তৃণমূল কি বুঝতে পারছে দুর্বল বাম, কংগ্রেস বিপদ ডাকতে পারে জোড়া ফুলেরই?

অমল সরকার

২ মে বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার দিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খানিক আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, “আমি চাই না কেউ শূন্য হয়ে যাক। বিজেপির বদলে ওরা কয়েকটা আসন পেলে বরং ভাল হত।”

কংগ্রেস ও বামদলগুলি এবার বিধানসভায় শূন্য। স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় এমন নজির নেই। যেমন নজির নেই, একের পর এক তৃণমূল নেতার তা নিয়ে একপ্রকার শোকজ্ঞাপন। পার্থ চট্টোপাধ্যায়, তাপস রায়, সুব্রত মুখোপাধ্যায়রা সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা অধিবেশনে সভার ভিতরে-বাইরে বাম-কংগ্রেসের অনুপস্থিতি নিয়ে আক্ষেপ করার পাশাপাশি তাদের গুরুত্ব, প্রয়োজনের কথাও বলেছেন।

পাশাপাশি আর একটি চিত্র ধারাবাহিকভাবে সামনে এসেছে। ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে বিজেপি-সহ বিরোধী দলগুলির তৃণমূলকে কাঠগড়ায় তোলা। মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধি-দল ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে হাইকোর্টে রিপোর্ট পেশ করেছে। সেই রিপোর্টকে হাতিয়ার করে মুখ্যমন্ত্রীর আসন্ন দিল্লি সফরের সময় রাজধানীর রাজনীতির হাওয়া গরম করতে চাইছে গেরুয়া শিবির।

আপাত দৃষ্টিতে বিষয় দুটির মধ্যে কোনও মিল নেই। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখা হলে বোঝা যাবে, মিল আছে বিস্তর। এক কথায় তা হল, সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাসের ফলশ্রুতি।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে খুব সহজেই বোঝা যাবে, শাসক বা বিরোধী, আজ যে দল যে ভূমিকাতেই থাকুক না কেন, প্রতিপক্ষের দিকে আঙুল তোলার জায়গায় কেউ নেই। হিংসা করা বা তাতে প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য এই রাজ্যে শাসন ক্ষমতা দখল যে পূর্ব শর্ত নয়, অতীতে ক্ষমতা থেকে দূরে থাকা তৃণমূল এবং বর্তমানে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি-কে দেখে তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। রাজ্যের বহু এলাকায় গেরুয়া সন্ত্রাস অত্যন্ত চালু কথা। সিপিএম এবং কংগ্রেসও যখন যে শাসক কিংবা বিরোধী, যার যখন যেখানে শক্তি ছিল, বিরোধীদের নিকেশ করার চেষ্টা চালিয়েছে। যে কারণে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলায় রাজনৈতিক হত্যা, গণহত্যার ঘটনাগুলি বহু ক্ষেত্রেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকেও ছাপিয়ে গিয়েছে।

কম আর বেশি, বদলা নয়, বদল চাই বলে ক্ষমতায় এলেও তৃণমূলের দশ বছরের জমানায় রাজনৈতিক খুন থেমে থাকেনি। নিহতের তালিকায় আছে তৃণমূলেরও বহু কর্মী-সমর্থক। কিন্তু রাজনৈতিক গণহত্যার ঘটনা নেই বললেই চলে। এজন্য প্রশস্তি করার আগে ভাবতে হচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে কি সেই জাতীয় প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে? সম্ভবত হয়নি।

