বুদ্ধদেব গুহর লেখা থেকে সিনেমা : কিছু অজানা কথা

কৌশিক লাহিড়ী

সত্তরের দশকের শেষ দিকে অগ্রগামীর পক্ষে জয়ন্ত ভট্টাচার্যের পরিচালনার বুদ্ধদেব গুহর (Buddhadeb Guha) চার চারটি উপন্যাস থেকে ছবি করার কথা ভাবেন প্রযোজক অজয় বসু। ‘একটু উষ্ণতার জন্য’, ‘কোয়েলের কাছে’, ‘নগ্ন নির্জন’ ও ‘চবুতরা’। উত্তম কুমার নিজে ‘নগ্ন নির্জন’ ও ‘চবুতরা’ পড়েন। ছবিগুলির সহ-প্রযোজক হতে চেয়েছিলেন চণ্ডীমাতা ফিল্মসের সত্যনারায়ণ খাঁ। যৌথ প্রযোজনায় উত্তম কুমার অভিনীত ছবি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল এই চারটি কাহিনির। আর ‘চবুতরা’ ছবিতে প্রথম বারের জন্য বাংলা ছবিতে অভিনয় করতেন রেখা! প্রযোজক অসীম সরকার, পরিচালক আলো সরকার এই বিষয়ে কথা বলেন শক্তি সামন্তের সঙ্গে। রেখা রাজি হন। ছবিতে থাকতেন আমজাদ খান। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে এই ছবিগুলি আর হয়নি। পিনাকী চৌধুরীর পরিচালনায় ‘কোয়েলের কাছে’ ছবির মহরত হয়ে যাবার পরও তা হয়ে ওঠেনি। সেই মহরতে অমিতাভ বচ্চনও এসেছিলেন। একবার ভেবে দেখুন যশোবন্ত অথবা সুকুমার বোসের ভূমিকায় মহানায়ককে।

এইসব ঘটনা মনে ছিল বুদ্ধদেব গুহর। তবে কোনও আক্ষেপ ছিল না। অনেকগুলো বছর পেরিয়ে এসে হয়তো আর দুঃখ পাওয়ার কথাও ছিল না। তবে মহানায়ক এবং কথাশিল্পীর অসংখ্য ভক্তের কাছে এ আক্ষেপ যাবার নয়।

বুদ্ধদেব গুহর লেখা নিয়ে এই ব্যাপারটা বার বারই হয়েছে। সত্তরের দশকে বিপুল জনপ্রিয়তা পায় আকাশবাণীতে অভিনীত ‘কোয়েলের কাছে’। যশোবন্তের ভূমিকায় ছিলেন অজিতেশ বন্দোপাধ্যায় আর লালসাহেব বসন্ত চৌধুরী! জানি না, পাঁচ দশক পেরিয়ে আজ আকাশবাণীর আর্কাইভে আর খুঁজেও পাওয়া যাবে কিনা সেই অবিস্মরণীয় নাটক!

‘কোয়েলের কাছে’ ছবির মহরতে অমিতাভ বচ্চন, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, অনুপ কুমার, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, পিনাকী চৌধুরী ও অন্যান্যরা

আজ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের এই অসামান্য মাইলস্টোন উপন্যাসটি নিয়ে কোনও ছবি কেন যে হয়নি সেটা সত্যি রহস্য।

একই ব্যাপার ‘একটু উষ্ণতার জন্য’ লেখাটি নিয়েও। এই উপন্যাসটি আটের দশকে শ্রুতিনাটক হিসেবে অসামান্য সফল হয় অপর্ণা সেন ও দীপঙ্কর দে-র অভিনয়ে। রবীন্দ্রসদনে হল তো ভরে যেতই, বহু মানুষ সদনের সিঁড়িতে বসে শুনতেন সেই শ্রুতিনাটক। মহানায়কের সময়ের অনেক পরেও আবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে ছবিটি হবার এবং আবার তা হয়নি।

পরবর্তী কালে ‘কোজাগর’ হিন্দিতে ছবি হবার কথা ছিল নানা পাটেকারকে নিয়ে। হয়নি। ‘মাধুকরী’-র ব্যাপ্তিও ধরা পড়ল না কোনও ছবিতে।

