বিজেপির কংগ্রেসিকরণ

 

অমল সরকার

নীতিন গড়কড়ির (nitin gadkari) মধ্যে যেন মাঝেমধ্যেই দেখা দেন অটল বিহারী বাজপেয়ি (Atal Bihari Vajpayee)। সমসাময়িক রাজনীতি (contemporary politics) নিয়ে বাজপেয়ি হাল্কাচ্ছলে কখনও নিজের কবিতার লাইন আউড়ে, কখনও জনপ্রিয় শায়েরি শুনিয়ে মনের কথাটি বলে দিতেন। দিন কয়েক আগে গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী বদলের সময় গড়কড়ি এক সভায় একগাল হেসে বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীরা সব আতঙ্কে ভোগেন কখন কার পদ খোয়া যায়।’

গুজরাটে বিজয় রূপাণিকে আচমকা সরানোই শুধু নয়, তাঁর উত্তরসূরী করে আনা হয়েছে আনকোরা এবং প্রথমবার বিধায়ক হওয়া একজনকে যাঁর রাজনৈতিক পরিপক্কতা সামান্য, প্রশাসনির অভিজ্ঞতা শূন্য। রূপাণির আগে সরতে হয়েছে কর্নাটকে ইয়েদুরাপ্পাকে। তার আগে মুখ্যমন্ত্রী বদল হয়েছে উত্তরাখণ্ডে। ২০০০ সালে উত্তরপ্রদেশ ভেঙে তৈরি হওয়া উত্তরাখণ্ডে এ পর্যন্ত ১০ জন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। তাঁদের সাত জনই বিজেপির (bjp)। পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিলেন একমাত্র কংগ্রেসের (congress) প্রয়াত নারায়ণ দত্ত তেওয়ারি। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীদের কারও কারও মাত্র কয়েক মাস মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসার সৌভাগ্য হয়েছে।

শোনা যাচ্ছে গদি হারাতে পারেন হিমাচল প্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীরাও। গড়কড়ির কথা অনুযায়ী তাঁরা নিশ্চয়ই আতঙ্কে আছেন। শনিবার সন্ধ্যায় অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল। মধ্যপ্রদেশের চারবারের মুখ্যমন্ত্রী সম্ভবত বিজেপির প্রথমসারির সবচেয়ে প্রবীণ নেতা শিবরাজ সিং চৌহান পর পর টুইট করলেন। কোনওটায় বলেছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে এক লাখ সরকারি চাকরি দেবেন। কোনওটির বক্তব্য, আর হাত ব্যথা করে চাপা কলের জল খেতে হবে না। দুয়ারে পৌঁছে যাবে জলের লাইন। আরও ঘোষণা করেছেন, তিনিও কৃষকদের মাথাপিছু চার হাজার টাকা করে দেবেন। শনিবারই জনদর্শন অভিযান শুরু করেছেন এই মুখ্যমন্ত্রী। যা দেখে বিজেপির অন্দরে বলাবলি শুরু হয়েছে, শিবরাজও কি তাহলে বিদায়ের বার্তা পেয়ে জনমুখী কর্মসূচি চালু করে দিয়ে যাচ্ছেন। কারও আবার অভিমত, গদি ধরে রাখতেই জনকল্যাণে মরিয়া শিবরাজ।

লক্ষ্যনীয় হল, ২০১৪-তে বিজেপিতে মোদী-শাহ জমানা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত বিজেপির ২০জন মুখ্যমন্ত্রীর আটজনকে মাঝপথে সরে যেতে হয়েছে। তারমধ্যে নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহর নিজের রাজ্যেই তা দু’বার হয়েছে।

এই জমানায় আরও একটি বিষয় দেখবার। মুখ্যমন্ত্রী পদে শুধু নতুন মুখ আনাই নয়, বসানো হচ্ছে কম বয়সিদের। বেশিরভাগেরই বয়য় পঞ্চাশের আশপাশে। ত্রিপুরায় বিপ্লব দেব, অসমে হিমন্ত বিশ্বশর্মা, উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ তো আছেনই, মহারাষ্ট্রে অধূনা প্রাক্তন দেবেন্দ্র ফডনবিসও এই তালিকাতেই পড়েন। গুজরাট, উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীরাও তাই।

রাজ্যে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী বদলে দ্রুততার কারণ নরেন্দ্র মোদী ২০২৪-এর জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। তিনি জানেন, পরের লোকসভা ভোটে আর মোদী ম্যাজিক কাজ করবে না। ভালো কাজের দৃষ্টান্তই একমাত্র ম্যাজিক হতে পারে। তাই মুখ্যমন্ত্রী বদল করে, একদিকে, সরকারি কাজে কর্পোরেট কালচার মুজবুত করছেন, অন্যদিকে, রাজনীতিতে অপরিপক্ক, প্রশাসনে অনভিজ্ঞদের বসিয়ে পাকাপোক্ত করছেন নিজের নিয়ন্ত্রণ।