এজন্য একদিকে যেমন বাম ও কংগ্রেসের দুর্বল, দিশাহীন নেতৃত্ব দায়ী, তেমনই প্রশাসন ও শাসক দলের তরফে রাজনীতির গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডলকে সঙ্কুচিত করে ফেলাও এক নয়া বিপদের সূচনা করেছে। মেরুকরণের রাজনীতির পরিণাম কী হতে পারে তা কারও অজানা ছিল না। বাম-কংগ্রেস শূন্য বিধানসভা একটা আনুষ্ঠানিক অধ্যায় মাত্র। বাংলার পরিষদীয় রাজনীতির এই নব-নির্মাণের সূচনা হয়েছিল এক দশক আগের দল ভাঙার খেলা দিয়ে। ২০১১-র পরিবর্তনের ভোটে তৃণমূলকে বিপুল সমর্থন জুগিয়েছিল বাংলার মানুষ। তারপরও বাম এবং একদা জোটসঙ্গী কংগ্রেসের বিধায়ক ভাঙানো, পঞ্চায়েত, পুরসভায় দলবদল ঘটিয়ে সেগুলি দখলে নিয়ে তৃণমূল সর্বশক্তিমান হয়েছে বটে, ক্রমশ দুর্বল হয়েছে অন্য ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি। বর্তমান জমানার গোড়ায় ওই ময়দানি রাজনীতি এড়ানো গেলে হয়তো রাজ্য-রাজনীতি আজ অন্য খাতে বইত। তৃণমূলকে শুনতে হত না, তারা খাল কেটে কুমির ডেকে এনেছে।

তবে এ কথাও বলব, বিরোধী শিবির, বিশেষত সিপিএম যেভাবে শুধুই তৃণমূলের সন্ত্রাসকে তাদের আজকের দুর্দশার জন্য দায়ী করছে সেও বড় হাস্যকর কাঁদুনি। আসলে ক্ষমতায় থাকার ৩৪ বছর রাজনীতির যে পথ ধরে তারা চলাফেরা করেছে, গোড়ায় কিছুদিন বিরোধীদের প্রবল বাধাবিপত্তির পর তা ছিল রানওয়ের থেকেও মসৃণ। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই মশার কামড়কে কেউটের ছোবল বলে মনে হচ্ছে তাদের। আর হিংসা-আশ্রিত এই রাজনীতির তারাও কম ভাগিদার নয়। যেমন নয় কংগ্রেসও। ছোটবেলার একটা কথা মনে পড়ে গেল, ‘রমনা শমনা, কেউ কারও চেয়ে কম না।’ সিপিএম, তৃণমূল, কংগ্রেস, বিজেপি তো দূরের কথা, এসইউসি, আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক, একদা যে যেখানে শক্তিশালী ছিল, সেই এলাকাকে তারা মুক্তাঞ্চল বানিয়েছে। বাসন্তী, গোসাবায় আরএসপি, কুলতলি, জয়নগরে এসইউসি, হুগলির গোঘাটে, মুর্শিদাবাদের লালবাগে ফরওয়ার্ড ব্লকের সন্ত্রাস পুরনো খবরের কাগজের পাতা ওল্টালেই জানা যাবে।

কুলতলিতে একবার এক সাংবাদিককে জ্যান্ত পুঁতে দিতে মাটি খোঁড়া শুরু করেছিল কিছু লোক। কারণ সেই সাংবাদিক সিপিএম-পন্থী একটি সংবাদপত্রে চাকরি করতেন। কেশপুর, গড়বেতা, আরামবাগ একটা সময় ছিল সিপিএমের মুক্তাঞ্চল। ওই সব এলাকাতেই পাল্টা মারের মুখে সে পার্টি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়েছে। ২০০০ সাল। তার দু’বছর আগে জন্ম নেওয়া তৃণমূলের পাল্টা মারে এলাকা ছাড়া হতে হয়েছিল বহু কমরেডকে, পার্টির নামে যা তালিবানি শাসন কায়েম করেছিল। ওই সব দিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কথায় কথায় বলতেন, টিট ফর ট্যাট। অতএব আজ কথায় কথায় আমরা যে তালিবানি সন্ত্রাসের কথা বলি, হিংসার ক্ষেত্রে বঙ্গ রাজনীতির কাছে তা নিতান্তই নবীন।

একটু আরও অতীতের দিকে তাকানো যাক, যখন বাংলার রাজনীতির সিংহভাগ জুড়ে সিপিএম আর কংগ্রেস। তৃণমূলের জন্ম হয়নি। বিজেপিও আজকের মতো পল্লবিত নয় এ রাজ্যে।

