাধ্যায় নামে আসানসোলের বাসিন্দা এক কংগ্রেস নেতা, যিনি দীর্ঘকাল রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন, দলের দলাদলি নিয়ে মজা করে মন্তব্য করেছিলেন, ‘কংগ্রেস না করলে জীবনটা রসকষহীন থেকে যেত।’ যাইহোক, ২০১১ পরবর্তী বাংলায় পদ্মফুল আর জোড়া ফুল মিলে কোন্দলকে দলবদলের রূপ দিয়ে রাজ্য-রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলা চলে।

সুপ্রিম কোর্ট ভোট পরবর্তী হিংসা’ নিয়ে রাজ্যের মামলার রায় দেবে ২৮ সেপ্টেম্বর

 

দিলীপবাবু যখন দলবদলকারীদের গরু-ছাগলের সঙ্গে তুলনা করেছেন তখন আয়ারাম-গয়ারাম এবং হর্স ট্রেডিং নিয়ে একটু শিক্ষামূলক আলোচনা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। সন-তারিখ বলতে পারব না, আনুমানিক একশো-সওয়াশো বছর আগে ইউরোপে ঘোড়া কেনাবেচায় বিশেষ পারদর্শিতা হিসাবে বিবেচিত হত ছলচাতুরি। কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়া সেই চাতুরিকেই সাদরে গ্রহণ করেছে বাণিজ্যিক কৌশল হিসাবে। ক্রমে তাই হর্স ট্রেডিং জনপ্রিয় হয়েছে রাজনীতিতেও। বঙ্গ-রাজনীতির বিগত দশ বছর কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দলই তো কেনাকাটার সবচেয়ে বড় হাট। তবে ঘোড়া নয়, দিলীপ ঘোষের কথায় গরু-ছাগল।

আয়ারাম-গয়ারামের পেটেন্ট আমাদের দেশের। শুনে দুটি চরিত্রের কথা মনে হলেও আসলে চরিত্র একটি এবং তাঁর আসল নাম গয়ালাল। ১৯৬৭-র কথা। আগের বছর ১৭তম রাজ্য হিসাবে জন্ম হয় হরিয়ানার। নতুন রাজ্যের বিধানসভার প্রথম নির্বাচনে গয়ালাল জিতলেন নির্দল হিসাবে। তারপর শুরু হয় তাঁর খেল। দিন পনেরোর মধ্যে তিনবার দল বদল। ততদিনে নির্দলদের নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘ইউনাইটেড ফ্রন্ট’ নামে একটি জোট। এই পনেরো দিনের মধ্যে গয়ালাল একদিন নয় ঘণ্টার ব্যবধানে দু’বার দলবদল করেন। এর মধ্যে কংগ্রেসে থাকা পর্বে সে দলের নেতা বিজেন্দর সিংয়ের রসিক মন্তব্য ছিল, ‘গয়ারাম আব হো গয়া আয়ারাম।’ সেই থেকে আয়ারাম-গয়ারাম।

অর্ধশতক পরেও কথাটা প্রচলিত এবং জনপ্রিয় থাকার কৃতিত্ব অবশ্যই রাজনীতিকদের। কারণ, আর কোনও ক্ষেত্রে এবেলা-ওবেলা দলবদলের নজির নেই। গড়ের মাঠে ফুটবলারদের দলবদলে বিস্তর নাটকীয় ঘটনার নজির আছে। আছে খেলোয়াড় অপহরণের ঘটনা এবং দলবদল ঘিরে রক্তারক্তির নজির। কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে তার ফারাক আছে। ফুটবলের দলবদলে খেলোয়াড়কে নিয়ে টানাটানির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অগণিত সদস্য-সমর্থকের আবেগ-উচ্ছ্বাস-ভালোবাসা। রাজনীতিকদের দল বদল মুখ্যত ব্যক্তির ধান্ধাবাজি।

যাই হোক, জয় বাবা গুগলের কল্যাণে অনেককাল আগে শোনা অতি-বিরল একটি অসুখের কথা নতুন করে জানার সুযোগ হল। অসুখটির নাম বোয়ানথ্রপি। মানসিক ব্যাধি। ল্যাটিন শব্দ বো (গবাদি পশু) এবং গ্রিক শব্দ অ্যানথ্রপি (মানুষ) থেকে ইংরেজি বোয়ানথ্রপি শব্দের উৎপত্তি। অর্থাৎ ‘গবাদি পশুর মতো আচরণকারী মানুষ’। আক্রান্ত মানুষটি স্বাভাবিক খাবার ছেড়ে ঘাস চিবতে শুরু করবে। হাত দুটিকে পা ঠাউরে চার পায়ে হাঁটবে এবং মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়াবে ও কখনও সখনও হাম্বা হাম্বা শব্দ করবে। আরও জানা গেল, প্রবল হতাশা থেকে নাকি এমন অসুখ হতে পারে। বাংলায় হালে দলবদলকারীদের অনেককেই ছেড়ে আসা দল সম্পর্কে বলতে শোনা গিয়েছে, ওখানে হাফিয়ে উঠছিলাম।

ফলে দিলীপবাবুর কথায় অপমানিত বোধ করার আগে উপসর্গগুলি মিলিয়ে দেখে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আর দিলীপবাবুরও বোধহয় আলটপকা মন্তব্য করা নিয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি। দলবদলকারীদের গরু-ছাগলের সঙ্গে তুলনা করার সময় তিনি বোধহয় খেয়াল রাখছেন না গরু তাঁর দলের কাছে পরম পূজনীয় গো-মাতা।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More