কংগ্রেসও হালে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী বদল করল। সনিয়া, রাহুল গান্ধীদের হয়তো এরপরের টার্গেট রাজস্থান ও ছত্তিশগড়। তবে কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী বদল করছে ঘরোয়া কোন্দল মেটাতে। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী বদল হচ্ছে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহদের ইচ্ছায়। বিজেপির অভ্যন্তরীণ সমীকরণটা এখন এমনই যে দুই গুজরাটি নেতার কথায় সায় দেওয়াই বর্তমান সভাপতি জেপি নাড্ডার দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাজপেয়ি-আদবানির জমানার সঙ্গে এখনকার ফারাক হল তখন দিল্লিতেও সুষমা স্বরাজ, মুরলিমনোহর যোশী, রাজনাথ, আরও আগে প্রমোদ মহাজনেরা বেশ গুরুত্ব পেতেন। আঞ্চলিক মুখ ছিলেন দলের মুখ্যমন্ত্রী, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, প্রদেশ সভাপতিরা। রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী থেকে উপরাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন ভৈঁরো সিং শেখাওয়াত। সেই রাজস্থানের আর এক প্রাক্তন বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়াকে দলে এতটাই নিষ্প্রভ করে দেওয়া হয়েছে যে একটি অরাজনৈতিক মঞ্চ গড়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করছেন। এখন বিজেপি মানে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ। গুজরাট দাঙ্গার সময় প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি চাইলেই মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে এক কলমের খোঁচায় সরিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে ঘাড়ধাক্কা না দিয়ে রাজধর্ম পালনের পরামর্শ দিয়ে থেমে যান।

আজকের বিজেপির সঙ্গে মিল আছে ঠিক যে পরিস্থিতিটা তৈরি হয়েছিল নেহেরু পরবর্তী কংগ্রেসে। ইন্দিরা, রাজীব এবং পরবর্তীকালে সনিয়া-রাহুলের সময় তাঁরা অথবা তাঁদের লেজুর প্রকৃতির কিছু নেতাই শেষ কথা ছিলেন। গত শতকের নয়ের দশক পর্যন্ত চাকরিবাকরির ইন্টারভিউতে লোকঠকানো প্রশ্ন হিসাবে কংগ্রেস শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের নাম জিজ্ঞাসা করা হত। আজ শুনে অবিশ্বাস্য মনে হবে যে, মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে ঠিকঠাক জবাব দিতে পারা প্রার্থীদের অনেকেই এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে দশবার ভাবতেন। কারণ, বলতে গেলে এ-বেলা-অবেলা মুখ্যমন্ত্রী বদল হত কংগ্রেসশাসিত রাজ্যগুলিতে।

ফলে মুখ্যমন্ত্রীরা সুযোগ পেলেই দিল্লি ছুটতেন ইন্দিরা, রাজীবদের পুজো দিতে। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে দ্য স্টেটসম্যান-এ একদিন লেখা হয়েছিল, ‘মুখ্যমন্ত্রী গতকাল দিল্লি থেকে কলকাতায় ফিরেছেন। আপাতত দিন সাতেক কলকাতায় থাকবেন।’ সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের তখন কাজ হয়ে গিয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীকে দর্শন দেওয়া। কলকাতায় থাকলেও ঘন ঘন ইন্দিরাকে ট্রাঙ্ক কল করতেন।

সত্তরের দশকের গোড়ার একটি ঘটনা বলি। ইন্দিরা গান্ধী আচমকাই অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কে ব্রহ্মানন্দ রেড্ডিকে সরিয়ে দেন। তাঁর উত্তরসূরী কে হবেন? দিল্লির একটি ইংরিজি সাময়িকিতে লেখা হল, ‘মাম্মি নোজ বেস্ট।’ আরও লেখা হয়, পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হবেন তিনি দিল্লিতে বসে ইন্দিরা গান্ধী যাঁকে দেখতে পাবেন। অন্ধ্রের বিধায়করা কাকে চান বা না চান তার কোনও গুরুত্ব নেই।

তবে গুজরাটের নতুন মুখ্যমন্ত্রী বাছাই বোধহয় অতীতের সব নজির ছাপিয়ে গিয়েছে। এখন জানা যাচ্ছে, ভুপেন্দ্র যাদব নিজেও জানতেন না তাঁর নাম মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য প্রস্তাব করা হবে। বস্তুত পরিষদীয় দলের বৈঠক চলাকালীন তিনি বেশ কিছুক্ষণ ছিলেন প্রেক্ষাগৃহের বাইরে। ঠিক করে রেখেছিলেন, নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পছন্দের রেঁস্তরায় গিয়ে জমিয়ে লাঞ্চ করবেন। সেই মতো একটা ফুলেক তোড়া সঙ্গে এনেছিলেন। পাঁচ বছরে দু’বার মুখ্যমন্ত্রী বদল হল ওই রাজ্যে।