১৯৮৯। রাজ্য বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু জানান, ১৯৮৮ থেকে ’৮৯, এই এক বছরে রাজ্যে ৮৬ জন রাজনৈতিক কর্মী খুন হয়েছেন। জ্যোতিবাবুর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী নিহতদের ৩৪ জন সিপিএম, ১৯ জন কংগ্রেস, ৭ জন আরএসপি, দু’জন ফরওয়ার্ড ব্লক এবং বাকিরা অন্যান্য দলের সমর্থক ছিলেন।

এত গেল সাধারণ সময়ের পরিসংখ্যান। ভোট মানেই বহু মায়ের কোল খালি হওয়া, বহু মহিলার বিধবা হওয়া যেন স্বতসিদ্ধ এই রাজ্যে। ২০০৩-এর পঞ্চায়েত ভোটের কথা ভোলার নয়। ভোটের দিন শুধু মুর্শিদাবাদেই খুন হন ৩৫ জন। সে বছর সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা একশো ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২০১৩-র তৃণমূল জমানার পঞ্চায়েত নির্বাচন দশ বছর আগের সেই নির্বাচনেরই পুনরাবৃত্তি বলা চলে। হাজার হাজার আসন বিরোধী শূন্য। ভোটের বলি পঞ্চাশের বেশি মানুষ।

এবার একটু এগনো যাক। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, ২০১৪-র লোকসভা ভোটে গোটা দেশে ১৮ জন রাজনৈতিক কর্মী খুন হন। তাঁদের সাতজন ছিলেন এই রাজ্যের। এছাড়া ২ হাজার ৮ জন রাজনৈতিক কর্মী এবং ১ হাজার ৩৩৫ জন সাধারণ নাগরিক রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হন। আহত ২ হাজার ৮ জন রাজনৈতিক কর্মীর মধ্যে ১ হাজার ২৯৮ জনই ছিলেন বাংলার। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৯৯ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বছরে গড়ে ২০ জন করে রাজনৈতিক কর্মী খুন হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ৫০ জন খুন হন ২০০৯-এ। পরের দু’বছরও খুনখারাপির কিছু কমতি ছিল না। ২০০৯ এবং ২০১৪-র লোকসভা ভোটের পরিসংখ্যান থেকে রাজনৈতিক হিংসায় বাংলার একটি পৃথক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। ২০০৯-এ দেশে নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত হিংসার ঘটনার ৭৪ শতাংশই হয়েছিল ভোট গ্রহণের আগে। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে দেখা যায় উল্টো চিত্র। এ রাজ্যে বেশিরভাগ হিংসার ঘটনা ঘটে ভোটের পর। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের সময়ও চিত্রটা একই ছিল। যেমন এবার বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর হয়েছে।

কারা বড় সন্ত্রাসি, কাদের জমানায় খুন-সন্ত্রাস বেশি, কোন দল দিতে পারে আশ্রয়, নিরাপত্তা, এই বিবাদ-বিতর্কের মাঝে বিরোধী শিবিরের শূন্যতার সুযোগ নিয়ে বিজেপি আজ বাংলায় দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি, বিধানসভায় বলতে গেলে একমাত্র বিরোধী দল। বাংলার মসনদ দখল করতে না পারলেও তাদের সাফল্যের গ্রাফ এতটাই ঊর্ধ্বমুখী যে এই সেদিন সংঘ পরিবার থেকে মাঠে-ময়দানের রাজনীতিতে পা রাখা দিলীপ ঘোষ সদম্ভে বলতে পারেন, ২০১৪-র লোকসভা ভোটেও তো নরেন্দ্র মোদী দলের মুখ ছিলেন। বাংলায় বিজেপি পেয়েছিল দুটি আসন। ২০১৯-এ সেই বাংলা থেকে দলকে আমরা ১৮টা আসন দিতে পেরেছি। সেই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ২০১৬-তে তিনি রাজ্য সভাপতি হন। বিধানসভা ভোটের পর তৃণমূল শিবিরের কেউ কেউ বলতে শুরু করেছেন, ২০২৪-র লড়াইটা শুধুই মোদী-মমতার। কিন্তু তৃণমূলের পক্ষে সেই লড়াইয়ে পাল্লার ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠতে পারে যদি না সমস্ত বিরোধী দল সমানভাবে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। নইলে মাঠে ময়দানের রাজনীতিতে তৃণমূলকে দু’কোটির বেশি মানুষের সমর্থন পাওয়া বিজেপিকে বলতে গেলে একাই মোকাবিলা করতে হবে। ভোটের ময়দান এবং মাঠ-ময়দানের নিত্যদিনের লড়াইয়ে যে আসমান জমিন ফারাক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও তা অজানা থাকার কথা নয়। পূর্বসূরি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তো হাড়ে হাড়ে তা টের পেয়েছিলেন। ২৩৫ আসনে জেতার দম্ভে হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন বামফ্রন্ট ভোট পেয়েছিল ৫১ শতাংশ। ৪৯ শতাংশ মানুষ তাকে চায়নি।

