সনিয়ার চেয়ারে অ-গান্ধী, অবশ্যই দলিত মুখ, বাঁচাতে পারে কংগ্রেসকে

অমল সরকার

দিন কয়েক আগে প্রবীণ কংগ্রেস (congress) নেতা কপিল সিব্বলের দিল্লির বাড়ির বাইরে একদল দলীয় সমর্থক বিক্ষোভ দেখায়, একটি গাড়িও ভাঙচুর করে। সিব্বলের অপরাধ, তিনি ফের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন একের পর এক কংগ্রেস নেতার দল ছেড়ে যাওয়ার ঘটনায়। সেই হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়াটিও লক্ষ্যনীয়। কংগ্রেসের গ্রুপ অফ টোয়েন্টি থ্রি (জি ২৩)-র একাধিক সদস্য-সহ সামনের সারির প্রবীণ নেতাদের অনেকেই সিব্বলের বাড়িতে হামলার নিন্দা করেছেন। স্বয়ং সিব্বল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, ‘কাদের নির্দেশে কারা এসব করছে বুঝতে পারছি না।’

রাজনীতিকরা সাধারণত উত্তর জানা থাকা বিষয়েই হাওয়ায় এই ধরনের প্রশ্ন ভাসিয়ে দিয়ে থাকেন। সিব্বলের ইঙ্গিত গান্ধী পরিবারের দিকে। প্রবীণ আইনজীবী সিব্বলের বাড়িতে হামলার ঘটনাটি চলতি রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সেটা বোঝার জন্য বছর তেইশ পিছনে ফেরা যাক।

১৯৯৮ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসের ঘটনা। এর বছর খানেক আগেই সনিয়া গান্ধী সক্রিয় রাজনীতিতে আসার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। তড়িঘড়ি তাঁকে স্বাগত জানান তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি সীতারাম কেশরী। কিন্তু বৃদ্ধ অনুমান করতে পারেননি যে বছর না ঘুরতেই সনিয়া গান্ধী তাঁর চেয়ারটাই দখল করে বসবেন। কথার কথা নয়, আক্ষরিক অর্থেই দিল্লি কংগ্রেসের সদর দফতরে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দলীয় সভাপতি হয়েছিলেন রাজীব-জায়া তথা ইন্দিরার পুত্রবধূ।

মাদক-কাণ্ডে ধৃত আরিয়ানে রাত কাটবে এনসিবি হেফাজতে, বেল ফাইলের প্রস্তুতি আইনজীবীর

জানা যায়, সীতারাম কেশরীকে সেদিন দলীয় দফতরে কিছু সময় একটি শৌচাগারে আটকে রাখা হয়েছিল। সেই ফাঁকে ৬ নম্বর আকবর রোডে এসে কংগ্রেস সভাপতির চেয়ারে বসেন সনিয়া। ৮২ বছর বয়সি বৃদ্ধ সীতারাম বাইরে বেরিয়ে এসে দেখেন তাঁর ঘরের নেমপ্লেট বদলে গেছে। সনিয়াকে পুষ্পস্তবক দিয়ে সভাপতির আসনে বসানোর সুযোগ এবং সম্মানটুকুও দেওয়া হয়নি তাঁকে। এই ঘটনাপ্রবাহের সময় কংগ্রসে দফতর ‘সনিয়া লাও কংগ্রেস বাঁচাও’, ‘সনিয়া লাও দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে সরগরম ছিল। এত কাণ্ডের কারণ, গান্ধী-পরিবারের পেয়াদারা আভাস পেয়েছিলেন, ৮২ বছরের বৃদ্ধ সীতারামও ক্ষমতার হাতবদলের এই অভ্যুত্থান মেনে নেবেন না। বৃদ্ধ সীতারামের লাঞ্ছনার সেদিন একজনও প্রতিবাদ করেননি।

সেই কংগ্রেসের এখন এমন অবস্থা যে সনিয়া-রাহুল-প্রিয়াঙ্কাই দলে একঘরে হওয়ার মুখে। দলটির দশা অনেকটাই মুর্শিদাবাদে ভাগিরথীর ভাঙনের মতো। বছরের পর বছর পাড় ভাঙছে তো ভাঙছেই। ভাঙনের কোনও বিরাম নেই। বিজেপিতে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহর জমানা শুরুর পর এ পর্যন্ত বিভিন্ন রাজ্য মিলিয়ে কংগ্রেসের জনা ৪০ বড়মাপের নেতা দল ছেড়েছেন, যাঁরা পার্টির সংগঠন ধরে রাখার পাশাপাশি ভোট-ক্যাচারও বটে।