ইন্দিরা জমানায় উত্তর প্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং অন্ধ্রপ্রদেশের অবস্থা ছিল অনেকটা মোদী-অমিত শাহ জমানার গুজরাট, হিমাচল প্রদেশের মতো। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯-এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশে পাঁচবার মুখ্যমন্ত্রী বদল করে কংগ্রেস হাইকমান্ড, মানে ইন্দিরা-রাজীব।

শরদ পাওয়ার তাঁর ‘অন মাই টার্মস, ফ্রম দ্য গ্রাসরুটস টু দ্য করিডোরস অফ পাওয়ার’ বইয়ে লিখেছেন, ১৯৯১-এ রাজীব গান্ধীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর তিনি যে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি তাঁর একমাত্র কারণ, সনিয়া গান্ধীর পছন্দের মানুষ হতে না পারা। আর কে না জানে, সনিয়া গান্ধী চাননি বলেই ২০০৪-এ প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী হতে পারেনি। দশ বছর তাঁকে কাজ করতে হয়েছে যোজনা কমিশনে তাঁর জুনিয়র হিসাবে কাজ করা রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ মনমোহন সিংয়ের অধীনে। শোনা যায়, কর্পোরেট লবির প্রবল চাপের মুখে একেবারে নিরুপায় হয়ে রাহুল-প্রিয়ঙ্কার মা প্রণববাবুকে রাষ্ট্রপতি পদে কংগ্রেসের প্রার্থী করতে রাজি হয়েছিলেন।

কংগ্রেসের এই হাইকমান্ড কালচারের কারণেই উত্তরপ্রদেশে একটা সময় চন্দ্রশেখর, চরন সিং, অনেক পরে তামিলনাডুতে জিকে মুপানার, অন্ধ্রপ্রদেশে রাজশেখর রেড্ডি, বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রা আঞ্চলিক দল গড়তে বাধ্য হয়েছেন। উত্তর প্রদেশ, বিহার, বাংলা, ওড়িশায় কংগ্রেসের মুছে যাওয়ার কারণও সেই হাইকমান্ডের খবরদারি। তারও আগের ইন্দিরা দলে তাঁর বিরোধীদের রাজনৈতিকভাবে কোতল করতে শুরু করাতেই জন্ম হয়েছিল জনতা পার্টির। তারপরও মোরারজি দেশাই, জগজীবন রাম, চরন সিং, চন্দ্রশেখর জর্জ ফার্নান্ডেজ, বিজু পট্টনায়েকের মতো নেতারা সর্বভারতীয় রাজনীতিতে উজ্জ্বল ছিলেন। এখন সে সবের বালাই নেই। বিজেপি মানে মোদী-অমিত শাহ, আর ভাঙতে ভাঙতে কংগ্রেসেই একপ্রকার একা হওয়ার জোগার সনিয়া-রাহুলের।

কংগ্রেসের মতো বিজেপিতে এখনও কোনও আঞ্চলিত স্বর মাথা তোলেনি। কংগ্রেস স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছে। নেহেরুর মতো প্রাতঃস্মরণীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীর মেয়ে ইন্দিরা। তাই তাঁর বিরোধিতা, তাঁর সিদ্ধান্তে আপত্তিকে কংগ্রেস হাইকমান্ড যতটা না দলবিরোধী বলত, তার চেয়ে বেশি বলত দেশ বিরোধী।

বিজেপিতে সেটাই হল দেশ এবং হিন্দুত্বের বিরোধিতার শামিল। যেমন, অখণ্ড পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের মানুষের ন্যায দাবিদাওয়া, যথার্থ প্রতিবাদকে ইসলাম বিরোধিতা বলে দেগে দিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তি সংগ্রামের এ বছর সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ। সেই ঐতিহাসিক পর্ব থেকে আমাদের অনেক শিক্ষার একটি হল, শাসনতন্ত্রের কেন্দ্রিকরণ জাতীয় সংহতির পরিপন্থী। আর দলের নামে ব্যক্তির শাসনের ভয়ঙ্কর পরিনতির দৃষ্টান্ত তো ভারতে কংগ্রেস, পাকিস্তানে পাকিস্তান পিপলস পার্টি। দুই দেশে দুটি জাতীয় দলই সবচেয়ে বেশি অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। তা দেখে আহ্লাদিত না হয়ে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের তা থেকে বরং অনেক কিছু শেখার, বোঝার আছে। দলে শৃঙ্খলা রক্ষার নামে বাকিদের শৃঙ্খলিত করে রাখার পরিনতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More