কেবলমাত্র আটের দশকে দূরদর্শনে বুদ্ধদেব গুহর বারোটি গল্প থেকে তৈরি হয়েছিল ‘অয়ন’।

সেখানেই শুরু, সেখানেই শেষ। আর হয়নি।

এখানে অবশ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন, ‘বাতিঘর’ ওড়িয়া ভাষায় অত্যন্ত সফল চলচ্চিত্র হয়েছিল। খুব জনপ্রিয় হয় এই ছবির গানগুলি। সাধু মেহের অভিনীত দ্বিভাষিক এই ছবিটি বাংলাতেও মুক্তি পেয়েছিল। তবে বাংলায় আজ পর্যন্ত কোনও সত্যিকারের বড়মাপের পরিচালক কালজয়ী এই সাহিত্যিকের কোনও লেখা থেকে কোনও সার্থক চলচ্চিত্র আমাদের উপহার দিতে পারেননি।

আজ থেকে প্রায় আঠেরো-উনিশ বছর আগে ‘সাসানডিরি’ মঞ্চস্থ হয়। পরিচালক ছিলেন অনিন্দিতা সর্বাধিকারী। সম্প্রতি ‘মাধুকরী’ মঞ্চস্থ করার দুঃসাহসী কাজে ব্রতী হন কৃষ্টি নাট্য দল। পরিচালনা এবং পৃথুর ভূমিকায় অভিনয়ের যুগপৎ অসমসাহসী দায়িত্ব পালন করেন সীতাংশু খাটুয়া।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সাহেব চট্টোপাধ্যায় অভিনীত ‘ভোরের আগে’ ছবি হয়েছে নব্বইয়ের দশকে।

‘সন্ধ্যার পরে’ নিয়ে মরমী টেলিফিল্ম করেছিলেন পরিচালক রাজা সেন। অভিনয়ে ছিলেন শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় এবং লিলি চক্রবর্তী।

কালানুক্রমিকতা অনুসারে ঘনাদা, ফেলুদার পরই বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব ঋজুদার। আর আবির্ভাবেই তুমুল জনপ্রিয়তা। বাংলার ঘরে ঘরে আজ ‘ঋজু’ নামটির ছড়াছড়ি। অথচ কোনও এক রহস্যজনক কারণে আজও পর্দায় এল না ঋজুদার একটি গল্পও!

ফেলুদা ও কাকাবাবুকে নিয়ে ছবি হয়েছে। এখন তো কমিকসও হচ্ছে। অস্পৃশ্য থেকে গেছেন ঋজুদা। তবে এখনও ঋজুদার জনপ্রিয়তা অব্যাহত।

‘গুগুনোগুম্বারের দেশে’ বা ‘রুআহা’র পটভূমি না হয় কৃষ্ণ মহাদেশ। কিন্তু ‘অ্যালবিনো’, ‘বনবিবির বনে’ নিয়ে কি সৃষ্টি করা যেত না শিল্প এবং বাণিজ্যসফল কোনও সার্থক ছবি?

এর একটা কারণ হয়তো লেখকের একটি শর্ত! শ্যুটিং করতে হবে আউটডোরে, যথাসম্ভব আসল পটভূমিকায়। এখানেই হয়তো আটকে গেছেন অনেক পরিচালক।

‘ঋভুর শ্রাবণ’ নিয়ে ছবি করতে চেয়েছিলেন গৌতম ঘোষ। বাংলাদেশে হওয়ার কথা ছিল আউটডোর লোকেশনের শ্যুটিং।

ঋতুপর্ণ ঘোষ ‘একটু উষ্ণতার জন্য’-র স্ক্রিপ্ট তৈরি করে নিয়ে এসেছিলেন লেখকের কাছে। ছবি হয়নি। জানি না, সেই অপ্রকাশিত স্ক্রিপ্ট এখন কোথায়।

কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের ইচ্ছে ছিল ‘কোজাগর’-কে রুপোলি পর্দায় তুলে আনার।

ঋজুদা নিয়ে ছবি করার কথা ঘোষণা করেছিলেন অরিন্দম শীল। ‘অ্যালবিনো’ আর ‘গুগুনোগুম্বারের দেশে’।

কিছুদিন আগে ব্রাত্য বসুর পরিচালনায় মুক্তি পেয়েছে লেখকের দুটি বিখ্যাত ছোটগল্প ‘স্বামী হওয়া’ এবং ‘বাবা হওয়া’ থেকে তৈরি ছবি ‘ডিকশনারি।