আরও স্পষ্ট করে বলা ভাল, নিজের এলাকায় বা রাজ্যে তারাই কংগ্রেস। যেমন বাংলায় মুর্শিদাবাদে ‘অধীর কংগ্রেস’। দীর্ঘ সময় মালদায় ছিল ‘গনি কংগ্রেস।’ ২০১৪-র লোকসভা ভোটের আগে দল ছাড়েন কর্নাটকের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণা। সাম্প্রতিক অতীতে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া দল ছাড়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটিয়ে ফের বিজেপিকে ক্ষমতায় ফিরিয়েছেন। গান্ধী পরিবারের, বিশেষ করে রাহুল গান্ধীর আস্থাভাজন ছিলেন জ্যোতিরাদিত্য। ইউপিএ সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দফতরের মন্ত্রীও করা হয়েছিল তাঁকে।

তার আগে উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের প্রভাবশালী নেতা এনডি তিওয়ারি, মহারাষ্ট্রের নারায়ণ রানে, গুজরাটে শঙ্কর সিং বাঘেলা দল ছাড়েন। বাঘেলাকে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রে ইউপিএ-১ সরকারের মন্ত্রী করা হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশে সৎপাল মহারাজ, রীতা বহুগুনা যোশী, জগদম্বিকা পালের মতো নেতাও দল ছেড়েছেন। কেউ সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। কেউ নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছেন। পাঞ্জাবের সদ্য অপসারিত মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং কংগ্রেস ছাড়ছেন। নিজের দল গড়বেন বলে ঘোষণা করেছেন। ছত্তীসগড়ে কংগ্রেসের প্রাক্তন কার্যকরী সভাপতি রামদয়াল বর্তমানে বিজেপিতে। উত্তর-পূর্ব ভারতে অসমের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, অরুণাচলের প্রেমা খাণ্ডুরি, মণিপুরের এন বীরেন সিংরা কংগ্রেস থেকেই বিজেপিতে গিয়েছেন।

তাহেরপুরে কিডনি বেচেছেন একই এলাকার ৬ জন! অভাবের তাড়নায় বিপন্ন জীবন

শুধু একলা নেতা নয়, দলবদ্ধ হয়ে দল ছাড়ার একাধিক ঘটনারও সাক্ষী বিগত কয়েক বছর। কর্নাটকে তো কংগ্রেসের জোট সরকারটাই হাতছাড়া হয়ে গেল মধ্যপ্রদেশের মতো। একই কথা প্রযোজ্য মণিপুর আর গোয়ার ক্ষেত্রেও। গোয়ারই প্রাক্তন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী দিন কয়েক আগে তৃণমূলে যোগ দিলেন। দক্ষিণে জয়ন্তী নটরাজন, জিকে ভাসানের মতো নেতারাও কংগ্রেস ছেড়েছেন।

লক্ষ্যনীয় হল, বিগত কয়েক বছরে কংগ্রেস ছেড়ে যাওয়া নেতাদের প্রায় একশো শতাংশই গান্ধী পরিবার, বিশেষ করে রাহুল গান্ধীর কাছের মানুষ ছিলেন। সেই সুবাদে কেন্দ্রে ইউপিএ সরকার কিংবা রাজ্য সরকার এবং সংসদে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। এই নেতারা সকলে নীতিনিষ্ঠ এবং কংগ্রেসে ‘দমবন্ধ হয়ে আসছিল’ বলে দল ছেড়েছেন এমন কোনও সরল সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো কঠিন। বরং অনেক বড় সত্য হল, দিল্লির বর্তমান শাসক দলের এখন পয়লা নম্বর জাতীয় কর্মসূচি হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্য দল ভাঙিয়ে নিজের দল ভারী করা। বিজেপিতে অটল বিহারী বাজপেয়ী-লালকৃষ্ণ আডবানিদের সময়ের সঙ্গে মোদী-শাহর জমানার সবচেয়ে বড় ফারাক হল, এই দলটি আর ‘পার্টি উইথ এ ডিফারেন্স’ নয়। মোদীর মন্ত্রিসভার এক তৃতীয়াংশের বেশি মন্ত্রী ভিন্ দল, বিশেষ করে কংগ্রেস ছেড়ে আসা। বাজপেয়ী-আডবানিদের দলটি মোদী-অমিত শাহদের হাতে পড়ে যেন ‘রাজনীতির অনাথ আশ্রম’ হয়ে উঠেছে। প্রতিপক্ষ দলে ছিপ ফেলে বসে আছে কে কখন টোপ গেলে।

তবে কংগ্রেসের এখন যা অবস্থা, তাতে এসব বলেও সনিয়া-রাহুল-প্রিয়াঙ্কাদের দল ধরে রাখা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়বে। এখনও কংগ্রেসে থাকায় চিদম্বরম, সিব্বল, গুলাম নবি আজাদরা যে কথাটা সরাসরি বলছেন না, সেটাই বলছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদ পওয়ারের মতো প্রাক্তন কংগ্রেসিরা। পওয়ার হালে বলেছেন, কংগ্রেসের জমিদারি গিয়েছে কিন্তু জমাদারের মেজাজটা যায়নি। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, বিজেপির মোকাবিলায় কংগ্রেস ব্যর্থ, পরপর দুটি লোকসভা ভোটে এবং রাজ্যে রাজ্যে বিধানসভা ভোটে তা প্রমাণিত।