সব শাসক দলের জন্যই এই শিক্ষা চিরন্তন। মনে আছে, ২০০৬-এর সেই নির্বাচনে বামফ্রন্টের বিপুল জয়ের পর জ্যোতি বসু বলেছিলেন, ‘আমরা অনেক আসন পেয়েছি। কিন্তু অনেক মানুষ আমাদের ভোট দেননি। সেটা চিন্তার কারণ। এই মানুষের কাছে আমাদের যেতে হবে।’ পরিচিত অনেককেই সেদিন বলতে শুনেছিলাম, পূর্বসূরি উত্তরসূরির সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে ওই কথা বলেছেন। কিন্তু জ্যোতিবাবু সেদিন পার্টি ও সরকারের জন্য যে বিপদের ইঙ্গিত করেছিলেন ক’দিন পরই তা মিলে গিয়েছিল। সেবার, তৃতীয়বারের জন্য বুদ্ধদেব বাবু শপথ নেন ১৮ মে। আর সিঙ্গুরে জমির প্রশ্নে তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ পথে নামে ২৫ মে। ব্যবধান মাত্র এক সপ্তাহের।

তৃণমূল সরকারের তেমন দশা হওয়ার কোনও উপসর্গ এ পর্যন্ত নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলার মানুষ নিছকই বিজেপি বিরোধিতার প্রশ্নে বেছে নিয়েছেন, সংখ্যালঘুরা শুধুমাত্র গেরুয়া শিবিরের যাত্রাভঙ্গ করতে জোড়া ফুলে ভোট দিয়েছেন, এমনটা ধরে নিলে তা অতিসরলীকরণ হবে। কোনও সন্দেহ নেই, বাংলার ২০২১-এর রায় ভালে কাজের প্রতিদানের ভোট। আর এই নির্বাচনকে নিশ্চয়ই কেউ পঞ্চায়েত, পুরসভার মতো লুঠতরাজের ভোট বলবেন না।

কিন্তু মনে রাখা দরকার এত কিছুর পরও বিরোধী পরিসরকে সযত্নে লালন করাই সবচেয়ে জরুরি। শুধু ভোটের আগে দেওয়াল লিখতে দেওয়া, পার্টি অফিস খুলতে দেওয়া, দেওয়ালে শুধুই বিজেপি বিরোধী কথাবার্তা লিখতে দেওয়ার অনুমতি, দীর্ঘ মেয়াদে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে তৃণমূলের মতো আর একটি ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির। তাই নিছকই কৌশল নয়, দলের দীর্ঘযাত্রা নিশ্চিত করতে ভুল শুধরে নিতে তৃণমূলকেই বিরোধী শিবিরের ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির পাশে থাকতে হবে। বাম-কংগ্রেসকেও স্পষ্ট করতে হবে এই প্রশ্নে তৃণমূল সম্পর্কে তাদের অবস্থান। ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থান নেওয়ার কোনও অবকাশ নেই।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More