এবার একসঙ্গে দুটি খবর! প্রথমটি হল, ‘বাবলি’ থেকে ছবি করতে চলেছেন রাজ চক্রবর্তী আর দ্বিতীয়টি হল, ‘প্রাপ্তি’ ছোটগল্প থেকে ছবি করতে চলেছেন তরুণ পরিচালক অনুরাগ পতি।

সার্থক, কালজয়ী সাহিত্য থেকে সবসময়েই যে রসোত্তীর্ণ চলচ্চিত্র সৃষ্টি হবে তার কোনও মানে নেই। বরং কখনও কখনও উল্টোটাই হয়েছে। গানের মতো সাহিত্যও লেখকের একার নয়। শ্রোতা যেমন মনে মনে গাইতে থাকেন, প্রকৃত পাঠকও চরিত্রগুলিকে গড়ে নিতে থাকেন মনের বনে, একাত্ম হতে থাকেন তাদের সকাল-সন্ধেয়, সুখ-দুঃখে-আনন্দে-বিষাদে।

বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে এসে ঋজু, রুদ্র, সুকুমার বোস, প্যাট গ্ল্যাসকিন, ছুটি, কুর্চি, পৃথু, লালসাহেব, যশোবন্ত, অভি, বাবলি, তিতলি, সায়ন মুখার্জি, মুঞ্জরি, মানি, দিগা পাঁড়ে, ঠুঠা বাইগা, রাম, সরিৎ মেসো, নাজিমসাহেব, রুষা চরিত্রগুলি জীবন্ত হয়ে ওঠেন লক্ষ পাঠক-পাঠিকার মনের দিগন্তে। প্রতিটি পাঠকের কল্পনায় যেন পুনর্জন্ম হয়ে চলে এক একটি চরিত্রের। তাদের চলন-বলন, আচার-আচরণ সবই পাঠক দেখতে পান। এক একজন প্রকৃত পাঠকের মনোভূমি যেন চরিত্রগুলির নতুনতর এক একটি জন্মভুমি। সেখানে জীবন্ত হয়ে থাকে চরিত্রগুলির অজস্র মনোক্ষেপ, অগণিত সংস্করণ।

চলচ্চিত্রের মুশকিলটা এখানেই। দর্শকের মনের কোনায় গড়ে ওঠা ছবির সঙ্গে রুপোলি পর্দার ছবি মিলে গেলে ভাল, আর না মিললে সামান্যতম আঘাতে চুরমার হয়ে যায় বিপুল পরিশ্রমে গড়ে তোলা ফিল্মের ছদ্ম-বাস্তবতা।

সাহিত্য আর চলচ্চিত্র দুটি আলাদা শিল্পমাধ্যম। বুদ্ধদেব গুহর মতো বিপুল জনপ্রিয় একজন কথাশিল্পীর লেখা থেকে ছবি করা প্রধানত দুটি কারণে বিপজ্জনক। প্রথম কারণটা আগেই বলেছি। সেটা অন্য যেকোনও প্রতিষ্ঠিত, সার্থক লেখকের লেখার ক্ষেত্রেও সত্যি। অন্য কারণটা হলেন স্বয়ং বুদ্ধদেব গুহ।

রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ নিয়ে যে সর্বব্যাপী অডিওভিস্যুয়াল এফেক্ট তৈরি হয় বুদ্ধদেব গুহর লেখার ছত্রে ছত্রে, যেভাবে সন্ধে নামে, বর্ষা আসে, ফুলের গর্ভাধান হয়, মাটির গন্ধ, ঘামের গন্ধ মিশে যায় মুলারি বাইয়ের রূপ বর্ণনায়, পৃথিবীর কোন ক্যামেরার ক্ষমতা আছে তাকে তুলে ধরে!

চিত্রঋণ : পিনাকী চৌধুরী

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা সুখপাঠ

বুদ্ধদেব গুহ-র শেষ বড় লেখা ‘শেষবিকেলে সিমলিপালে’, ধারাবাহিক আত্মকথা প্রকাশিত হয়েছে দ্য ওয়ালেরই সাহিত্যপত্রিকা সুখপাঠে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More