কিন্তু একটু লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, প্রাক্তন কংগ্রেসিরা আসলে বর্তমান বিক্ষুব্ধ কংগ্রেসিদের মনের কথাটাই বলছেন। তা হল, কংগ্রেস সভাপতির ভার আবার গান্ধী পরিবারের বাইরের কারও হাতে দেওয়া হোক। ২০১৭-তে রাহুল গান্ধী সভাপতি হওয়ার দু-বছরের মাথায় সভাপতির পদ ছেড়েছেন ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বিপর্যয়ের পর। সেই থেকে সনিয়া গান্ধী কার্যনির্বাহী সভাপতি।

একটা সময় প্রিয়ঙ্কা গান্ধীকে নেতৃত্বে আনার দাবি বেশ জোরালোভাবেই উঠেছিল দলে। কিন্তু তিনিও উত্তরপ্রদেশে ব্যর্থ হয়েছেন। সেই তাঁকেই যোগীর বিপরীতে মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী করার কথা হচ্ছে শুনে নেহেরু-ইন্দিরার রাজনীতির কর্মভূমিতে দলে দলে নেতা-কর্মীরা পার্টি ছাড়ছেন। এরই মধ্যে দিন কয়েক আগে দলের ছাত্র ও যুব সংগঠকে দিয়ে বলানো হয়েছে রাহুল গান্ধীকে আবার সভাপতির পদে ফেরানো হোক।

কিন্তু কংগ্রেসে এখন যে পরিস্থিতি তাতে গান্ধী পরিবারের প্রতি আস্থা-সমর্থন কতটা অটুট, সন্দেহ আছে। বরং, চলতি রাজনীতিতে কংগ্রেসের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ হাজির হয়েছে দলকে ঘুরে দাঁড় করাতে। তার জন্য দরকার সনিয়া গান্ধীর উদারতা। যেভাবে তিনি ২০০৪ এবং ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, সেইভাবে এখন তাঁর উচিত হবে গান্ধী পরিবারের বাইরের কাউকে হাতে ধরে এনে সভাপতির চেয়ারে বসানো। সেই নেতা দলিত পরিবারের কেউ হলে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার পাশাপাশি দলেরও মঙ্গল করবেন তিনি। কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে যাঁকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে ফেলে তিনি দলের মাথায় বসেছিলেন সেই সীতারাম কেশরী জাতিতে ছিলেন অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণির। কংগ্রেসের একাংশ অবশ্য বলার চেষ্টা করে, তিনি বানিয়া ওবিসি। কিন্তু রাজনীতির লোকজন জানেন সীতারাম রাজনীতিতে কোন সম্প্রদায়কে প্রতিনিধিত্ব করতেন।

ফের নিম্নচাপের ভ্রূকুটি, রবিবার ভিজল কলকাতা, উত্তরবঙ্গে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস

হালে জাতীয় রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনটি হল, বিজেপি ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির পাশাপাশি জাতপাতের অঙ্ককেও সমান গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে। তাদের নয়া সমীকরণের মস্ত বড় পরীক্ষাগার এখন ধর্ম-রাজনীতির গর্ভগৃহ উত্তর প্রদেশ। ওই রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে তাদের জাত রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বাংলায় মাছের বাজারে এক সময়ে অনাদরে পরে থাকা লাইলেনটিকা, তেলাপিয়া, চারাপোনা, গ্রাসকার্প, ভোলা, ফ্যাসা এখন মুহূর্তের মধ্যে উবে যায়। দামও দিনকেদিন চড়ছে। তেমনই রাজনীতিতেও দলিত, অন্যান্য অনুন্নতদের ভোটের মূল্যও গোটা দেশে তরতর করে বাড়তে শুরু করেছে। এই বাস্তবতা মেনেই বোধহয় পাঞ্জাবে কংগ্রেস একজন দলিত শিখকে মুখ্যমন্ত্রী করল। এখন কংগ্রেসের মাথাতেও তেমন কাউকে বসালে দলটা টিকে যেতে পারে, নইলে সমূহ বিপদ কংগ্রেসের এবং অ-বিজেপি দলগুলিরও। কংগ্রেস দলিত মুখকে নেতৃত্বে আনলে বিজেপি খানিক বিপাকে পড়বে সন্দেহ নেই। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ তোলার অস্ত্রটি ভোঁতা হয়ে যাবে এবং দলিত সভাপতিকে আক্রমণ করার আগে সাত বার ভাবতে হবে গেরুয়া শিবিরকে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More